ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, পরম্পরা, দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে ‘রামায়ণ’-এর সঙ্গ-প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে কোনও না কোনওভাবে! হতে পারে সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, কোথাও সেটা অমোঘ বিশ্বাস বা ভক্তিভিত্তিক, কখনও আবার সেটা পৌরাণিক যুক্তি-নির্ভর! আম-বাঙালির রোজনামচাও কিন্তু জ্ঞাত এবং/অথবা অজ্ঞাতসারে এই পরিমণ্ডলের ঊর্ধ্বে নয়। এক্ষেত্রে যেটা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় বলে মনে হয়েছে চিরঞ্জয় চক্রবর্তীর, তা হল— ছোটদের জন্য লেখা রামায়ণ-এর বিচিত্র জগৎ।
বাংলা তো বটেই, অন্য কোনও ভাষাতেও গবেষক তো দূর অস্ত্, বিষয়টি নিয়ে কোনওরকম আলোচনা এ-যাবৎ হয়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই! এর একটা কারণ হয়তো, ভারতের আর কোনও ভাষায় বাংলার মতো এতগুলো ছোটদের রামায়ণ লেখা হয়নি! লেখক-কর্তৃক সংগৃহীত ও আলোচিত এই সংখ্যাটা ১৫৩! অবশ্য ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের রামায়ণের প্রসঙ্গটি আসেনি এর মধ্যে। গবেষণাটির রেডারে ধরা পড়েছে উর্দু, হিন্দি, ওড়িয়া, অবধি, অসমিয়া, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালাম, গুরমুখি (পাঞ্জাবি), মারাঠি, গুজরাটি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা শিশুতোষ রামায়ণের কথা ও কাহিনি! বিষয়ের এই ব্যাপ্তি ও বহুস্তরীয় কসমিক বর্ণময়তা সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো!
চিরঞ্জয়বাবুর প্রায় তিন দশকের ধারাবাহিক তন্নিষ্ঠ ও মেধাবী গবেষণার ফসল একটা অনালোচিত ঘরানাকে কেবল চিহ্নিত ও একঠাঁই-ই করেনি, সেই সঙ্গে রামায়ণের একটা স্বতন্ত্র আইডেন্টিটি তৈরি করেছে! তাঁর বিশ্লেষণের ‘ন্যারেটোলজি’ পাঠককে নিছক সেসব বিচিত্র রামায়ণ-কথা শুনিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। পাশাপাশি তাদের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা থেকে জানতে পারি, আমরা সংশ্লিষ্ট শিশুপাঠ্য রামায়ণটি লেখার প্রেক্ষাপট-সহ এদেশে রামায়ণ-চর্চার গতিপ্রকৃতি, এই বিশেষ ধাঁচের রামায়ণের বইতে অলংকরণ, চলিত রামায়ণের বৃত্তের বাইরে থাকা রামায়ণ, রামায়ণের ভিন্ন পাঠ, বটতলার রামায়ণ ও রচনাকারদের মনোজগৎ-এর বিচিত্র হদিশ!
আরও পড়ুন : গ্যালারি ছাড়িয়ে বৃহত্তর গ্যালারির কথা উঠে আসে সৌরাংশুর ‘রাজার মুকুট’-এ!
লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…
লেখকের অকপট স্বীকারোক্তি, বইয়ের আলোচনার পরিধির বাইরে থেকে গেছে আরও অনেক শিশুপাঠ্য রামায়ণ। আমাদের সেকেলে দিদিমা-ঠাকুমাদের গল্প বলার সংস্কৃতি যেভাবে বিলীন হয়েছে কালের গর্ভে; ঠিক সেই ধারায় সংরক্ষণের অভাবে চিরতরে হারিয়ে গেছে পণ্ডিতমশাইদের স্ব-উদ্যোগে ছাপা ও বিনে পয়সায় বিলি করা, ছোটদের কথা ভেবে লেখা আরও অনেক রামায়ণ! এ-জন্য দায়ী আমাদের জাতিগত ও জিনগত নির্মম উদাসীনতা!
বয়স্কাদের গল্প বলার ঘরানায় কাহিনির অবয়ব তৈরি হত তাঁদের আপন মনের ও কল্পনার নিঃশুল্ক মাধুরী মিশিয়ে। অনেক সময় মূল রামায়ণ না-পড়া বা না-জানার জন্য এক্ষেত্রে এহেন মিশেলটুকু জরুরি ছিল।
বইয়ের অন্দরমহলে ঢোকার আগে বলা দরকার, বর্তমান বইয়ের ভিত্তি হল ২০০০ সালে প্রকাশিত লেখকের বই ‘শিশুরামায়ণ কথা’। এখনকার বইটিকে পূর্বোক্ত বইয়ের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ বললে ভুল হবে। কারণ ২০০০-এ বইটির প্রকাশ-পরবর্তী পাঠ-প্রতিক্রিয়া থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরন্তর অনুসন্ধান ও গবেষণালব্ধ ফলাফলের আলোকে উদ্ভাসিত বর্তমান বইটি। ‘নাটক, পুতুলনাচ, পালা’ শীর্ষক অধ্যায়টি নতুন সংযোজন। বেড়েছে তথ্যের কলেবর। বদলেছে বিশ্লেষণের ধারা ও স্বভাবতই আনুষঙ্গিক সিদ্ধান্ত। সঙ্গে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তথ্যের উপস্থাপনা বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বইয়ের নাম, সচিত্র কি না, লেখার ফর্ম (কবিতায় না কি নাটকে), লেখক, প্রকাশক, প্রকাশকাল, পৃষ্ঠা সংখ্যা, মূল্য— এই সমস্তটা যথাসম্ভব পরিবেশন করেছেন চুম্বকে ট্যাবুলা-র ফর্ম্যাটে।
বিষয় একই থাকলেও মাধ্যম-ভাষার পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট ভাষার সিনট্যাক্স কীভাবে বইয়ের নামকরণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে তার নমুনা: ‘দ্য কিডন্যাপিং অফ সীতা’, ‘দ্য বিল্ডিং অফ রামাসেতু’ ইত্যাদি। এহেন নামকরণ রামায়ণের বাণিজ্যিকীকরণ, প্রকাশকের মোটিভ ও রামায়ণের কাছে নব্য পাঠকের চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। এটাও স্পষ্ট, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে ‘রামায়ণ’ সম্পর্কে কোনও পূর্ণ ধারণা তৈরি হচ্ছে না। মহাকাব্যের অন্তর্গত ঘটনাবিশেষের আগু-পিছু না জানায় খণ্ডচিত্রের আঁচ শিশুমনে থ্রিলারের ছাপ রেখে যাচ্ছে। চিরায়ত ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করার বদলে সীমাবদ্ধ লঘু অগভীর মনস্তাত্ত্বিক বিনোদনে পরিণত হচ্ছে। ভাবনা, রূপক, উপমানের ভাস্কর্যের বীজ রোপিত হচ্ছে না শিশুর কল্পলোকে। এ-জাতীয় শিশুপাঠ্য রামায়ণ সংশ্লিষ্ট লেখকের ব্যক্তিগত ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষার উড়ান হতে পারে, কিন্তু শিশুসাহিত্য হিসেবে তাকে কোনওভাবেই ধ্রুপদি ঘরানায় ফেলা যায় কি?

প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম: ‘মহাবীরের প্রবেশ’। রামায়ণ-চর্চায় লেখকের হাতেখড়ি কীভাবে হয়েছিল, সে-গল্প আছে এখানে।
বাংলায় ‘শিশুপাঠ্য রামায়ণ’-এর আত্মপ্রকাশ ১৮৮৪ সালে। নাম ‘সরল রামায়ণ’। লেখকের নাম জানা যায়নি। রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দর শৈশব ততদিনে পেরিয়ে গেছে। সেদিক থেকে আমরা ভাগ্যবান বলতে হবে। যদিও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অ্যাকাডেমিক পড়াশোনায় যথেষ্ট উজ্জ্বল, চোখে চালসে পড়ার সময় এসে গেছে। কিন্তু রামায়ণ— সে ছোটদের কি বড়দের যাই-ই হোক, আর পড়া হয়ে ওঠেনি। এমন মানুষ জানেন না, তিনি কী হারাচ্ছেন! দোহাই, এর মধ্যে কেউ রাজনীতি খুঁজবেন না। মহাকাব্য পাঠের মাধ্যমে লব্ধ নান্দনিক আনন্দ, ভাবনাচিন্তার রসদের কথাই বলছিলাম। যখন ছোটদের রামায়ণ লেখা হয়নি, তখন ছোটরা কীভাবে দেশীয় দৃশ্য-শ্রাব্যর লৌকিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে রামায়ণের স্বাদ পেত, তার সুলুকসন্ধান রয়েছে ‘তখন ছোটদের রামায়ণ ছিল না’ পর্বে।
‘পাঠ্যপুস্তকে রামায়ণ’ অধ্যায়ে আমরা জানতে পারি, বাংলা ভাষায় রচিত ক্ষুদ্রতম রামায়ণ-এর চমকপ্রদ কাহিনি। ‘বাল্যশিক্ষা’ বইয়ে ২৭ পৃষ্ঠায় রামসুন্দর বসাক লিখেছিলেন (১৮৭৯) মাত্র ন’লাইনে! চিরঞ্জয়বাবু শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ বসু-র লেখা (১৮৯১) ১৮ লাইনের রামায়ণের উল্লেখ করেছেন। এইখানে আমার একটা ছোট্ট সংযোজন: একদা ট্রামে-বাসে বিক্রি হত চতুর্ভুজ পুস্তকালয় থেকে প্রকাশিত ‘ছোটদের রামায়ণ’। লেখকের নাম মনে নেই। দাম এক টাকা। এটা গত শতকের নয়ের দশকের প্রথম দিককার কথা।
বাংলা ভাষায় লেখা ছোটদের রামায়ণের সাতসতেরোর হদিশ পাবেন ‘ছোটদের রামায়ণ’ পর্বে। এখানেই আছে বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য-প্রণীত ‘শিশুরঞ্জন রামায়ণ’ নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রর প্রতিক্রিয়ার কথা। ‘ছোটদের রামায়ণ’ হিসেবে এ-যাবৎ লেখা বইগুলোর কোথায় খামতি, কোনটা তার বৈশিষ্ট্য; সমগ্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মূলের সঙ্গে কোথায় কতটুকু তফাত, বিচ্যুতি ও লৌকিক সংযোজন; লেখার পর্ববিন্যাস, আঙ্গিক ও সাহিত্যমূল্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। আছে নিকট অতীতে ন’দিন ধরে পুতুলনাচের মাধ্যমে রামায়ণ পালা শোনার বিচিত্র অভিজ্ঞতার স্মৃতি!

‘সাধু-মহারাজদের লেখা রামায়ণ’ এই বইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রামায়ণ লেখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লেখকের আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণা সৃজনশীল লেখাকে কীভাবে কতটা প্রভাবিত করে— এই গোটা ব্যাপারটা শিশু-মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রসদ আছে এই অধ্যায়ে।
‘সীতা হরণের আসল কারণ’ অধ্যায়ে আছে, ‘খুদ্দুর যাত্রা’, ‘চাঁইবুড়োর পুঁথি’-কে বর্তমান বইয়ে আলোচনার পরিসরে অন্তর্ভুক্ত না-করার স্বপক্ষে লেখকের যুক্তিগ্রাহ্য আলোচনা। সংক্ষিপ্ত অথচ অকাট্য।
রামায়ণ অবলম্বনে রামায়ণ লেখার ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন ‘রামায়ণ: অন্য পাঠ’ পর্বে। এই প্রসঙ্গে লীলা মজুমদারের লেখা অন্যতম রামায়ণ পালা ‘বালী-সুগ্রীব কথন’ নিয়ে নিজস্ব ভাল লাগার কথা জানিয়ে একেবারে শেষে যে টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছেন, অবশ্যই তা সারগর্ভ। ‘লীলা মজুমদার এই পালাটি রচনা করেছেন কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের ঘটনাবলির ওপর নির্ভর করে। আমরা জানি, হনুমান লঙ্কা পোড়ানোর পর ল্যাজের আগুন নেভাতে গিয়ে মুখটা পুড়িয়ে ফেলেন, তারপর থেকেই তাঁর মুখ কালো এবং একটা প্রজাতিই কালো মুখের, তাদের বলি হনুমান, অন্যদের, অর্থাৎ লালমুখোদের বলি বাঁদর। যদি বাল্মীকি সত্য হয়, তাহলে পালার শুরুতেই হনুমান কালো মুখের কী করে হলেন? তিনি তো সুন্দরকাণ্ডে মুখ পুড়িয়েছেন। বাল্মীকি রামায়ণে ল্যাজে আগুন দেওয়ার আগে হনুমানের মুখ রক্তবর্ণ ছিল। সেটা আর কেউ না দেখুক জানকী দেখেছেন।’
‘বটতলার রামায়ণ’ সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণের নির্যাস: ‘রামায়ণ এখানে ধর্ম পুস্তক আর সেই ধর্মপুস্তক গুরুচণ্ডালি দোষে ভরা।’ আর অন্যের লেখা নির্বিকল্প আত্মসাৎ-এর মুদ্রিত নমুনা।
আলোচ্য বইয়ের সম্পদবিশেষ ‘রামায়ণের বাইরে রামায়ণ’ অধ্যায়টি। প্রসঙ্গত, এ-বিষয়ে ইতিপূর্বে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় বেশ কিছু হেভিওয়েট কেতাব লেখা হয়েছে। ইউটিউব-এ সহজলভ্য লেখক অ্যামি গনাত্রা-র রামায়ণের ৩০০ ভার্সন!
কিন্তু তাতে থাকা উচিত ছিল, অথচ নেই, কিংবা প্রায় অনালোচিত দিকটি (শিশুপাঠ্য রামায়ণ) নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করেছেন গবেষক।
‘লেখা কম ছবি বেশি’ এবং ‘ছবি ও ছড়ায় রামায়ণ’— অধ্যায়দু’টি আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে প্রাবন্ধিকের ভাবনার গভীরতা, শিশুপাঠের মনস্তত্ত্ব ও শিশুসাহিত্য নিয়ে নিজস্ব ভাবনাচিন্তার মৌলিক স্বাক্ষর।
‘লীলা মজুমদার এই পালাটি রচনা করেছেন কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের ঘটনাবলির ওপর নির্ভর করে। আমরা জানি, হনুমান লঙ্কা পোড়ানোর পর ল্যাজের আগুন নেভাতে গিয়ে মুখটা পুড়িয়ে ফেলেন, তারপর থেকেই তাঁর মুখ কালো এবং একটা প্রজাতিই কালো মুখের, তাদের বলি হনুমান, অন্যদের, অর্থাৎ লালমুখোদের বলি বাঁদর। যদি বাল্মীকি সত্য হয়, তাহলে পালার শুরুতেই হনুমান কালো মুখের কী করে হলেন?
শেক্সপিয়রের লেখা এ-যুগের ইংরাজিতে লেখা হয়েছে, অনেকদিন হল। সেকেলে অ্যাংলো-স্যাক্সন শব্দাবলি, যার একটা বড় অংশ এ-যুগে অপ্রচলিত, সেই দুরুহ বাধা এড়াতেই এহেন প্রয়াসের নেপথ্য চালিকাশক্তি বলা যেতে পারে। সম্প্রতি, বঙ্কিমচন্দ্রের ছ’টি উপন্যাস একালের বাংলা ভাষায় প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের এক প্রকাশক। এ-জাতীয় উদ্যোগ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে হবেও। কিন্তু ঘটনাকে অস্বীকার করা যায় না। বা, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাটা হবে একদেশদর্শিতার নামান্তর। চিরঞ্জয়বাবু এক্ষেত্রে নিজের লেখক-গবেষক সত্তাকে সবরকম গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে রেখে খোলা মনে আলোচনা করেছেন বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে এ-পর্যন্ত লিখিত শিশুপাঠ্য রামায়ণ সম্পর্কে। ‘আধুনিক রামায়ণ’-এ সময়ের দাবিকে মান্যতা দিতে লিখেছেন।
কেবল রামায়ণ লেখার ধরণ, প্রকৃতি, আঙ্গিক, ভাষা প্রয়োগ, উপস্থাপনার প্রবণতা নিয়েই আলোচনা থেমে থাকেনি। তার প্রমাণ ‘ছোটদের রামায়ণ অলংকরণ’। এক্ষেত্রে খুব বেশি টেকনিক্যাল কচকচানির মধ্যে না গিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন লেখার সঙ্গে ছবির সংগতি এবং প্রাসঙ্গিকতার দিকটি।
‘খুব ছোটদের জন্য রামায়ণ’ এই গ্রন্থপাঠের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, বাংলা ভাষায় তিন থেকে পাঁচ/ছয় বছরের বাচ্চা; এবং যাদের অক্ষরজ্ঞান হয়নি, তাদের উপযোগী বই প্রকাশে প্রকাশকদের দৈন্য সত্যিই পীড়াদায়ক ও দুঃখের। ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’-র গ্রিক, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় একবছর বয়সি থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক বিশেষ সংস্করণ দেখার সুযোগ হয়েছিল। ইংরেজিতে রয়েছে ইলিয়াড-এর পপআপ বই, সচিত্র ও শব্দনির্ভর বিশেষ সংস্করণ।
চিরঞ্জয়বাবুর বইটি হয়তো প্রকাশকদের এ-বিষয়ে উদ্যোগী করে তুলবে অদূর ভবিষ্যতে, এমন আশা রাখি।
নাটকের আকারে বাংলায় লেখা শিশুতোষ রামায়ণের অশ্রুত-প্রায় কাহিনি বিশদে বলেছেন ‘নাটক, পুতুলনাচ পালা’ অধ্যায়ে।
বইয়ের শেষ পর্যায়ে এসে বলেছেন অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় রচিত রামায়ণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়-সহ প্রসঙ্গকথা।
পুস্তানি বিষয়ানুগ হলে বইয়ের নান্দনিকতা বৃদ্ধি পায় ও বাড়তি আকর্ষণ তৈরি হয়। এজন্য প্রকাশকের যেটুকু ব্যয়-বৃদ্ধি হত, এই ধরনের বইয়ের ক্ষেত্রে পাঠক সাদরে সেটুকু ভার বহন করতে কুণ্ঠিত হতেন না বলেই বিশ্বাস। পাতা ও ছাপা চমৎকার। শিল্পী সোময়েত্রী চ্যাটার্জী-র মানানসই সুন্দর প্রচ্ছদ মূল পাঠে প্রবেশের আগে নিঃসন্দেহে পাঠকমনের প্রস্তুতির সহায়ক হয়ে উঠবে। চিরঞ্জয়বাবুর এহেন ব্যতিক্রমী প্রয়াসের কোনও পূর্বসূরি এবং সমান্তরাল নজির নেই। অবিলম্বে বইটি অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হওয়া প্রয়োজন। তাতে ভিনভাষী পাঠকসমাজ যে ঋদ্ধ ও যারপরনাই আহ্লাদিত হবে— এ-কথা জোর গলায় বলা যায়!
ভারতীয় ভাষায় শিশুতোষ রামায়ণ
চিরঞ্জয় চক্রবর্তী
লালমাটি
প্রথম প্রকাশ: কলকাতা বইমেলা ২০২৬
৪০০.০০




