প্রকাশ্য লজ্জার দলিল

জেফ্রি এপস্টিন! কে জানত, এই একটা নামের সূত্রেই বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গোপনীয় তথ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। ‘এপস্টিন ফাইল’ নামটা বিভীষিকা হয়ে দাঁড়াবে বড় অংশের হোমরাচোমরাদের কাছে। ১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া এপস্টিনের বাবা ছিলেন সিটি পার্ক বিভাগের কর্মচারী এবং মা স্কুলে সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ছোটবেলায় আর্থিক স্বচ্ছলতা তো দূরের কথা, তাঁর জীবন ছিল সাধারণ শহুরে বালকের মতোই। কলেজের পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি প্রথমে শিক্ষকতায় যোগ দেন এবং নিউ ইয়র্কের নামী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডালটন স্কুলে গণিত পড়াতে শুরু করেন। এই স্কুলেই উচ্চবিত্ত পরিবারগুলির সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়, যা পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

সেখান থেকেই যোগাযোগের সূত্রে তিনি চাকরি পান ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ সংস্থা বেয়ার স্টার্নসে। বিনিয়োগ জগতে ঢোকার পর খুব দ্রুতই তিনি ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পান এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের একটি বিনিয়োগ-সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়ার সংস্থা গড়ে তোলেন। আশ্চর্যের বিষয়, এর পর থেকেই তাঁর সম্পদ অস্বাভাবিক গতিতে বাড়তে থাকে। তিনি বিলাসবহুল প্রাসাদ, ব্যক্তিগত বিমান এবং ক্যারিবিয়ানে ব্যক্তিগত দ্বীপের মালিক হয়ে ওঠেন। তবে ঠিক কীভাবে তিনি এত বিপুল অর্থ উপার্জন করেছিলেন, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা আজও মেলেনি। এই রহস্যময় সম্পদবৃদ্ধিই তাঁকে আরও বিতর্কিত করে তোলে। ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সেলিব্রিটি— অনেক উচ্চপর্যায়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। বাইরে থেকে তিনি ছিলেন বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ব্যক্তিগত বিমান, প্রাসাদোপম বাড়ি ও ব্যক্তিগত দ্বীপের মালিক। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ অপরাধের চিত্র প্রকাশ্যে আসে।

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি নাবালিকা মেয়েদের চাকরি বা টাকার প্রলোভন দেখিয়ে নিজের বাড়ি ও দ্বীপে নিয়ে গিয়ে যৌন শোষণ করতেন এবং একটি সংগঠিত পাচারচক্র চালাতেন। ২০০৫ সালের পর থেকে একের পর এক অভিযোগ জমা হতে থাকে। প্রথমদিকে আইনের ফাঁকফোকর ও প্রভাবের জোরে তিনি কঠোর শাস্তি এড়িয়ে গেলেও, পরবর্তীকালে ফেডারেল তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন পাচার ও ষড়যন্ত্রের গুরুতর মামলা গড়ে ওঠে। ২০১৯ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু বিচার শুরু হওয়ার আগেই নিউ ইয়র্কের একটি জেলে তাঁর মৃত্যু ঘটে, যা সরকারিভাবে ‘আত্মহত্যা’ বলে ঘোষণা করা হলেও তা নিয়ে আজও বিতর্ক ও সন্দেহ রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন : কোন অঙ্কে নিউ ইয়র্কের মন জিতলেন জোহরান মামদানি?
লিখছেন অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়…

তদন্তে উঠে আসে, তিনি একা বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধ করেননি। বরং একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন, যা অনেকটা কর্পোরেট কাঠামোর মতো কাজ করত। এই চক্রের প্রথম ধাপ ছিল ‘রিক্রুটমেন্ট’, অর্থাৎ অল্পবয়সি, আর্থিকভাবে দুর্বল বা পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত মেয়েদের খুঁজে বের করা। তাঁদের কাছে ম্যাসাজের কাজ, সহজে টাকা আয়, মডেলিংয়ের সুযোগ ইত্যাদি প্রলোভন দেখানো হত। প্রথমবার গেলে কয়েকশো ডলার দেওয়া হত, যাতে বিশ্বাস তৈরি হয়। তারপর বলা হত, আরও কাউকে নিয়ে এলে বেশি টাকা পাবে। এইভাবে ভুক্তভুগীকেই আবার নতুন ভুক্তভুগী আনার মাধ্যম বানানো হত, ফলে পাচারচক্রটি নিজেই নিজেকে বিস্তার করত।

এর পর ছিল পরিবহণ ও নিয়ন্ত্রণের ধাপ। মেয়েদের নিউ ইয়র্ক বা ফ্লোরিডার বিলাসবহুল বাড়ি, কখনও ব্যক্তিগত বিমান, কখনও ক্যারিবিয়ানের ব্যক্তিগত দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হত। যাতায়াতের সমস্ত খরচ, থাকার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা এমনভাবে সাজানো থাকত, যাতে বাইরে থেকে কিছুই সন্দেহজনক মনে না হয়। কিন্তু একবার ভেতরে ঢোকার পর তাঁদের ওপর মানসিক চাপ, ভয় দেখানো, অর্থের লোভ বা সামাজিক অপমানের আশঙ্কা তৈরি করে আটকে রাখা হত। অনেকের ফোন বা যোগাযোগের পথ সীমিত করে দেওয়া হত। এই গোটা প্রক্রিয়ার প্রমাণ মিলেছে নানা নথিতে। ফ্লাইট লগ, পেমেন্ট রেকর্ড, যোগাযোগের তালিকা, ইমেল, সাক্ষ্য ও জবানবন্দিতে। এই ঘটনার তদন্ত চালায় ‘Federal Bureau of Investigation’ বা এফবিআই এবং মামলাগুলি ওঠে নিউ ইয়র্কের ‘United States District Court for the Southern District of New York’–এ।

এসব নথি থেকেই স্পষ্ট হয়, এটি কোনও একদিনের বা এক-দু’জনের ঘটনা নয়। বরং বহু বছর ধরে চলা একটি সংগঠিত শোষণচক্র। এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ম্যাক্সওয়েলর বিরুদ্ধেও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তিনি মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তাঁদের আস্থা অর্জন করে পরে এপস্টিনের কাছে নিয়ে যেতেন, অর্থাৎ নিয়োগ ও প্রভাবিত করার কাজে সক্রিয় ভূমিকা নিতেন। সব মিলিয়ে, এপস্টিন ফাইলের পাচারচক্র দেখায়, কীভাবে অর্থ, সামাজিক প্রভাব এবং ক্ষমতার আড়ালে একটি অপরাধচক্র বছরের পর বছর ধরে আইনের চোখ এড়িয়ে চলতে পারে। এখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, ব্যবহারযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখা হয়েছে। তাই এই ফাইল কেবল আইনি নথির সংগ্রহ নয়। এটি আধুনিক সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানব-পাচারের নির্মম বাস্তবতার এক শক্তিশালী প্রমাণপত্র।

এপস্টিন কাণ্ড সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল এই কারণে যে, মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিসর ছিল অস্বাভাবিকভাবে বিস্তৃত এবং সেই তালিকায় বিশ্বের বহু প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী ও সেলিব্রিটির নাম উঠে আসে। তাঁর ফোনবুক, ইমেল, ব্যক্তিগত বিমানের ফ্লাইট লগ, পার্টির অতিথি তালিকা এবং আদালতে জমা হওয়া নথিতে দেখা যায়, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই ক্ষমতার কেন্দ্রের মানুষদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। এই তালিকায় যেমন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিমানে ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া গিয়েছে, তেমনই পুরনো সামাজিক যোগাযোগের সূত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও উঠে এসেছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যানড্রিউয়ের বিরুদ্ধে এক ভুক্তভুগীর সরাসরি অভিযোগ থাকায় তাঁর নাম সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করে এবং পরে তিনি আইনি সমঝোতার পথ নেন। ব্যবসায়িক জগতে বিল গেটসের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের খবর প্রকাশ্যে আসে, আর ধনকুবের লেসলি ওয়েক্সনের দীর্ঘদিন তাঁর আর্থিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে জানা যায়। এমনকী, বৈজ্ঞানিক মহলের মানুষ, যেমন স্টিফেং হকিংস কোনও অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণে তাঁর দ্বীপে গিয়েছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ আছে।

এপস্টিন ফাইলকে শুধু যৌন হেনস্থা বা পাচারচক্রের ফাইল বললে বিষয়টা অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সত্যি কথা বলতে, এই ফাইলের কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই রয়েছে নাবালিকাদের যৌন শোষণ, প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া, সংগঠিত পাচারচক্র এবং সেই সংক্রান্ত অপরাধের প্রমাণ, কিন্তু এর পরিধি তার থেকেও অনেক বড়। মার্কিন ধনকুবের জেফ্রির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর যখন তদন্ত শুরু হয়, তখন প্রথমে সংগ্রহ করা হয় ভুক্তভুগীদের জবানবন্দি, সাক্ষ্য, পেমেন্ট রেকর্ড, যোগাযোগের তালিকা, ব্যক্তিগত বিমানের ফ্লাইট লগ, বাড়ি ও দ্বীপ থেকে উদ্ধার হওয়া ছবি–ভিডিও ও ডিজিটাল প্রমাণ। এগুলো সরাসরি যৌন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তদন্ত যত গভীর হয়, ততই সামনে আসে তাঁর বিপুল অর্থসম্পদের উৎস, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন, অফ-শোর অ্যাকাউন্ট, ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিলাসবহুল সম্পত্তি কেনাবেচা, দাতব্য সংস্থায় অর্থপ্রদান, এমনকী, কীভাবে আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তিনি বহু বছর কঠোর শাস্তি এড়িয়ে গিয়েছিলেন— তারও বিশদ তথ্য।

মার্কিন ধনকুবের জেফ্রি এপস্টিনের ব্যক্তিগত যোগাযোগের তালিকায় বহু রাজনীতিক, কূটনীতিক ও ক্ষমতাবান ব্যক্তির নাম উঠে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মায় যে, অভিজাত মহলের জন্য আলাদা আইন চলে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম দফার মামলায় তুলনামূলক হালকা শাস্তি এবং পরে দীর্ঘদিন মামলা চাপা পড়ে থাকার ঘটনাও এই সন্দেহকে আরও জোরালো করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আইনব্যবস্থা ও প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয় এবং Federal Bureau of Investigation ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ে। আন্তর্জাতিক স্তরেও এর প্রভাব পড়ে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যানড্রিউয়ের নামে অভিযোগে জড়ানোয় তাঁকে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়, যা ব্রিটিশ রাজনীতিতেও বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের খবর প্রকাশ্যে আসায় রাজনৈতিক বিরোধীরা একে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তালিকায় রয়েছে, এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এলন মাস্কের নামও। জানা যাচ্ছে, নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস নাকি এপস্টিনের থেকে তাঁর পনেরো বছর বয়সি ছেলের ঘরের জন্য চেয়েছিলেন এক নগ্ন নারীর ছবি। নোয়াম চমস্কি থেকে মীরা নায়ারের মতো প্রগতিশীলদের নামও এই তালিকায় উঠে এসেছে, বিভিন্ন মহলে যা অস্বস্তি বাড়িয়েছে। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম উঠে আসা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। সময়ের সঙ্গে আরও কত তথ্য কোন ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসবে, তা এখনও আন্দাজের বাইরে। ফলে এপস্টিন ফাইল কেবল একটি অপরাধের মামলা হয়ে থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি, এলিট নেটওয়ার্কের অস্বচ্ছতা এবং আইন কি সবার জন্য সমান— এই মৌলিক প্রশ্নের প্রতীক। অর্থাৎ, এই ফাইল বিশ্বরাজনীতিতে নীতির চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে বিশ্বাস ও নৈতিকতার স্তরে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রথমবার এত স্পষ্টভাবে দেখেছে ক্ষমতার অন্দরমহলের অন্ধকার দিক।

আমেরিকার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র চাইলে কি এপস্টিন কাণ্ড পুরোপুরি চাপা দিতে পারত না? না কি উল্টে তারাই ইচ্ছে করে এই ফাইল জনসমক্ষে ভাইরাল করেছে? বাস্তবতা আসলে এই দুই চরমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। এপস্টিনের  বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার পর বিষয়টি আর শুধু প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকেনি। তদন্ত করেছে Federal Bureau of Investigation, মামলা পরিচালনা করেছে United States Department of Justice, আর নথি জমা পড়েছে স্বাধীন আদালতে, যেমন United States District Court for the Southern District of New York, যেখানে বহু তথ্য আইনত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। ফলে পুরো বিষয়টি গোপন রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে একই সঙ্গে সরকার— কীভাবে, কতটা এবং কোন অংশ প্রকাশ পাবে— তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখেছে। অনেক নথি রেড্যাক্ট করা, সংবেদনশীল প্রমাণ সিল করে রাখা বা ধাপে-ধাপে তথ্য প্রকাশ করা তারই ইঙ্গিত। অর্থাৎ, এটি নিছক দুর্ঘটনাবশত ফাঁস নয়, আবার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রকাশও নয়। বরং একধরনের নিয়ন্ত্রিত উন্মোচন, যেখানে রাষ্ট্র বাধ্য হয়ে সত্য সামনে এনেছে, কিন্তু সেই সত্যের পরিধি নিজস্ব কৌশলে সীমিতও রেখেছে।

ক্ষমতাবান রাষ্ট্র কি ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে না? ইতিহাস বলছে, করে। গোয়েন্দা দুনিয়ায় গোপন তথ্য মানেই সম্ভাব্য লিভারেজ। কিন্তু এই ফাইলের ক্ষেত্রে ছবিটা ততটা সরল নয়। কারণ এই নথিগুলো কোনও ব্যক্তিগত সিন্দুকে বন্দি নেই। তদন্ত ও সংরক্ষণ করেছে Federal Bureau of Investigation এবং United States Department of Justice, আর মামলার বড় অংশ উঠেছে স্বাধীন আদালতে, যেমন United States District Court for the Southern District of New York, যেখানে জমা পড়া নথির অনেকটাই আইনত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। অর্থাৎ এগুলো আর গোপন অস্ত্র নয়, বরং উন্মোচিত তথ্য। ব্ল্যাকমেলের মূল শর্তই হল গোপনীয়তা। যা সবার সামনে চলে এসেছে, তা দিয়ে কাউকে ভয় দেখানো যায় না। তার ওপর রাজনৈতিক বাস্তবতাও ভিন্ন কথা বলে। কোনও রাষ্ট্রনেতা যদি এই ফাইল ব্যবহার করে কাউকে চাপে ফেলতে চান, তাহলে সেটি আইনি ও সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়া, বিরোধী দল, এমনকী, প্রশাসনের ভেতর থেকেই প্রতিরোধ তৈরি হবে। মার্কিন ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট একা কোনও তদন্ত ফাইল ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন না। করলে সেটাই নতুন কেলেঙ্কারিতে পরিণত হবে। ফলে কূটনৈতিক ব্ল্যাকমেলের বদলে উল্টো রাজনৈতিক আত্মঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। এপস্টিন ফাইলের বহু তথ্যে কেবল যোগাযোগ বা সামাজিক সম্পর্কের ইঙ্গিত আছে, সরাসরি অপরাধের প্রমাণ নয়। তাই এগুলো দিয়ে আইনি বা কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে তথ্য স্পষ্ট, অকাট্য এবং গোপন। সেটাই কার্যকর অস্ত্র হয়। অর্ধেক-প্রকাশিত, বিতর্কিত তথ্য নয়। ফলে এই ফাইলের প্রভাব গোপন দর-কষাকষির টেবিলে নয়, বরং জনমত ও নৈতিকতার আদালতে বেশি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এপস্টিন ফাইল গুপ্তচরবৃত্তির ব্ল্যাকমেল-ডকুমেন্ট হয়ে ওঠেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছে প্রকাশ্য লজ্জার দলিল। অর্থাৎ এটি রাজনৈতিক অস্ত্রের চেয়ে বেশি ক্ষমতার অন্দরমহলকে উন্মুক্ত করে দেওয়া এক সামাজিক আয়না, যেখানে লুকোনোর জায়গা নেই, কেবল জবাবদিহিই শেষ সত্য।