‘ট্রান্সজেন্ডার পারসনস প্রোটেকশন অফ রাইটস’— ২০১৯ সালে পাশ হওয়া এই অ্যাক্ট ভারতের ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের জন্য এক সর্বব্যাপী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংজ্ঞা তৈরি করেছিল। এই অ্যাক্টের শুরুতেই উল্লেখ করা ছিল— ‘ট্রান্সজেন্ডার এমন একজন মানুষ যার লিঙ্গ, জন্মমুহূর্তে নির্ধারিত লিঙ্গের সঙ্গে মেলে না।’ এই অ্যাক্টের আওতায় ট্রান্স পুরুষ ও ট্রান্স মহিলারা তো পরতই, সেই সঙ্গে এতে শামিল ছিল তারাও যারা সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বাঁচে যেমন, কিন্নর, যোগটা, হিজরা ও আরাবনি। এই অ্যাক্টে বেশ কিছু অসংগতি, বা ফাঁকফোকর থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে একে যুগান্তকারী রায় বলেই চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তবে ২০২৬-এর মার্চ মাসে যা ঘটল, তা অবিশ্বাস্য না হলেও আশ্চর্য ও ভীতিমূলক তো বটেই। মাত্র কয়েকদিনের নোটিশে, গত ২৫ মার্চ, এই অ্যাক্টের যাবতীয় অধিকার খারিজ করে দিল সংসদ। ২০১৯-এ যখন এই অ্যাক্ট পাশ হয়, আর ’২৬-এ যখন একে খারিজ করার ঘোষনা জারি করা হল— এই সাত বছরে কেন্দ্রে কিন্তু সরকারের কোন বদল ঘটেনি। তাহলে কীসের জন্য এই অ্যাক্ট খারিজের তাড়াহুড়ো? কেন ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়কে হঠাত তাদের লিঙ্গ-পরিচিতির অধিকার দিয়েও কেড়ে নেওয়া?
মনে রাখতে হবে, গত ১৩ মার্চ এই বিল পেশ করার পর বেশ কিছু উকিল, সংসদের সদস্য ও এই সম্প্রদায়ের সক্রিয় কর্মী, এর প্রতিবাদে পিটিশন পাঠিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতিকে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে দেখা গিয়েছিল ট্রান্স মানুষদের। তা সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র দেরি না করে, এটিকে খারিজ করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, এর ফলে, সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪-র ‘নালসা’ বনাম ভারতের যুগান্তকারী রায়-এরও আর কোনও অস্তিত্ব রইল না।
আরও পড়ুন : নাম-কাটা অভিযানের ভার কি গণতন্ত্র বইতে পারবে?
লিখছেন আব্দুল কাফি…
তাহলে হাতে রইল কী? খোলসা করে বলতে গেলে, কিছুই না। এরপর মেডিক্যাল বোর্ড থেকে লিঙ্গ-নিশ্চয়ক পরীক্ষায় যদি নিশ্চিত হওয়া যায়, তবেই একজন মানুষ পাবেন তাঁর ট্রান্সজেন্ডার সার্টিফিকেট। এই সব্বোনেশে আইনের চোটে আর কোনও ট্রান্সজেন্ডার মানুষই লিঙ্গ-আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে কোনও সার্টিফিকেট আর পাবেন না। ২০১৯-এর অ্যাক্টে যা উল্লেখ করা ছিল, তার থেকে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে এই আইন দেশকে আরও বেশি করে পশ্চাদ্মুখী করে তুলল। কিন্তু ট্রান্স-পুরুষ, ট্রান্স-নারী, নন-বাইনারি বা লিঙ্গ-প্রবাহমানতা (gender fluidity)-কে গ্রাহ্য না করলেও এই অ্যাক্ট কিন্তু সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ে যারা বাঁচে, যেমন কিন্নর, যোগটা, হিজরা ও আরাবনি— এদের অধিকার কেড়ে নিল না। কেবল চিরাচরিত বেশ কিছু ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়কে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই সম্প্রদায়গুলির অন্তর্গত মণিপুরের ‘নুপি মানবী’ বা ‘নুপি মানবা’, পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের ‘খোয়াজা শিরা’ ও আরও অনেকে। তামিলনাড়ুর দলিত ও ট্রান্সজেন্ডারদের সক্রিয় কর্মী, গ্রেস বানু-র মতে, এই আইন তাদের ইতিহাসের বিরুদ্ধে। ক্ষমতায় থাকা মানুষেরা ট্রান্স মানুষদের শিক্ষার অধিকার, কর্মসংস্থানের অধিকার, সংরক্ষণের অধিকার নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। এমনকী, কোনও ট্রান্স মানুষ তার পরিবারের নির্যাতনের হাত থেকে কীভাবে নিষ্কৃতি পাবে, তা নিয়েও বিন্দুমাত্র ভাবিত নয়। তারা কেবল কেড়ে নিল সামান্য সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও। অথচ এই মানুষগুলোও ভারতেরই নাগরিক।
প্রিয়দর্শিনী চিত্রাঙ্গদা-র (নন-বাইনারি লেসবিয়ান, পেশায় ব্র্যান্ড ম্যানেজার) মতে, “‘নালসা’-র মতো প্রগতিশীল অ্যাক্ট পাশ হওয়ার পর, সম্প্রদায়ের মানুষজন খানিকটা স্বস্তিতে ছিল। ২০১৯-এর অ্যাক্টটি খানিক অস্পষ্ট ছিল বটে, তবে সেখানে ট্রান্স প্রতিনিধির উপস্থিতি ছিল। কী পদ্ধতিতে ট্রান্সজেন্ডার সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, তাই নিয়ে আলোচনার জায়গা ছিল। এখন আর কিছুই রইল না!”
আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের ভারতকে এক আদর্শ হিন্দু-রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করার আপ্রাণ চেষ্টাগুলির মধ্যেই অন্যতম এটি। সেইজন্যই হিন্দু ধর্মীয় পাঠ্য বা পৌরাণিক কাহিনিতে যে-সব সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে, তাদের থেকে কোনও অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে না! এই যে কিন্নরি আখাড়া-র মাথা লক্ষ্মীনারায়ণ ত্রিপাঠী, যিনি নিজেকে হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের সক্রিয় কর্মী বলে পরিচয় দেন, তাঁর কিন্তু এই বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তার কারণ, তিনি হিন্দু-কুইয়ার জোট-এ বিশ্বাসী।
কিন্তু ২০১৯ থেকে ২০২৬-এ এই আমূল বদল ঠিক কী কারণে? প্রিয়দর্শিনী-র মতে, “এটি পূর্বপরিকল্পিত। প্রথমে ‘এসআইআর’ আর তারপর এই। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা মানুষগুলো যে-সব সম্প্রদায়ের মানুষজন পছন্দ করে না, তাদের থেকে মৌলিক অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। অথচ ‘ক্যুয়ের আইডেন্টিটি’ তো কোনও সমসত্ত্ব পরিচয় নয়! আগে হাই কোর্ট অনেক বেশি ট্রান্স-বান্ধব ছিল। এখন আর নেই। এই অ্যাক্ট আমাদের কাছে মৃত্যু পরোয়ানার শামিল। এর ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ট্রান্স মানুষদের অবস্থা কী হবে ভাবতে পারছেন? তাদের কোনও পরিচয়ই তো রাষ্ট্রের চোখে আর বৈধ থাকছে না! শেষে মেডিক্যাল বোর্ড একজন নন-বাইনারি বা ট্রান্সজেন্ডার মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণ করে দেবে? শারীরিক পরিচয়টাই সব? এ আমরা মেনে নেব না কখনওই। কোনও রাষ্ট্র ঠিক করে দিতে পারে না কোনও মানুষের বৈধতা। আমাদের গোটা জীবনটাই আসলে লড়াই করতে করতে কেটে যায়। মার্চ মাসের পর থেকে আরও একটা অসম্ভব লড়াই শুরু হল।”
ট্রান্সজেন্ডার আইডেন্টিটি সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য আত্ম-পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল। এটি পাওয়ার জন্য ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পরিচয়ের নথিপত্র আর ঠিকানা দিলেই হত। এর পরে কেউ যদি তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চাইত, কেবল সেক্ষেত্রে চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের প্রমাণপত্র দেখাতে হত। এখন যে অ্যাক্টটি এল, তাতে লিঙ্গ-পরিচয়কে মানবাধিকার হিসেবে না দেখে, কেবল শারীরিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হবে, যা এই সম্প্রদায়ের মানুষজনের কাছে মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার সমান।
কৌস্তুভ দাশগুপ্ত (নন-বাইনারি, পেশায় লেখক এবং অধ্যাপক) অবশ্য মনে করেন, “২০১৯-এর যে প্রোটেকশন রাইট, তাতেও এই সম্প্রদায়ের মানুষ তেমন কোনও অধিকার বা সুবিধে পায়নি সরকারের থেকে। তাঁর মতে, ‘নালসা’-র কারণে আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে ট্রান্স-সার্টিফিকেট পাওয়া যেত ঠিকই, তবে শিক্ষা বা স্বাস্থের পরিসরে কোনও সুবিধে ছিল না। আর এখন, সরকার ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের যৌন-প্রতিবন্ধী হিসেবে দেগে দিতে চাইছে। এই নতুন অ্যাক্টের মাধ্যমে ট্রান্স-পুরুষদের পরিচয়টাই নাকচ হয়ে গিয়েছে। তার সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের তারা অপরাধী হিসেবে গণ্য করতে চাইছে! সংখ্যালঘুদের বিপদ আরও বেশি করে বেড়ে গেল। তাদের যে-কোনও পরিচয়কেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া হল।” তিনি আরও বলছেন, “২০১৯ থেকে ২০২৫— এই ছয় বছরে বিজেপি ক্ষমতায় থেকে একটু একটু করে বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ বিস্তার করেছে। আর এখন এই অ্যাক্টের ফলে মুসলমান ট্রান্সজেন্ডার আর নন-বাইনারিরা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়ল। ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় একটি ‘আম্ব্রেলা’ টার্ম। এর মধ্যে থেকেই বিভিন্ন মতবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। প্রতিবাদ হচ্ছে, আন্দোলনও হচ্ছে এর বিরুদ্ধে। কিন্তু আরো বেশি করে জোট বেঁধে নামা দরকার।”
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রান্সজেন্ডার আইডেন্টিটি সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য আত্ম-পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল। এটি পাওয়ার জন্য ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পরিচয়ের নথিপত্র আর ঠিকানা দিলেই হত। এর পরে কেউ যদি তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চাইত, কেবল সেক্ষেত্রে চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের প্রমাণপত্র দেখাতে হত। এখন যে অ্যাক্টটি এল, তাতে লিঙ্গ-পরিচয়কে মানবাধিকার হিসেবে না দেখে, কেবল শারীরিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হবে, যা এই সম্প্রদায়ের মানুষজনের কাছে মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার সমান। কারণ এতে শুধু শরীরের উল্লঙ্ঘন হবে না, তাদের সম্মানহানিও হবে। যারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তাদের পক্ষে বোঝা শক্ত নয় যে, এই অ্যাক্টটি কেবল হিন্দু পুরাণকে মাথায় রেখে, বাকিদের পরিচয় নস্যাৎ করে দিতে চাইছে। ট্রান্স অধিকার তো মানুষের অধিকার থেকে আলাদা হতে পারে না!
আর্চি রায় (দলিত-ক্যুয়ের শিল্পী, ও ক্যুয়ের-অধিকার কর্মী) বলছেন, “আমি এই লড়াইটাকে কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের লড়াই হিসেবে দেখতেই চাই না। এটা তো মানবাধিকারের লড়াই, মানুষের লড়াই। অথচ কোনও সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখতে পাচ্ছি না। অভয়া মঞ্চ হোক বা তার জন্য ন্যায়বিচার চেয়ে লড়াই হোক, সারা শহর যখন রাত জেগেছে, সেখানে আমাদের তো বলতে হয়নি। কারণ আমরা অভয়ার লিঙ্গ পরিচয় জেনে নিয়ে তার জন্য লড়াই করতে নামিনি। ‘এনআরসি’ ‘এসআইআর’— এই সমস্ত লড়াই আমাদের লড়াই, কারণ আমরা বাকিদের থেকে আলাদা নই। (প্রসঙ্গত, রাণুচ্ছায়া মঞ্চ এবং শহরের অন্যান্য জায়গায় ট্রান্স অ্যাক্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’-এর প্রতিবাদে বা প্রতিরোধে বেশ কম-সংখ্যক বিসমকামী মানুষের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে)। এই বাংলার আন্দোলনে ‘পরিচয় রাজনীতি’ অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে এখনও। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে ট্রান্স সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গে মহিলারাও কিন্তু সমাজে ভয়ের উদ্রেক ঘটায়। ট্রান্স মানুষদের এখানে কেবল একটা স্কিম হিসেবে দেখা হয়। সরকার দেখেছে, ‘এসআইআর’ খুব একটা সফল হচ্ছে না, অগত্যা ট্রান্স মানুষদের অধিকার তুলে নাও। আরও বেশি করে কোপ বসাও। তবে আমাদের সঙ্গে কেউ যোগ দিক আর না দিক, আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। সরকারকে স্বস্তিতে থাকতে দেব না।”
ভারতের মতো দেশে, পুরুষ ও মহিলা— কেবল এই দুই শ্রেণির মানুষ ছাড়াও আরও অনেক ধরনের মানুষ ছিল, আছে, ও থাকবে। তাদের লম্বা ইতিহাস আছে। বিসমকামী মানুষ হওয়া মানে এই নয়, যে সেই ইতিহাসের প্রতি তাদের কোনও কৌতূহল থাকবে না। এক সমাজে বাস করে এই ‘আমরা’–‘ওরা’ বিভেদে মানুষ যতদিন বিশ্বাস করবে, সরকারের ক্ষেত্রে ক্ষমতার রাজনীতি প্রয়োগ ততটাই সোজা হয়ে যাবে। তা সে ধর্মভিত্তিক হোক বা লিঙ্গভিত্তিক। যাঁরা মনে করছেন, এ-লড়াই আমাদের নয়, তাঁরা ভুল করছেন। আসলে সমাজের সব স্তরেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে গেলে একজোট হয়ে নামাটাই মূল নীতি। সহমর্মী সমর্থন কেবল সোশ্যাল মিডিয়া বা খাতায়-কলমে নয়, লড়াইয়েও জরুরি। অনেকেই সেটা করছেন, কিন্ত আরও অনেক বেশি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ মানুষের পাশে থাকলে তবেই লড়ে যাওয়ায় আরও বেশি স্ফুলিঙ্গের জন্ম হয়।




