রবাটে সুখ নাই
আদি থেকেই কালীঘাটের দুটো মুখ। একটা পুণ্যের হলে, আর একটা পাপের!
বিগ ইন্ডাস্ট্রিজকে ঘিরে স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে ওঠে, এটাই নিয়ম। কালীঘাটের কালী ঠাকুর হলেন বড় শিল্প, তার পাশেই অজস্র অনুসারী শিল্প, মানে ছোট-মাঝারি ঠাকুর আছেন। কালীঘাটের কালী ঠাকুরের ভৈরব হলেন নকুলেশ্বর। তাঁর আবাস নকুলেশ্বরতলা। তিনি কিন্তু সেই শিল্পতালুক মন্দির চৌহদ্দির মধ্যে নেই। একটু দূরে অবস্থান করছেন। যেন কর্মসূত্রেই দূরে আছেন। একসময় হয়তো সবটা মিলেই দেব-দেবীর একান্নবর্তী সংসার ছিল, এখন ভেঙে সবাই নিউক্লিয়ার দেব-দেবী হয়েছেন।
কালীমন্দিরের চৌহদ্দিতে আছে শ্যাম-রাই মন্দির। অপূর্ব সুন্দর বিগ্রহ। তার উল্টোদিকে জোড়া মহাদেব মন্দির। মন্দিরের ভেতরে শিবলিঙ্গ আছে, কিন্তু মহাদেব মন্দির নামেই পরিচিত। তার সামনেই বলিঘর। ছাগল যার যার। এখান ছাগবলির দক্ষিণায় দিতে হবে ২১৬০ টাকা। সেসময় ছিল ১১ টাকা। ছাগলের ছাল ও মুণ্ড যিনি বলি দেবেন তাঁর। এঁরাই মাংস কেটে টুকরো করে দেবেন।
বাঘাদা, টুকরের ক্ষুর ও কালীঘাটের যুদ্ধক্ষেত্র! পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১০…
শ্যাম-রাই মন্দিরের সামনেই ফুলের দোকান। আগে ওখানে পর পর ডালার দোকান ছিল। আমার এক বন্ধুর জ্যাঠার ডালার দোকান ছিল ওখানে। এখন তার পাশ দিয়ে পিছনদিকে গেলেই ষষ্ঠীতলা। এই ষষ্ঠীতলায় আছে ফণিমনসার প্রাচীন ঝোপ। সেখানে মানুষ সন্তান-কামনায় মানত করে, ডোর বাঁধে। তারও পরে তাকালে কুণ্ডপুকুর। আগে মন্দির থেকে কুণ্ডপুকুর আলাদা ছিল। এখান সবটাই একসঙ্গে। মাল্টি সুপার-স্পেশালিটি হসপিটালের মতো, সবই এক ছাদের তলায়। আগে প্রধান গেট এখন প্রস্থান পথ হয়ে গিয়েছে। আগে গঙ্গার মুখোমুখি ছিল প্রধান গেট। ভেতরে নাটমন্দির। তখন নিত্যদিন নাটমন্দিরে কেউ না-কেউ এসে সন্ধেবেলা গান করতেন। মূলত শ্যামাসংগীত, রামপ্রসাদী, কালীর গান। কালীঘাট অঞ্চলের অনেক বউ-ঝি-দের সন্ধেবেলা গন্তব্য ছিল কালীঘাট মন্দিরের নাটমন্দির। শনিবার আর অমাবস্যা-পূর্ণিমায় নাটমন্দির জমজমাট। তখন টিভি ছিল না, সিরিয়াল ছিল না। মন্দির-চাতালে বছরে একবার যাত্রাগানের আসর বসত। আমি সেখানে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর গান শুনেছি। ওই মন্দির-চাতালে অনেক যাত্রাপালাও দেখেছি। নামী-দামি যাত্রা কোম্পানি এসে মন্দির-চাতালে অভিনয় করত। তখন মন্দির-পার্শ্ববর্তী চাতাল এত ছোট ছিল না। প্রায় পাথরে মোড়া একটা ছোটখাট ফুটবল মাঠ ছিল। এখন দোকান দিয়ে ঘেরাও হয়ে গেছে।
কালী মন্দিরে ভেতর আগে কোনও গাছ ছিল না। একটু যদি চোখ বন্ধ করে দেখি, সে-সময়ও কালীঘাট অঞ্চলে গাছপালা বড্ড কম ছিল। মন্দিরের ভেতর ফণিমনসা ছাড়া আর বাইরের দিকে দুটো বড় বট গাছ ছিল। একটা নির্মল হৃদয় পেরিয়ে এসে, যেখানে শাঁখার দোকানগুলো আছে— সেই জায়গায়। আর একটা বটগাছ ছিল কুণ্ডপুকুরে ঢোকার মুখে। ওখানে গণেশ বা বজরংবলিরও পুজো হতো। প্রধান দরজার কাছে কোনও গাছ ছিল না। এখনকার প্রস্থান-পথে, যে রাস্তা সোজাসুজি গঙ্গার ঘাটের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তায় মন্দিরের পরেই শীতলা মন্দির। গেরুয়া রঙের মূর্তি। ছোটবেলায় শীতলা মন্দিরের জল বাড়িতে এলেই বুঝতাম— বসন্ত এসে গেছে। তার পরেই ভুবনেশ্বরী মন্দির। গঙ্গার ঘাটের দিকে গেলে আছে নবগ্রহ মন্দির। ওদিকে গ্রহশান্তির জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা আছে। তখন পাড়ার মোড়ে-মোড়ে এত শনিমন্দির ছিল না। শনিপুজোর জন্য নবগ্রহ মন্দিরেই যেতে হত। ওর আশপাশেই অনেক জ্যোতিষীর আখড়া। এখনও আছে। এখনও জ্যোতিষীদের খুপরি ঘরগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাবেন উকিলের চেম্বারের মতো সার সার আইনের বই! আইন নয়, সব পুরনো পঞ্জিকা। ওখানে গেলেই আপনার ঠিকুজি-কোষ্ঠীতে কোনও না-কোনও একটা গলদ বের করে ঠিক গোল বাঁধিয়ে ছাড়বে। আমি কাউকে দেখিনি ওখানে ঢুকে হাসিমুখে বের হতে।
গঙ্গার ঘাটে আছে শায়িত সত্যবানকে কোলে নিয়ে সাবিত্রী বসে আছেন। কিছুদিন আগে আমি সেই সাবিত্রী-সত্যবানের সিঁদুরচর্চিত মূর্তির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম। ছোটবেলার সেই ঠাকুরের মূর্তি কি ওখনও রয়েছে? তাহলে আমার মায়ের ছোঁয়ানো সিঁদুরের কোনও কণা এখনও ওখানে অবশিষ্ট আছে। আগে ফেরি ছিল জোয়ারের সময়। ভাটায় নৌকা বাঁধা থাকত। ফেরি পারাপার দু-পয়সায়। ওপারে চেতলা, চেতলার হাট।

আমাদের সামনেই কালিকা সিনেমা হলের পর্দা থেকে নেমে এলেন দেবী সন্তোষী। মাঝে-মাঝে মনে হয়, অনেককে যেমন জন্মাতে দেখেছি, তেমনই সন্তোষী মাতাকেও চোখের সামনে জন্মাতে দেখলাম। সিনেমার পর্দা থেকে সরাসরি ঘরে ঢুকে পড়লেন। আর সবাইকে শুক্রবার টক খেতে মানা করে দিলেন। সেই সন্তোষী মাতার মন্দিরও পেয়ে যাবেন গঙ্গার ঘাটে। ওদিকেই ছিল এক তান্ত্রিক সাধুবাবা, নাম কি সত্যানন্দ হতে পারে? মাথায় খাটো, মাথায় টাক, এক মুখ দাড়িগোঁফ। ভারি গম্ভীর, ভারী চেহারার মানুষ। দু-হাত জুড়ে অনেক মাদুলি, তাবিজ, পাথর। উনি ছিলেন তান্ত্রিক, রক্ত বসন পরতেন। বাড়ির ভেতর ছিল বগলা মন্দির। বগলা পুজো করতেন। বাৎসরিক উৎসব হত। দু-একবার গিয়েছি করুণাপিসির সঙ্গে। মাংস আর পোলাও খেয়েছি। শুনলাম সেই বগলা মন্দির এখন নেই। বগলা মাতা গৃহপালিত ঠাকুর নন। তাঁকে বশ করা, পুজো করা কঠিন কাজ।
কালী মন্দিরের সঙ্গে এসবই অনুসারী ঠাকুর-শিল্প ছিল, আছে, থাকবে। এছাড়াও একান্নবর্তী পরিবারের নানা সদস্য ছিল—
প্যাঁড়ার দোকান, ডালার দোকান, ঠাকুরের কাপড়ের দোকান, শাঁখার দোকান, ফুল ফল মিষ্টির দোকান, দেব-দেবীর ফোটোর দোকান, পেতল-কাঁসার বাসন ও মূর্তির দোকান, পাথরের নানা জিনিস নিয়ে পাথরপটির অসংখ্য দোকান, দোকানময় কালীঘাট ছিল এই সংসারের অঙ্গ। আর ছিল যাত্রী নিবাস।
যাত্রী নিবাসে বিয়েই হত বেশি। গঙ্গার ঘাটের দিকে আদ্যশ্রাদ্ধ। দূর থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা এখানে বিশ্রাম নিতেন।
কালীঘাট চত্বরে ছড়ানো ছেটানো কালীচরণ পান্ডার যাত্রীনিবাস। এখনও আছে। ওখানে বিয়ের তারিখে বিয়ে লেগেই থাকত। ঘরে-ঘরে বিয়ে। সামান্য আয়োজন। বিয়ের পরে সামনের স্টুডিও থেকে ছবি তোলা। চপ-কচুরি-মিষ্টি খেয়ে নবদম্পতির হন্টন। তারিখ ছাড়া বিয়ে করার দরকার পড়লে কালীঘাটে চলে যেতে পারেন। ওখানে সারা বছর বিয়ে হয়। কোনও মাস বাদ নেই।
এই এত বড় কালীমায়ের শিল্প সংসারে আর এক অনুসারী শিল্প পান্ডারা। না কি এরা শিল্পের দূষণ?
প্রথমে জুতো চুরি হয় বলে— জুতো খোলাবে। তারপর হাতে জল দেবে। তারপর মাথায় ডান্ডা মারবে। একবার হাতে ডালা ধরিয়ে দিয়ে পর পর নানা কিছু দিয়ে যাবে— প্যাঁড়া, ফুল, ধূপ, সিঁদুর, শাঁখা, চেলি, লাল সুতো— আরও কত কিছু যে ভরে দেবে তার ইয়ত্তা নেই। মুখে একটাই কথা, আগে মাকে দর্শন করে আসুন, বেশি নেব না। দর্শন হয়ে গেলেই তখন গলা কাটবে। এরা ভক্তিশিল্পের দূষণই হবে! এদের ধর্ম সর্বকালেই এক।
কালীঘাটে অনেক কালী! কালীময়! কালীচরণ পাণ্ডার কথা তো আগেই বলেছি। কালীদির চোলাইয়ের ঠেকও খুব বিখ্যাত। দিবারাত্রি খোলা। ব্লাডারে করে চোলাই আসত। দিন-রাত লোক বসে। সারা কালীঘাটের তাবৎ মাতাল কালীদির খদ্দের। দিবারাত্রি খোলা? শ্মশানযাত্রীরা খুঁজে খুঁজে ঠিক এখানে আসবে। তখন বিলাতি নয়, দেশিই চলত।
তারপর আছে কালীবাবুর বিড়ি। কালীঘাট বাজারের উল্টোদিকে। লাল সুতো, নীল সুতো। কড়া-হালকার স্বাদ পালটে যেত। দোকানের ভেতরই পাঁচ-সাতজন দুলে দুলে বিড়ি বানিয়ে চলেছে। টাটকা, কড়া, স্বাদে অনন্য। তামাকের ঝাঁঝালো গন্ধে ভরপুর। সামনে ট্রানজেস্টার বাজছে। কালীঘাটে ছড়ানো ছিল নানান কালী! আমার শৈশবের স্কুলের নামে তো জোড়া কালী। কালীঘাট মহাকালী পাঠশালা!
যাই হোক, যে-কথা বলছিলাম, খুব ভাল করে দেখলে যেখানে গঙ্গার ধারের কালীমাতার সংসার, সেখানে গাছের বড়ই অভাব। সেটা কালীঘাট চৌহদ্দি জুড়েই। আমাদের চক্রবর্তী পাড়ায় একটা শিউলি গাছ ছিল ঝন্টুদাদের বাড়িতে। সুকুদাদের বাড়িতে একটা পেয়ার গাছ ছিল। পেয়ারা ছিল খুব কষা। ওই পেয়ারা কেউ খেত না, দাঁতের যন্ত্রণায় পেয়ারা পাতা, সেদ্ধ জল ওষুধ হত। সামনের দিকে বিশ্বনাথ-শ্যামলদাদের বাড়িতে ছিল বিশাল একটা ছাতিম গাছ, আর একটা দুর্দান্ত জামরুল গাছ, আম গাছ।
এই গাছওয়ালা বাড়িটা ছিল ছোটবেলায় আমাদের কাছে দৈত্যের বাগান। ওই গাছে ঝেঁপে জামরুল হত। আর সারা দুপুর সবাই ইট ছুড়ত। আমাদের ছিল পাশের বাড়ি। শ্যামলদা ছিলেন ছোটবেলায় সাক্ষাৎ যম। ইট পড়লেই হাতে একটা লাঠি নিয়ে বের হতেন। পুরো দৈত্য! ফরসা একমাথা কোঁকড়ানো চুল। গলায় সুতীব্র চিৎকার। আমি কোনওদিন ওই গাছে ইট ছুড়িনি। বাবার কড়া বারণ ছিল।

সেই দৈত্যের বাগান একসময় খুলে গেল। শ্যামলদার ছেলে সবুজ বড় হতেই তিনি কেমন পালটে গেলেন। আমাদের সঙ্গে তারপর শ্যামলদার অসমবয়সি বন্ধুত্ব। ওঁদের বাড়িতে প্রথম টিভি এল। খেলা দেখার জন্য অবারিত দ্বার। ওই বাড়িতে কতদিন খেলা দেখেছি, মনে নেই। ওই বাড়ি আমাদের বন্ধুদের সবার ছোটবেলায় টিভিমুখর করেছিল। শ্যামলদার দাদা বিশ্বনাথদা ছিলেন রেসের মাঠে জকি। এটা আমার শোনা কথা। আমি বিশ্বনাথদাকে দেখেছি। খুব ফরসা, শান্ত, চাপা গাল, প্রচণ্ড গম্ভীর। শুনতাম, মদ খেতেন, কিন্তু কোনওদিন পাড়ার মেয়ে-বউদের মুখের দিকে তাকাতেন না। আমাদের পাড়ার সবচেয়ে বেশি জমি নিয়ে ওঁদের বাড়ি। এত বেশি জায়গা নিয়ে কোনও বাড়ি ছোটবেলায় আমার নজরে পড়েনি। বিশাল একটা গেট, সেটা বন্ধই থাকত। সে-দরজা কোনওদিন খুলতে দেখিনি। ছোট দরজা দিয়েই ওঁদের যাওয়া-আসা। একবার আমাদের ফুটবল কেনার জন্য বিশ্বনাথদা টাকা দিয়েছিলেন। নিমাইদাই চেয়ে দিয়েছিল। তখন নিমাইদা বলেছিল, আরে বিশ্বনাথও একজন স্পোর্টসম্যান। ঘোড়দৌড় কি মুখের কথা! ওটাও একটা খেলা। তার আগে মনে করতাম, রেস মানেই সর্বনাশ। ছোট-ছোট বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা কত বিদ্বান দেখেছি। কিন্তু নিমাইদা আমাদের দেখার চোখ পালটে দিয়েছিল।
আসলে দেখা। আমি কী দেখছি, আর তুমি কী দেখছ?
এবার একটু অন্য আর এক শিল্পতালুকের দিকে চোখ রাখি। ওই যে নিমাইদা আমার দেখার চোখ পালটে দিয়েছে, তাই আপত্তি না থাকলে অন্য কিছু দেখি—।
নিমাইদা বলত, কালীঘাটে দুটো জিনিসই দেখার আছে রে। মায়ের বাড়ি আর খানকিবাড়ি। শুধু পুণ্য নিয়ে যাবি? পাপ দেখবি না?
সেই শিল্পতালুকের অনুসারী শিল্প, দূষণ— সব কথাই বলব। পুণ্য দেখেছেন, এবার পাপ দেখুন।
নিমাইদা বলেছিল— মা দর্শন করে ফেরার সময় সব্বার ঘাড় দেখেছিস কেমন শক্ত হয়ে থাকে। বাঁ-দিকে তাকাবে না। তাকালেই সব পুণ্য ভ্যানিশ হয়ে যাবে। কিন্তু তাকাবেই— তাকাবে। গৃহস্থ লোক সঙ্গে বউ কাচ্চাবাচ্চা, তবু একবার পাপ দর্শন করবেই করবে। মেয়েরাও তাকাবে। তাকিয়েই ছেলে-মেয়েদের ধমক কষাবে— সোজা চল। এত এদিক-ওদিক কী, অ্যাঁ?
আর কদম ছাঁট দেওয়া জাহাজি মানুষ, নানা ধরনের রক্ষাকর্মীদের দলবদ্ধভাবে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকা আছে। তারা স্পষ্ট। বাছাই করছে। রাস্তার ওপারে কার নৌটঙ্কি বেশি, দমক-ছমক বেশি, কার খাঁজ, কার ভাঁজ— কে কার মনে ধরে। এসব দেখার জন্য নিমাইদা আমাদের জ্ঞানচক্ষু দিয়েছে।
সেই জ্ঞানচক্ষুতে জড়িয়ে থাকা দু’-চোখ মেলে ছড়িয়ে থাকা কালীঘাটের কথা লিখতে বসেছি—
নিমাইদার কথামতো এবার দ্বিতীয় শিল্পের দুয়ারে যাই। এই শরীর-শিল্পের সঙ্গে অনুসারী শিল্পও অনেক। গলির মুখে পান-সিগারেটের দোকান। লাল শালুর ওপরে রাংতায় তবক জড়ানো পান থাকে। নিচে বরফ। শরীর ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন-প্রাণও ঠান্ডা হয়ে যায়। হরেক কিসিমের জর্দা আছে। মদ খেয়ে বার-বাড়ি ঘুরে এসে মুখে হিমশীতল জর্দা দেওয়া পান। পান চিবুতে চিবুতে সিগারেটে লম্বা টান— চোখ বন্ধ করে ভাবুন! ওই পানের দোকানে আর-একটা জিনিস দেখতে পাবেন, লাড্ডুর মতো। ভাঙ। বড় ধরনের নেশাড়ুরা সেটাও খায়। তারা সিনেমার রাজেশ খান্নাকে দেখে হাতে বেলিফুলের মালাও জড়ায়। বেল-জুঁইয়ের সিজনে ফুলওয়ালা মেলে। মেয়েরা যেমন কেনে, চুলে দেয়। বাবুরাও শখ করে হাতে জড়ায়। গোপন পথে মদ আসে, আর ওপেনে চাট বিক্রি হয়।

আমি যখন বড় হচ্ছি, সেসময় একটা বিপ্লব ঘটে গেল। বাজারে নিরোধ এল! পঁচিশ পয়সায় তিনটি। রেডিও খুললেই বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে-বিজ্ঞাপনে কান ঝালাপালা করে দিত। পাড়ার বদমাইশরা ছোটদের মুখস্থ করিয়ে দিল। এমনই এক বদমাইশ বাচ্চা পাকানোর মাস্টারমাইন্ড ছিল শৈলেন। আমাদের শৈলেনদা। আমাদের থেকে বেশ কিছুটা বড়। সে পাখিপড়া করে কালটাকে শিখিয়ে দিল— বল, পঁচিশ পয়সায় তিনটে… বল। কালটা বেধড়ক মার খেল। কালটাদের পানের দোকান ছিল বাজারে। ডেঁপো ছেলে বলে কানমোলাও খেল।
এ তো গেল একদিক। অপরদিকে দেখি—
নিরোধ এল, দেখল আর জয় করে নিল এমনটা নয়। তখন পানের দোকানে দোকানে নিরোধের বিজ্ঞাপন দেওয়া চাঁদমালা ঝুলছে। পানের দোকানে বোয়েম ভর্তি করে নিরোধ অভয় জানাচ্ছে, হাতছানি দিচ্ছে। আর গম্ভীর মুখ করে গলির উল্টোদিকে ডাক্তারবাবুরা দেখছেন। তারা হাহাকার করে উঠল— হায় হায় ব্যবসা গেল!
আসলে এঁরা হলেন বড় শিল্পের পাশে যেমন অনুসারী শিল্প, তেমনই তাঁরা শিল্পের দূষণরোধক প্ল্যান্ট।
এই ডাক্তাররা ছিলেন খুব গুরুগম্ভীর ব্যক্তি। আদৌ ডাক্তার কি না বলতে পারব না, কালীঘাটের গলির উল্টোদিকে তাঁদের চেম্বার। বাইরে তাঁদের নাম বোর্ডে লেখা থাকত। আর ডিগ্রি? উরে বাবা মেলাই ডিগ্রি। সে-সময় সাধারণ মানুষদের মধ্যে এত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেননি। দাঁতের ডাক্তার, চোখের ডাক্তার, আর সব ডাক্তার এক। মেডিসিনই এক এবং অদ্বিতীয়ম। সেই সমাজে দাঁড়িয়ে এঁরা কিন্তু সবাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক— গুপ্ত রোগের, গোপন রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক! চেম্বারের বাইরে লেখা থাকে ‘গুপ্তরোগের গোপনে চিকিৎসা করা হয়’। তখন যৌনকর্মী শব্দটা মার্কেটে আসেনি বলে, ডাক্তারবাবুরা যৌনরোগ কথাটা হয়তো বলতেন না। বলত—গুপ্ত রোগ। বড় বড় করে লেখা থাকত— গোপনে সিফিলিস-গনোরিয়ার চিকিৎসা করা হয়।
একবার আমাদের পাড়ার শম্ভুদা অফিসে অসুস্থতাজনিত ছুটি নিয়েছিল। তারই লিভ সার্টিফেকেটের জন্য এমনই এক ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকেছিল বেচারা। শম্ভুদাকে অমন গোলমেলে জায়গায় ঢুকতে দেখে পাড়ার এক সম্মাননীয় ব্যক্তি দাঁড়িয়ে পড়েন। তিনি গম ভাঙানোর দোকানে গম জমা দিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে নজর রাখেন— শম্ভুদা কখন গোপন চিকিৎসা করিয়ে বের হয়। তারপর তিনি স্পষ্ট দেখেছেন— শম্ভুদা হাতে প্রেসক্রিপশন নিয়ে বেরিয়েছে। ব্যস, সে খবর চলে আসে পাড়ায়। জনে-জনে শম্ভুদাকে ডাকে আর জিগ্যেস করে— হ্যাঁ রে শম্ভু একটা দুর্ঘটনা শুনলাম, তা এখন ভাল আছিস তো?
আমরা ওই ডাক্তারগুলোকে খুব ভয় পেতাম। আমাদের বড়রা বুঝিয়ে দিয়েছিল— ওই ডাক্তারখানার দিকে খবরদার যাবি না— ওখানে কেন্নোর মতো সিফিলিসের জার্ম বুকে হেঁটে চলে, ওখানে জোঁকের মতো গনোরিয়ার জার্ম লাফায়! উরে বাপ রে, ওদিকে কেউ যায়? গলির ছেলে-মেয়েরা, মাসিরা-দিদিরা আমাদের কাছে সে-অর্থে অচ্ছুত ছিল না, অচ্ছুত ছিলেন গুপ্তরোগের ডাক্তাররা
শম্ভুদা প্রথমে বুঝতে পারেনি। যখন বুঝতে পারল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে— জনে-জনে একই প্রশ্ন — শম্ভু শেষে তুই—!
শম্ভুদা মা কালীর দিব্যি কাটল। বাবা-মায়ের দিব্যি কাটল। কেউ বিশ্বাস করল না। সবাই বলল— তোর এতটা অধঃপতন! শম্ভুদা মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলল রাগে। কেঁদেও ফেলল। সবাই বলল— হাসপাতালে যা। শুনেছি, ওই জার্ম মাথায় বাসা বানায়। মানুষ পাগল হয়ে যায়। দেশে-বিদেশে কোন কোন কবিরা নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।
শম্ভুদা পাগলপারা!
শেষে সেই শম্ভুদা একদিন লুঙ্গি পরে উদভ্রান্তের মতো নিমাইদার কাছে চলে এল। এসে লুঙ্গি তুলে চিৎকার করে বলল— নিমাই আমাকে একবার চেক করে নিয়ে সবাইকে বল নিমাই, নইলে আমাকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলতে হবে।
নিমাইদা চেক করেছিল কিনা জানি না। কিন্তু তারপর থেকে শম্ভুদাকে কেউ ভাল চোখে দেখত না। আড়ালে কেউ কেউ ফিসফিস করত— চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা। ও নিমাইয়ের কাছে গেল কেন? শুয়োর চিনেছে কচু! যেন শম্ভুদার উচিত ছিল লুঙ্গি পরে সবার বাড়ি গিয়ে গিয়ে ‘দুয়ারে-শম্ভু’ হওয়া!
আমরা ওই ডাক্তারগুলোকে খুব ভয় পেতাম। আমাদের বড়রা বুঝিয়ে দিয়েছিল— ওই ডাক্তারখানার দিকে খবরদার যাবি না— ওখানে কেন্নোর মতো সিফিলিসের জার্ম বুকে হেঁটে চলে, ওখানে জোঁকের মতো গনোরিয়ার জার্ম লাফায়! উরে বাপ রে, ওদিকে কেউ যায়? গলির ছেলে-মেয়েরা, মাসিরা-দিদিরা আমাদের কাছে সে-অর্থে অচ্ছুত ছিল না, অচ্ছুত ছিলেন গুপ্তরোগের ডাক্তাররা।
তখনও ‘দুর্বার’ আসেনি। জনস্বাস্থ্যকর্মীরা ঢোকেনি। অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র ভোটপ্রচারে ওখানে ঢোকার সময় মুখে রুমাল চাপা দিয়েছিলেন। এই নিয়ে বড়দের তির্যক আলোচনা শুনেছি। তবে শেষ কথাটা এখনও কানে লেগে আছে—
একদিন গোপাল সুইটসে কচুরি-লোভী হয়ে আমরা বেশ কয়েকজন সন্ধ্যামুখে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় গলির ভেতর থেকে এক মাসি একটা লোককে কলার ধরে হিড়হিড় করে টেনে এনে রাস্তায় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল— মেয়েরা উদ্বিগ্ন। আমরা কৌতূহলী। কে যেন বলল— ব্যাটা নির্ঘাত টাকা দেয়নি?
মাসি বলল, না না, হারামজাদা বলে কিনা— রবাটে সুখ নাই।
এই সুখের খোঁজের সুখপাখিদের জন্যই শরীর-শিল্প তালুকের বাইরে ডাক্তারগুলো হাঁ করে বসে থাকতেন। এই ডাক্তারদের কী বলা যাবে— বড় শিল্পের সঙ্গে অনুসারী শিল্প, না কি শিল্পবর্জ্য-দূষণরোধক প্ল্যান্ট!




