প্রান্তজনের বাইবেল
১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাইবেল অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় মিশনারিদের ধর্মান্তঃকরণের প্রচেষ্টার সাফল্য মোটের ওপর সীমিত। যে বিপুল অর্থ, শ্রম, বিপন্ন বিনিয়োগ এর নিমিত্ত ব্যয় হয়েছে, তার তুলনায় বাঙালি হিন্দুর খ্রিস্টান হওয়ার সংখ্যা নগণ্য। অন্যান্য নানা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে ঠিক-ই, খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে, বিশেষ করে যীশুখ্রিস্টের উদার ও নৈতিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে আগ্রহ ও শ্রদ্ধাও জন্ম নিয়েছে— কিন্তু সেটা বাইবেলে আগ্রহ বা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে রূপান্তরিত হয়নি, যেরকম আফ্রিকায় বা দক্ষিণ আমেরিকার কোনও কোনও স্থানে হয়েছে। প্ল্যান এ কাজ না-করলে, নেওয়া হয় প্ল্যান বি। কেরির মতো প্রাচ্যবিদ্যায় আগ্রহী মিশনারিদের জায়গায় এলেন সেই মিশনারিরা, যাঁরা পাথেয় করতে চাইলেন পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে। মিশনারিদের এই প্ল্যান বি ছিল শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে খ্রিস্টের পথে নিয়ে আসা। ‘প্রিপেরেটিয়া এভাঞ্জেলিকা’। আগে শিক্ষার মাধ্যমে সু-সমাচারের জন্য প্রস্তুতি, তারপর সু-সমাচার প্রদান।
এই ঝোঁকবদলের কার্যকারিতা স্কটিশ মিশনারিরা অনেক আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলেন। কিছু ক্যাথলিক মিশনারিও আগে থেকে বুঝে গিয়েছিলেন যে, কেবল বাইবেল-নির্ভর প্রচার ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই শিক্ষাকে এগিয়ে দেওয়ার কৌশল স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পেতে শুরু করে। স্কটিশ মিশনারি অ্যালেকজান্ডার ডাফ লিখছেন,
ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান ও তদাশ্রয়ী দর্শন (natural philosophy) এখানকার প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানার ফলে খানিকটা ধর্মনিরপেক্ষ সত্যের মর্যাদা আদায় করে নিতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে আমরা এই বিষয়-শিক্ষাগুলিকে মিশনারি কাজের অনিশ্চিত সহায়ক হিসেবে সরিয়ে না রেখে সরাসরি ধর্মশিক্ষার পন্থা হিসেবেই ব্যবহার করতে পারি।
আরও পড়ুন : বাংলায় বাইবেল অনুবাদে এত ভিন্নতা কেন?
অরিক্তম চ্যাটার্জির কলমে ‘বাংলার বাইবেল’-এর পঞ্চম পর্ব…
এই দর্শন অচিরেই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়। আমরা সাধারণত, মেকলের মিনিটস-এর কথা জানি। ভারতীয় সমাজে তার প্রভাব এখনও তীব্র এবং সময়ে-সময়ে চর্চাতেও উঠে আসে। তার পনেরো বছরের মধ্যে আরেকটি শিক্ষা-বিষয়ক মিনিটস প্রকাশিত হয়, মারকাস টুইডেলের সভাপতিত্বে। এটিকে বাইবেল মিনিটস-ও বলা হয়। তার মূল প্রতিপাদ্য হল,
I can see no sufficient reason for objecting the Bible being made available in the public schools under the rule laid down by the council… nor do I see how Native Society itself can safely and permanently advance, except upon this basis…

এরপর মিশনারিরা বাংলা জুড়ে, ও পরে ভারত জুড়ে বিপুল পরিমাণে আধুনিক শিক্ষাদানে প্রয়াসী হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় বাইবেল স্টাডি। এই মডেল এখনও মিশনারি শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান। আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে বাইবেলের কোনও বিরোধ আছে বলে প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিরা মনে করতেন না। দুটোই র্যাশনালিটির জয়কেতন বহন করে। এই র্যাশনালিটির প্রকাশ-ই না সভ্যতা! আর উপনিবেশের মধ্য দিয়ে এই সভ্যতাই তো ইউরোপ পৌঁছে দিচ্ছিল পৃথিবীর সব প্রান্তে। খ্রিস্টধর্মের মহত্তই তো এইখানে যে, অন্যান্য ধর্মের তুলনায় সে যুক্তি বা র্যাশনালিটির প্রয়োজনগুলোকে আরও সফলভাবে মেটাতে পারে। তাই আধুনিক শিক্ষা দিলে মানুষ অবশ্যই বাইবেলের গুরুত্ব বুঝতে পারবে। তখন নিজের থেকেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে আগ্রহী হবে। এই হল মোটের ওপর ঔপনিবেশিক বয়ান। বাইবেল মিনিটস-এও তাই প্রতিফলিত হয়েছিল।
শিক্ষাক্ষেত্রে এর ব্যবহার যত বাড়তে থাকে, একে ব্যবহার করে সামাজিকভাবে অগ্রসর হওয়ার কৌশল-ও বাড়তে থাকে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে। আমরা লালবিহারী দে-র লেখায় বা কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীমূলক নাটক ‘পার্সিকিউটেড’-এ তার প্রমাণ পাই। ডাফ সাহেব দুঃখ করে বলতেন, এত এত ব্রাহ্মণ ছেলে আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়, ইংরেজি শেখে। কিন্তু সব শেষে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রশ্ন তুলতেই স্কুল ছেড়ে দেয়। এ মহা সমস্যা! তারপর সংস্কার আন্দোলনগুলি, শুরু হলে বাইবেল অনুবাদ ও চর্চায় আসে ভাটার টান। বিশেষ করে ব্রাহ্ম সমাজের উত্থান মিশনারিদের বেশ কিছু প্রতর্ককে নিজের স্ট্রাকচারের মধ্যে টেনে নেয়। ১৮৪৪-এ খেদের সঙ্গে জেমস লং লিখছেন,
কিছু বছর আগেও একজন শিক্ষিত নেটিভ হিন্দু ধর্ম সরিয়ে রেখে খ্রিস্টধর্মের সত্যতাকে স্বীকার করতেন, কিন্তু এখন দেখছি এই নতুন বৈদান্তিকদের প্রশ্রয়ে তাঁরা একটি আধাখ্যাচড়া ঘাঁটি পেয়েছে (halfway house), সেখানে তাঁরা হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার থেকেও দূরে থাকছে আবার খ্রিস্টধর্মের ঐশ্বরিক উৎসকেও স্বীকার করছেন না।
এই বৈদান্তিক অবশ্যই উপনিষদ-আশ্রয়ী ব্রাহ্ম। ওদিকে ইয়ং বেঙ্গলের একটি বড় অংশ খ্রিস্টধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হলেও প্রবলভাবে জাতীয়তাবাদী ছিলেন। তাঁরা মিশনারিদের, বিশেষ করে সাবেক প্রাচ্যবাদী মিশনারিদের, রেয়াত করতেন না। নানা পরতে জটিল হতে থাকা শিক্ষা— ধর্মের টানাপোড়েনের এই ডামাডোলের মধ্যেই ১৮৫৭-র মার্চ মাসে বারাকপুর সেনাছাউনিতে গোলমাল বাধে আর তার আঁচ ছড়িয়ে পড়ে দেশ জুড়ে।

সিপাহি আন্দোলনে ব্রিটিশরা পুরোদস্তুর বিব্রত, প্রায় পর্যুদস্ত হয়। শেষ অবধি ব্রিটিশ গড় রক্ষা হলেও, তাঁর নড়বড়ে রূপটি খোলসা হয়ে যায়। এর অভিঘাতে ইংল্যান্ড কেপে ওঠে। তাঁরা বিশ্বাস-ই করতে পারে না যে, প্রায় অসংগঠিত একদল সৈন্য ঔপনিবেশিক দখলদারির শীর্ষে থাকা ব্রিটিশ শক্তিকে নাকানিচোবানি খাওয়াতে পারে। নজিরবিহীনভাবে রানি ভিক্টোরিয়ার ফরমানে ১৮৫৭-র সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখে ইংল্যান্ড জুড়ে মহাসমারোহে ‘লাঞ্ছনা দিবস’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গান, ধর্মীয় প্রবচন ও আনুষ্ঠানিক দোষ স্বীকারের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। দোষটা কী? সেটা হল— যিনি প্রাচ্যের সেনার ক্ষেত্র ভারতভূমি তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাঁর বাণী প্রচারে তাঁরা মনোযোগী হননি। সেই ভুল শুধরে নেওয়ার শপথ নেন সবাই। পরের দিন ‘টাইমস’ পত্রিকায় ছাপা হয় সেই শপথের কথা,
আমরা ঈশ্বরের আশীর্বাদ যাঞ্ছা করি আমাদের সেই প্রবাসী সেনাদের প্রতি, যারা হিন্দু ও মহম্মদীয়দের ওপর খ্রিস্টের জয়ধ্বজা ওড়াবেন।
এই সেনাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে প্রচারকরাও ছিলেন। কারণ এর পরেই দেখি শিক্ষাপ্রচারের হিড়িকে যে বাইবেল অনুবাদ আর প্রচারে ভাটা পড়েছিল, তাতে পুনরায় জোয়ার আনার ব্যবস্থা চলে। ইয়েটসের অনুবাদকে খানিকটা পরিমার্জন করে বাইবেল সোসাইটির টাকায় বিপুল পরিমাণে বাইবেল ছাপানো আর তা বিলোনো শুরু হয়। প্রচারের মাত্রাও চড়ানো হয়। তাতে দেশীয় খ্রিস্টানদেরও শামিল করা হয়। আমরা ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-য় এই দৃশ্য দেখতে পাই,
কোথাও পাদরী ঝুড়ি ঝুড়ি বাইবেল বিলুচ্চেন— কাছে ক্যাটিকৃষ্ট ভায়া—সুবর্ব্বন চৌকিদারের মতো পোষাক… আদালতী সুরে হাত মুখ নেড়ে খ্রিস্ট ধর্মের মাহাত্ম্য ব্যক্ত কচ্চেন।… দিশী খৃষ্টানদের দুর্দশা দেখে খৃষ্টান হতেও ভয় হয়।
কিন্তু এখানেও বাইবেলের মতাদর্শগত স্থানাঙ্ক ঔপনিবেশিক— তা ব্রিটিশ অপরাধবোধ স্খলনের দর্পণ। তাতে দেশীয় খ্রিস্টানদের দুর্দশা কমে না। আরেকটি জিনিসও লক্ষণীয়, এই সময় থেকে প্রচারের ভরকেন্দ্রটি শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির থেকে উপজাতীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরিয়ে নিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক সচেতন প্রয়াস শুরু হয়। পরে তাঁদের মধ্য থেকেই নতুন করে ভারতীয় বাইবেল ভাষ্য রচনা হবে। জন্ম নেবে বাইবেলের উত্তর-ঔপনিবেশিক রেসপন্স।
সারা পৃথিবীর মতো ভারতেও দীর্ঘদিন ধরেই একটি নিজস্ব খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ধারা সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে। আমরা হুতোমের লেখায় কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ আগেই দেখলাম। তিনি ভারতীয় থিওলজির একজন আদিপুরুষ। বাংলায় কৃষ্ণমোহন, দক্ষিণ ভারতে অরুম্যনিয়াগম সুত্তমপিল্লাই, আরুমাকা পিল্লাই উত্তরে সাধু সুন্দর সিং, পশ্চিমে পণ্ডিতা রামাবাঈ— এঁরা বাইবেল-কে যেভাবে ইন্টারপ্রেট করতেন, তাঁকে ‘শপথ পূরণের ধর্মতত্ত্ব’ বা ‘ফুলফিলমেন্ট থিওলজি’ বলে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর, যখন বেশিরভাগ উপনিবেশ স্বাধীন হয়ে যায়, তখন খ্রিস্টান জগতে এক বিশাল পরিবর্তন দেখা যায়। উপনিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টীয় ব্যাখ্যার ওপরেও ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ কমে আসতে থাকে। বাইবেলের ওপরেও। বাইবেল ব্যাখ্যার অভিমুখ, উৎস থেকে লক্ষ্য-সংস্কৃতির দিকে ঘুরে যায়। প্রতিটি দেশ থেকে আসে নতুন নতুন বাইবেল পাঠ— তাঁদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি আর সমাজ-বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে। এছাড়াও মার্ক্সীয়, নারীবাদী, এমনকী, বিনির্মিত অবস্থান থেকে বাইবেল আলোচনার পরিসর তৈরি হয়। প্রান্তিকতার নবভাষ্য লেখা হতে থাকে বাইবেলকে আশ্রয় করে। তার ছায়া পড়ে অনুবাদ-দর্শন আর অনুবাদ-কৌশলে। সেই অনুবাদ দর্শনের প্রফেট হয়ে ওঠেন ইউজিন নাইডা এবং তাঁর ডাইনামিক ইকুইভালেন্সের (DE) অনুবাদ-তত্ত্ব, যা তিনি মোটামুটি চমস্কির জেনারেটিভ গ্রামার তত্ত্বের ওপর নির্মাণ করেন। যদিও এটি অনুবাদ তত্ত্বের আলোচনার পরিসর নয়, তবু বাইবেল অনুবাদের আধুনিক কালের কোনও কথাই নাইডা-কে ছাড়া অসম্পুর্ণ। বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগের অধিকাংশ বাইবেল অনুবাদ এই তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে।
খুব ভাষাতাত্তবিক জটিলতায় না গিয়েও বলা যায়, এই পন্থায় পাঠককে বাইবেলের কাছে না এনে, বাইবেলকে পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়া হোক। তাঁর নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির চিহ্নগুলিকে অপরিবর্তিত রেখে গ্রন্থটিকে সাজানো হোক। বাইবেলের বাণী ও তাঁর ইতিহাস শাশ্বত, কিন্তু সেগুলোকে বলা হয়েছে ইহুদি, মিশরিয়, গ্রিক ও রোমান ভাষা-সাংস্কৃতিক বলয়ে। নাইডা-র মতে সেগুলি টেক্সটের বহিরঙ্গ। সেখান থেকে ফলের শাঁসের মতো বক্তব্যগুলি পৃথক করা সম্ভব। পরে সেগুলিকে লক্ষ্য-সংস্কৃতির বহিরঙ্গে সাজিয়ে নেওয়া কাম্য। বাংলা বাইবেলের ক্ষেত্রে ERV বাইবেল স্পষ্টতই এই অনুবাদ-দর্শনের অনুগামী। অন্তত, সূচনায় তাঁরা সেরকম-ই বলেন।
সারা পৃথিবীর মতো ভারতেও দীর্ঘদিন ধরেই একটি নিজস্ব খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ধারা সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে। আমরা হুতোমের লেখায় কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ আগেই দেখলাম। তিনি ভারতীয় থিওলজির একজন আদিপুরুষ। বাংলায় কৃষ্ণমোহন, দক্ষিণ ভারতে অরুম্যনিয়াগম সুত্তমপিল্লাই, আরুমাকা পিল্লাই উত্তরে সাধু সুন্দর সিং, পশ্চিমে পণ্ডিতা রামাবাঈ— এঁরা বাইবেল-কে যেভাবে ইন্টারপ্রেট করতেন, তাঁকে ‘শপথ পূরণের ধর্মতত্ত্ব’ বা ‘ফুলফিলমেন্ট থিওলজি’ বলে। মোটের ওপর এঁদের বক্তব্য হল, বাইবেল বৈদিক (কোনও ক্ষেত্রে পৌরাণিক) ধারার স্বাভাবিক ও অন্তিম পরিণতি। কৃষ্ণমোহনের কথায় খ্রিস্ট বেদের প্রজাপতি, অরুমাকা পিল্লাইয়ের ভাষায় ‘মূর্ত মহাদেব’ ইত্যাদি। এঁরা বাইবেলকে হিন্দু শাস্ত্রের সঙ্গে সরলরেখায় রাখতে চাইতেন। তবে স্বাধীনতার পরে ভারতীয় খ্রিস্টতত্ত্বের সবচেয়ে পুষ্ট ধারা হয় দলিত খ্রিস্টতত্ত্ব বা দলিত থিওলজি। সারা ভারতে প্রবলভাবে প্রচলিত হলেও বাংলায় এর অভিঘাত কম। তাই বাংলা বাইবেল অনুবাদ ও ভাষ্য রচনাতেও এর প্রভাব কম। সেটি দুর্ভাগ্যের, কারণ সারা এশিয়ার একমাত্র থিওলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় শ্রীরামপুরে, যেখানে দেশ-বিদেশের স্ক্লাররা বাইবেল ও খ্রিস্টতত্ত্ব চর্চা করেন, যেখানে ড. প্রতাপ গাইনের ও দীপ্তি গায়েনের মতো বাইবেল-পণ্ডিত দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। আশা করি, শীঘ্র এ-বিষয়ে কিছু দিশা অচিরেই দেখা যাবে। যদিও কৃত্রিম মেধা, ডিজিটাল মানববিদ্যা, ব্রাউসার-নির্ভর ভাষান্তর অনুবাদের জগতটিকে একবারে গোড়া থেকেই পালটে দিচ্ছে। সেই বিষয়ে আলোচনা করেই আমি ইতি টানব।
কৃত্রিম মেধা ও অনলাইনে বাইবেল অনুবাদ
আমরা নানারকম মেটিরিয়ালিটির মধ্য দিয়ে বাইবেল-কে গড়তে দেখলাম, হয়তো ভাঙতেও দেখলাম। নবি ও খ্রিস্টের মুখনিঃসৃত বাণী, তার লিখিত নথি আর সেই লিখনের নানা রূপের পাণ্ডুলিপি মুদ্রণ ও তার কতশত অভিঘাত পেরিয়ে এসে পড়ে ডিজিটাল মাধ্যম, অ্যাপ হয়ে, অবশেষে কৃত্রিম মেধার ধূসর জগতে। আমাদের জীবন যেরকম ক্রমেই এক পোস্ট-হিউম্যান, উত্তর–মানবতার সংযোগব্যবস্থায় আবর্তিত হচ্ছে, তেমনই তার অভিঘাত অনুবাদ-ক্রিয়া, পদ্ধতি আর দর্শনেও এসে পড়েছে। এখন বেশ কিছু অনলাইন বাইবেল বাংলায় পাওয়া যায়। তাঁর কিছু কিছু ছাপা বইগুলির-ই অনলাইন ট্রান্সক্রিপশন। কিছু নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে, মানব ও যান্ত্রিক মেধার সাহচর্যে। তবে বাইবেলের ফর্ম্যাটে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমি এক-ই টেক্সটের গ্রন্থাকার ও অ্যাপীয় আকার পাশাপাশি রেখে দেখেছি, যে একটা সাধারণ প্যাটার্ন ফুটে উঠছে। সেগুলি এরকম,
১) DE-র চরম ব্যবহার— ভাষাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা— ভাষাকে সরল, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তরল করে তোলা।
২) বাক্যের দৈর্ঘ্য ছোট করে এনে বাক্য-সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া। মোবাইল স্ক্রিনের মাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে বাক্যের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা।
৩) অনুচ্ছেদের বদলে হাইপারলিঙ্কের মাধ্যমে টেক্সটটিকে সংহত করা।
৪) টেক্সটের সরলরৈখিক গঠনকে রাইজোমের মতো বিস্তৃত করা, যাতে পাঠক যে-কোনও জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারেন। পাঠক্রিয়ার এই পরিবর্তিত ধরনকে মাথায় রেখে টেক্সটের পুনর্বিন্যাস।
অনুবাদের এই ডিজিটাল মোড় নেওয়ার ভাল-মন্দ দুই দিক-ই দেখা যাচ্ছে। অনলাইন বাইবেলের যে ফর্ম্যাট, তার একটা বড় সমস্যা হল, শৈলীগত সমস্ত বিবিধতাকে বিলোপ করে দেওয়া হচ্ছে। ভক্তিবাদী মথি, ভাববাদী জোহান ও তার্কিক পলের সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা ও শৈলী ভিন্ন। পলের বাক্যগঠন জটিল, ও তিনি দীর্ঘ বাক্য লেখেন। কিন্তু স্থির সুসমাচারের লেখার শৈলী একেবারেই অন্যরকম, ছোট সরল ও নির্দেশক বাক্যের প্রাধান্য। বাইবেলের অনলাইন ও অ্যাপ-নির্ভর সংস্করণে সেই পার্থক্য আর বজায় থাকছে না। সাহিত্যিক মূল্যের ভিত্তিতে এই ক্ষতি অপরিসীম। কিন্তু অনলাইন বাইবেলের একটা ভাল দিক হল, এটা একরকমের পুঁজি ও সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাইবেল অনুবাদকে মুক্ত করতে পেরেছে। অনুবাদের বিভিন্ন স্বরকে প্রকাশ করার একটা সম্ভাব্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। এখন বাংলায় সেটার যথেষ্ট সুযোগ নেওয়া গেল কি না, সেটা অন্য প্রশ্ন। কিন্তু অনেক ভাষায়, এমনকী, অনেক ভারতীয় ভাষাতেও এই বিষয়ে সচেতনতা গভীর।
তো এই হল বাংলা বাইবেলের মোটামু্টি একটি রূপরেখা। এর ভেতরে-বাইরে আরও কত না গল্পের পরত, কত না-জানা, না-বলা আখ্যান রয়ে গেছে। এই গ্রন্থকে বাঙালিরা আপন করেছে, অবলম্বন করেছে, আলোচনা করেছে, ক্ষেত্রবিশেষে গ্রহণ করেছে, আবার বর্জন-ও করেছে। বন্ধুভাবে গলা মিলিয়েছে, শত্রুভাবে আক্রমণ করেছে। সারা বিশ্বেই সেটি হয়েছে। কিন্তু একে ঘিরে উৎসাহ, নির্মাণ ও আগ্রহের ভাটা পড়েনি কখনও, কোথাও। এর অসংখ্য ধারা, বাইবেল-চর্চার সাগরে সব এসে মিলেছে। আমার এলোমেলো ইতস্তত ভাবনাগুলোও একটি ক্ষুদ্র, ক্ষীণ ও চকিত স্রোত হিসেবে মুখ দেখিয়ে মিলে যাক, এইটুকুই আশা।



