১২ এপ্রিল

Poetry illustration

উৎসর্গ: দেবারতি মিত্র


বন্ধ ঘরে বইগুলো ঘেমে-ঘেমে যায়।
দেয়ালের কোণ থেকে উই নামছে টরটর টরটর
ক’দিন পরেই সব ছারখার করে দেবে।
কথামৃত না গোল্ডেন ট্রেজারি
আজকাল তুমি কী পড়ছ?
ত্বক ফেটে-ফেটে রক্ত পড়ছে তবু
এই উই-ধরা ঘরে আমি খুঁজতে এসেছি
তোমার না-শেষ হওয়া পাণ্ডুলিপি।

তোমার অনেক আগে সূক্ষ্ম হয়ে গেছি বলে
এখন ক্রমশ ফের স্থূল হতে ইচ্ছে যায়।
এখন কখনও ছুঁতে পারি কিছু-কিছু বই,
তোমার বিছানা, হাত বুলিয়ে দিচ্ছি মাথার বালিশে।
কতদিন মাথা রাখোনি এখানে তবুও মাথার দাগ
অতিকায়, স্পষ্ট।

কেটে নেওয়া গাছ তার একনিষ্ঠ শিকড় ভোলেনি।


পশ্চিমদিকে কি সূর্য ওঠে কোনওদিন?
রোদের ভীষণ ইচ্ছে সে কিছুটা বেঁকে যায় যেন,
কে তাকে ঘুরিয়ে দেবে ঘাড় ধরে টেনে?
কে বলবে, তুমি আমার জন্যেই এসেছ এখানে,
মোম রাখো কাঠ হওয়া হৃদয়ে আমার।

শীত পড়তে-না-পড়তেই জন্মেছে অনেক প্রজাপতি।
জানলার গ্রিল গলে ঘরে ঢুকছে,
             আবার বেরিয়ে যাচ্ছে…
ওরা কেউ দেখছে না, কাঠ হয়ে আসা
শরীর আমার, শুধু তুমি রোদ হয়ে পায়ে
পড়েছ বলেই ধীরক্রমে বেঁকে গিয়ে
যাত্রাপথ ছেড়ে দিতে চাইছি।

তুমি যাও আগে, নইলে জন্মদিন
কে আর সন্তান স্নেহে সাজিয়ে রাখবে?


কালো ছেলে শুয়ে-শুয়ে মা-মা করে…
যোগিয়া বাড়ির সিঁড়ি এখন কৈলাস—
পার্বতী আবার উঠছেন ছেলের কান্না শুনে;

আজ তো জন্মদিন, মা কোথায়?
মুখেতে আঙুল পুড়ে ছেলে শুয়ে-শুয়ে ভাবে,
বাইরে তখন বসন্তের হাওয়া অতিশয় পৌত্তলিক।
পশ্চিমের বারান্দায় সূর্য হেলে পড়ছে।

হাওয়া দিচ্ছে, ফরফর উলটে যাচ্ছে বইয়ের পাতা
ভোর থেকে অপেক্ষা-অপেক্ষা করে যাচ্ছি,
আসবার সময় হল এই সন্ধেবেলা?

চিৎ হয়ে হাত-পা ছোড়া ছেলে মা-কে দেখে
আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করে।
কোলের ছেলেকে দেখে মা তাকে আবার
কোলে নিতে চায়।

এত সূক্ষ্ম তারা যে, কেউ কাউকে ছুঁতেই পারে না!


সহজে যে-কথা শুনতে পাও না
সেই কথা শোনাচ্ছি তোমাকে।
রোদে ফেটে চৌচির আকাশ,
এমন অস্থির প্রাণ তার মধ্যে খাবি খেতে-খেতে
পশ্চিমে মিলিয়ে গেল।
এই শুধু জন্মদিন আমার এখন।

সময়বিহীন এক অকূল সমুদ্রে
ডুবে যাওয়া নাবিকের মতো
জলের আকার খুঁজে মরি,
জলের আকার দিয়ে সেই কথা
চিরে-চিরে গলা চিরে যদি কোনোদিন
সহজে পৌঁছয়… কোলে ফিরে এসো
এই অশরীর চাবগে-চাবগে
সিধে করে রেখেছি এখনও।
পথের ঠিকানা নেই, ঠিকানাই পথ রেখে গেছে।


ছেলেবেলা না বড়বেলা কোনটা ভাল
এ-কথা জিজ্ঞেস করে-করে মাথা ধরিয়ে দিতে।
আজ আর কিছুই জিজ্ঞেস করবার নেই।

আমিও অশান্ত মনে গন্ধরাজ গাছ হয়ে আছি।
অনেক অনেক কুঁড়ি চারপাশে।
কোনটা পাখি ঠুকরে দেয়, কোনটা হনুমানে খায়,
এই চিন্তা হয়। এর মধ্যে কোন কুঁড়িতে তোমার প্রাণ
আবার জন্মাবে বলে মনস্থির করেছে, সে-কথা
ভেবে-ভেবে দিশাহীন হয়ে যাই। শরীরেই আছ,
তবু হাত দিয়ে কিছুতেই আগলে রাখতে পারি না।
ফুঁ দিয়ে পোকার সংক্রমণ থামাতে পারি না।

এই জন্মেও কি ঈশ্বর আমাকে মা হতে দেবেন না?