প্রিয় সুবিমল: পর্ব ৬

লেখালিখি ও যূথবদ্ধতা

খামের ভেতর ছোট্ট একটা চিরকুট। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৪। সুবিমল বসাক তখন মেদিনীপুরে কর্মরত। প্রদীপ চৌধুরীর লেখা এই চিরকুট যথা সময়ে পেয়েছিলেন কি? সেদিন দেখা হয়েছিল তাঁদের? আমরা তা জানি না। তবে, সুবিমলের সংগ্রহে থাকা প্রদীপের অজস্র চিঠির মধ্যে, কালানুযায়ী প্রথম এটিই।

সুবিমল

     আমাদের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত তুমি কোথাও বেরিও না। office থেকে ফিরে সারাক্ষণই ঘরে থেকো। বিকেল ৪/৪.৩০শে একবার খুঁজ নেবো। না পেলে আবার। মোট কথা তুমি ঘরে থাকবেই রাত ৯টা পর্যন্ত। আজ দমদম যোয়ো না। অনেক কথা আছে।

প্রদীপ

প্রদীপ চৌধুরী (১৯৪৩-২০২১), হাংরি আন্দোলনের অন্যতম কবি। ১৯৬৩ সালে, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিঃস্কৃত, ‘অশ্লীল’ কবিতা লেখার অপরাধে। পরবর্তীতে ভর্তি হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর, পড়াশোনা ছেড়ে বোহেমিয়ান জীবন। হাংরিদের সঙ্গে মেলামেশা। কবিতাচর্চা। ১৯৮৪-র জুলাইতে বাবার কর্মস্থল আগরতলায় চলে যাওয়া। পরবর্তীতে, হাংরি জেনারেশনের বিতর্কিত সংখ্যার জন্য গ্রেপ্তার ও জামিন। ‘স্বকাল’ (পরবর্তীতে ‘ফুঃ’) পত্রিকার সম্পাদক। এসব তথ্য সরিয়ে চিঠিপত্রে উঁকি দিলে, সুবিমলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কখনও তা বন্ধুত্বসুলভ, কখনও আবার খানিক বিরোধ। দেখে নেওয়া যাক—

প্রিয় সুবিমল

            বিশেষত ঠিকানা বদল করেছি
   বেশ কিছুদিন আগরতলা ছিলাম না, তাই তোমার চিঠি পেতে দেরী হয়ে গেল। আমার খুব অবাক লাগছে আজকাল কারোর চিঠিই পাইনা। তোমাদের সব হলো কি? মলয়, সুভাষ শৈলেশ্বর কি কোলকাতা নেই। কি এমন ঘটল এর মধ্যে? ১৪ই ডিসেম্বর মলয়ের কেসের জাজমেন্ট— মলয় ও তুমি দুজনেই লিখেছিলে। কি হলো কিস্‌সু জানাবার প্রয়োজন বোধ করলে না। খবরের কাগজেও কিছু দেখতে পেলাম না এদিকে আমি কি অসম্ভব একা সময়ের ঘানি টেনে চলেছি তা কি জানো। এখানে কিছুই ঠিক হয়নি আমার, মনে হচ্ছে কোনোদিন হবেও না। জেব্রার লেখা আজও পাঠাতে পারিনি। সময় থাকলে আমাকে জানিও।
   তুমি লেখা দিচ্ছনা কেন? সম্ভব হলে তোমার সম্পর্কে লেখাটা আমি পাঠাব; ভাবাই তো আছে।
   এষনা বেরোল?
   মলয়ের কেসের কি হলো জানিও
   তোমরা সব কেমন আছ জানিও
   তুমি কেমন আছ জানিও

প্রদীপ
২৯/১২/৬৫

এ সংখ্যা জেব্রার সম্ভাব্য সূচিপত্র সম্পর্কে জানালে ভালো হয়।

১৪ ডিসেম্বর ব্যাঙ্কশাল কোর্টে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার রায় বেরোনোর কথা থাকলেও, তা বেরোয় ২৮ ডিসেম্বর। ‘জেব্রা’— মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত পত্রিকা।

প্রিয় সুবিমল

   তুমি এখন কোথায় আছো, মরে অথবা বেঁচে আছ জানার কোন উপায় নেই। কিম্বা হয়ত ঠিকই আছ তোমরা, দু হাতের দুই মুষ্ঠিতে প্রেম ও প্রতিহিংসা রেখে এখনো কোলকাতা গণিকালয় ও কফিহাউস attend করে চলেছ। আমি কতকাল এমন যোগাযোগহীন ও নিঃসঙ্গ আছি, মনে হচ্ছে যেন দেহত্যাগ করে ফেলেছি, ভৌতিক পৃথিবীতে ৫০ কোটি মানুষের সঙ্গে আমিও ভূত হয়ে এখন একজন কেরানী মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি।
   কয়েকমাস আগেপর্যন্ত লেখালেখি nilএর কোঠায় চলে গিয়েছিল— এখন অবশ্য মাঝে মাঝে ‘৬৪ ভূতের খেয়ার’ কিছু কিছু পাণ্ডুলিপি তৈরী করছি। তোমার লেখালিখি কি পর্যন্ত চলছে? সেই প্রসঙ্গে নীচের স্তবকে দৃষ্টি দিলে ভালো হয়।
   এখানকার ছেলেরা ‘নান্দীমুখ’ নামে সাম্প্রতিক জেনারেশনের একটা কাগজ বের করছে   ৩টি issue ইতিমধ্যেই বেরিয়ে গেছে। পূজোর আগে একটা ভালো সংকলন করতে চায়, ওরা সুবোর ১৬ পৃষ্ঠার একটা essay ছাপছে— আমি ৩/৪ page লিখব, শৈলেশ্বর সুভাষ ও মলয়কে চিঠি দিচ্ছি— তুমি চিঠি পরার সঙ্গে সঙ্গে ৫ পৃষ্ঠার মধ্যে একটা crazy লেখা পাঠাও— আমি ওদের কথা দিয়েছি— এই inlandও ওদের পয়সায় কেনা হয়েছে।
   মলয় এখন কোথায় আছে বাঁকীপুরের address-এ ওঁকে লিখলাম— immediate লেখা পাঠিও, চিঠি দিও।
   নীচে ঠিকানা দিলাম—
   Pradip Choudhuri
   Lecturer of Eng.
   Navagram H.S. School
   PO. AIR-PORT
   Agartala
   Tripura

With love
প্রদীপ চৌধুরী
২০.৮.৬৬

এই চিঠির প্রেক্ষিতে, সুবিমল বসাকের ডাইরিতে ৩০.৮ তারিখে ‘প্রদীপকে চিঠি দিলাম’-এর বাইরে কোনও এন্ট্রি নেই। তবে এর পর যে-দুটি চিঠি তুলে ধরা হবে, তার সঙ্গে সুবিমলের জবাবি চিঠির খসড়াও পেয়েছি। দুটি মিলিয়ে পড়লে, আকর্ষণীয় ঠেকতে পারে।

প্রিয় সুবিমল

   Card পেয়েছি
   হা, তুমি যেকোন লেখা পাঠাতে পার— সাহস আমার আছে ঠিকই— আমি শুধু চাই, তোমার লেখাটা চলতি বাংলায় হবে (ক) এবং তা চার ফুলস্কেপশীট হবে (খ)। কোলকাতায় আমার কোন এজেন্ট নেই— কারণ Agent দের কমিশন দেবার কোন ক্ষমতাই আমার নেই। আমি ফু বার করেছি কোলকাতার অনেক বাইরে থেকে একথা ভুলে যেও না। আমি শুধু চাইছি যে সাহিত্যকে কেন্দ্র করে কেউ ব্যবহৃত না হোক, কেউ ব্যবহার না করুক। তুমি জানো কি বাইরে এখন মলয়ের মুখোশ খুলে গেছে? ওর বিরুদ্ধে প্রত্যেকের অভিযোগ এত তীব্র কেন? চরম পক্ষপাত না দেখালে তুমিও ঠিকই বুঝতে পারবে। আমি জানি মলয়ের সব তথ্য ফাঁস করে দিলে বিদেশে প্রচার বন্ধ হবার আশঙ্কা খুব? কিন্তু আমি সে ব্যবহারিক ক্ষতিও মেনে নিচ্ছি— তোমার ধারনা স্পষ্ট জানাবে— লেখা পাঠাবে, খুব দ্রুত, ছাপা প্রায় শেষ, W/Love

প্রদীপ
১৭/৭/৬৮

এই চিঠি সম্পর্কে, সুবিমল ডাইরিতে (১৬ আগস্ট ১৯৬৮) লিখছেন— ‘…প্রদীপকে যা লিখবো, ভেবে রেখেছি। প্রদীপের চিঠিটাই মিস্ট্রিয়াস। ওর প্রত্যেক চিঠিতে আলাদা-আলাদা ডিসিসন। …১৪ তারিখে চিঠি দিলাম। নাম চুপ করে থাকার মানে হয় না…।

কী লিখেছিলেন সুবিমল সেই চিঠিতে? খসড়া থেকে জানা গেল—

১৪/৮/৬৮

প্রদীপ,

   মাসখানিক বাইরে থেকে ফিরে এসে মেজেয় ধুলোয় তোমার কার্ড পেলাম। ফুঃ সম্পর্কে তোমার ফাইনাল ডিসিশন না নেয়া ওব্দি আমি কোন লেখা দিতে পারছি না। ধরে নাও আমার তৎপরতার অভাব। ‘খিটক্যাল’ লেখাটা দ্রুত ফেরত পাঠিয়ে দাও— কপি করার যে কি রকম ঝামেলা তোমার ভালো করে জানা আছে।
   মলয় সম্পর্কে তোমার ব্যক্তিগত গোলমালে আমার কোন উৎসাহ নেই। বিদেশী ভাষায় আমার কোন অনুদিত গ্রন্থ নেই, মলয়ের বাইরে প্রচার বন্ধ করে ব্যবহারিক ক্ষতি— আমার খুশী হওয়ার কোন ব্যাপার নেই। মলয়ের আন্তরিকতা আমি অস্বীকার করি কি করে, যখন আর সবাই অপরের পোঁদ থেকে কাঠি সরিয়ে তেল দিতে মগ্ন; বাড়ী থেকে পেছন দরজা দিয়ে যাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, সেও দেখি হাজির হয় নিজের ‘ইগো’ ঝালিয়ে নিতে।
ভালোবাসা সহ।

সুবিমল বসাক

সুবিমল বসাক অঙ্কিত প্রদীপ চৌধুরীর স্কেচ

ডাইরি পড়ে জানা যায়, সেই সময়ে হাংরিদের মধ্যে মনান্তর তুঙ্গে এবং সেদিনই বাক্‌বিতণ্ডার পর সুভাষ ঘোষকে ঘুসি মারেন সুবিমল। যাই হোক, পরের চিঠিটি ওই বছরেরই ডিসেম্বর মাসের, এবং খুঁটিয়ে পড়লে পূর্ববর্তী চিঠিটির রেশ টের পাওয়া কঠিন নয়।

প্রিয় সুবিমল,

কার্ড পেয়েছি, আমি ৩/৪ দিনের মধ্যে তোমাকে লেখাটা রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠিয়ে দেবো— বেয়ারিং করে পাঠানোর প্রশ্নই ওঠেনা, কারন লেখাটা আমি চেয়ে নিয়েছিলাম।
   গত সংখ্যা ফুঃতে তোমার লেখা ছাপাতে পারিনি তার কারণ তুমি জান— কিন্তু এর ফলেও জেনারেশন সংক্রান্ত perplexity থেকে মুক্ত হতে কি পেরেছি? কিন্তু এতে অবাক হবার কি আছে? একদিন লেখালিখির চেয়ে বেশি যূথবদ্ধতা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমাদের Causeটাকেও, আজ যদি লেখার কোন point থেকে প্রত্যেকে আলাদা হয়ে যেতে চায়, সেটাই তো স্বাভাবিক।
   মলয় এবং তার পোষা কয়েকজন সকলের সততার বিনিময়ে বিদেশে কি পরিমাণ Stage Manage করে নিয়েছিল আজ তার সব প্রমাণ আমার হাতে। সকলেরই প্রকৃত চেহারা আজ আবরণহীন। anyhow, ফুঃ আমি আবার প্রেসে দেবো Jan/Feb। তাতে তোমার লেখাটা ছাপতে আমার আপত্তি নেই— তবু লেখাটা তোমাকে ফেরৎই পাঠাচ্ছি। Wait.
   মলয় এখন কোথায় আছে? ওর প্রেরিত HG Poster পেয়েছি— ওর ঠিকানাটা পাঠিও— প্রাপ্তিসংবাদ জানাব। কেমন আছ?

১৮/১২/৬৮
প্রদীপ চৌধুরী

ডাইরিতে চিঠিটির সম্পর্কে সুবিমল লিখছেন (২০.১২.৬৮)— ‘বাসায় ফিরেই প্রদীপের ১টা চিঠি পেয়েছি। আমার জন্মাদিনে লিখেছিলাম— লেখাটা ফেরৎ পাঠাতে, বেয়ারিং হলেও। ও সঙ্গে সঙ্গে চিঠি দিয়েছে পেয়েই। তাতে ১গাদা ফিরিস্তি— আবার তেল মারার ব্যাপার। মেজাজ খারাপ করে দেয়। ভেবে নেই— কি লিখতে হবে। আসলে বদমায়সি না করলে চলছে না— যতই সরে থাকতে চাই, ততই চেপে ধরবে। কালই লিখে দিতে হবে।

সুবিমলের চিঠির খসড়া থেকে জানা যায় সেই জবাব—

প্রদীপ চৌধুরী
সম্পাদক,
ফুঃ,

​সাহিত্যে শেষ পর্যন্ত ইনডিভিজুয়ালিটি দাড়িয়ে থাকে— এ ব্যাপার, আমাদের পরবর্তী ছেলেরা যেমন ফালগুনী, শম্ভু এরাও বুঝে ফেলেছে, অথচো প্রদীপ চৌ অ্যান্ড কোং এতদিন যৌথ কারবার চালিয়ে সবে উপলব্ধী করতে পেরেছে। তবুও কি কাটিয়ে উঠতে পেরেছে যুথবদ্ধতা? অবশ্য কিছু বলার নেই। কাকে তেল মারার জন্য গ্রন্থের ভূমিকা রচনা, কাকে তেল মারার জন্য অনুবাদ, কি ভাবে বিদেশী মুদ্রা আনার জন্য অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ, কি উদ্দেশ্যে কাভার তৈরী— এতসব কান্ডকারবার করার পরেই প্রদীপ চৌধুরীর মুখে stage-manage এর কথা মানায়। নিজের গলায় বকলেশ এঁটে শৈলেশ্বরের হাতে চেন তুলে দেয়া তার পক্ষেই সম্ভব ও শোভনীয়। আর সত্য! বেবাক হালায় পুটকির ভিৎরে গিয়া হ্যান্দাইছে। প্রদীপ চৌধুরীর উচিৎ সততা ঝালিয়ে নেয়ার জন্য নিজের চিঠি আবার করে পড়ে নেয়া। প্যান্ট, ধুতি খুলে শ্রীমান সত্যবাদীদের গু* বের করে দেয়ার প্রমাণ আমার হাতেও আছে। Cause নিয়ে কিসের এত মাতামাতি! সরকারের তরফে সাক্ষ্যদান, লালবাজারে statement, কান ধরে হাতপায়ে নাকে খৎ দিয়ে ‘আর কোন দিন সংশ্রব রাখবো না’— হায়ার্কিহীন সমাজের বুলি কপচানোদের বিবাহ, বিবাহের সংবাদ, জামাইষষ্ঠী পালন, ছেলের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে পত্রিকার স্পেশাল ইস্যু— fuck! পোঁদে লাত মারার চোটে Causeও পাল্টে যায় দেখছি।

​   আমি পত্রিকা বা’র করছি। তোমার লেখা পাঠাতে পারো— লেখা পেলে নিজের লেখা ছাপানোর লোভ সামলে অপরের লেখা বা’র করার সাহস রাখি। আমি অবশ্য তোমার কয়েকটা চিঠি ছাপছি,— তার বিনিময়ে প্রতিচিঠির দরুণ ১০ টাকা করে তুমি পাবে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের চিঠি লেখার আগে নিজের লুপহোল খতিয়ে নিও।

সুবিমল বসাক
২১/১২

এর পরও প্রদীপ চৌধুরীর অনেক চিঠি পেয়েছি সুবিমলের সংগ্রহে। এমনকি, নব্বইয়ের দশকেও পত্রিকার জন্য লেখা চেয়ে পত্রবিনিময়ের চিঠিপত্র রয়েছে তাতে। অপ্রাসঙ্গিক-বোধে, আপাতত সেসব আলোচনা থাক।

পরবর্তী যে-ব্যক্তির চিঠি আলোচিত হবে এই পর্বে, তিনি কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়। তাঁর সম্পাদিত ‘কবিপত্র’ পত্রিকার একাধিক সংখ্যায় লিখেছেন সুবিমল; সুবিমলের আহ্বানে ‘আবহ’ পত্রিকার জন্যও লেখা পাঠিয়েছেন পবিত্র। সুবিমলের সঙ্গে ‘আবহ’-এর সম্পর্ক ও সম্পৃক্তি আলোচিত হয়েছে পূর্ববর্তী পর্বগুলিতে।

প্রতাপাদিত্য রোড
১০.৯.৭৩

শ্রীযুক্ত সুবিমল বসাক
বন্ধুবরেষু,

   এখনো কি সময় আছে? আমি আবহ’র জন্য লেখা পাঠিয়ে দিলাম। দেরী হল, কারণ লিখতে পারছিলাম না। যদি সময় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়ে থাকে জানালে বাধিত হবো।
   আপনি এসেছিলেন যেদিন, আমার জরুরী কাজ ছিল; বলতে পারেন কবির সঙ্গে সাক্ষাৎকার কি কম জরুরী? বলবো, সব চেয়ে বেশী, তবুও প্রাণধারণ কি শ্রমসাধ্য হয়ে উঠছে ভাবুন; তার জন্য সবই যেতে বসেছে।
   কবে আসবেন এ দিকে? ভালো আছেন তো? লেখা দেখবো আশা করি।

মঙ্গলার্থী
পবিত্র মুখোপাধ্যায়

‘আবহ’ পত্রিকার শারদ সংকলন, ১৩৮০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় পবিত্র-র কবিতা ‘আত্মজৈবনিক সনেট কল্প/৪’। এই লেখাটিই পাঠিয়েছিলেন তিনি।

‘আবহ’-র সূত্রে পত্রবিনিময় হয়েছিল তৎকালীন আরেক তরুণ কবির সঙ্গেও— রণজিৎ দাশ। তবে চিঠিতে তিনি পদবির বানান লিখেছিলেন ‘দাস’, পত্রিকাতেও ছাপা হয় তেমনই।

১৬-৮-৭১

প্রিয়বরেষু,
   আপনার চিঠিটি অপ্রতাশিত, স্বল্পভাষী। এবং অতি নিগূঢ়ভাবে আন্তরিক। খুব ভালো লাগলো। আপনি সেদিন কফিহাউসে আমার জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন, এটা মনুষ্যসমাজের পক্ষে বড় সুখবর। আজকাল কে কার জন্যে অপেক্ষা করে মশাই? হৃদয় নিয়ে?
   দুটো লেখা পাঠাচ্ছি তাড়াহুড়োর মধ্যে। ভালো না লাগলে ছিঁড়ে ফেলবেন। বাজে লেখা ছিঁড়ে ফেলার মধ্যে একটা শুদ্ধ আনন্দ আছে মশাই, আছে দায়িত্বজ্ঞান, শ্লাঘা। গদ্য দু’চারটে হাতে ছিল না যে তা নয়, কিন্তু গদ্য কপি করে পাঠানো খুব ঝামেলা, অনেক কাটাকুটি, অনেক দেরি।
   আপনার পত্রিকাটির একটি সংখ্যা পাঠালে সুখী হবো।
   চিঠিটির জবাব চাই।                           ভালোবাসা জানবেন।

রণজিৎ দাস

রণজিৎ দাস
হসপিটাল রোড
শিলচর-৫
আসাম।

অতঃপর, ‘আবহ’ পত্রিকার শারদ সংকলন ১৯৩৮ সংখ্যায় প্রকাশ পায় রণজিৎ-এর একটি কবিতা— ‘ডায়েরী’। তবে এই চিঠির প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষিত রণজিৎ বিস্মৃত হয়েছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৯৮ সালের একটি চিঠি থেকে।

কলকাতা
৩০.১২.৯৮

প্রিয় সুবিমলদা,

   জীবনে প্রথম আপনার চিঠি পেয়ে খুবই ভালো লাগলো।
   আপনি কষ্ট করে আমার কবিতার হিন্দি অনুবাদ করেছেন, একথা জেনে আনন্দ যেমন হচ্ছে, তেমন সঙ্কোচও হচ্ছে। অনুবাদটি দেখার খুব ইচ্ছে রইল।
   ভালো থাকবেন। ভালোবাসা জানাই।

রণজিৎ

রণজিৎ দাশের কবিতার অনুবাদটি আমিও দেখেছিলাম, কয়েকবছর আগে, সুবিমল বসাকের বাড়িতেই। কিন্তু কোন কবিতা— মনে পড়ছে না কিছুতেই। খুঁজে দেখতে হবে আবার…

(ডায়েরি ও চিঠিগুলির বানান অপরিবর্তিত)

ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য