‘অশরীরি ইমেজ’
এই পর্ব দুই হাংরি শিল্পী নিয়ে— করুণানিধান মুখোপাধ্যায় ও অনিল করঞ্জাই। ১৯৬২ সালে, বেনারসের চার চিত্রশিল্পী বিভাস দাস, অনিল করঞ্জাই, সুবীর চট্টোপাধ্যায় ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় তৈরি করেন এক গ্রুপ— ‘ইউনাইটেড আর্টিস্ট’। সেই গ্রুপের সদস্য করুণানিধান হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সংযুক্তি প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালে লিখেছিলেন— ‘…সেই সময় সারা পৃথিবীতেই হুলুস্থুল চলছে সাহিত্য, কবিতা, শিল্প ও স্বাধীনভাবে বাঁচা নিয়ে। এ্যামোন সময় একজনের আবির্ভাব। আগুনে ঘা দেওয়ার মত! এ্যালেন গীন্সবার্গ— বীট কবি। তাকে নাকি মলয় রায়চৌধুরী নামে কোনো কবি আমাদের কথা বলেছে। কাশীতে একদল শিল্পী— সাহিত্য নিয়ে আন্দোলন করছে। তাদের সাথে দ্যাখা করতে। সেই থেকেই ধীরে ধীরে হাংরিদের সাথে পরিচয়।’
সুবিমল বসাকের সংগ্রহে করুণানিধান মুখোপাধ্যায়ের লেখা অনেকগুলি চিঠি আছে, সেইসঙ্গে স্কেচ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কার্ড ইত্যাদি। সেই চিঠিপত্র থেকেই উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তুলে ধরা হবে।
28.10.65 Karuna Nidhan Mukherjee
D.48/151, Missirpokhra.
Varanasi
Dear
Subimal দা—
আজ ভোরে ৫-৪৫ মি: আমার এক মাত্র ছেলে ‘আরক’ মারা গেলো। Bronko নিমোনিয়াতে। আমি একা ওকে নিয়ে চলে গেলাম— ওপারে বালুতে তারপর অনেক কিছু ভাবলাম, পাথর বেঁধে মাঝগঙ্গায় ফেলে দিলাম। বাড়ী ফিরে এসেছি। এখানে আমার বৌ ভীষণ কাঁদছে শান্তনার কোন শব্দ নেই আমার কাছে তাই মনের কথা একটা কাগজে লিখে এগিয়ে দিলাম ওর হাতে
কালা মন আর পোড়া ঘা নিয়ে
আমি চাই বাঁচতে
মৃত্যু তাই তুমি আমায় মারতে পারবে না।
আমি হাসি কান্নাকে অনুবাদ করে
দুঃখ তাই তুমি আমায় কাঁদাতে পারবে না।
একবার দুবার তিনবার পড়লো তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টী ম্লান হাসলো। ব্যাস
আপনাদের কাব্য দর্শন ও মলয়দার ‘জখম’ এ দুটোই আমার কাছে ছিলো (আপনার পাঠানো) কিন্তু নানা কারণে পড়তে পারিনি, আজ দুপুর বেলায় অফুরন্ত সময় থাকাউ তুলে নিলাম পড়তে। প্রায় ঘণ্টা চারেক এক ভাবে পড়ে শেষ করলাম দুটোই। আরও পড়তে ইচ্ছে করছে কেন জানিনা। কেন জানিনা সব পড়ার পর থেকে আমার মন এক অপূর্ব শান্তি অনুভব করছে মনে হচ্ছে এ সব কথা, আমার কথা। সাহিত্য চর্চা বহুদিন করিনি কারণ কেন জানিনা ভীষণ মনোটোনাস লাগে তাই ছবির জগতেই নিজেকে নিয়ে মেতেছিলাম। আমার পরিচয় না দিয়েই সব বলে যাচ্ছি— সংক্ষিপ্ত পরিচয়। জন্ম— কাশীতে। বাবা তখন I.N.A. নেতাজীর গ্রুপে। তারপর ২.৩ বছরে আমায় বাবা নিয়ে যান Rangoon এ। বাবাও চাকরি নেন Police এ। I.N.A. ছেড়ে দেন। প্রায় ১০ বছর এক নাগাড়ে Rangoon এ থাকা। তারপর সেই সাইরেন। Black-out এর মধ্যে জাহাযে চড়ে বর্ম্মা থেকে একেবারে খিদির পুর। সেখান থেকে আবার কাশীতে Permanent থাকা। বহুদিন পর জানতে পারলাম বাবা কোন বার্মিজ মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমি তখন অনেক ছোট। সেই থেকে শুরু হলো লড়াই সমাজ, সংস্কৃতি ও নিজের সঙ্গে। লেখাপড়া হলোনা অর্থাৎ ১০ ক্লাসের দরজায় পৌঁছে বাবার টাকার সাহায্য বন্ধ হয়ে গেলো। আমি তখন থেকেই নেমে এলাম রোজগারের পথে। সেই থেকে প্রায় লেগে আছি জানিনা কি হবে। এদিকে আমার মধ্যের শিল্প জেগে উঠলো 1953 তে। ছোটবেলায় আঁকার ঝোঁক ছিলো ক্লাসে 1st Boy ছিলাম কিন্তু যখন শুরু করলাম তখন আর সেই ছবি হলো না তার বদলে এক বিভৎস রূপ পেলাম। ছবি দেখে লোকে পাগোল বলতে লাগলো, বাড়ীর লোকে মা, বোন ইত্যাদি পাগোল বলে বাড়ীর থেকে বের করে দিলো অথচ আমিই বড় ছেলে বাড়ীর। যাক্ তারপর কাশীতে একটা ঘরভাড়া করে নিজের Studio করলাম এবং ধীরে ধীরে কাশীর তরুণ চিত্রকরের একত্র করলাম এবং 1962 তে আমরা আমাদের গ্রুপ তৈরী করলাম— U.A. Group 62 (United Artist) তখন থেকে শুরু হলো আমাদের সংগ্রাম Traditionalist দের বিরুদ্ধে প্রথম Exhibition এই আমরা ঘোষণা করলাম। নিজেদের Pamplate এ— “Tradition has been the first casualty on this ouslaught. But there is nothing to lament about the deadening tradition as was practised in the major centres of art in India. Tradition was merely another name for sterile repetetion and work with-out any sense of adventure.”
এর পরেই কাশীতে একটু সাড়া পড়লো খুব গালাগালি খেলাম অন্য চিত্রকররা ঘৃণার চোখে দেখতে লাগলো। এমনি করেই আমরা এগিয়ে এসেছি 1965 এর শেষ কোঠায়। Recently আমরা আমাদের Group show Lucknow তে করে এলাম খুব প্রশংসা পেয়েছি। সাথে আমাদের Card ও Pamplate পাঠালাম।
ছবিতেই মেতে রয়েছি এখন December মাসে WAR PAINTING এর Exhibition হবে Lucknow তে। আমায় ছবি দিতে হবে।–
29.10.65. রাত ১টা—
আণবিক ফোঁড়া কম্প্রেস করতে গিয়ে ফেটে গেছে। নারীর গর্ভ অকেজো হয়ে গেছে। আমার সামনের সমস্ত দৃশ্য ধেবড়ে গেছে। বিজ্ঞানে ধসা; মানুষ, মাঠ, জানোয়ার সব যেন কেমন এক হয়ে মাটীতে মিশে গেছে। ব্রেনের ক্রুদ্ধ শাঁসের ভাগ থেকে রেটিনার ওপর রঙ্গীন নাইট্রো-সেলুলোজ ঝরে পড়ছে। ক্ষুধার্ত্ত Orange এগিয়ে আসছে Blue কে গ্রাস করতে মাঠের Yellow ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।— এই মাত্র ওপরের Painting টা শেষ করলাম। আপনাদের শব্দপ্রয়োগে ভাবটা জানালাম কিন্তু এখন সমস্যা হলো এই যে ছবির নাম কি দেবো। যদি ওপরের Matter পড়ে একটা সুবিধামত নাম জানাতে পারেন ইংরাজিতে তাহলে আমি এযাত্রা বেঁচে যাবো। কারণ আমাদের নাম দিতেই কেমন যেন বিশ্রি লাগে। ঠিক যা বলতে চাই তা নামে আসে না।
পরিচয়ে একটু বাকি থেকে গেছে। আমি বিয়ে করি আজ ২ বছর হলো একটি কায়স্থ মেয়েকে (কোর্ট থেকে) তার পর অব্রাম্হন্ বলে বাড়ী থেকে বিতাড়িত থাকি আলাদা।—
আপনাদের আরও লেখা পড়তে ইচ্ছে করছে যেমন— ইতিহাসের দর্শন ও ক্ষুধার্ত্তবাদ। কিভাবে পেতে পারি জানাবেন। আর একটি বিশেষ কথা যে আপনাদের সাহিত্য (যা পড়েছি এযাবৎ) পড়ে যা বুঝলাম তাতো হলো কিন্তু আমি এর পরে কি করবো আমায় বলেদিন। আর বলুন যে আমি কি করতে পারি। আমার ছেলের মৃত্যুর আর কোন রকম আঘাত নেই আমার মনে— শুধু দুটো বই আমার সব সেন্টিমেন্টকে খেয়ে ফেললো। অপূর্ব্ব মলয় রায়চৌধুরী। তাকে আমার অন্তরের সব কথা দিলাম জানাবেন।—
আপনাদের সম্পূর্ণ ছাপা বই যদি আমি চাই তাহলে আমায় কত পয়সা দিতে হবে জানাবেন। আমি চাই সবকটা পড়তে। কোন রকম সংকোচ নাকরে জানাবেন আর জানাবেন এর পর আমি কী করবো।
ইতি, করুণানিধান

সুবিমলের সংগ্রহে থাকা যাবতীয় চিঠির মধ্যে দীর্ঘতম বোধহয় এটিই। ষোলো ইঞ্চি বাই সাড়ে ছয় ইঞ্চি কাগজের চার পাতা জুড়ে লেখা। সন্তানের মৃত্যু সম্পর্কে, পরবর্তীতে (১৯৮৬) করুণানিধানের স্মৃতিচারণ—
‘১৯৬৫ আমার একমাত্র ছেলে ‘আরক’ মারা যায়। ব্রংকো নিমোনিয়ায়। ডাক্তারের খরচ জোগাতে পারি না। ছেলেকে পাথর বেঁধে মাঝ গঙ্গার জলে ফেলে আসি। মাঝিকে টাকা দি— ও ন্যায় না বলে ‘আপকা লড়কা হ্যায়, আপনে রোয়া নহীঁ? ম্যায় প্যায়সা নহীঁ লে সকতা। মেরে উপর পাপ লাগেগা।’
‘পাপ-পুণ্য কুছ নহী হোতা ভাই। তুমহারে ঘরকে বাচ্চাঁকো— মিঠাই খরীদ দেনা। লেও।’
এই ঘটনার পরেই আমি একটা লেখা পাঠাই ‘জেব্রা’য়, ছেপে যায়। এই আমার বাংলা লেখার হাতে খড়ি।’
পরের চিঠিটির তারিখ নেই। অনুমান, ১৯৬৬-৬৭র কোনও এক সময়ে লেখা।
একটা জরুরী মতামত
March এ যদি Cal এ প্রদর্শনী হয় তখন সবাই নিজের কথা জানাবে। আমি এই ব্যাপারে একটু কমজোর অর্থাৎ ঠিক ভাষার প্রয়োগ করতে পারবো না। আপনার সাহায্য চাই। আমি ছবি দিয়ে হয়তো দর্শককে বা সমালোচককে বা অন্য অন্য শিল্পীকে (শিল্পী অর্থে বুঝতে পারছেন বোধহয়) তাদের মনে রাগ জ্বালা অহংকারে ঘা ইত্যাদি আমার ছবির মাধ্যমে দিতে পারবো কিন্তু ভাষায় তা হয়তো পারবো না। তাই আমার সম্বন্ধে আপনি যা জেনেছেন— তার উপর Base করে গোটা 10/12 লাইনের মধ্যে ইংরাজী তে এবং তার বাংলা করে আমায় পাঠান যার মধ্যে একটা জ্বালা ‘হরর’ যেন নিশ্চয় থাকে আর একটা নূতন ধরণ থাকে। যেমন এলেন একবার বলেছিলো আমাদের জিজ্ঞাসায় যে এমন হয়তো একটা যুগ আসবে মানুষ Painting এর সামনে এসে প্রথমে আঃ— বলে চেঁচিয়ে উঠবে বা তার মন এক অজানা রাস্তায় চলে যাবে— এবং পরে সে অনুভব করবে আমি কি দেখেছি।—
এই চিঠির উত্তরের সঙ্গে যেন ১০ লাইন লেখা পাই তার পর তার সঙ্গে আমি কিছু যোগ করে একটা বক্তব্য তৈরী করবো। নিশ্চয়ই পারা চাই—
করুণা
চিঠিতে উল্লিখিত ‘এলেন’ প্রকৃতপক্ষে আমেরিকান বিট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। সুবিমল ‘এ ফর অনিল, কে ফর করুণা— এ.কে. 47’ শীর্ষক একটি স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধ লিখেছিলেন, যাতে করুণানিধান ও অনিলের সঙ্গে হাংরিদের যোগাযোগ ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তৃত জানা যায়। জানা যায় ১৯৬৭ সালের নেপাল অভিযান সম্পর্কেও। সুবিমল লিখছেন— ‘ষাটের দশকের এক সকালে, করুণানিধান এসে হাজির আমার বেলঘরিয়ার আস্তানায়, সঙ্গে জনৈক আলাস্কান যুবক ট্রেশাস গ্রেগ, শিল্পী। সংক্ষেপে ট্রেশ। …পাঁচদিন হই-হুল্লোড়, কলকাতার রাস্তা মাপা, এক দুপুরে ফালগুনীর বিশাল প্রাসাদে, জলসাঘরে ভেতরের মহালে মায়ের কক্ষে বসে চেটেপুটে খাওয়া, নিমন্ত্রণ ও আড্ডা। …বেলঘরিয়া থেকে করুণা ট্রেশাসকে বগলদাবা করে সোজা কাঠমাণ্ডু। …কাঠমাণ্ডু পৌঁছেই করুণা চিঠি দিল, পেছন থেকে এভারেস্টের চুড়ো দেখলুম। আমরা তো দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলি ওর চিঠি পেয়ে। কাঠমাণ্ডু থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে আমরা, অর্থাৎ সমীর, মলয়, অনিল, কাঞ্চন ও আমি রওনা দিই…।’ এরপরে কাঠমাণ্ডুতে দিনযাপন, নেশা ও ছবির বিস্তৃত বিবরণ।

অবশ্য করুণানিধান বারানসীতে থাকতেই গড়ে উঠেছিল নেশার সম্পর্ক। সুবিমলকে পাঠাতেন বিভিন্ন নেশাদ্রব্য, সঙ্গে চিঠিতে ব্যবহারের বিস্তৃত বিবরণ। তেমনই একটি চিঠি, ১৯৬৭ সালের জুন মাসের, তুলে ধরা হল—
প্রিয় সুবিমল
উন্মার্গ ও জেনারেশনের কাগজ পেলাম— উন্মার্গ খুব ভালো লাগলো। ঘরোয়া আলোচনাটা বেশ জমেছিলো কিন্তু অজ্ঞেয়কে আর একটু চেপে ধরলেই ঠিক হতো কি রকম জেন কম্প্রোমাইজ করে করে এগিয়ে গেছে। তোমার ছাতামাথা বেরোলে পাঠিও। কান্চনের আমুখ ৩ পেয়েছো কি। অতি কদাকার হয়েছে। ভেতরে রাজকমল ও মুদ্রার লেখা ভালো কিন্তু গেটআপ ইত্যাদির যা অবস্থা। প্রথম ইসুতে আমার ও অনিলের সহযোগিতা ছিল বলে অমন সুন্দর গেট-আপ হয়েছিলো (যার প্রশংসা তুমি করেছো) ব্যাস হয়ে গেলো। আজকাল নুতন কিছু একটা কোরবো বলে এগিয়ে আসে তার পরই সেই ট্রাডিশনে লিপ্টে যায়। যাক্ তোমার মগজ ঠিক করার জন্যে একটা ওষুধ পাঠালাম। আফগানিস্তানের খাঁটি ‘এ্যাসেস’ আমি পাউডার করে পাঠিয়ে দিলাম— প্রায় এতোখানি মশলা সিগারেটের অর্দ্ধেক মশলা বের করে মিলিয়ে তার পর আবার ভরে নিয়ো তার পর আরামসে একা বোসে খেও বাড়ী মজা পাবে। মলয়কেও দিও গোটা ১০ সিগারেট তৈরী হবে। যদি বেনারসে আসো তো সঙ্গে খানিকটা দিয়ে দেবো (অনেক কষ্টে যোগাড় কোরেছি আমার একটি ROCK নামে ইংরাজ বন্ধুর কাছ থেকে) মালটা কি রকম জানিও ও এই পত্র পেলে কিনা তাও জানিও। চিন্তায় থাকবো কারণ প্রসাদ যাচ্ছে তোমার হস্তোগতো হলো কিনা। (চিলাম খেয়োনা— পাইপ অথবা সিগারেটে) তোমার কলকাতার ঠিকানা বদলে গেল কেনো?
আমার মাথা ভীষণ ভাবে দপ দপ কোরছে। আজ ভীষণ ভাবে অ্যাসেস্ খেয়েছি। রাত তিনটে হলো। হ্যাঁ একটা বিখ্যাত বস্তু হস্তোগতো হলো একটি প্যারিসের মেয়ের কাছ থেকে— L.S.D. কাশীতে এই প্রথম আমার হাতে এলো বোধহয়। সামনের রবিবারে গঙ্গার ওপারে গিয়ে ট্যাবলেটটা খাবো তারপর ১২ ঘণ্টা যানিনা কি হবে। ট্যাবলেটটা খাওয়া সম্বন্ধে চিন্তা কোরলেই একটা ভয় হচ্ছে যদি হার্ট ফেল হয়। তাই এখনও পর্য্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছি। পাটনার কোনও নূতন সংবাদ বা পত্রিকা হলে পাঠিও।
উত্তর তাড়াতাড়ি দেবে।
করুণা

উন্মার্গ— ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত পত্রিকা। ‘আমুখ’ হল কাঞ্চন কুমার সম্পাদিত হিন্দি পত্রিকা।

ছোট একটি চিঠির উল্লেখ করে করুণানিধান-প্রসঙ্গ শেষ করা যাক। ঠিক চিঠিও নয়, একটি কার্ডের পিছনে কয়েক লাইন লেখা, সেইসঙ্গে একটি খবরের কাগজের কাটিং। কার্ডটি হল ‘Two hungrialists: painters from varanasi’-শীর্ষক একটি এক্সজিবিশনের, যেটি ৬ জুন ১৯৬৮ সালে আয়োজিত হয়েছিল কাঠমান্ডুর ‘max’s gallery’-তে। করুণানিধান লিখছেন—
ক্যাটালগ পরে পাঠাচ্ছি— পোনেরো তারিখে ছবি পোড়াবো— ২০ তারিখে কাশী রওনা, মধ্যে পাটনা রুক্বো—/ হালচাল সব জানাও কোল্কাতার—/ তোমার নেগেটিভ পেলাম। এখানে আমাদের ছবি ওদের চোম্কে দিয়েছে— পোদঁ ফেটে গ্যাছে—
অবিক্রীত ছবি পোড়ানোর উল্লেখ রয়েছে প্রকাশিত সংবাদেও— ‘He said, he would set fire to all the unsold paintings after the exhibition was over.’

করুণানিধানের চিঠির সংখ্যা অনেক হলেও, অনিল করঞ্জাই-এর মাত্র দুটি চিঠিই খুঁজে পেয়েছি। হাংরিদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্কে, ১৯৮৬ সালে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে অনিল জানান— ‘হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ও সম্পর্কের সূত্রটি একটু অন্য রকমের। প্রাথমিক স্তরে প্রধানত বাংলা ভাষায় হাংরি লেখালেখিকে হিন্দী সাহিত্যে অনুবাদের মধ্যে দিয়ে প্রচারিত করতে গিয়েই হাংরি লেখক-কবিদের সঙ্গে আমার পরিচয় গড়ে ওঠে এবং আস্তে আস্তে আন্দোলনের সঙ্গে আমি আমার নিজস্ব নিয়তিকে জড়িয়ে ফেলি। এছাড়াও ছবি-আঁকিয়ে হিসেবেও হাংরি আন্দোলনে আমার কিছু কিছু ভূমিকা ছিলোই।’
অনিলের প্রথম চিঠিটি ১৯৬৭-র জুন মাসের—
“সুবিমল”
জঠর ইত্যাদি পেয়েছি—
ভাল—
‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ’ পেতে হলে কি কোরতে হবে জান্তে চাই
তোমাদের প্রকাশিত সব পোড়তে চাই—
সম্ভব হলে পাঠাবে–
কিছু ছোট স্কেচ পাঠাব কভার ইত্যাদির জন্য— প্রয়োজনে জানাতে পার
ইতি—
একমাত্র
অনিল—
‘জঠর’— শঙ্খপল্লব আদিত্য সম্পাদিত পত্রিকা, ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ’— শৈলেশ্বর ঘোষের কাব্যগ্রন্থ।

দ্বিতীয়টি একই বছরের ডিসেম্বর মাসের। পোস্টকার্ডের একটি পিঠ অলংকৃত, বাক্যগুলিও তদনুরূপ। অনিল লিখছেন—
প্রিয় সুবিমল
তোমার ভালোবাসা পেয়েছি— জবাব দিতে চেয়েছিলাম অনেক আগেই; পারিনি/ ঝাঁকে ঝাঁকে অশরীরি ইমেজরা ছেঁকে ধরে মগজ/ ভিষণ অসহায় হোয়ে পোড়ি কোন কিছুই কোরে উঠতে পারি না/ এগুলো ঝেড়ে না নামান পোর্য্যন্ত শান্তি নেই যানি করুণার কাছে তোমার চিঠি দেখলাম, তোমার যাযাবর জীবন যাপন, পোড়লাম সব; খুব ভাল, যান। এসব খুব দরকার আমাদের। এখানে আমার-বাবার একটা বাড়ি আছে, তা সত্যেও আমি আলাদা ঘর নিয়ে থাকি— অনেক রাত রাস্তায় কাটে/ আমি চাই তুমি একবার এসো, দেখে যাও আমাদের
আমার কিছু ছবি কোলকাতায় শো কোর্তে চাই, তাই চেষ্টায় আছি/ আমরা এই চারজন আছি— আমি/কোরুণা/সুবীর/বিভাস/ সব শুদ্ধু গোটা কুড়ি ছোবি হবে ব্যবস্থা তোমাকেই কোর্তে হবে/ এ সম্বন্ধে চিঠি দিও— কি কোরে কি হবে আমার যানাও সম্ভব হোলে— এখানে তোমার আসা চাই একবার আমি বোলছি, ভালো লাগবে, তোমার/
- আমি
অনিল
B-7/ 26 Bagh Hara
Varanasi

অনিল করঞ্জাই সম্পর্কে, সুবিমলের পূর্বোল্লিখিত নিবন্ধের শেষাংশটি প্রাসঙ্গিকবোধে তুলে ধরা হল—
বছর দেড়েক আগে নাকতলা থেকে মলয়ের ফোন— জরুরি কাজ না থাকলে চলে এসো। অনিল এসেছে, অনিল।
প্রায় দু-যুগ পেরিয়ে। খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়নি, শ্যামলা রং মুছে গিয়ে লালচে, মাথার চুল ছোটোছোটো কার্লিং, ব্রাউন ডাইং-দিল্লীর স্টাইল। শরীর-স্বাস্থ্য একইরকম। স্বল্পবাক আগেও ছিল, এখনও তাই। শ্রাগ, ঘাড় বেঁকানো, চোখের ভঙ্গিমা বিদেশে আয়ত্ত করে থাকলেও এখানে তার ছিটেফোঁটা নেই। হাসি আগের মতো। আড্ডা জমে উঠল দুপুর থেকে রাত। বাকারডি এল। টেনশন কেটে ফুরফুরে মেজাজ। বিদেশি প্রেম, রোমহর্ষ ঘটনা, স্মর্তব্য মুহূর্ত।
এক প্রতিবন্ধী শিশুকে দত্তক নিয়েছে অনিল। জুলিয়েটকে সঙ্গে নিয়ে এলে না কেন?
জুলিয়েটকে বিয়ে করেছে বছর কয়েক আগে। কলকাতা থেকে ফিরে গিয়ে রেয়ার পেন্টিংস-এর রিপ্রোডাকশন কার্ডে চিঠি— খুব সস্তায় বাংলো পাওয়া গেছে দেহরাদুনে। মুসৌরি যাবার পথে। চোদ্দ লাখে। এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ইংরেজ দম্পতি বিক্রি করে ফিরে যাচ্ছে।
তোমরা চলে এসো সকলেই। আমন্ত্রণ। জুলিয়েট ও অনিল।
বছর দশেক আগে হলে, করুণা লিখত- ‘হ্যাপেনিং’ করা যাবে। সব ‘লুন্ড’ হয়ে থাকব। করুণা মারা গেছে।
দিন পনেরো বাদে কাঞ্চনের ফোন: অনিল মারা গেছে। হার্টফেল। পরশু। অনিলের মৃত্যুদিন ১২ই মার্চ, ২০০১।
মাত্র কিছুকাল ছিল দেরাদুনের সেই সদ্যকেনা বাংলোয়।


অনিলের স্ত্রী, জুলিয়েট রেনল্ডস্-এর সঙ্গে ফোন-মারফত আলাপ হয়েছিল আমারও, ২০১৭-১৮ সালে। অনিলকে নিয়ে একটি বই সম্পাদনা করছিলেন তিনি, তার জন্য সুবিমল বসাকের লেখাটি প্রয়োজন। পাঠাই ও পরবর্তীতে তা অনূদিত হয়ে ছাপাও হয়। বইটির নাম— ‘Roads across the earth: On the life, times and art of Anil Karanjai.’ প্রকাশের পর, বইটি আমায় পাঠান জুলিয়েট।
করুণানিধানকে নিয়ে এমন কোনও বইয়ের খবর আমার জানা নেই।
(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য




