শ্রমের দাবি

Representative Image

যেহেতু আস্ত একটা বছর শেষ হয়েছে সদ্য, নানাবিধ খতিয়ান ভেসে ভেসে উঠছে, উঠবেও। সংবাদপত্রে। সোশ্যাল মিডিয়ায়। সিনে-জগতের কোন কোন মহাতারকার জীবনাবসান ঘটেছে কিংবা আবিশ্বের ভূ-রাজনীতি উলটেপালটে দিল যে যে ঘটনাবলি, সেই সমস্ত ঠাঁই পেয়েছে ‘ফিরে দেখা’ শিরোনামের নীচে।

আমি বরং বলি, ভারতের ‘গিগ-মজুর’দের কথা। ‘শ্রমিক’ শব্দটি ব্যবহার করা গেল না। যেহেতু, ভারতরাষ্ট্র এখনও গিগ-মজুরদের ‘শ্রমিক’ বলে গণ্য করতে অপারগ। ‘সুইগি’, ‘জোম্যাটো’, ‘ব্লিঙ্কইট’, ‘জেপ্টো’, ‘ফ্লিপকার্ট’ ‘মিনিট্স’-সহ বিভিন্ন কুইক-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যারা কর্মরত। ডেলিভারি বয়। ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক ক্যালেন্ডার বলছে, ভারতের গিগ-মজুরদের সংখ্যা, প্রায় ১২ মিলিয়ন। আগামী পাঁচ বছরে, যে-সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হবে ২৩ মিলিয়ন। যা মোটামুটি অভূতপূর্ব। গিগ-অর্থনীতির এহেন বিস্ফোরণের কারণ? এক, নগরায়ণ। দুই, ডিজিটাল যোগাযোগের সহজলভ্যতা। তিন, সস্তার শ্রম। 

আরও পড়ুন: যুদ্ধ, মানবতা, শ্মশানের শান্তি! ২০২৫-এ কোনদিকে গেল পৃথিবী?

অথচ, গত ৩১ ডিসেম্বর, দেশব্যাপী এক ধর্মঘটে সামিল হয়েছিলেন গিগ-মজুরদের সংগঠনগুলি। ক্রিসমাসের দিনেও ‘ফ্ল্যাশ স্ট্রাইক’, অর্থাৎ, আকস্মিক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরা। ধর্মঘট কতখানি সফল, বা আমাদের বছরশেষের আমোদ-প্রমোদ তা কতখানি ভেস্তে দিয়েছিল— তা নিয়ে ছেলেমানুষি তর্ক আছে। সেসব নিয়ে না ভেবে, প্রথমেই, গিগ-শ্রমিকদের দাবিগুলো একটু শুনে নেওয়া যাক। মূলত স্থায়ী বেতন, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা।

ঠিক এখানেই, পুঁজিবাদের একটি ফাঁদ পাতা আছে। কেমন? ধরুন, আপনি অর্ডার করলেন কোল্ড ড্রিংকস। ব্লিঙ্কইট বলেছে, দশ মিনিটে হাজির করে দেবেই। কিন্তু যে-ডেলিভারি বয়, সে আটকে আছে কলকাতা শহরের স্থবির ট্র্যাফিকে। অথবা সাইকেলটা বিগড়েছে মাঝপথে। দশ মিনিট পেরিয়ে গেলে বৃথাই এ ছুটোছুটি। প্রতি ডেলিভারিতে মজুরি সামান্যই, সেখানেও কোপ বসাবে কোম্পানি। তাই জান কবুল করে, অধিকাংশ সময়ে ট্র্যাফিক আইন ভেঙেচুরে সে পৌঁছয় আপনার দুয়োরে। পুলিশের কাছে এক, দুই, তিন…অগুনতি কেস। ট্যাঁকের পয়সা খসছে। তবু কোম্পানির ‘টার্মস অ্যাণ্ড কন্ডিশন’ জানিয়েছে, ডেলিভারি বয়ের প্রাণের ঝুঁকি থাকবে কেন? ওঁদের আবার নিরাপত্তা? মুনাফা ছাড়া আমরা কিছু বুঝি না। আপনিও তাই আপনারই সহ-নাগরিককে ভাবতে শুরু করেছেন উৎকৃষ্ট কোনও পণ্য। না-মানুষ। এ-ই সেই দশ মিনিটের ম্যাজিক!

চোদ্দ ঘণ্টার শিফ্ট। বদলে ৬০০ টাকা। খুব বেশি হলে, ৭০০ টাকা। অর্থাৎ, মাসিক আয় ১৮,০০০ টাকা। শুরুতেই বলেছি, গিগ-শ্রমিকের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। কিন্তু চাহিদা কন্স্যান্ট। ফলে একজন ডেলিভারি বয়ের যৎসামান্য আয়ের পরিমাণও দিনে-দিনে কমছে। তাহলে মানুষের মনে আরও চাহিদার জন্ম দিতে হয়। পুঁজিবাদের চিরাচরিত আকাঙ্ক্ষা। অতএব আরও, আরও কুইক-কমার্স অ্যাপ। এইবার আট মিনিটে ডেলিভারি! আর কোনও জমজমাট ফেস্টিভ সিজ্নে, একজন ডেলিভারি বয় অতিরিক্ত কমিশানের গোল্লাপাকে আটকে গেল। সে ভুলে গেল ঘুম। চোদ্দ ঘণ্টা থেকে আঠেরো ঘণ্টা। তারপর চব্বিশ ঘণ্টা। কমিশন, কমিশন… নুন্যতম বেতন নেই। সম্ভবত সম্মানও নেই। কোনও ডেলিভারি বয়, একের বেশি অর্ডার প্রত্যাখ্যান করলেন, সারাদিনের মতো অ্যাকাউন্ট ব্লক।

রাষ্ট্র এখনও গিগ-কর্মীদের শ্রমিক তকমা দেয়নি কেন? এখানেও একটা ম্যাজিক আছে। মানুষ তো মানুষের থেকে বিচ্ছিন্নই। কিন্তু শ্রমিকদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা গেলে, কোনও ট্রেড ইউনিয়ন তৈরি না হলে, শোষণের পথগুলো হয় দৃঢ়। সুগম। জবরদস্ত। ন্যায্য দাবির জন্য কোনও সংগঠিত চিৎকার হয় না। যে-ম্যাজিক সহজেই দেখানো যায়: তোমার কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকবে কেন? যদি তুমি প্রতিদিন ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে পারো, মাসের শেষে ৪০,০০০ টাকা! তাই না? তাই তো গিগ-অর্থনীতির রমরমা। এখানে প্রতিটি ডেলিভারি বয়, একা। একার সুরক্ষা। একার কমিশন। একার হতাশা।

গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম সার্ভিস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ান তবু তৈরি হয়েছে। মুখপাত্র নির্মল অগ্নি, যিনি চিঠি লিখেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এহেন শ্রম আসলে চাপিয়ে দেওয়া। বেঁচে থাকার যাবতীয় ইচ্ছে-অভিলাষ-বাসনা, শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার ফিকির। তাই কাজের সময় সুনির্দিষ্ট আট ঘণ্টা চাই। ডেলিভারি বয়ের আইডি ব্লক করা চলবে না। আর সবশেষে বলতে হবে, দেশের শ্রমিক। রাষ্ট্রের সঙ্গে একধরনের বোঝাপড়ায় ব্যস্ত সকল গিগ-মজুর।

দশ মিনিটে কি সবসময় অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছয়? দাউদাউ আগুন জ্বললে দমকল? অপরাধ ঘটলে পুলিশ? তবে দশ মিনিটের ম্যাজিক একা আমরা দেখাব কেন? কী দায়? নানাবিধ প্রশ্ন রাষ্ট্রের সামনে। আপনার সামনেও। আপনি কেমন বোঝাপড়া করবেন? না-মানুষের মতো? রেটিং-সর্বস্ব? না কি দারুণ গ্রীষ্মের দুপুরে একগ্লাস ঠান্ডা জল? ‘তুই’ নয়, ‘আপনি’। পরবর্তী ধর্মঘটের আহ্বান এলে, একদিনের জন্য অ্যাপগুলো আনইন্সটল করে দেবেন তো? হুইচ সাইড আর ইউ অন?