অবলাদের জেলখানা

Representative Image

জোন্স সাহেব তো এশিয়াটিক সোসাইটির স্থাপনকালে ‘মানব ও প্রকৃতি’ নির্ভর যা কিছু এশিয়ায় চর্চাক্ষেত্র, তাকে এশিয়াটিক বলে দিলেন ১৭৮৪র ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের জুড়ি-রুমে। তাতেই উৎসাহী সাহেবরা সংগ্রহ করতে থাকলেন নানাবিধ উপাদান। সেসবের এক বিপুল সম্ভার হতে থাকল পরবর্তীকালে নির্মিত সোসাইটির ভবন; মুশকিলে পড়লেন সংগ্রহশালার কিউরেটর। একটু-একটু করে এশিয়াটিকের গর্ভ থেকে জন্ম নিতে থাকল বিষয়ানুসারী নানা সর্বেক্ষণ বিভাগ, ভারতীয় জাদুঘর ইত্যাদি।

১৮৪২ নাগাদ সোসাইটির তৎকালীন কিউরেটর ড.জন ম্যাকলেল্যান্ড ভাবলেন কেমন হয় একটা পূর্ণাঙ্গ চিড়িয়াখানা নির্মাণ করলে, যেখানে স্বচক্ষে জীবন্ত প্রাণীদের দেখা সম্ভব হবে। ‘ক্যালকাটা জার্নাল অফ ন্যাচেরাল হিস্ট্রি’-তে তিনি একটি প্রস্তাব দিলেন কলকাতায় চিড়িয়াখানা চাই, কোনও ফল হল না। বাঙালির চিড়িয়াখানার ধারণা ‘পশ্বাবলী’, ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ বা ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’-র বিচ্ছিন্ন লেখা-ছবিতে খানিক হয়েছে। তবে এদেশের সাহেবদের কাছে চিড়িয়াখানা বেশ জনপ্রিয় বিষয়। বাংলার গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি তাঁর ব্যারাকপুরের গ্রীষ্মাবাসে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন একটি ছোট পশুশালা গড়ে তোলার। করেও ছিলেন, তারপরে সাহেব মেয়াদ শেষে দেশে গেলে স্কটিশ প্রাণীতত্ত্ববিদ ফ্রান্সিস হ্যামিলটন এই প্রাণীদের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। সেখানে চার্লস ডওইলি মতো শিল্পী গিয়ে ছবি এঁকেছেন, এমনকী চলেছে নির্মম শিকারও। আর-একজন বাঙালি ১৮৩৫ নাগাদ তাঁর ৪৬, মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের বাড়ি মার্বেল প্যালেসের ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা করলেন। তিনি রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক। এটি এখনও বর্তমান, এখানে  হর্নবিল, ম্যাকাও, ম্যাগপাইয়ের মতো পাখি, শজারু, হরিণ, বেবুন আছে। এটিকে দেশের প্রথম দেশীয় ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা হিসাবে দাবি করা হয়। যদিও, ব্যরাকপুরের লাটবাগানে আগেই সেটি সাহেবরা করেছিলেন।

আরও পড়ুন: শান্তিপূর্ণ জঙ্গলে হঠাৎ কেন বাঘের আনাগোনা? লিখছেন তিষ্য দাশগুপ্ত…

ওদিকে, ম্যাকলেল্যান্ডের ভাবনা দাম না পেলে, ১৮৬৭ নাগাদ সোসাইটির খোদ প্রেসিডেন্ট ড.জোসেফ বার্টফেয়ার সরকারকে প্রস্তাব দেয়, চিড়িয়াখানা করার। বিষয়টি সরকারের কাছে মনোগ্রাহী হচ্ছিল, এই সময়ে পোস্টমাস্টার জেনারেল কার্ল লুইস সুইন্ডলার ১৮৭৩-এ সরকারের কাছে একটি বড় আকারে চিড়িয়াখানা করার সম্পূর্ণ প্ল্যান দিলেন। মুশকিল, জায়গা পাওয়া নিয়ে। ১৮৭৫-এ লেফটানেন্ট-গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল নিজের উদ্যোগে আলিপুরের কাছের জায়গাটি, যেখানে আগেই বিরাট এগ্রি-হর্টিকালচার সোসাইটি নির্মিত ছিল, সেটির কাছাকাছি উত্তর-পশ্চিমে জলাশয়সহ চিড়িয়াখানা স্থাপনের জমি বাছলেন। কিন্তু, ততদিনে মাদ্রাজ প্রথম সরকারি উদ্যোগের চিড়িয়াখানা করে ফেলেছে- ১৮৫৫য়, সেন্ট্রাল মিউজিয়ামের কর্তা এডওয়ার্ড ব্যালবিউরের উদ্যোগে।

প্রাথমিক প্রায় ৩৩ একর জায়গা নিয়ে ১৮৭৬ সালের ১ জানুয়ারি (মানে আজ থেকে ১৫১বছর আগের এইদিনে) প্রিন্স অফ ওয়েলস সপ্তম এডওয়ার্ডকে দিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে চিড়িয়াখানার পথচলা শুরু। চিড়িয়াখানা তো হল, প্রাণী আসবে কথা থেকে। সে-সময়ে সাহেবদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ, সেই সংগ্রহে থাকত জীবন্ত পশুপাখিও। ভারতীয় রেলের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত জার্মান ইলেকট্রিশিয়ান কার্ল লুইস সোয়েন্ডলারের পশুপাখিদের নিয়ে শুরু হয়েছিল আলিপুর চিড়িয়াখানার জয়যাত্রা। সেইসঙ্গে আরও অন্যান্যদের উপহার দিয়েছিলেন পশুপাখি। সম্পূর্ণ নির্মাণের খরচ প্রায় ৫০০০টাকা, যা সরকারের সঙ্গে দিয়েছিলেন ময়মনসিংহ রাজা সূর্যকান্ত আচার্য, মহীশুরের রাজা চতুর্থ কৃষ্ণরাজ ওয়াদিয়ার। দিনে-দিনে প্রাণীর সংখ্যা বাড়তে থাকে, বিশেষ করে যখন ১৮৮৬ নাগাদ ওয়েলেসলি সাহেবের ব্যারাকপুর লাটবাগানের বাকি প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়ের সংস্থান হয় আলিপুর। তখন চিড়িয়াখানার আকার অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল।

১৮৭৬-র ৬ মে থেকে জনসাধারণের জন্য চিড়িয়াখানার দরজা খুলে দেওয়া হয়। প্রথম দিকে যে-সকল প্রাণী ছিল বলে জানা যায়, সেগুলো হল জ্যাঞ্জিবারের ভেড়া, গৃহপালিত ভেড়া, চার-শৃঙ্গবিশিষ্ট ভেড়া, কাশ্মীরি ছাগল, আফ্রিকার বাফেলো, গেজেল হরিণ, সম্বর হরিণ, চিত্রা হরিণ, আন্টেলোপ প্রমুখ। চিড়িয়াখানার সঙ্গেই গঠিত হল তার পরিচালক-সমিতি। তাতে প্রথম সভাপতি ছিলেন লর্ড ব্রাউন আর সম্পাদক ছিলেন সি.ই ব্যাকল্যান্ড। আর, নানা-সাহেবদের নামকে অতিক্রম করেই দেশের প্রথম চিড়িয়াখানা সুপারিন্টেনডেন্ট হলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র রামব্রহ্ম সান্যাল। ১৮৭৭তে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পালন করেন। পশু-পাখির আচরণ, তাদের খাওয়া-দাওয়া, প্রজনন সময় ও সমস্যা ইত্যাদি বিষয়গুলো তিনি প্রথম অবস্থায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। এভাবেই, প্রাণীদের চিকিৎসা থেকে শুরু করে অস্ত্রপ্রচার সবেই তিনি দেশে দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। তিনি ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবকে দেখিয়েছিলেন দেবী-বাহন ‘সিংহ’, কিংবা বিবেকানন্দদেরও তিনি নিয়ে ঘুরিয়ে দেখান চিড়িয়াখানা।

আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রতিষ্ঠিত রামব্রহ্ম সান্যালের মূর্তি

চিড়িয়াখানা খোলার পরেই লোকজনের ভিড় ছিল বেশ। কেমন ছিল উনিশ শতকের শেষপর্বের বাঙালির চিড়িয়াখানার প্রতিগ্রহণ। সে-সময়ের একটি মজার তথ্য শোনা যাক, ১৮৭৭এর তৎকালীন কর্তৃপক্ষের একজন বাক্‌ল্যান্ডের স্মৃতিকথাতে আছে এটি। আগত মানুষদের মধ্যে সকলের সবচেয়ে বেশি উৎসাহ ছিল জিরাফকে দেখা নিয়ে। সেই জিরাফ দেখার প্রসঙ্গে এক বাবুর বক্তব্য মেলে। তিনি জিরাফ দেখে জানিয়েছিলেন, তিনি এমন বাঘ জীবনে অনেক মেরেছেন- তবে গলায়-বহরে এটি অনেক লম্বা আরকি! তাকে শেষপর্যন্ত জিরাফ চেনানো সম্ভব হয়েছিল যখন প্রাণীটি গাছের পাতা খেয়ে নিজেকে নিরামিষাশী বলে নিজেই প্রমাণ করে। আলিপুর চিড়িয়াখানার সঙ্গে জড়িয়ে অনেক গল্প। যেমন, দীননাথ ভার্গভের ওপরে দায়িত্ব দিলেন গুরু নন্দলাল বসু, ‘অশোকস্তম্ভ’র আদলে ভারতের প্রতীককে পুনর্নির্মাণ করার। স্বাধীন দেশের সংবিধান রচনা ও শৈল্পিক নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছেন তাঁরা, দায়িত্ব ভাগ হয়েছে সকলের। দীননাথবাবু ‘অশোকস্তম্ভ’র আদলে ভারতের প্রতীক নির্মাণ করতে গিয়ে মুশকিলে পড়লেন। সেটি প্রায় ২৫০খ্রি.পূ’র শিল্পকর্ম, এবং ভগ্ন। তিনি দায়িত্ব পেয়ে মূল সারনাথের স্তম্ভ দেখেন, তবে সেটির বাস্তবিক শৈল্পিক রূপ দিতে তাঁর প্রয়োজন ‘লাইভ-মডেল সিটিং’। মুশকিল আসান করলো, আলিপুর চিড়িয়াখানা- দীর্ঘ মাস তিনেক আলিপুর চিড়িয়াখানায় এসে তিনি সিংহকে দেখে ‘অশোক স্তম্ভ’এর মূল অবয়বকে নিয়ে আসেন। এছাড়াও, আরেকটি বিষয় উল্লেখ অবশ্য প্রয়োজন- সেটি ‘টাইগন’ ও ‘লিটিগন’রা। দেশের মধ্যে এখানেই প্রাথমিকভাবে বাংলার বাঘ ও আফ্রিকার সিংহের বা কখনও বিপরীতের মধ্যে বিমিশ্র প্রজনন-ঘটিয়ে ‘টাইগন’ এবং ‘লিটিগন’এর জন্ম দেওয়া হয়েছিল। যদিও, সংকরায়ণের ফলে এই পশুরা নানা জিনগত ত্রুটির সমস্যায় ভুগতো, নানা বয়স-বিলম্বী অসুখ দেখা দিত, সেজন্যে তারা বেশিদিন বাঁচত না। তবে, এই বিষয়টি অভিনব হলেও, প্রাণীদের শারীরিক গঠনকেন্দ্রিক অত্যাচার বিষয়ে বিশ্ব বন্যপ্রাণ তহবিলের (WWF) থেকে আপত্তি জানানো হলে, ভারত সরকার ১৯৮৫থেকে আইন করে সংকর প্রজনন বন্ধ করে দিয়েছে।

এই জায়গায় একটা কিন্তু চলে এল। প্রাণীদের শারীরিক অত্যাচার, কিছুটা মানসিকও! বাংলায় যাকে বলছে ‘চিড়িয়াখানা’, সেটির ইংরেজি কিন্তু বলে প্রাণীতত্ত্বের উদ্যান। যেখানে মুক্ত একটি স্বাধীনতার বার্তা থাকলেও, আসলে চিড়িয়াখানার সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি বদ্ধ ‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরী যেন। আজকাল হয়তো কাচের দেওয়ালের ওপারে বাঘ-সিংহের শিকারি মনোভাবকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করে রিল থেকে রিয়েল মানুষজন। এতে, একটু ‘জায়গা দাও মা’ বলে প্রাণীরা কি সত্যিই আনন্দে আছে! আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রতিষ্ঠা থেকে আজও হয়তো বলা যায়, নেই।   

১৯৮০-৮২ নাগাদ মোহন নামের একটি শিম্পাঞ্জি নিজের খাঁচা থেকে পালিয়ে যায়। সে একেবারে নিশ্চিন্তে বাইরে বেরিয়ে ঘুরতে থাকে এদিকে-ওদিকে। এই ঘটনার কিছুদিন আগেও ক্যারোলিনা নামের একটি শিম্পাঞ্জি বেরিয়ে আসে খাঁচা থেকে। যদিও, সেটিকে সাহাজাদি নামের আরেকটি হাতির ভয় দেখিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু, মোহনের বেলায় এসবের প্রভাব পরছে না। চিড়িয়াখানার অফিস ক্লার্ক বৈদ্যনাথ ঝা মোহনের সঙ্গে খুব ভাল মিশতে পারতেন। সকলে ব্যর্থ হলে তিনি তাকে ডাকতেই সে এসে তার কোলে বসে পড়ল। শেষে দু’জনে হাত ধরে হেঁটে খাঁচায় ঢুকে গেল। কিন্তু, মোহন থেকে গেল ভেতরে, বৈদ্যনাথবাবু ফিরে আসেন নিজের কাজে। এই ‘ঘরে-বাইরে’র লড়াই আসলে প্রাণীদের নিদারুণ কষ্টের কারণ হয়ে উঠেছে চিড়িয়াখানায়। সাম্প্রতিককালেও ২০২২এ আলিপুরে মাত্র ১২দিনের মাথায় দু’বার পালানোর প্রয়াস নেয় একটি শিম্পাঞ্জি- যার নাম ‘বুড়ি’। বিশেষ করে সে খাবার দেওয়ার সময়ে পালানোর চেষ্টা করে। বাইরে আসতে পারে না। কারণ, তার খাঁচার বাইরে বিদ্যুতের তার রয়েছে। সেটি নিয়ে চিন্তা প্রকাশ করেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু, বিনোদনের জন্যে রাখা ‘বুড়ি’র মধ্যে যে ‘মোহন’এর ইচ্ছাও বাহিত হয়ে আসছে, সেটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের চিন্তা নেই।

আলিপুর চিড়িয়াখানা ছাড়াও কলকাতার কাছাকাছি আছে আরও কিছু চিড়িয়াখানা। যেমন উত্তর কলকাতার মার্বেল প্যালেস বাদ দিলে, হাওড়ার বাগনানের গড়চুমুক প্রাণী উদ্যান, কিংবা সাম্প্রতিক সংযোজন রাজারহাটের ইকো পার্কের কাছে হরিণালয় মিনি জু। এখানে হরিণ, জিরাফ, জেব্রা ও নানা জাতের বিদেশি পাখি আছে। প্রাণী সংরক্ষণের স্বাধীনতাহীনতার নিদারুণ ছবি সেখানেও দৃশ্যমান। একটু দুরে গেলেই মেলে ঝাড়গ্রামের জঙ্গলমহল চিড়িয়াখানা। এটি ১৯৮০তে হরিণ উদ্যান হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলেও, ২০১৪ থেকে এটিকে মাঝারি চিড়িয়াখানার মর্যাদা দিয়েছে রাজ্য সরকার। আগে হরিণদের নির্দিষ্ট খাঁচায় বন্দী রাখলেও, এখন একটু অর্থ-সাম্বল্যে তাদের এনক্লোজার বর্ধিত করা হয়েছে। তবে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় কাছেই রমনাবাগান অভয়ারণ্য, যেটিকে চিড়িয়াখানা হিসাবেই ভ্রমণকারীরা দেখতে যান। সেখানে অবশ্যি, অন্য এক মর্মান্তিক দৃশ্য ধরা পরল কদিন আগেই। ২৩ আগস্টে রাতের আশ্চর্য পরিমাণ প্রায় ২৮ঘন্টা বৃষ্টির জন্যে বর্ধমান শহরে ২০০মিমি জল হয়েছিল। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে জল সেই জল উপচে ঢুকে পড়েছিল রমনাবাগান অভয়ারণ্যতে- সঠিক নিকাশির অভাবে। এখানে চিতা, হায়না, ভাল্লুক, হরিণকে খাঁচায় রাখা হয়। সেই খাঁচাবদ্ধ থাকা অবস্থায় তাদের কোমর জল। প্রাণীরা সঠিক জীবনযাপনের কী অধিকারী নয়! সেই জল নামানো হয় দুই দিনে।

এতো গেল, চিড়িয়াখানার ভেতরের অবস্থার কথা। শিয়ালদহ ষ্টেশনে দক্ষিণ শাঁখা থেকে বেরোলে অনেকের চোখে পড়বে পুরনো কলকাতায় ছবিগুলি। সেখানে স্পষ্ট দেখা যায় মার্বেল প্যালেসের রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক নিজের জিরাফে টানা গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ছবিটির সঙ্গে খুব মিলে যায় ভারতীয় ধনকুবেরের ছেলের বাড়ির নিজস্ব চিড়িয়াখানায় ফুটবলার মেসির সফরচিত্র। পশুরা কেমন আছেন! কে রাখে সেই খবর! বিলাসিতার এই উচ্চতার পাশেই, আলিপুর চিড়িয়াখানায় ১৮৮৩-র জুলাই নাগাদ দক্ষিণ আন্দামানের থেকে ছয়জন আদিবাসী ব্যক্তি, যাতে দু’জন মহিলা ও চারজন পুরুষকে আনা হয়েছিল প্রদর্শনস্তু হিসাবে। এটার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কার্ল হেগেনবার্ক নৃতাত্ত্বিক প্রদর্শনী হিসাবে। ভাবতে অবাক লাগে, প্রাণীর সংজ্ঞার মধ্যে নৃতত্ত্বকেও স্থান দিয়েছিলেন সেকালের সাহেবরা।

বাংলাদেশের কিছু চিড়িয়াখানায় প্রাণীরা কেমন আছে? গতবছরের বেরিয়ে এসেছে ‘ডেইজি’ নামের সিংহী বিকেল ৪.৪৫মিনিটে, মীরপুর চিড়িয়াখানায়। শেষে একটি জাল ঘেরা জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায় তাকে, শেষে ঘুম-পাড়ানি গুলিতে সে আবার ফিরে আসে খাঁচায়। পরে, দেখা যায়, সিংহীর দুটি দরজার তালাই খোলা ছিল। হয়তো এটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। তবে, প্রাণীদের শারীরিক কষ্টের ছবি এই মিরপুর চিড়িয়াখানায় অনেক। বৃদ্ধ সিংহী ‘কান্তা’ তার বাম পায়ের তালুতে নখ ঢুকে গেছে, চোখে কম দেখে, দাঁতের ক্ষয় শুরু হয়েছে- তাই মাংস ছিড়তে পারে না ঠিক করে। এইজন্যে তাকে প্রদর্শন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনি নিদর্শন পশুদের নিজদের বয়সের সামঞ্জন্স্যও হচ্ছে না অনেক জায়গায়। যেমন, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় ১৮বছরের সিংহ নিজে থেকেই খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে, প্রাকৃতিক কাজও নিয়মিত নয়। এখানে ভাল্লুকেরও একই অবস্থা। সেখানের কিউরেটর শাহাদাত হোসেন জানাচ্ছেন, ‘সিংহ ও ভালুকটিকে এমনভাবে রেখেছি যে মানুষ দূর থেকে দেখতে পারছে। তবে এগুলো যে নানা জটিলতায় ভুগছে, তা মানুষ দূর থেকে বুঝতে পারছে না। এতে মানুষও খারাপ ধারণা নিচ্ছে না।’ একই চিত্র রংপুর বিনোদন উদ্যান ও চিড়িয়াখানায়। সেখানের কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, এমন প্রাণীদের জন্যে আলাদা খাঁচা না থাকায় অগত্যা তাদের প্রদর্শনীতে রাখা। মানুষ এইরকম পশু দেখতে চায় না। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যায়নি, এমন পশুও তাড়াতাড়ি বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছে।  

আলিপুর চিড়িয়াখানায় ১৮৮৩-র জুলাই নাগাদ দক্ষিণ আন্দামানের থেকে ছয়জন আদিবাসী ব্যক্তি, যাতে দু’জন মহিলা ও চারজন পুরুষকে আনা হয়েছিল প্রদর্শনস্তু হিসাবে। এটার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কার্ল হেগেনবার্ক নৃতাত্ত্বিক প্রদর্শনী হিসাবে। ভাবতে অবাক লাগে, প্রাণীর সংজ্ঞার মধ্যে নৃতত্ত্বকেও স্থান দিয়েছিলেন সেকালের সাহেবরা।

এমনই সকরুণ অবস্থার শিকার হচ্ছে প্রাণীরা। এইসবের মধ্যেও একটি আশার খবর। দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান চিড়িয়াখানায় দেশের প্রথম বন্যপ্রাণী জৈবব্যাঙ্ক করা হয়েছে ২০২৪এর জুলাই থেকে। এটি বায়োব্যাঙ্ক। এখানে তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করে বিপন্ন প্রজাতির ডিএনএ, টিস্যু, প্রজনন উপকরণ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ২৩টি প্রজাতির প্রায় ৬০টি প্রাণীর জিনগত উপাদান সংরক্ষণ করেছে। এটি বন্যপ্রাণীর জেনেটিক্স, রোগ, প্রজাতির পরবর্তী পুনরুজ্জীবনের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আলোর সঞ্চারী হলে এই জৈবব্যাঙ্ক নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে নব-নির্মিত বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের ফিরিয়ে দেবে তাদের স্বাধীনতার জঙ্গলে। সেখানে বংশ-বিস্তার হলে শিশু মায়ের কাছেই শুনুক তাদের ঘুম-পাড়ানি ছড়া। যেন, কোন ঘুম-পাড়ানি গুলি তাদের দিকে ধেয়ে না আসে!