প্রিয় সুবিমল: পর্ব ১২

‘কুড়ি মিনিটের খেলা’

শক্তি চট্টোপাধ্যায় এমন একজন মানুষ, যাঁকে সুবিমল বসাক বিশেষ পছন্দ করেননি কোনওদিন, আবার এড়িয়ে যেতেও পারেননি। সুবিমল, শক্তির থেকে ছ’বছরের ছোট, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ১৯৬৩ সালে। শক্তির সঙ্গে আলাপও সেই পর্বেই। শক্তি হাংরি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। একাধিক হাংরি বুলেটিনে বেরিয়েছে তাঁর লেখা। অথচ ১৯৬৪ সালে সুবিমলের সঙ্গে তাঁর যে প্রত্যক্ষ সংঘাত, তার নেপথ্যে হাংরিদের ক্রিয়াকলাপই।

মলয় রায়চৌধুরী পরবর্তীতে লিখেছেন, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় শক্তির চাকরি পাওয়ার শর্ত ছিল, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করতে হবে। তবে তা ছাড়াও, ১৯৬৪-র মে-জুন মাসে হাংরিদের বেশ কিছু কাজকর্ম শক্তি ও তাঁর সঙ্গীদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার একটি হল ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকা। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘Published distributed publicised, owned and pissed by Subimal Basak’— বিমল করকে দেওয়া, শক্তির কবিতা ছাপানো, সন্দীপনের চিঠির অংশবিশেষ তুলে ধরা— সব মিলিয়ে তুলকালাম ফেলে দিয়েছিল সাহিত্যজগতের এক অংশে। সুবিমলের ডাইরি থেকে জানতে পারছি (৩০.৫.৬৪), দেবী রায়কে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও তারাপদ রায় জিজ্ঞেস করছেন, হাংরিরা বিমল করের কাছে গিয়েছিল কি না এবং বিমল কর ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পেলেন কী করে। অতঃপর, দেবী রায়কে শাসানি। সুবিমলের টিপ্পনী— ‘আজ যখন কফিহাউসে ঢুকি বা এর আগে একদিন কফিহাউসের টেবিলে শক্তিকে দেখেছিলাম, আমার সঙ্গে কথাই বলেনি, কেমন যেন এড়িয়ে গেছিলো। ইতিপূর্বে যখনই দেখা হয়েছে কথা বলেছে, খবরাখবর জেনেছে— এরপর বলেন। ব্যাপারটা সিরিয়াস হয়ে উঠেছে। যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও বেশি।

আরও পড়ুন: ‘মলয়ের কাছেও তো আমার বিরুদ্ধে অনেকেই চিঠি লিখেছে’, বাসুদেব দাশগুপ্তকে চিঠিতে লিখেছিলেন সুবিমল বসাক! লিখছেন তন্ময় ভট্টাচার্য…

এর আগে একদিন (২২.৫) সন্দীপনের সঙ্গে সুবিমলের মোলাকাত— ‘রাত্রে সন্দীপনের সঙ্গে কফিহাউসে দেখা। বলল আমার চিঠিটা ছাপবেন না। যদি ছেপে থাকেন, প্লীজ ছিড়ে ফেলবেন। আমি বললুম ‘আচ্ছা দেখবো’।’ কী ছিল সেই চিঠিতে? ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকায় একাংশ তুলে ধরেছিলেন মলয়, সন্দীপনের নাম দিয়েই— ‘কৃত্তিবাস এখন হিকাড়েদের আড্ডাতেই দাঁড়িয়েছে। তবে শরৎবাবুর কেস এই যে উনি সুনীলের অবর্তমানে কাজ চালাচ্ছেন জেব্রা বের করার একটা চেষ্টা এবার করো।

ডাইরিতে, ৩১ মে-র এন্ট্রিতে লেখা— ‘…শক্তির ওপর অনেকে চটে। যে এককালে Hungry Generation-এর নেতৃত্বের পদ নিয়েছিল, সে যে এমন করবে ধারণা করা যায় না, Hungry-কে ‘ফাঁক-আউট’ করতে চাইছে।

সুবিমল-শক্তি দ্বন্দ্বে ফিরে আসা যাক। মলয় রায়চৌধুরী বিভিন্ন সাহিত্যিককে পোস্ট করে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকা ও ‘কুড়ি মিনিটের খেলা’ পাঠান। দ্বিতীয়টি হল একটি কাগজে সুবিমলের স্কেচ— দু’জোড়া পায়ের ছবি, ছ’টি ভিন্ন-ভিন্ন ব্লকে, বিভিন্ন মুহূর্তের। মিলন-পূর্ব, মিলনকালীন ও মিলন-পরবর্তী মুহূর্তের প্রতিফলন ওই স্কেচে। ‘কুড়ি মিনিটের খেলা’ বা ‘Twenty Minutes: A Play’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-সহ, পৌঁছেছিল শক্তির কাছেও। এ থেকেই বিতণ্ডা গড়ায় ও সুবিমলের গায়ে হাত তোলেন শক্তি, কফি হাউসের নীচে। এ-নিয়ে তৎকালীন সাহিত্যমহলের একাংশে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনাক্রম, সুবিমলের ডাইরি থেকেই পড়ে নেওয়া যাক—

১৮.৭.৬৪ (শনিবার)
… ফেরার সময় অফিস থেকে সরাসরি আমি চলে এলাম কফিহাউসে। যাবার মুখে ডানদিকে শক্তি বসে, বরীন পবিত্র ভিটু ওরাও বসে রয়েছে— বেলালও আছে। আমি বাঁদিকে এগিয়ে গেলাম।… হঠাৎ কোন থেকে শক্তি উঠে এলো। ওর স্বভাব মতো হাত তুলে নমস্কার করলো শরদকে। সবাই তখন উঠেছে, বাইরে যাবার জন্য। দেবী উঠতে তার চেয়ারে আমার পাশে বসে পড়লো। দেবীকে জিজ্ঞেস করলো— আমার বাসায় ঐ পত্রিকা কে পাঠিয়েছে। রাবিশ পত্রিকা— কে পাঠিয়েছে আমার বাসায়। দেবী বললো— আমি জানি না, মলয় পাঠিয়েছে। শক্তির মুখ থেকে গন্ধ বার হচ্ছে। কোনে ওর চেলাচামুন্ডারা বসে আছে, উন্মুখ। দেবীকে বললো— শুনে যান। দেবী বললো— আমি নিচে যাচ্ছি—বসার সময় নেই। পরে শুনবো— উঠে গেল। সবাই তখন যাচ্ছে। আমাকে বললো— সুবিমল, তুমি নিশ্চয়ই জানো— তোমার প্রতি আমি একটু অসন্তুষ্ট হয়েছি। তোমার সঙ্গে কথা বলিনি। আমি বললাম— হ্যা, দেখেছি। আমি তখন সোমনাথের চিঠিটা বার করবো ভাবছিলাম— দেখাবো এই বলে যে অনুবাদ হচ্ছে। কিন্তু বার করলাম না। শক্তি বললো— আমার ওখানে কেন পাঠিয়েছো— ঐ সব রাবিশ পেপার— পর্নোগ্রাফী ছবি দিয়ে। আমি বললাম— জানি না! বোধহয় মলয় পাঠিয়েছে। জানি না মানে— তুমি পাব্লিশার্স ও ডিস্ট্রিবিউটার। কেন, আমার ওখানে ওসব বই যায়। আমি বললাম, আমি পাঠাইনি। মলয়কে জিজ্ঞেস করুন। এমন সময় সুবো এল, ওকে দেখে বললো— কবে এলে? ভালো? মাথা নাড়ল উভয়েই। শক্তি চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে— আমি জানতে চাই। …তুমি কি তোমার মা’র কাছে পাঠাবে। আমার মা’র হাতে এই বই পড়েছে। সুবো আমায় বললো— তুমিও মা’র কাছে পাঠিয়ে দেবে। আবার বললো কেন পাঠানো হয়েছে। আমি বললাম— মলয় পাঠিয়েছে। চোখের দিকে চেয়ে— ‘আমি জানতে চাই?’ এবার বললাম— ওটা Complimatary হিসেবে পাঠানো হয়েছে। আপনার কবিতা ছিল। বলে উঠলো রেগে— না, আমার কবিতা নয়। ও কবিতা অন্য কারো কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। আমি বললাম— ওটা আপনার হাত থেকে নেওয়া হয়েছে। আপনি নিজে হাতে দিয়েছেন? বলল— না, আমি দিইনি। এবার দাড়াতে দাড়াতে বললাম— মিথ্যে কথা বলছেন? আপনার কাছে ঐ বই এসেছে কি না জানি না— সেটাও মিথ্যে কথা বলছেন? আমার হাত ধরে বলল— বসো! আবার চোখের দিকে তাকিয়ে— খুব চালাকী করছো। উঃ। আচ্ছা! তারপর সেই আবার বলেছি— মিথ্যে কথা। তখন হঠাৎ রেগে উঠে— আচ্ছা, দেন কাম ডাউন! বলে সোজা দ্রুত বেরিয়ে গেল!
আর সবাই বেরিয়ে গেছে। শৈলেশ্বর বলছিলো চলো-চলো। দেবী বলল— দাঁড়াও। তলায় গিয়ে দাঁড়ালো। শক্তি নিচে নেবে গেল—শক্তির সঙ্গে সঙ্গে তাদের দলের সবাই এক এক করে নেবে গেল। আমি প্রথমটা ভয় পেয়ে গেলাম, কেউ নেই— শুধু শরদ দাঁড়িয়ে। ব্যাপার কিছু না-বুঝতে পেরে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। আমার ব্যাগ কাগজ-পত্তর তার হাতে দিলাম— কিছু একটা ঘটবে, এ ব্যাপার সেই মুহুর্তে বুঝতে পারলাম। সিঁড়ি বেয়ে তলায় নাবতে দেখি, শক্তি চেঁচাচ্ছে— আসুক আসুক দেখে নেবো শালাকে। একটা ছাতা হাতে নিয়ে আস্ফালন করছে সে। বিটু ওর কাছ থেকে কেড়ে নিল জোর করে। বেলাল ওরা চেপে ধরছে। শক্তি হাত ছাড়িয়ে ওপারের ফুটপাথে গিয়ে বইয়ের দোকান থেকে একটা লোহার রড আনলো— সবাই কেড়ে নিল। আমি ততক্ষণে তলায় নেবে এসেছি। মুখেই জিগ্যেস করছে— কেন পাঠিয়েছো? আমি বললাম— পাঠাইনি। আবার চুপ। শক্তি পকেটে হাত রেখে ফুঁসছে ক্রমাগত। আসা-যাওয়ার পথে ভিড় জমে গেল, ফুটপাথের পাশে এসে দাঁড়ালো। শৈলেশ্বর এগিয়ে গেছে। সুভাষও পথে, সুবো ওরাও তাই। আমরা সবাই এগিয়ে যেতে লাগলাম। সংস্কৃত কলেজ পার করে গেছি, বাঁ দিকে বিল্ডিংটার কাছে পৌছুতেই আবার শক্তি ছুটে এল। এবার আরও বেশী ভিড়। সম্ভবতঃ শক্তিকে ওঁর চেলাচামুণ্ডারা উস্‌কেছে— কিছু করেনি বলে। শক্তি এগিয়ে গিয়ে পথ আগলে দাড়ালো। বেশ ভিড় জমে গেছে— গোলাকার। মাঝখানে আমি ও শক্তি। একদিকে ওরা সবাই। শক্তি হারাধনকে বলল— কি লিখছেন আজকাল? হারাধন বলল— উপন্যাস লিখছি। উপন্যাস? চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, শক্তি। আবার আমার কাছে এসে, কি জবাব দিচ্ছো না সুবিমল— কেন ঐ সব নোংরা বই আমার কাছে যায়। বদমাসী শিখেছ? I will crash you and your group। তারপর বলল—আমি জবাব চাই। শক্তি আমি মুখোমুখি। শক্তি হাত গোটাচ্ছে— আমি তিনবার বলব— জবাব দাও। ওয়ান…। আমি চুপ। আবার কিছুক্ষণ পরে জবাব চাইলো— দুই… আমি চুপ। আমার পাশে তখন দুদিকে বেলাল ও বিটু দাঁড়িয়ে— ওর চোখ কুঁচকে আসছে। উৎকট গন্ধ। তিন… বলেই এক থাপ্পড় কষালো। আমি লাথি ছুড়েছি তার আগেই ওরা দুজন আমাকে ধরে ফেলেছে। আর কিছু করলাম না। আমরা চাইছিলাম— শক্তি মারুক। আমরা সোজা চলে আসছি। ওরা কফি হাউসের দিকে। শক্তি হনহনিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে— ফিরে এসে শরদকে বললো শরদ তুমি কিছু মনে করো না please। আমাদের আবার পরে দেখা হবে। শরদ এলো আমার সঙ্গে। বাসুদেব আর সবাই এসে বললো— সুবিমল কিছু মনে করো না তোমাকে মারা মানে আমাদের মারা। আমার মুখ দিয়ে কোন কথা নেই। অপমানে লজ্জায় আমার শোচনীয় অবস্থা। বাসুদেব বললো এই থাপ্পড়টা আমার মুখে পড়লে হতো। সুভাষ শৈলেশ্বর সান্ত্বনা দিলো। দেবীও। দেবী বলল— কোলকাতায় বিমলকে কিছু মূল্য দিতে হতো। দিয়েছে। সুবো প্রতিবাদ করলো— আমি এটা মানি না।

ডাইরির পৃষ্ঠা, শক্তির সঙ্গে বিবাদ-সংক্রান্ত

এ-ঘটনা এতদিন বিভিন্ন লেখকের লেখায় উঠে এলেও, এই প্রথম ডাইরির সূত্রে খোদ সুবিমলের বয়ান প্রকাশ্যে এল। লক্ষণীয় পরের দিনের ডাইরির এন্ট্রিও (১৯.৭), যেখানে উপস্থিত শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবো আচার্য ও সুভাষ ঘোষ। সুবিমল লিখছেন— ‘… আমি ওদের শুধু বললাম— ডায়রি করে দিয়েছি শক্তির নামে। এ কথাটা নিশ্চয়ই প্রচার হবে বলেই জানিয়ে দিলাম। সুভাষকে গতকালের কথা জিজ্ঞেস করি, বললো অনেক কিছু ঘটে গেছে— পরে বলবো। শৈলেশ বললো— কফিহাউসে শক্তি নাকি ওদের পার্টি বলেছে— দেখবো কি করে H.G. বার হয়? আমরাও দেখছি।

‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-তে প্রকাশিত শক্তির কবিতাটির নাম ‘হৃদয় থেকে হৃদয়ে’। মজার বিষয়, পরের মাসেই অর্থাৎ আগস্ট ১৯৬৪-তে ‘Hungry Generation’ নামে একটি পত্রিকা বেরোয়, যেটি ‘শ্রী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক পরিকল্পিত’ ও ‘শ্রী শক্তি চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত’। সেখানে হাংরিদের বইতালিকায় শক্তির একটি বইয়ের নামও দেখা যায়— ‘অমল যোনির পানে’। অথচ আমরা জানি, এ-নামে শক্তির কোনও বই-ই নেই। এ কি নিছক হাংরিদের ষড়যন্ত্র, না এ-নামে সত্যিই কোনও বইয়ের পরিকল্পনা হয়েছিল?

শক্তির সুবিমলকে নিগ্রহ করা প্রসঙ্গে সমীর রায়চৌধুরীর একটি চিঠি (১৯৬৪) তুলে ধরা যেতে পারে—

প্রিয় সুবিমল? কেমন আছো? শুনলাম শক্তি নাকি তোমার ওপর বীরত্ব ফলানোর চেষ্টা করেছে। শালা ও তো একটা আস্ত হিজড়ে। কি ব্যাপার খুলে জানাবে।
   প্রীতি জেনো।

সমীরদা
২৩/৭

সমীর-শক্তির বন্ধুত্বের কথা সর্বজনবিদিত; এমনকী সমীরকে লেখা শক্তির একাধিক বন্ধুত্বসুলভ চিঠি পড়ারও সুযোগ পেয়েছি। সুবিমলকে লেখা চিঠিতে সমীরের এই মন্তব্য কি নিছক সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য? নাকি শক্তি হাংরি আন্দোলনের সংস্পর্শ ত্যাগ করার কারণে ক্রোধ? প্রশ্ন থেকেই যায়।

সুবিমলের ডাইরির প্রায় সব খণ্ডেই শক্তির প্রসঙ্গ রয়েছে। সব উল্লেখ করা অপ্রয়োজনীয়। তবে ১৯৬৫-তে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন সাক্ষী শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে সুবিমলের বিভিন্ন টিপ্পনী নজর কাড়ে। আশ্চর্যের এই যে, তিক্ততা থাকলেও, বিভিন্ন জায়গায় দেখা হতে উভয়ের মধ্যে কথাবার্তাও চলেছে। সময়ের সঙ্গে বোধকরি কমে এসেছিল সেই তিক্ততাও। সুবিমলের সংগ্রহে থাকা শক্তির একমাত্র চিঠিটি পড়ে সেই অনুমানই জাগে—

সুবিমল,

   আজ বা কাল আমাদের অফিসে সুদীপের সঙ্গে একটু দেখা করো। মানে হিন্দি কাগজের সুদীপ। আমার একটা ছোট্ট লেখা ওর কাছে আছে। তুমি যদি, দয়া করে একটু অনুবাদ করে দাও তো কৃতজ্ঞ থাকবো।
   ভালোবাসাসহ

শক্তিদা
২৭/৭/৭৭

সুবিমলের ডাইরিতে এই চিঠি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের কোনও উল্লেখ না-থাকায়, আমরাও আলোচনা বিস্তারে নিয়ে যেতে পারলাম না।

শক্তি-প্রসঙ্গ থেকে সরে, পরবর্তী ব্যক্তির চিঠির দিকে যাওয়া যাক। দ্রোণাচার্য ঘোষ। কবি ও বিপ্লবী। জন্ম ১৯৪৮-এ, প্রথম যৌবনেই উদ্বুদ্ধ হন নকশাল আদর্শে। ১৯৭২-এর ৭ ফেব্রুয়ারি, জেলখানায় পুলিশের অত্যাচারে মৃত্যু। সুবিমল বসাকের সংগ্রহে তাঁর দুটি চিঠি খুঁজে পেয়েছি। প্রথমটি মলয় রায়চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে লেখা। বস্তুত, মলয়কে লেখা হলেও, চিঠি পাঠানো হয়েছিল সুবিমলের ঠিকানাতেই।

প্রিয় মলয়বাবু,

   আপনাদের হাংরি জেনারেশনের আমি একজন অনুরাগী পাঠক। কিন্তু মফঃস্বলে থাকার জন্যে আপনাদের বইপত্র নিজের কাছে পাওয়া সম্ভব নয়। আমি হাংরি জেনারেশনের এ পর্যন্ত যা যা বইপত্র বেরিয়েছে— আমার নিজের সংগ্রহে থাকা ব্যতীত বাকিগুলো কিনতে চাই। অনুগ্রহ করে যদি লিস্ট পাঠান তবে খুবই অনুগৃহীত হবো। এবং কোত্থেকে গিয়ে সেগুলো সংগ্রহ করতে পারবো সেটাও জানিয়ে দেবেন।
   উপস্থিত আর কি, এখানেই শেষ করলাম হাংরি জেনারেশনের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে।

   ভালোবাসা সমেত

দ্রোণাচার্য ঘোষ
জয়পুর
মগরা
হুগলি
পশ্চিমবাংলা

চিঠিতে তারিখ লেখা না-থাকলেও, পোস্ট অফিসের স্ট্যাম্প দেখে বোঝা যায়, ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে এ-চিঠি লিখেছিলেন তিনি।

দ্বিতীয় চিঠিটি সরাসরি সুবিমল বসাককেই লেখা, ১৯৬৮-র জানুয়ারি মাসে—

   আপনার পোস্টকার্ড পেলাম। কিন্তু চিঠিটার সমস্ত শব্দগুলো পড়ে ফেলবার পর গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি— বর্তমানে আমার পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যা বের হওয়ার আশা সুদূর পরাহত— তিনমাস পরেও বেরোতে পারে, আবার তিনবছর হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। যেহেতু সর্বসাকুল্যে কারণ মাত্র একটাই— আর্থিক সমস্যা। তবে কয়েকদিনের মধ্যে অন্য পত্রিকায় ঐ বিজ্ঞাপন দিয়ে দেবার চেষ্টা করবো, আশা করি তাতে আপত্তির কিছু নেই আপনার।
   আপনি নতুন কবি-লেখকদের কিছু ঠিকানা পাঠাতে বলেছেন, আমার জানা ঠিকানা কটা দিলাম—
X ১) পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। ১৩সি, ঘোষ লেন। কলকাতা – ৬
২) গৌতম দাশগুপ্ত। ৫৫/৫ কালীচরণ ঘোষ রোড। কলকাতা – ৫০
৩) অমিতাভ গুপ্ত। ২০২-এ, কে.সি. ঘোষ রোড। কলকাতা – ৫০
৪) মদনমোহন বিশ্বাস। সিমলা। সুগন্ধা। হুগলি।
৫) গৌতম মুখোপাধ্যায়। ৭ডি, হরেকৃষ্ণ শেঠ লেন। কলকাতা – ৫০
X ৬) শুভঙ্কর ঘোষ। সাউথ স্টেশন রোড, আগরপাড়া। ২৪-পরগণা
X ৭) শ্যামসুন্দর দত্ত। ৪৬, গৌরীবাড়ি লেন। কলকাতা – ৪
৮) অঞ্জন কর। c/o নিউ মেডিকেল স্টোর। পো:- রহড়া। ২৪-পরগণা
X ৯) সুবিমল মিশ্র। ১৭, দূর্গাপুর লেন। কলকাতা – ২৭
X ১০) দীনেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১/এফ বীরপাড়া লেন। কলকাতা – ৩০
১১) দীপঙ্কর ঘোষ। c/o আনন্দচন্দ্র ঘোষ। জয়পুর। মগরা। হুগলি
    তবে ওপরের কজনের মধ্যে একমাত্র পার্থপ্রতিম, দীপঙ্কর ও অঞ্জন ছাড়া আর কেউ হাংরী টাইপের কবিতা কখনো লেখেনি। আর যে-কজনের নামের আগে ঢ্যারা (X) চিহ্ন দিয়েছি সে কজন কবিতা ছাড়া গল্পও লেখে।
   আপনি কি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র জন্যে আপনাদের হাংরী জেনারেশনের মতন লেখা চাইছেন, না সমস্তরকম মিলিয়ে? ‘আধুনিক’ শব্দটা বড্‌ডো বেশি গোলমেলে এবং ব্যক্তি বিশেষের কাছে তার অর্থও দাঁড়ায় ভিন্ন— তাই আমার এ প্রশ্ন। আর সেইজন্যেই কবিতা পাঠাতে ভরসা পেলাম না, আপনার উত্তরের ওপর নির্ভর করছে কবিতা পাঠাবো, কি, না। যেহেতু আমি হাংরী জেনারেশনের মতন কবিতা লিখিনি। আশা করি উন্নাসিক, বা, অন্য কিছু ভাবছেন না! আমার পরিস্থিতিতে পড়লে হয়তো আপনিও এই একই প্রশ্ন করতেন— তাই না?
   যাক্‌, চিঠির উত্তর তাড়াতাড়ি পাঠাবেন আশা করি; আর হ্যাঁ, ‘জেব্রা’ ১-ম সঙ্কলন ও ২-য় সঙ্কলন পারেন যদি এক কপি এক কপি অর্থাৎ মোট দু’কপি পারেন যদি (সম্ভব হলে) পাঠাবেন।
   সবশেষে আপনাদের জেনারেশনের জন্য ও আপনাকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি শেষ করলাম।
   নমস্কারান্তে—

দ্রোণাচার্য ঘোষ

দ্রোণাচার্য-সম্পাদিত পত্রিকাটির নাম ছিল ‘সুন্দর’। চিঠির প্রথমাংশ পড়ে বোঝা যায়, ওই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন হিসেবে কিছু ছাপতে দিয়েছিলেন সুবিমল। ‘জেব্রা’— মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত পত্রিকা।

এই চিঠি লেখার সময়ে সুবিমলের সঙ্গে দ্রোণাচার্যের প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না। পোস্ট অফিসের স্ট্যাম্প দেখে বোঝা যায়, ৪ জানুয়ারি চিঠিটি পোস্ট করা হয়েছিল। অন্যদিকে, সুবিমলের সঙ্গে দ্রোণাচার্যের মুখোমুখি আলাপ ৯ জানুয়ারি। কলেজ স্ট্রিটে সাহিত্যিকদের প্রতিবাদসভা, হাজির দ্রোণাচার্যও। কীসের প্রতিবাদ? ইতিহাসের স্বার্থে, সুবিমলের ডাইরি থেকে সেই অংশটুকু তুলে ধরা হল—

৯ জানুয়ারি ১৯৬৮
কফিহাউসে গেলাম। আজ সাহিত্যিকদের প্রতিবাদ সভা স্টুডেন্টস্‌ হলে। আমাদের আর কাউকে দেখলাম না। একাই গেলাম। এটার আয়োজন মার্ক্সিস্ট (রাইট)। রাজনীতি আমি স্পষ্ট বুঝি না, তাছাড়া আমার ভালো লাগে না। এখানে আসায় খেয়োখেয়ি ল্যাং মারামারি এবং নোংরামি গুলোর মুখোমুখি থাকতে হচ্ছে। কফিহাউস থেকে নক্সালবাড়ির লোকেরা এখন গায়েব। ওরা এক্সট্রিমিস্ট— তাই বলা হয়, হাংরিদের ১টা শাখা। রাইট-রা আমাদের উপর তবু বা সমর্থিত। যদিও রাজনীতিটা আমাদের কোন ব্যাপার নয়— সাহিত্যই মূল পয়েন্ট। স্টুডেন্টস্‌ হলে অনেক কবি-লেখককে দেখা গেল। শম্ভু ছিল, ও এসেছে। ব্লুজ বিলি করে কিছু কিছু। এখনও সেই বোকামিটা তার রয়েছে। নক্সালবাড়ী কেটে বেরুবাড়ী করতে বলে দিলাম। দ্রোণাচার্য ঘোষের সঙ্গে আলাপ হলো, থাকে মগরায়। এবং এখন আমাদের ইয়োংগ কবি-লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটাতে হবে।

সেই আলাপ-যোগাযোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দ্রোণাচার্য ঘোষকে কারাগারের ভেতরেই পুলিশ মেরে ফেলেছিল। রাষ্ট্রীয় হত্যা…

(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য