নিমাইদার ওয়াহিদা রহমান
আমি ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছি কালীঘাট মহাকালী পাঠশালায়। খুবই নামী স্কুল। ওখানে আমার দিদি, বোনেরা স্কুল শেষ করেছে। ওই স্কুলেই আমাদের অনেক সহপাঠী ছিল, যারা বেশিরভাগ আমাদের পাড়ার। কেউ কেউ ছিল গলির ছেলে-মেয়ে।
একদম ছোটবেলায় এসব বুঝিনি। কারা পাড়ার, কারা গলির। গলির ছেলেমেয়েদের পরিচয় নিয়ে কোনওদিন কাউকে বাঁকা কথা বলতেও দেখিনি। আমারও তেমন দু-তিনজন ছিল, যারা গলির। যারা স্কুলের বন্ধু। কিন্তু বেশিরভাগ গলির ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমার মেলামেশা খেলার মাঠে।
খেলার মাঠ বলতে দুধওয়ালা পার্ক নয়, হয় সেই কালীঘাট পার্ক। নয় এদিকে জেলগ্রাউন্ডে। এখান থেকে লেকের মাঠ বেশ দূরে। এছাড়াও চারদিকে ছোট ছোট মাঠ ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কথায় বলে মাঠে-ঘাটে। আমাদের মাঠ ছিল যেমন অনেকগুলো, তেমন ঘাটও ছিল। তার মধ্যে একটা শ্মশানের ঘাট।
পাড়া আর গলি মিশে যেত কালীঘাটে! জয়ন্ত দে-র কলমে ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১…
ওখানে হাঁ করে দেখেছি কলকে ফাটিয়ে সাধুবাবাদের গাঁজা খাওয়া। ‘ব্যোম, ব্যোম’ করা আকাশডাকা ডাক। আমাদের বন্ধু চিন্টু ছিল এসবের গুরুঠাকুর। চিন্টুর নেতৃত্বে শ্মশানঘাটে হাজির হতাম সিগারেট নিয়ে। একটা সিগারেটে বারোজনের সুখটান। সে কী উত্তেজনা! চিন্টু গাঁজার মতো করে সিগারেটও টানত। সেই সময় থেকে আমি কোনওদিন সিগারেট-গাঁজা খেতে পারিনি, ভয়ংকর কাশি হত। ভয়ংকর রোগা ছিলাম, পাঞ্জাবি পরলে সবাই দেখত হ্যাঙারে পাঞ্জাবি ঝুলছে। তবু উত্তেজনায় উত্তেজিত হতে বাধা কোথায়?

এইসব উত্তেজনার জন্য আমাদের অনেক দূর যেতে হত। অনেক সময় খেয়া পার হয়ে চেতলার দিকে। তার মধ্যেই একদিন শুনলাম, চিন্টু নেপালি গলির ভেতর গাঁজা খেয়েছে। নেপালি গলি! তার ওপর গাঁজা!
নেপালি গলিটা ছিল একদম চক্রবর্তী পাড়ার মুখোমুখি। গলি বলুন, বাড়ি বলুন— ওখানকার বেশিরভাগ মেয়েই নেপালি। তাই মুখে মুখে নেপালি গলি।
সেদিন গাঁজা খাওয়ার জন্য আমাদের পাড়ার নিমাইদা ওকে বুনোদাকে দিয়ে গাট্টা খাইয়েছিল। নিমাইদা নিজে চিন্টুকে মেরে হাত গন্ধ করেনি। গম্ভীর মুখে বলেছিল— চিন্টু তুই এখানে অপেক্ষা কর, বুনোকে ডেকে পাঠিয়েছি, ও আসছে। বুনোদা এল। এসেই হুঙ্কার দিল।— চিন্টু অন্যায় করেছিস। চিন্টু বলল— করেছি। আর করব না বুনোদা। নিমাইদা বলল— বুনো, শাসন যা করার করেছি। তুই কষে ক’টা গাট্টা মার। যাতে ওর মনে থাকে।
বুনোদা গাট্টা কষিয়েছিল। কিন্তু পরে চিন্টুর মনে থাকেনি। সে গল্প আলাদা। তার আগে নিমাইদার কথা বলি।
নিমাইদা ছিল শ্রীযুক্ত বাবু নিমাই। নিমাইদার পদবি কী ছিল, মনে নেই। নিমাইদার বাবা বেশ ক’টা বাড়ি রেখে গিয়েছিলেন। সেইসব বাড়ি থেকে বেশ অনেক টাকাই ভাড়া পেত মাস গেলে। নিমাইদা একটা বাড়ির একতলা জুড়ে থাকত। বাড়িটা ঠিক পাড়ার ভেতর ছিল না, একটু বাইরের দিকে। কালীঘাট রোডের দিকে। সেখানে আমাদের অবাধ যাতায়াত ছিল। আমাদের সকালে। বড়দের সন্ধেবেলা। নিত্য সন্ধেবেলা ওখানে মদের আসর বসত। কিন্তু মাতলামি হত না। কেউ কোনওদিন সামান্য চিৎকার-চেঁচামেচি পর্যন্ত শোনেনি। সন্ধের পর যারা ঢুকত তারা সুড়সুড় করে ঢুকত। রাত বাড়লে নেশা চড়লে টলতে টলতে বেরিয়ে আসত। ব্যস! এটুকুই।
নিমাইদা সাধারণত সাদা পাজামা আর গলায় সুতোর কাজ করা পাঞ্জাবি পরত। প্যান্ট-শার্ট পরা নিমাইদাকে কখনও দেখিনি। সকালবেলা সচরাচর তাকে দেখা যেত না। অষ্টমীর অঞ্জলি, সরস্বতী পুজোর দিন, দোল আর ভোট এলে নিমাইদাকে সকালবেলা দেখা যেত। এছাড়া নিমাইদা দৃশ্যমান হত সূর্য ডুবলে। ওর আত্মীয়স্বজন কেউ ধারে-কাছে ছিল না। নিমাইদাকে পাড়ার সবাই সমীহ করত। নিমাইদাও সবাইকে অসম্ভব শ্রদ্ধা, সৌজন্য, ভালোবাসায় রাখত। নিমাইদা দাঁড়িয়ে, চেনাজানা কেউ পাড়ার মোড়ে হাতে-টানা রিকশা থেকে নামলেই ইশারা করে দিত। ভাড়া নিমাইদা দেবে। অনেকেই আপত্তি করত। কেন নিমাই তুমি দেবে? নিমাইদা অমায়িক হাসত— কী হয়েছে? আমার কে আছে, আপনারা আছেন, আমার আপনজন, একটু নয় করলাম। নিমাইদার সামনে থেকে কেউ রিকশায় উঠলেও আবার ইশারা— আমি দেব। গন্তব্য নামিয়ে রিকশাওয়ালা ভাড়া নিত না। সবটাই আপনজন আর জমিদারি ব্যাপার!
কোনও এক জায়গা থেকে রোজকার দুপুরে তাঁর খাবার আসত। বেশ তরিবত করে অনেক পদের রান্না। কোথা থেকে আসত জানি না। রাতে রুটি-মাংস বাঁধা। সেটা এক পাঞ্জাবি দোকানের। শালপাতায় মোড়া রুটি, মাটির ভাঁড়ে খাসির মাংস। নিমাইদাকে নিয়ে এত কথা লিখলাম একটা কারণে— কালীঘাটের গলিতে কোনও সুন্দরী মেয়ে এলেই নিমাইদার কাছে প্রথম খবর আসত। খবর আসত উড়ে। গলির দালালরাই খবর দিত। বিনিময়ে নিমাইদা তাদের খুশি হয়ে বখশিস দিত। তারপর অবশ্যই নিমাইদা তাকে দেখতে যেত— জামাই সেজে। যদি মনে ধরত তবে বেশ কিছুদিন নিমাইদা তাকে নিয়েই মশগুল থাকত।
তখন নিমাইদার গায়ে ডবল সুগন্ধি, বুকের পাকা বঁড়শির মতো রোমের খাঁজে ভাঁজে পাউডারের উড়ো গুঁড়ো। মুখে জর্দা দেওয়া পানে, হাতে সিগারেটের প্যাকেট— নিমাইদা তখন হিন্দি সিনেমার রাজকুমার।
হিন্দি সিনেমার রাজকুমার ছিলেন নিমাইদার একমাত্র হিরো। তারপর দেব আনন্দ।
একদিন নিমাইদা বলল, যা দেখে আয়। …গলিতে হুরি নেমেছে। ওফ একদম ওয়াহিদা রহমান! ওকেই আমি রেখে দেব। টপ টপ। টোটাল কালীঘাটে আর কেউ নেই রে। এত্ত সুন্দরী!
আমি, চিন্টু, বুড়ো, গজা— আমরা দেখতে দৌড়লাম।
বিখ্যাত তবলা গলির আগে সেই গলি। ওই গলির বিশেষত্ব হল, এখানে একটাই বাড়ি। ওখানকার বেশির ভাগ মেয়ে হিন্দিভাষী। তারা মাঝে মাঝেই বদলে যায়। কোথা থেকে মাঝে মাঝে ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসে, তারপর হঠাৎ একদিন উড়ে যায়। পরে চিন্টুর কাছ থেকে শুনেছি ওরা ওয়াটগঞ্জ, সোনাগাছি থেকে আসে, আবার এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যায়। যাই হোক, ওদের আদবকায়দাও বেশ ভিন্ন। কালীঘাটে বসবাস করা মেয়েদের মতো নয়। আমরা ওখানে গিয়ে একডজন গলির মেয়েকে দেখেও বুঝতে পারলাম না, কে নিমাইদার ওয়াহিদা রহমান, কে টপ?
কালীঘাট অঞ্চলের কিমা ঘুগনির অনেক রকমফের ছিল। ওদিকে বারোমাস মোদোমাতালদের ভিড়। ওদের কিমা ঘুগনি ছিল আলাদা। তাতে পাঁঠার নাড়িভুঁড়ি কুচি কুচি করে কেটে মেশানো থাকত। কেউ বলত বট ঘুগনি, কেউ বলত কিমা। আমাদের জন্য স্পেশাল কিমা ঘুগনি ছিল। আমাদের বিশ্বাস ছিল ওটায় কিমাই থাকত। তবু এই কিমা ঘুগনি খাওয়ার জন্য কতবার যে বাড়িতে মার খেতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। মা দিদিরা প্রত্যেকবার বোঝাত, স্পেশাল বলে কিমা ঘুগনির কিছু হয় না। সব পাঁঠার নাড়িভুড়ি।
চিন্টুর তখন ওসব জায়গায় বেশ চেনা-পরিচিতি তৈরি হয়েছে। অবশ্যই খদ্দের হিসেবে নয়, এলাকার ছেলে হিসেবে। চিন্টু তখনও দাদা হয়নি, শুধু চিন্টু। চিন্টু গলির একটা মেয়েকে সটান জিজ্ঞাসা করেই বসল— বাজার-পাড়ার নিমাইদা কার ঘরে আসে?
সে চোখ কুঁচকে বলল— ওই জমিনদার নিমাইবাবু। দাঁড়াও সে মেয়ে এখানে নেই। ওর ঘরে লোক আছে। একটু ঘুরে আসো।
আমরা পটুয়াপাড়া থেকে একচক্কর ঘুরে এলাম। এবার এসে তাকে দেখতে পেলাম। খুব ফরসা, কটা চোখের একটা মেয়ে। তার মাথায় একঢাল চুল। আমার নিমাইদার ওয়াহিদা রহমানকে দেখলাম। এর আগে গোপাল সুইটসের পাশের গলিতে নিমাইদার হেমা মালিনীকে দেখেছি, শনি মন্দিরের পিছনে নিমাইদার সুচিত্রা সেনকেও দেখেছি। নেপালি গলিতে নিমাইদার এক ‘টপ মাল’ ছিল— আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ড্যানিবউদি!
এদের সবাইকে নিয়েই নিমাইদার হেব্বি আদিখ্যেতাও দেখেছি। যেন পারলে বিয়ে করে নেয়। এবার ওয়াহিদা রহমান।
এবার আমাদের গিয়ে নিমাইদার পছন্দকে তারিফ করতে হবে, তাহলে কিমা ঘুগনি আসবে।
কালীঘাট অঞ্চলের কিমা ঘুগনির অনেক রকমফের ছিল। ওদিকে বারোমাস মোদোমাতালদের ভিড়। ওদের কিমা ঘুগনি ছিল আলাদা। তাতে পাঁঠার নাড়িভুঁড়ি কুচি কুচি করে কেটে মেশানো থাকত। কেউ বলত বট ঘুগনি, কেউ বলত কিমা। আমাদের জন্য স্পেশাল কিমা ঘুগনি ছিল। আমাদের বিশ্বাস ছিল ওটায় কিমাই থাকত। তবু এই কিমা ঘুগনি খাওয়ার জন্য কতবার যে বাড়িতে মার খেতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। মা দিদিরা প্রত্যেকবার বোঝাত, স্পেশাল বলে কিমা ঘুগনির কিছু হয় না। সব পাঁঠার নাড়িভুড়ি।
তখন অনেক কিছু আমাদের স্পেশাল ছিল।
সকালের স্পেশাল ছিল কোয়ার্টার পাউরুটি কেটে সাদা মাখন লাগিয়ে চিনির বস্তায় একবার ঠেকিয়ে দেওয়া। স্পেশাল ছিল, কালীঘাট মন্দিরের সামনে ভাঙা বিস্কুটের দোকান। স্পেশাল ছিল, আইসক্রিম কোম্পানির কোনা-ভাঙা দুধ-আইসক্রিম।
সেই সঙ্গে ছিল পদে পদে বড়দের বাধা। এই বাধা মানে মুখে নয়, সবসময় মার। আমরা সবাই বাড়িতে মার খেতাম। এটা লজ্জার ব্যাপার ছিল না। মার মানে আড়ংধোলাই, মার মানে ঠ্যাঙানি, চাবকানো। সিনেমা হলের খোচড়, খেলার মাঠের মাউন্টেন পুলিশের মতোই তখন বাড়ির লোকজন। মায়ের হাত ব্যথা হলে দিদিরা দায়িত্ব নিত। বাবা কোনওদিন মারেনি। কিন্তু অনেক বন্ধুর বাবা বেল্ট দিয়ে চাবকাত। চিন্টু কালীঘাট বাজার থেকে একটা শংকর মাছের লেজ জোগাড় করেছিল। চাবুক। মাঝে মাঝে সেটা ছপাৎ ছপাৎ করে হাওয়ায় চালাত। চাবকাত। ভাবটা ছিল ভবিষ্যৎ চাবকে ও কালীঘাট শাসন করবে। চিন্টু আমাদের ক্যাপ্টেন ছিল। কারণ ডিউস ব্যাট, ডিউস বল, গ্লাভস, প্যাড, উইকেট সব ওর। তাই ও আমাদের ক্যাপ্টেন। ফুটবলটাও ওর ছিল। ওর খেলার বুট ছিল। আমাদের কেডস। অনেক পরে লেকের মাঠে যাওয়ার পর খেলার বুট হয়েছে। লেকের মাঠে আমাদের সঙ্গে যেত একটা বাচ্চা ছেলে। খুব শান্ত শিষ্ট। তার নাম টুকরে। চিন্টু নয়, ভবিষ্যতে টুকরেই কালীঘাট শাসন করবে। তার কথাও পরে বলব।
সে-সময়টা ছিল আলাদা।
সে-সময় গঙ্গার মাটিও বিক্রি হত চুপড়ি করে। তখন তোলা উনুন, পাতা উনুন। নিয়ম করে উনুনের গায়ে মাটি ধরাতে হত। বেশিরভাগ সময় মাটি যাঁরা বিক্রি করতেন, তাঁদের বিনিময় ছিল রুটি। চারটে রুটিতে একঝুড়ি মাটি। মাটি কিনত বাড়ির বউরা। তাদের হাতে পয়সা কোথায়, রুটি আছে।
ছোটবেলায় প্রশ্ন ছিল— ওই রুটি দিয়ে কী হয় গো মা?
উত্তর নেই। পাড়াতুতো এক পিসি বলেছিল— রুটি শুকনো করে, গুঁড়ো করে চপের গায়ে… সস্তা পড়ে। অত বিস্কুট কোথায় যে, বিস্কুট গুঁড়ো দেবে! সিনেমা দেখতে গিয়ে যে চপগুলো গিলিস… আর খাস না।
আর খাব না।

কিন্তু বসুশ্রী, উজ্জ্বলা, রূপায়ণ, বিজলী, ভারতী, পূর্ণ সিনেমার হাফটাইমে গ্রিলের সামনে ভেজিটেবল চপ দেখলে কে আর সে কথা মনে রাখে। তখন সিনেমা হলের পাস ছিল। আর উজ্জ্বলার চানাচুর ছিল। এখন উজ্জ্বলা হল নেই, কিন্তু চানাচুর আছে। মন্টু বোস নেই, কিন্তু বসুশ্রী আছে। মন্টু বোসের মতো কোনও সিনেমার মালিকের এমন দেখনদারি ব্যক্তিত্ব ছিল না। ছোটখাট, গোলগাল, সাদা ধুতি আর গিলে-করা পাঞ্জাবি পরা মানুষটার সিগারেটে টান যারা দেখেছে, তাদের চোখে লেগে আছে। হিরো! হিরো!
আমাদের বাড়ির ঠিক পিছনের দিকে ছিল কালীঘাট হাইস্কুল, তার পাশে অভিনেতা রবি ঘোষের বাড়ি।
আমাদের বাড়ির ঠিকানায় লেখা থাকত কালীঘাট রোড। সে অর্থে আমি এক নম্বর কালীঘাটের লোক। কালীঘাট রোডের এপাশে গলি, ওপাশে পাড়া। মাঝখানে নদী নয়, কালীঘাট রোড বয়ে চলে যায়…।




