ডাকবাংলা

এক ডাকে গোটা বিশ্ব

 
 
  

"For those who want to rediscover the sweetness of Bengali writing, Daakbangla.com is a homecoming. The range of articles is diverse, spanning European football on the one end and classical music on the other! There is curated content from some of the stalwarts of Bangla literature, but there is also content from other languages as well."

DaakBangla logo designed by Jogen Chowdhury

Website designed by Pinaki De

Icon illustrated by Partha Dasgupta

Footer illustration by Rupak Neogy

Mobile apps: Rebin Infotech

Web development: Pixel Poetics


This Website comprises copyrighted materials. You may not copy, distribute, reuse, publish or use the content, images, audio and video or any part of them in any way whatsoever.

© and ® by Daak Bangla, 2020-2024

 
 

ডাকবাংলায় আপনাকে স্বাগত

 
 
  • কাঞ্চনজঙ্ঘার সেই ঘটনা


    শুভময় মিত্র (December 4, 2023)
     

    মেপে দেখলাম, উত্তরকাশীর কাছে সিলকিয়ারা টানেল থেকে নেপাল-সিকিম সীমান্তে সিঙ্গালিলা রেঞ্জের ওপর মার্ক না করা এক গিরিবর্ত্মের দূরত্ব, হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করলে পনেরোশো কিলোমিটারের কিছু বেশি। ম্যাপের প্রস্তাবিত রুটে একবার নেপালে ঢুকতে হবে অল্প সময়ের জন্য। তারপর সিকিমে। হিমালয়ের দু-প্রান্ত। দ্বিতীয় গিরিবর্ত্মের নাম চোঙপা লা। সময়ের সরণিতে রিভার্সে গিয়ে থামলাম নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। এখনকার মতোই, ঠান্ডা পড়ে গেছে। হিমালয় বলে কথা।  

    শেষ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় একটি ঘটনার লাইভ দেখেছি বাড়িতে বসে। এর যাবতীয় পরিস্থিতির খুঁটিনাটি ডিটেল মুখস্থ হয়ে গেছে। দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষগুলোর জবানবন্দি প্রকাশিত হচ্ছে এখন— ওদের কাছে কেমন ছিল ওই ভয়ঙ্কর ক’টা দিন! শুনছি উদ্ধারকারী দল, প্রশাসনের কথাও। সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া হয়েছিল। যায়-যায় অবস্থা হয়েছিল অনেকবার। ওদের, আমাদের সবার-ই আশার প্রদীপগুলো নিবুনিবু হয়েও নেবেনি। আমরা মনে মনে বিশ্বাস করে গেছি যে, ঠিক পারবে। আধুনিক যন্ত্র ভার্সেস সাধারণ মানুষের হাতের খেল নিয়ে আলোচনা জারি আছে। রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হব হব করছে। দুর্ঘটনার জন্য কে দায়ী— খামখেয়ালি প্রকৃতি? নাকি হিমালয়কে খুঁচিয়ে রাগানো মানুষ নিজেই? নিরাপত্তার আগাম ব্যবস্থার অভাব নিয়েও উষ্মা প্রকাশ পেয়েছে। ‘…শেষ ভাল তার’-এর শান্তি নেমে আসায় তরজা উচ্চগ্রামে পৌঁছয়নি, কিছুদিন পরে মিলিয়েও যাবে। এসব কথা তুলছি কারণ প্রায় বত্রিশ বছর আগে, স্থান-কাল-পাত্র, ঘটনার চরিত্র আলাদা হলেও, মূল যে বিষয়— ফেঁসে যাওয়া, মরেও যেতে পারে— এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল একটু আগে উল্লেখ করা গিরিবর্ত্মের কাছে। পাত্রদের মধ্যে আমিও ছিলাম!        

    ‘অ্যাডভেঞ্চার’তীর্থযাত্রা, অর্থাৎ ট্রেকিং, যা পর্বতারোহণের ছোটভাই, চলছে বহু বছর ধরে। আমাদের দেশে হিমালয়ের অভাব নেই। পায়ে হেঁটে দুর্গম অঞ্চল পেরোনোর ইচ্ছে বা প্রয়োজন নতুন নয়। শুধুমাত্র সাহেব অভিযাত্রী নয়, বাঙালিও বহু বার সামিল হয়েছে এই কাজে। এমন একজন হলেন বাবু শরৎচন্দ্র দাস। ১৮৭৯ থেকে ১৮৮১, ব্রিটিশ এজেন্ট হিসেবে উনি নেপাল, তিব্বত, কাঞ্চনজঙ্ঘা অঞ্চলে দুর্দান্ত অনুসন্ধানকাণ্ড চালিয়েছিলেন। বই আছে। ওঁর রুটটা, যতখানি সম্ভব, ঘুরে দেখার ইচ্ছে নিয়ে আমরা পাঁচজন ঢুকেছিলাম নেপালে। মোটামুটি একটা কাগজের ম্যাপ, লেখার বিবরণ ও স্থানীয় লোকের সহায়তা পাওয়া যাবে, সেই ভরসায় এগিয়েছিলাম। গুগল ম্যাপ, জি পি এস, সেলফোন শুরু হয়নি তখনও। মধ্য নেপাল, এভারেস্ট পাড়ায় প্রচুর ভিড়। নেপালের পূর্বতম প্রান্তে, কাঞ্চনজঙ্ঘা এলাকায় তখন বিশেষ ঢুকত না কেউ। ঝামেলা ছিল, সরকারি অনুমতি পাওয়া যেত না। মিললেও, এজেন্সির তত্ত্বাবধানে যেতে হত। ভয়ঙ্কর খরচ, আমাদের সাধ্যের বাইরে। জেদি হিসেবে বিখ্যাত, একটু সমালোচিত-ও, সিনিয়র ট্রেকার রতনলাল বিশ্বাস আপন তালে যেতে পারার অনুমতি পাওয়ার ব্রেক থ্রু-টা করতে পেরেছিলেন বহু বছরের চেষ্টায়। সঙ্গে অলোকনাথ মল্লিক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘাঘু পাহাড়িয়া। নির্মল ওঁরাও, রতনলালের বাল্যবন্ধু, সাইলেন্ট পাওয়ারহাউস, প্রায় সব অভিযানের পার্টনার। শুভাশিস ব্যানার্জি আর আমি, সবে চার-পাঁচটা ট্রেক করেছি। আমরা ওই রকম হেভিওয়েটদের দলে ঢুকলাম অদ্ভুত পরিস্থিতিতে। আমাদের মতলব ছিল, এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেক করব। ট্রেনে শিলিগুড়ি, সীমান্ত পেরিয়ে বাসে কাঠমান্ডু, তারপর আর ঝামেলা নেই। নিউ কয়লাঘাটে ট্রেনের টিকিটের লাইনে সামনের দু-একজনের কথা ওভারহিয়ার করে বুঝলাম, ওদের দল-ও নেপালে ট্রেক করতে যাবে। দুজন শেষমুহূর্তে বাগড়া দিয়েছে, টিকিট ক্যানসেল করতে হবে। কাঞ্চনজঙ্ঘা কথাটা কানে এল। মুহূর্তের মধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এভারেস্ট বাদ, এটাই হোক। পরিচয় জানা নেই। যেচে আলাপ করে আমাদের ইচ্ছে প্রকাশ করলাম। এর কিছুদিন পরে আমরা সবাই চলন্ত ট্রেনের মধ্যে। কাদের সঙ্গে, কোথায় যাচ্ছি শুনলাম, আস্তে-আস্তে ঢুকল মাথায়।     

    ৫ অক্টোবর, ১৯৯১। দু-লাইনে সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা বেসক্যাম্প ট্রেকের বর্ণনা দিই— তারপর তো আমরা একে-ওকে জিজ্ঞেস করে, পোর্টার বদলাতে বদলাতে তাপলেজুং, ঘুনসা, কাম্বাছেন, লোহনাক পেরিয়ে পাংপেমা অর্থাৎ কাঞ্চনজঙ্ঘা বেসক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। একটা অস্ট্রেলিয়ান দল, টিম ম্যাকার্টনি, শম্ভু তামাং-এর (এঁরা যে বিশ্ববিখ্যাত পার্বত্য মাস্তান তখন জানতাম না) সহযোগিতায় ভোরের অন্ধকারে লাপসাং লা পেরিয়ে পুবমুখো এগিয়ে সিঙ্গালিলার ওপর একটা সহজ পাস, কাং লা টপকালেই সিকিম, জংরি, তারপর আর কী, হয়েই গেল! এই দু-লাইনের সময়কাল যদিও প্রায় এক মাস। হিমালয়ের নিবিড়, অকৃত্রিম সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে পথচলার কান্তি ভুলে যেতাম, এটা লিখছি না। নীচে বেশ গরম। ময়লাপানা গ্রাম। একদা রাজা-প্রজা নিয়ে গমগম করত। এখন এক-আধটা মানুষ। প্রায় সবাই মোট বয়ে চলেছে। বা কাঠ কাটছে। গেল কোথায় সবাই? ঘুনসাতে অনেক আগের একটা সাংঘাতিক ঘটনা শুনলাম। অত্যাচারী রাজাকে গ্রামের কিছু লোক মেরে, মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। রানি নিজে এসে খোঁজ করে জানতে পারে সেটা। কিচ্ছুটি না বলে, মহা সমারোহে দেহ সৎকার করে গণভোজের আয়োজন করা হয়। তারপর মদ। মদে বিষ। উজাড় হয়ে যায় একটা এলাকা।   

    ট্রেক মানে তো স্রেফ রঙিন ছবি নয়। কষ্ট খুব, আচ্ছা ওসব কথা এখন থাক। পাহাড়ঘেরা, সবজে-খয়েরি আবহ, আকাশ একটু বেশি নীল, কয়েক দিনের মধ্যে বিগ বসের সামনে পৌঁছব— এইসব ভাবতে ভাবতে হাঁটা। ট্রি-লাইন পেরিয়ে, হাজার বারোর ওপরে উঠলে লাংস্‌-দুটো চিলাউট করতে থাকে। সতেরো-হাজারি পাংপেমাতে বিকট ঠান্ডায় চাঁদনি রাতের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার উত্তেজনা অস্বীকার করি কী করে! লাপসাং লা-র ওপর থেকে এভারেস্ট, মাকালুর দুর্লভ ভিউ দেখার সুযোগ, ভাবা যায়? রতনদা, অলোকদা, নির্মলদার হাত ধরে কাঁপতে কাঁপতে (ঠান্ডায়) থ্যাঙ্ক ইউ বলা যায় নাকি? এক মাস হতে চলল। শরীর পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে। আমার মতোই ডাউনের জ্যাকেট পরা মেঘগুলো ভাসতে-ভাসতে আমাদের দেখছে, হাসছে। কিছু দেখে, সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলে লাইভ করে সময়-নষ্ট করার সুযোগ ছিল না তখন। ভাগ্যিস। বাড়ি ফিরে ইয়াকের মাংস পাব না ভেবে তখন দুঃখ হচ্ছিল। তবে ওই ইয়াকের দুধ, উদ্ভট মাখন আর নুন দিয়ে তৈরি চা-টা বানানো যাবে ভেজাল দিয়ে, চমকে যাবে সবাই, সে-সবও মাথায় ঘুরছিল চলতে চলতে।   

    ঝলমলিয়ে সকাল হল। বুঝলাম, পাহাড়ের গায়ে কোথাও একটা সেঁটে আছি আমরা। দারুণ ওয়েদার। টুকটুক করে নামতে শুরু করলাম। নামছি তো নামছিই। এত ঘন গাছপালা যে নীচের কিছু দেখতে পাচ্ছি না।         

    কাঞ্চনজঙ্ঘা ডান! কোনও ঝামেলা হয়নি। এবারে নেপাল টু সিকিম ক্রস-কান্ট্রি ট্রেক। গেট রেডি, এইখানে, একটু ফাঁসলাম আমরা। সামনে দেওয়ালি, ভাইটিকা। লোক পাওয়া মুশকিল। যে আমাদের পথ দেখিয়ে, পাস টপকে সিকিমের নাগরিক আবহে পৌঁছে দেবে। একই রাস্তায় তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। অসুবিধে হতে পারে, বরফ এসে যেতে পারে। বিকল্প হল, কিছুটা হেঁটে, বাস ধরে আরও নেমে, ফের নেপালে ঢুকে, প্রচুর চড়াই ভেঙে… নাহ্‌, কেউ রাজি নয়। এদিকে লোক ছাড়া আমাদের পক্ষে রাস্তা চেনা সম্ভব নয়। তেমন ম্যাপ-ও নেই। সিনিয়রদের ভুরু কুঁচকে আছে তো আছেই। একজনকে বলে-কয়ে রাজি করান গেল। দোর্জে। পুরো পথ পারবে না, পাসের মাথায় আমাদের তুলে, পরের রাস্তা দেখিয়ে ফিরে যাবে। ওপর থেকে পুরো জায়গাটা দেখতে পাব। তারপর জাস্ট নামা। কোনও ব্যাপারই নয়। শীত একটু এগিয়ে এসেছিল একান্নব্বইয়ের অক্টোবরে। বরফ-ও। স্নো-বাউন্ড পাস পেরোতে ঝামেলা থাকে কিছু, ক্রিভাসের ব্যাপার আছে। এদিকে খবর পেলাম, কাং লা বন্ধ হয়ে গেছে। ‘পাত্থার গিরতা যায়’— এর কিছু দূরে চোঙপা লা, খোলা আছে, ওখান দিয়ে সিকিমে ঢুকব আমরা। দেশে ফিরব। লাস্ট-লেগের হাঁটা শুরু হল। প্রথম দিকে খারাপ আবহাওয়া একটু জ্বালাতন করলেও, ঝকঝকে এক দুপুরে নির্বিঘ্নে পাসের মাথায় পৌঁছে এক পা নেপালে, এক পা সিকিমে রেখে (কাল্পনিক সীমানা) ছবি তোলা হল। দূরে, ইন্ডিয়ার জংরি বাংলোর লাল টিনের ছাদ-ও চোখে পড়ল। দোর্জে ফিরে গেল নেপালে। এখন থেকে পোর্টার নেই, টেন্ট, প্রেসার-কুকার নিজেদের-ই বইতে হবে। খাবারের রসদ অল্পই রাখা হল, কারণ মেরেকেটে আর দু’দিনের মধ্যে আমরা হোটেলে খাবার অর্ডার দিতে পারব।    

    পাস পেরোতেই ল্যান্ডস্কেপ বদলে গেল। বিস্তীর্ণ পাথুরে ময়দান। মরা ঘাস। বুনো ঝোপ, সাংঘাতিক সহ্যশক্তি এদের। কোথা থেকে যেন একটা লোক হাজির হল, সেও নামছে। ভালই হল। ভীষণ গতি তার। মাল পিঠে নিয়ে তার সঙ্গে আমাদের পাল্লা দেওয়া শক্ত। সে যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। এই ধরনের ভূতুড়ে জায়গা আগে দেখিনি। গ্লেসিয়ার আছে কি? হয়তো এইসব জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে এক-একটা ধারা। নামতে থাকে। আরও অনেককে জুটিয়ে, দল ভারী করে, হয়ে ওঠে ঝোরা। তারপর নদী। একটা ভারী কুয়াশা এগিয়ে এল। মুড়ে ফেলল আমাদের। একেবারে হোয়াইট আউট হয়ে গেল। ওকে ডাকাডাকি করতে লাগলাম। নিজেদের হারিয়ে ফেললে চলবে না। ঘন ফগের মধ্যে থেকে সে কিছু বলল বোধহয়। আর দেখতে পেলাম না। কোথায়, কোন দিকে যাচ্ছি, রাস্তা আছে কি না বুঝতেই পারছিলাম না। দ্রুত নামতে হবে। নামলে জনপদ পাওয়া যাবে। চেনা জায়গা দেখতে পেয়েছি আগে। কিছুটা চলার পর থামতে হল। কুয়াশা সরে যেতে দেখি আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটা খাদের ধারে। আলো কমে আসছে। খোলা জায়গায় থাকা যাবে না। ঝোপঝাড় পাকড়ে একটু নেমে বুঝলাম, কোথাও পৌঁছনো যাচ্ছে না। একটা জলের শব্দ পাচ্ছিলাম। এর মধ্যে দিয়ে নির্মলদা কী করে নামল, জল তুলে নিয়ে এল, জানি না। টেন্ট খাটানো, রান্না করার উপায় নেই। কোনও ব্যাপার নয়। সকালে দেখা যাবে।     

    ঝলমলিয়ে সকাল হল। বুঝলাম, পাহাড়ের গায়ে কোথাও একটা সেঁটে আছি আমরা। দারুণ ওয়েদার। টুকটুক করে নামতে শুরু করলাম। নামছি তো নামছিই। এত ঘন গাছপালা যে নীচের কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তারপর হঠাৎ, সমতল অনেকটা জায়গা। কুয়াশায় আমরা মূল চলার জায়গা থেকে কিছুটা সরে গিয়েছিলাম বোধহয়। আবার ধরে নেব। একটু রান্না করা দরকার। অল্প চাল, আমার কাছেই রাখা ছিল। প্রচুর খুঁজেও আমার রুকস্যাকের মধ্যে সেই প্যাকেটটা আর পেলাম না। অর্থাৎ লস্ট। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, ঝটপট নেমে যেতে হবে। রাস্তা বলে কিছু নেই। অদ্ভুতভাবে নামতে লাগাম একটু-একটু করে। বিকেলে বুঝলাম, আমরা অনেকটাই সরে গেছি। ঠিক কোথায় আছি, বোঝা যাচ্ছে না। পথ ফিরে পেতে আর একটু সময় লাগবে।   

    প্রায় একইভাবে পরের একদিন নয়, দু’দিন নয়, তিনদিনেও কোথাও পৌঁছনো গেল না। ওপরে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। একটাই ভাল ব্যাপার, আবহাওয়া বিট্রে করছে না। ঠান্ডা একটু কমেছে। আমরা ট্রি-লাইনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। ঝর্ণা, জলের অভাব নেই। মনটা একটু অস্থির হয়ে আছে। রাস্তা কেন ভুল হল, ঠিক কোনখান থেকে আমরা বিপথগামী হয়ে পড়লাম সে আলোচনা কানে আসছিল। একটু পারস্পরিক দোষারোপও। আমি কিছু বুঝি না। যদি ডিটেইল্ড কন্টুর ম্যাপ থাকত, তাহলেই বা বুঝতাম কী করে, কোথায় আছি? রেফারেন্স গুলিয়ে গেছে। কেউ বলবে প্ল্যানিংয়ের ভুল। আরে বাবা, ঠিক কবে নেপাল-সিকিম সীমান্ত পেরোনো যাবে সেটা আগে থেকে বোঝা সম্ভব ছিল না। এটা কেদার যাত্রা নয়। লোক পাওয়া যাবে না কিছুতেই, তাও কি জানতাম? এ রাস্তায় অন্য কারুর অভিজ্ঞতার কথা আগে শুনিনি। আমরা কি খুব হঠকারীর মতো অ্যাডভেঞ্চারের লোভে এগিয়েছিলাম? একটু মুস্কিলে পড়েছি, তাই এসব মনে হচ্ছে। পেটে খাবার নেই, সেটাও একটা ব্যাপার। এমন দুর্ধর্ষ একটা ট্রেকের শেষে ফালতু দেরি হলে কি ভাল লাগে নাকি? টাকা আছে কিছু, কোনও কাজে লাগছে না।           

    পশ্চিম সিকিমের এই জঙ্গলে এগোতে বেগ পেতে হচ্ছে কারণ পা ফেলার মতো সমতল জায়গা কম। গাছের গুঁড়ি, ডাল পাকড়ে, হাঁচড়েপাচঁড়ে একটু এগিয়ে হয়তো দেখলাম আর একটুও যাওয়া যাবে না। আবার পিছিয়ে, ওপর বা নীচ দিয়ে এগোনোর ব্যবস্থা করা। শরীরের শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজন অনুভব করে নতুন টেকনিক ধরা হল। একজন লিড করবে, রাস্তা খুঁজবে, ঠিক বুঝলে ডাকবে, তখন আসবে বাকিরা। অনেক জায়গায় পাহাড় ধসে গেছে। ওই ঝুরো জায়গা দিয়ে কোনও ভাবেই এগোন যায় না। অতএব আরও ওপরে ওঠো। খারাপ জায়গা পেরিয়ে নামো। খুব খাড়াই পাহাড়ের গায়ে নামা কঠিন, অন্তত আমাদের পক্ষে। রেকি করে হয়তো দেখা গেল, একটু নীচে কিছুটা সমতল রয়েছে। এইখানে অলোকদার খেল দেখলাম। দড়ির একদিক ওপরে বাঁধা রইল। বাকিটা শরীরে, পায়ের ফাঁক দিয়ে ঘুরিয়ে লক করে, সুড়ুৎ করে নীচে। শিখলাম নতুন জিনিস, এর নাম র‍্যাপলিং। মনে-মনে ভেবে রেখেছিলাম, কলকাতায় ফিরে পাড়ার বাড়ির ছাদ থেকে এইভাবে নেমে খুব ইয়ে করা যাবে। পঞ্চম দিনে খেয়াল করলাম, আর খিদে পাচ্ছে না। জঙ্গলে, গাছের গুঁড়িতে প্রচুর ছত্রাক চোখে পড়ছে। বললাম, ‘খেলেই হয়।’ জানলাম, এসব মানুষে খায় না, অনেকগুলো যথেষ্ট বিষাক্ত। সিকিমের এই জঙ্গলে খরগোশ পাওয়া যায় না? এখানকার গাছে কোনও ফল হয় না? এই ধরনের কিছু হাসির কথা বলে বাকিদের চিয়ার আপ করার চেষ্টাটা স্থগিত রাখলাম। নামতে গিয়ে পড়লাম কয়েকবার, তেমন আঘাত লাগেনি যদিও। নীচে নরম ফার্ণ, ঝরাপাতার স্তুপ থাকায়। রতনদার চশমা ভাঙল, ভাঙল রুকস্যাকের ফ্রেম। নির্মলদা নির্বিকারভাবে খৈনির মতো কী একটা খাচ্ছিল মাঝেমাঝে। অলোকদা নানাভাবে নিজেদের অবস্থানটা ঠাহর করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। ক্রমাগত গাছের ডাল, কাঁটায় আমার জ্যাকেট ফর্দাফাই হয়ে গিয়েছিল। হাতের তালুতে দুর্ভাগ্যের কাটাকুটি প্রিন্টস বেড়েই চলছিল। আমরা দুই ফেকলু বুঝতে পারছিলাম না, এরপর কী হবে। শুধু বুঝতে পারছিলাম, জোর ফেঁসেছি। বেরোনো সহজ হবে না।       

    বিকেলের পর আগুন জ্বালাতাম। শুকনো বা ভিজে, যা হোক ডালপাতা জোগাড় করে আগুন জ্বালাতে পারতাম আমি। আমার একমাত্র কন্ট্রিবিউশন। এমন তো হতেই পারে যে, আসলে আমরা গ্রামের বা কোনও গোট হাউজের কাছেই আছি। ঘন জঙ্গলে দেখতে পাচ্ছি না। আগুনের আলো বা ধোঁয়া, কেউ না কেউ দেখতে পাবে নিশ্চয়ই। পাশে নদীর জলের আওয়াজটা ছিল আমাদের নিরন্তর আশ্বাসবাণী। জঙ্গলের অনেক নিজস্ব শব্দ থাকে। জমি ছুঁয়ে শুকনো পাতার ওপর হাওয়া চললে মনে হয়, ওই কেউ আসছে খড়মড় করে। পাখির ডাক, ক্রমাগত। কেউ সিটি মারল কি? দূরে কী যেন একটা চকচক করছে, বাড়ির চাল? এই ধরনের পরিস্থিতিতে ‘দাজু, দাজু’ বলে চিৎকার করতাম অনেকক্ষণ ধরে। পরের দিকে, আর নয়। শরীর ক্লান্ত হয়ে গেছে, ভুল দেখছি, ভুল শুনছি। বুঝতে পারছি শুরু হয়ে গেছে যা হওয়ার। ভয় করছে না তেমন। সবসময় মনে হচ্ছে, এই তো, আর জাস্ট একটু। একবারও মনে হচ্ছে না, আর কোনও দিন এই জঙ্গলের ফাঁদ থেকে বেরোতে পারব না। একে-একে, আমরা সবাই, কমবেশি আগে-পরে, পড়ে যাব কোথাও না কোথাও। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসবে। আর উঠব না। খুব কষ্ট নাও পেতে হতে পারে। অনেক বছর ধরে একটু একটু করে মিশে যাব মাটিতে। এমন একবারও মনে হয়নি। তবে, গাছপালার মধ্যে দিয়ে নিকষ কালো আকাশের তারাদের দেখে মনে হত, কে যেন অজস্র রুপোলি পেরেক ঠুকেই গেছে হিংস্রভাবে।    

    একবারও যে নদীর ধার ছাড়িনি, তার সঙ্গে আর একটা নালা এসে মিশল। কনফ্লুয়েন্সে একটা পাথরের ওভারহ্যাং। বসলাম সেখানে। দু’পাশ থেকে দুটি স্রোত মিশে চলে যাচ্ছে আমাদের ফেলে রেখে। ব্যাগের মধ্যে পেলাম কিছু ওষুধ, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল। কাগজের ওপর পেন দিয়ে ছক এঁকে, কিছুক্ষণ লুডো খেলার চেষ্টা হল। এর মধ্যে একদিন শুভাশিস মনে করাল, সেদিন ভাইফোঁটা। বলতে লাগল, ‘সেজেগুজে বসবি, দিদিরা আসবে, ভাল-ভাল খাবার সাজিয়ে দেবে। তুই বলবি, প্যাক করে দাও। গিফটগুলো নিয়ে পাশে জমিয়ে রাখবি। চকচকে ক্যাশটা গুনে পকেটে পুরবি। কীরে, তোর ফোঁটা হবে না? হবে না তোর ফোঁটা?’ ক্ষমতা থাকলে দু-পায়ে লাথি চালাতাম। সারাদিন ধরে চলার ক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়েছিল আমাদের। সকালে যতটা সম্ভব কভার করে, রেস্ট নিতে বাধ্য হতাম। প্রতিশোধ নিলাম পরের দিন। হাঁটা শুরু হবে, শুভাশিস বলল, ‘একটু হালকা হয়ে আসি।’ আমি চেপে ধরলাম, ‘পটি পাচ্ছে কী করে? সোর্স কী? নিশ্চয়ই তোমার কাছে লুকোনো খাবার আছে…’ ফিরে এসে রুকস্যাক তুলতে গিয়েই ও বসে পড়ল, অবসন্ন অবস্থায়। তার মানে, শুরু হয়ে গেছে কাউন্টডাউন, পাণ্ডবদের ড্রপিং কেস। ঘোলাচোখে বলল, ‘তোর যদি পায়, করিস না। ওটাই লাস্ট আমাদের যা আছে।’     

    একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এভাবে আর কতদিন? কুয়াশায় পথ ভুলে আমরা যেখানে নামার কথা, সেখানে না নেমে সম্ভবত নেমেছি রাথং চু নদীর ধারে। ফেরার সব রাস্তা বন্ধ। ওই নদী পেরোতেই হবে। পেরিয়ে উল্টোদিকের পাহাড় ধরে উঠে লোকালয়ের সন্ধান করতে হবে। আর কোনও উপায় নেই। আহত অবস্থায় রতনদা এটা পারবেন না। আমি আর শুভাশিস অনভিজ্ঞ। খরস্রোতা পাথুরে নদী পেরোতে অভিজ্ঞতা লাগে। ঠিক হল, যাবে অলোকদা আর নির্মলদা। আমরা সবাই ক্লান্ত, শরীর নিংড়ে এই অবধি পৌঁছেছি। ওই দুজনের ফিটনেস আলাদা লেভেলের। যদি জীবিত অবস্থায় ওরা কোথাও পৌঁছতে পারে, তাহলে লোক পাঠিয়ে আমাদের উদ্ধারের চেষ্টা করবে। না হলে, ‘আগের আগের’ প্যারাগ্রাফের শেষ-টা। যেখানে রয়েছি, সেখান দিয়ে পেরোনো অসম্ভব। আরও এগিয়ে চেষ্টা করবে ওরা। যত এগোবে, স্রোতের তীব্রতা, জলের গভীরতা আরও বাড়বে। খুব রিস্কি। এমন পরিস্থিতিতে শেষবারের মতো ব্যাগ হাঁকড়াতে শুরু করলাম। কার কাছে যেন, পাওয়া গেল এক টুকরো চকলেট। সেটাই ওদের একমাত্র ফুয়েল। দুজনে বেরিয়ে গেল চোয়াল শক্ত করে।  

    সব জিনিস পাথরের ওভারহ্যাং-এর নীচে, গুহার মতো জায়গাটায় গুঁজে দিলাম। বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। খুব ধীরে, এবারে তিনজনে, শুরু করলাম হাঁটা। রতনদাকে সামনে রেখে। কথা কম বলেন, এখন আরও-ই নয়। অল্টিচিউড কমছে। গাছপালার চেহারা বদলাচ্ছে। মাঝেমাঝে একটা ভূতুড়ে শব্দ কানে আসছে। উজ্জ্বল হলুদ-সবুজ বাঁশঝাড়। হাওয়ায় মটমট করছে। পাতার মধ্যে হাওয়া চললে হিসহিসে দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাচ্ছে। একদিন দুপুরে, আমি একটু এগিয়ে, শরীর জোড়া তন্দ্রা। একটু ওপরে উঠে এগোনোর রাস্তা খুঁজছি। হঠাৎ মনে হল, কেউ যেন কথা বলছে। কান খাড়া করে রইলাম। শ্রুতিভ্রম। শুনতে পাচ্ছি কিন্তু, ‘ইট উইল বি অল রাইট, অল রাইট।’ পরিস্থিতি মানুষকে সজ্ঞানে ভুল কথা শোনায়, বুঝতেও শেখায় যে সেটা ভুল। অলোকদা, নির্মলদা ঠিক আছে তো?            

    বারো দিনের মাথায়, দুপুরের দিকে, আরও আচ্ছন্ন অবস্থা, ফের শুনলাম, কারা যেন কথা বলছে। একটা মসাবৃত পাথর ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। পারছিলাম না। ঝাপসা চোখে মনে হল, কয়েকটা লোক। একটু ওপর থেকে আমাকে দেখছে। মাথা খালি হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। তুলে নিয়ে শুইয়ে দিল একটা খোলা জায়গায়। যেভাবে শিশুদের দোলনায় ঘুম পাড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেইভাবে। ওদের পিঠে ছোট-ছোট ব্যাগ। হাতে কাটারি। ঝড়ের মতো গাছ কেটে, পোস্ট বানিয়ে, তার ওপরে পলিথিনের ছাউনি লাগিয়ে সস্নেহে বলল, ‘আর চিন্তা নেই। অল্প খাবার দিচ্ছি, একসঙ্গে বেশি নয় এখন, আস্তে আস্তে, একটু-একটু করে।’ এই কল্পদৃশ্যের ঘোরের মধ্যেই শুনলাম, ‘তোমাদের লোক জিন্দা আছে, চিন্তার কিছু নেই।’ আমাদের সব ব্যবস্থা করে ওরা বেরিয়ে গেল, আরও লোক, খাবার আনতে। ‘এখানেই থাকো, কোনও চিন্তা নেই, আসছি আমরা।’ স্বপ্নের মধ্যে একটাই কাজ করা যায়। ঘুমিয়ে পড়া। পড়লাম। রাতে, আগুন জ্বালাল ওরা। এই প্রথম একটা জিনিস খেলাম, সেদ্ধ নুডলস দিয়ে ব্যাঙের ঝোল। পরের দিন দুপুরের মধ্যে মধ্যে ফিরে এসে, আমরা চলতে সক্ষম নিশ্চিত হয়ে বলল, ‘চলো, বাখিম কাছেই।’ যাব তো, নদী পেরোব কী করে? আমাদের সব জিনিস পড়ে আছে, তার কী হবে? ওরা জেনে নিল কোথায়। টলতে-টলতে নদীর ধরে পৌঁছে দেখি, বাঁশকাঠ দিয়ে তৈরি পায়ে চলার মতো দিব্বি এক সাঁকো। একদিকে রেলিং-ও আছে। বানিয়ে ফেলেছে ওরা। পেরিয়ে অল্প চড়াই। আমরা ভীষণ অধৈর্য হয়ে উঠেছি। অলোকদা, নির্মলদা কোথায়? ‘ঘর পে’ বলে একটা ছোট্ট ঘর দেখাল। বাখিমে এসেছি, লোক জমছে, উঁকি মেরে দেখছে আমাদের। ইহজন্মে এরা এমন জ্যান্ত মানুষ দেখেনি। এর পরের বেশ কিছুটা আমার কাছে আজও ব্ল্যাঙ্ক। ১৬ নভেম্বর, ১৯৯১।

    নির্মলদার জুতোর হার্ড হয়ে যাওয়া সোল স্লিপ করেছিল। পড়ে মাথায় চোট লাগে, রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সেই অবস্থায় জামাকাপড় খুলে, শরীরে দড়ি বেঁধে, একজন তীরে ধরে রেখেছে, অন্যজন জলের সঙ্গে যুদ্ধ করে নদী পেরোনোর চেষ্টা চালিয়ে, একটা দানবিক ইচ্ছাশক্তির জোরে পৌঁছয় ওপারে। সেটা হতেই অন্যজন আগেরজনের ভূমিকায় সুইচওভার, এবারে একটু-একটু করে টেনে তোলা। সাবধানে। অনেকটা সময় লেগেছিল বরফজলের সঙ্গে অসম যুদ্ধে জিততে। কিছুক্ষণের জন্য বোধহয় জ্ঞান ছিল না কারুরই। ফিরতেই, আবার এগোতে শুরু করে দুজন। এবারে চড়াই। গ্রামের কেউ আসছিল। দেখতে পায়, ভয়ংকর চেহারার একজন মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় উঠে আসছে জঙ্গল ভেঙে, সঙ্গে আরেকজন। আতঙ্কে সে পালিয়ে গিয়ে গ্রামে খবর দেয়।    

    আমরা ঠিক করেছিলাম ইয়োকসমে থাকব ক’দিন। আর কিছু না হোক, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করব ওদের নিয়ে। সে সুযোগ পেলাম না। আমাদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে কলকাতায় অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। আমাদের রুটটা মোটামুটিভাবে বাড়িতে বলা ছিল। আমার বন্ধুর বাবা, তখন ডিজি পুলিশ, অর্চিষ্মান ঘটক, সিকিম-নেপাল সীমান্তে অ্যালার্ট জারি করেন। পাঁচজনের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পেলেই অ্যাকশন নেবে। ইয়োকসাম থানাতেও খবর ছিল। পথ হারানোর শাস্তি হিসেবে আমরা ইয়োকসাম পৌঁছনো মাত্র, জীপে তুলে সে রাতেই আমাদের নামিয়ে আনা হল পেলিং-এ। ফোন করলাম বাড়িতে। শুনলাম, সেই মুহূর্তে আমাদের বাড়ির দরজায় রতনদার পরিচিত একদল ছেলে রুকস্যাক নিয়ে তৈরি সিকিম যাবে, রেসকিউ করবে বলে। তারপর শিলিগুড়ি। ট্রেনে ভয়ংকর ভিড়। আমাদের যা চেহারা, একজনের মাথায় লাল ছোপ ব্যান্ডেজ, কেউ কোনও কামরায় উঠতে দিল না। মিলিটারি যাচ্ছিল, সেই কামরায় কাকুতি মিনতি, টয়লেটের সামনে বসে সকালে শিয়ালদা। ট্রেনের দরজার বাইরে বিস্মিত, কী বলবে ভেবে না পাওয়া বন্ধুবান্ধবরা। সুস্থ হতে কিছুদিন সময় লেগেছিল। নির্মলদার অপারেশন হয়েছিল, উন্ড দেখে ডাক্তার ঘাবড়ে গিয়ে কিছু বলার সাহস পাননি। অসম সাহসিক অ্যাডভেঞ্চার, পরিস্থিতির সঙ্গে দুর্দমনীয় লড়াই করে বেঁচে ফিরে আসার জন্য আমাদের খুব হিরো করা হয়েছিল। এখনও হয়, ‘ও, তুমি সেই টিমে ছিলে?’ আজও শুনি। আসল নায়কদের পরিচয়টা দিলাম এখন। আর একটা কথা। র‍্যাটহোল মাইনারদের মতোই, এঁরাও আমাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য পারিশ্রমিক নিতে চাননি। সিকিমের জঙ্গলে যখন ওইসব কাণ্ড চলছে, কলকাতায় আমার বাবা তখন অসুস্থ, প্রথম হার্ট-অ্যাটাক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল যদিও। অনেকদিন পরে, সব মিটে গেছে, একদিন বলল— বুঝলি, তোরা তখন হারিয়ে, তোদের যে এমন কাণ্ড হয়েছে জানি-ই না। ফিরতে দেরি হচ্ছে, একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল এখানে। আমি হাসপাতালে, আচ্ছন্ন অবস্থায়। মনে হল কেউ কানে-কানে বলছে, ‘ইটস ওকে, ইটস অল রাইট।’ দিনক্ষণ জানলাম। মিলে গেল। কয়েক মাস পরে, এপ্রিলে, আমরা কয়েকজন আবার ফিরে যাই ইয়োকসমে। কথা রাখতে। হারানো রাস্তাটা রি-ভিজিট করতে। শুনি, কয়েকজন আর নেই, নেপালে চলে গেছে। অনেকে, আবার সেই হারিয়ে যাওয়া, মরতে বসা লোকগুলো ফিরে এসেছে শুনে, দেখবে বলে এসেছিল। দৌড়ে পালিয়ে গেল। কেউ চিনতে পারল না। ওদের স্মৃতিতে যে ভাঙাচোরা মুখগুলো রয়েছে তার সঙ্গে আজকের ক্লিন-শেভড পোর্ট্রেট মিলবে কী করে?

    ছবি এঁকেছেন শুভময় মিত্র

     
      পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা  
     

     

     




 

 

Rate us on Google Rate us on FaceBook