বাংলার বাইবেল: পর্ব ৩

Representative Image

বাতিল নীল নকশা

বাইবেল অনুবাদ করা এক জিনিস, আর সেটিকে অনুবাদ করে বই হিসেবে বের করা অন্য চ্যালেঞ্জ। কাগজ, কলম, ভাষাজ্ঞান আর মনের জোর থাকলে প্রথমটা হয়ে যায়। দ্বিতীয়টার জন্য পুঁজির জোর লাগে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতে এবং কলকাতায়, একটি ছোট বই ছাপিয়ে বের করাও বেশ খরচসাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। পরেও যে তা খুব সুলভ হয়েছে, তা নয়। হয়তো নানান সংস্থার আর্থিক আনুকুল্যে বিভিন্নরকমের ভর্তুকির কারণে পাঠকের হাতে স্বল্পমূল্যে এমনকী বিনামূল্যেও মুদ্রিত বস্তু এসে পৌঁছেছে; কিন্তু মুদ্রণমূল্য বরাবরই চড়া। তাই এখন যেটাকে অ্যাডভান্স বুকিং বা প্রি বুকিং বলে, দুশো বছর আগে তা বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রায়ই লেখক বা প্রকাশকরা আগাম বুকিং-এর মাধ্যকে একটা প্রাথমিক খরচ তুলে নিয়ে বই ছাপানোর কাজে হাত দিতেন। বাংলা বাইবেলের ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম খাটে।     

বাংলা বাইবেল-সংক্রান্ত প্রথম বিজ্ঞাপনটি আমারা পাই ১৭৮৩ সালের ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া গেজেট’ পত্রিকায়। বেশ রহস্যের ঢঙে লেখা সেই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলায় ধর্মগ্রন্থ (স্ক্রিপচার্স) অনুবাদে কেউ আগ্রহী এবং যোগ্য হলে, তাঁকে আর্থিক সাহায্য করা হবে। উত্তর আরও রহস্যজনক। জনৈক এ-বি-সি জানান তিনি মূলত ফার্সি অনুবাদে আগ্রহী, তবে যোগ্য নেটিভ-সহায়তা পেলে তিনি বাংলাতেও করে ফেলতে পারেন; যদিও ভাষাটি তাঁর তেমন রপ্ত নয়। দ্বিতীয় উত্তরটি অনামী নয়। রেভারেন্ড জনসন কলকাতায় কোম্পানির পাদ্রী হয়ে এসেছিলেন, সেন্ট জন্স চার্চ পত্তন করেছিলেন আর সর্বোপরি বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস ও বাবু নবকৃষ্ণ দেবের কাছের লোক হিসেবে বেশ প্রভাবশালী মানুষ হিসেবে নিজেকে কলকাতার ইউরোপীয় মহলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি চিঠি লিখে জানান, বিজ্ঞাপনের প্রস্তাবটি উত্তম, তবে তিনি বিজ্ঞাপনদাতার পরিচয় জানতে আগ্রহী— যাতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে বিশদে আলোচনা করতে পারেন। প্রভাবশালী মানুষের ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার আগ্রহ এখন যেমন ভাল খবর নয়, সেকালেও ছিল না। ফলে, এই উত্তর পাওয়ার অল্পদিনেই বিজ্ঞাপনদাতা প্রথমে কলকাতা ও পরে দেশ ছাড়েন।    

ব্যাপ্টিজম শব্দের অনুবাদ নিয়ে চলেছিল জোর তর্ক! পড়ুন: বাংলার বাইবেল পর্ব : ২

ব্যাপারখানা কী? পরিচয়গুলো যেহেতু এতদিনে মোটামুটি স্পষ্ট হয়েছে, তাই বলে দেওয়াই ভাল। বিজ্ঞাপনদাতা এক আজব মানুষ। তাঁকে নিয়ে ভাল-মন্দ মিশিয়ে গল্পের শেষ নেই। তিনি প্রথমে খেলোয়ার, পরে পাটোয়ার, এবং শেষে মিশনারি হতে চেয়ে অবশেষে ডাক্তার হয়েছিলেন। জন শোরের একটি বক্তৃতায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কোম্পানির জাহাজে ডাক্তার হিসেবে কলকাতায় আসেন। ১৬৯৮-তে প্রকাশ করা রাজা তৃতীয় উইলিয়মের আমলে একটি আইন অনুযায়ী যে-কোনও প্রাচ্যগামী বাণিজ্যপোতে দু’জন মানুষ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। ডাক্তার আর পাদ্রি। সমুদ্রপথে প্রয়োজনমতো প্রথমজন ইহলোকের কাজ মিটিয়ে দিলে, দ্বিতীয়জন যাতে পরলোকের কাজ সেরে দিতে পারেন। এই ইহলোক-পরলোকের গরমিল বাদ দিলে, দু’জনের দু’জায়গায় ভয়ানক মিলও ছিল। এক, নাবিকদের দু’জনের একজনকেও সহ্য করতে পারত না; আর দুই, একবার জাহাজ বন্দরে ভিড়ে গেলে, না ছাড়া পর্যন্ত এঁদের দু’জনের কারওরই কোনও কাজ থাকত না। অনেক পাদ্রি, যাঁরা প্রায়ই জাহাজের সঙ্গে আসতেন-যেতেন, তাঁরা কলকাতায় নানারকমের ব্যবসা জমিয়ে প্রচুর টাকাপয়সা রোজগার করেছিলেন। এই নিয়ে বিলেতে সমালোচনাও হয়েছিল প্রচুর।      

সমালোচনা আমাদের বিজ্ঞাপনদাতাও করেছিলেন। এ-দেশে বসেই। জাহাজ খেজুরিতে নোঙর করলে তিনি কলকাতায় চলে আসেন, সেখানকার বসবাসকারী ইংরেজদের ‘অনাচার’ ও ধর্মের প্রতি উদাসীনতা দেখে বিচলিত হন। তিনি দেখেন কলকাতার ইউরোপিয়ানদের মধ্যে ধর্মের অভাব। আর তা ঠিক করতে ধর্মের কাজে তাদের এগিয়ে আসতে হবে। দেশীয়দের মধ্যে খ্রিস্টের বাণী প্রচার করার উদ্যোগ নিতে হবে। অতএব বাইবেল অনুবাদই পথ, ফলত বিজ্ঞাপন। তিনি ব্যাপ্টিস্ট সোসাইটির সদস্য হলেও নিযুক্ত মিশনারি নন। প্রথাগত ধর্মীয় ট্রেনিং-ও তাঁর ছিল না। সার্জেন ছিলেন। তাঁর বয়ানে, তিনি বার দুয়েক যিশু খ্রিস্ট ও মাতা মেরির দর্শন পেয়েছিলেন— তাও জ্বরের ঘোরে। উপরোক্ত কোনওটাই বাইবেল অনুবাদে জড়িয়ে যাওয়ার খুব স্বীকৃত যোগ্যতা নয়। খামখেয়ালিপনা ছিল তাঁর স্বভাবের গুণ, আর অস্থিরতা ছাড়া কিছুতেই তিনি স্থির নন। অথচ তিনিই হয়ে উঠলেন বাংলা বাইবেলের ভগীরথ। 

কলকাতায় তাঁর কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনা ইউরোপীয় মহলে যুগপথ কৌতুক, কৌতূহল ও প্রবল বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছিল। ন্যায়নীতির কথায় তিনি লঘু-গুরু জ্ঞান হারাতেন। তাই বিজ্ঞাপন বেরোতে জনসন আন্দাজ করেছিলেন এ সেই অত্যুৎসাহী ব্যাপ্টিস্ট পুঙ্গবের কীর্তি। হতে পারে ইউরোপীয়দের বিরক্তির খানিকটা আঁচ টমাসও পেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, একজন খুব প্রভাবশালী অ্যাংলিকাল তাঁর সাথে দেখা করতে আসছেন, এটা প্রচ্ছন্ন হুমকি। গডফাদারের ভাষায় যাকে বলে, তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার নয়। অতএব, আপাতত ফিরে যাওয়াই মঙ্গল। 

বিজ্ঞাপনের প্রথম উত্তরদাতার পরিচয় এখন নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া হয়, উইলিয়ম চেম্বার্স। মার্শম্যানও তাই মনে করেন। চেম্বার্স সুপ্রিম কোর্টের নোটারি ছিলেন, ভাল ফার্সি জানতেন, আর প্রথমে ফার্সিতেই বাইবেল অনুবাদ করবেন ভেবেছিলেন। বাইবেলের ফার্সি অনুবাদ বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে ঔপনিবেশিক অনুবাদকদের তালিকায় আমি ওঁর নাম দেখেছি, ১৭৯৩ সালে তিনি মথি-র ১-১৩ অনুবাদ করেছিলেন গ্রিক থেকে। বাংলাতেও করবেন ভেবেছিলেন। মুন্সি হিসেবে রামরাম বসু ওঁরই আবিষ্কার, যিনি বাংলা বাইবেলের গোড়ার দিকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রায় সকলেরই মুন্সি হয়েছিলেন। ওই বিজ্ঞাপনের পর পরই জন টমাস ফিরে যান। তবে চিরতরে নয়। আবার তিনি আসেন ফিরিয়া। ইতিমধ্যে আরও কয়েকবার নানারকম দর্শন ইত্যাদি পান, এবং অবশেষে যখন আসেন, তখন ঠিক করেন পাকাপাকিভাবে থাকবেন আর বাইবেল অনুবাদ করবেন। কিন্তু কলকাতায় তাঁর থাকা হয় না দীর্ঘদিন। সম্মিলিতভাবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় এমন জায়গায়, যেখানে তিনি কোণঠাসা ও একা হয়ে পড়েন। মালদার নীলকুঠি।      

আঠারো শতকের শেষে মালদায় আর লাগোয়া দিনাজপুরে ছিল নীল চাষের রমরমা। তবে বাকি নীল অঞ্চলগুলির সঙ্গে এর একটা পার্থক্য ছিল। এখানে যৌথ মালিকানা ছিল কম ও ব্যক্তি মালিকানা বেশি। আর এসবের শীর্ষে ছিল প্রবল প্রভাবশালী পুঁজিপতি ও জবরদস্ত প্রোটেস্ট্যান্ট চার্লস গ্রান্ট। সারা মালদা তখন গ্রান্টের নামে কাঁপত। উডনি, এলার্টন ইত্যাদি নীল প্রভুরা ছিল তাঁর কাছের লোক, যাকে বলে ভিতরবৃত্তের লোক। এই সুবিশাল প্ল্যান্টেশনগুলোয় প্রভুরা রাজা-বাদশার মতো দিন কাটাত। তাদের কথাই ছিল আইন। এছাড়া অন্য কোনও আইনের তোয়াক্কা করত না তারা। তাদের নিজস্ব অশ্বারোহী সৈন্য ছিল, যার সাহাজ্যে পুরো এলাকায় শুধু তাদেরই নিয়ম লাগু হত। আর না মানলে গরিব-নিরক্ষর শ্রমিকদের ওপর চলত তীব্র অত্যাচার। চার্লস গ্রান্টের অত্যাচার ছিল সুবিদিত। গম্ভীরা গান আছে সেই নিয়ে— 

‘আর ওদিকে চালসা গ্যাটা পিঠির ছাল ছাড়্যায়াছে
মাঠের চুয়া কাটার হিসেব লিয়্যাছে’ 

এই প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারগুলিতে ধর্মপ্রচারকরা আশ্রয় পেতেন। তাদের কাজ ছিল রবিবার করে পরিবারদের খ্রিস্টের বাণী শোনাতেন; আর বাকি সময়ে মোটামুটি মুখ বন্ধ রাখা। সেরকমভাবেই ১৭৯৫-তে মালদায় উডনিদের পরিবারে এসে পড়লেন আমাদের বিজ্ঞাপনদাতা। জন টমাস। মুখ বন্ধ রাখতে না পারা আর সেই হেতু বিপদে পড়াই যাঁর স্বভাব। আসার পর পরই তিনি রবিবার ছাড়া বিকি দিনগুলিতে সেখানকার শ্রমিক আর কৃষকদের কাছে প্রচারের কাজ শুরু করেন, আর সেই নিরিখে শুরু হয় তাঁর বাইবেল অনুবাদের কাজ— ছোট-ছোট করে। টমাসের অনুবাদ কেউই পছন্দ করেননি। তখনও নয়, পরেও নয়। তাঁর বিশেষ কিছু নেইও, ওই একটি পঙ্‌ক্তি ছাড়া, যা তাঁর জীবনীকাররা উদ্ধৃত করেছেন। ওই ‘পাপের গোনা মিরতু, কিন্তু খোদার দেয়া প্রমাই’ ইত্যাদি।

১৮১৯ সালে ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত এলার্টনের দ্বিভাষিক গসপেল-এর একটি পৃষ্ঠা।

মজার কথা হচ্ছে, জন টমাস যখন এই আজব পিজিন ভাষায় ছোট-ছোট অনুবাদ করে তার নেটিভ শ্রোতাদের বিলোচ্ছেন আর তাদের আগ্রহী রেসপন্সের কথা জার্নালে লিখে রাখছেন, ঠিক তখনই তাঁর পাশের কুঠিতে জন এলার্টনও বাইবেল অনুবাদ করছিলেন। এলার্টন ছিলেন ঠিক টমাসের বিপরীত। মনেপ্রাণে অ্যাংলিক্যান এলার্টন ব্রিটিশ কোম্পানির কাছের লোক ছিলেন। পেশাদার নীল সাহেব। ব্যাপ্টিস্টদের মতো প্রয়োজনের তাগিদে নীল ব্যবসায় নামেননি। তিনি দীর্ঘদিনের নীল ব্যবসায়ী। মার্টিনের নীল ব্যবসা-সংক্রান্ত বইতে বার বার ‘গোয়ামালতীর এলার্টন সাহেব’-এর কথা এসেছে। অর্থাৎ নীলকর মহলে তাঁর ভালমতো পরিচিতি ছিল। গোয়ামালতী নীলকুঠিতেই প্রথম কেরি আশ্রয় পেয়েছিলেন, মদনাবাটীতে নিজে কুঠি খোলার পুর্বে। এলার্টন অবশ্য শুধ্য গোয়ামালতী নয়, মালদা-দিনাজপুর অঞ্চলে সতেরোটি নীলকুঠির মালিক ছিলেন— ভোলানাথ, শিবগঞ্জ, কালিয়াচক, মণিহারি। তিনি পূর্ণিয়া আর দিনাজপুর অঞ্চলের নীল চাষের পার্থক্য নিয়ে একাধিক রিপোর্ট লিখেছিলেন। ধান চাষের তুলনায় নীল চাষের সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা নিয়েও তাঁর লেখা ছিল— অবশ্যই স্বজাতীয় ব্রিটিশদের এই ব্যবসায় নামার আগে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে।  

যাই হোক, এই এলার্টন বাইবেল অনুবাদেও হাত দিয়েছিলেন, এবং অনেকটা এগিয়েওছিলেন। পরে কেরি বাইবেল অনুবাদের কাজে হাত দিলে তিনি থামিয়ে দেন। যদিও তাঁর অনুবাদ করা অংশগুলি ১৮১৯ সালে ব্যাপ্টিস্ট মিশন থেকে প্রকাশিত হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, একই জায়গায় একই সময়ে থেকে টমাস আর এলার্টনের অনুবাদের ধরনের পার্থক্য। এলার্টনের বাংলা জড়তাপূর্ণ, কিন্তু সেটা পণ্ডিত মুন্সির থেকে শেখা ভাষা। নতুন শেখা ভাষার সতর্ক ব্যাকরণ-নির্ভরতার যত্নের ছাপ তাঁর শরীরে। টমাসের মুন্সি থাকলেও তাঁর ভাষাটি একেবারে যুক্তবেণির মতো পাশাপাশি থাকা হিন্দু-মুসলমান মানুষের যৌথ যাপনের দ্বারা তৈরি মুখের ভাষা। এ-ভাষা তিনি তুলছেন তাঁর বাগানের শ্রমিক-কৃষকদের মুখের কথা থেকে। তাদের সত্যপীরের গান, মাতাম গান বা অষ্টক গানের পদ থেকে, তাদের মুখের ভাষা থেকে। নাহলে একই বাক্যে ‘গোনা’ ও ‘প্রমাই’-এর মতো লোকায়ত শব্দের ব্যবহার তাঁর আগে বা পরে কেউ করেননি, বাউল-ফকিরদের পদ বাদ দিলে। ব্যাপ্টিস্টরা পরে মুসলমানি বাংলায় আলাদা বাইবেল প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ তাদের মতে, আগেরটা হিন্দু বাংলা ছিল। কেরি হিন্দু-মুসলমানের বাংলা আলাদা করে বুঝেছিলেন। টমাস-ই তা এক করে, মিলিয়ে দেন। আজ বিভিন্ন বাংলা সাহিত্যের বইতে তাঁর অনুবাদের দুর্বোধ্যতা নিয়ে ঠাট্টা করার আগে তাঁর প্রচেষ্টার স্পিরিটটাকে, তা সে যতই আড়ষ্ট হোক, মান্যতা দিতে হয়।    

উল্লেখ্য, তাঁর অনুবাদ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বহুবার। সেই প্রচেষ্টা সফলও হয়েছে। টমাসের অনুবাদ নেই। বলা হয়েছে, এলার্টনের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় এই কাজে তিনি হাত দিয়েছেন। বার বার চেষ্টা করেও টমাস যখন তাঁর অনুবাদ প্রকাশ করতে পারলেন না, উলটে তৎকালীন প্রোটেস্ট্যান্ট সমাজের চক্ষুশূল হলেন, তখন তিনি ইংল্যান্ডে গেলেন আর সঙ্গে করে নিয়ে এলেন উইলিয়ম কেরিকে। ব্যাপ্টিস্ট লেখালেখিতে টমাস হলেন জন দ্য ব্যপ্টিস্ট, আর কেরি হলেন খ্রিস্ট। কিন্তু কেরিও এদিক-ওদিক ঘুরে এসে থিতু হলেন মদনাবাটীর নীলকুঠিতে। পাশাপাশি টমাস-ও মহিপাল কুঠিতে এসে ব্যবসা খুলে বসলেন। ফলে ১৭৯৫ থেকে ১৭৯৯ অব্দি মালদায় এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হল। একের পর এক নীলকুঠি, আর সেগুলিতে কেউ-না-কেউ বাইবেল অনুবাদের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নীল হয়ে উঠেছিল বাইবেল ছাপার পুঁজি সমস্যার সমাধান। ১৭৯৮-এর ১ মার্চ কেরি লিখছেন তাঁর সোসাইটিকে, ‘আমি মালদায় এক নীলকুঠি দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়েছি— ঈশ্বরের আশীর্বাদে এক প্রবল অবলম্বনের দরজা আমাদের সামনে খুলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’ আবার পরের মাসেই লিখছেন, ‘আমার আর ভবিষ্যতে কোনও সাহায্য না পেলেও চলবে। আমি আমার উপার্জনের একটি অংশ বাংলা বাইবেলের মুদ্রণের জন্য সরিয়ে রাখছি।’

তবে এই নীল-নির্ভরতায় এক নতুন সমস্যার উদয় হয়। নীল ছিল মনোপলি ব্যবসা। এই অঞ্চলে মিশনারিদের এত প্রবল উপস্থিতি মূল প্রোটেস্ট্যান্ট কোম্পানি বণিকদের না-পসন্দ। তাঁরা নানারকম অসুবিধে সৃষ্টি করতে শুরু করে। কেরি এমনিতেই নানান অসুবিধের মধ্যে ছিলেন। প্রতিকূল আবহাওয়া, স্ত্রীর অসুস্থতা, পুত্রের মৃত্যু। শিশুবয়সে অকালে ঝরে যাওয়া পিটারের দেহ আজও সেই নিভৃত ভূমিতে নীরবে একাকী শায়িত। তাঁর ওপর বাংলার শাশ্বত শিউলির ফুল ঝরে পড়ে শরত এলে। শীতের হাওয়া করুণ সুরে বয়। ঈশ্বরেরও বুঝি অভিপ্রায় ছিল না, এই নীলের মতো পাপের টাকায় তাঁর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছয়। অচিরেই কেরি মালদা ছাড়েন শ্রীরামপুরের উদ্দেশ্যে, সঙ্গে নিয়ে যান কাঠের মুদ্রণযন্ত্রটিও; যেটিকে গঙ্গায় কাপড় চাপা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে নদীর দু’দিকে লোক জড়ো হয়ে প্রণাম করে বলতেন, ওই বিলিতি দুর্গা যাচ্ছে। তাঁর শক্তির প্রকাশ অচিরেই মানুষ দেখবে। টমাস চলে যান নবদ্বীপ। আর নীল বাগানগুলিকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাইবেলের বাংলা অনুবাদের এই আদি পর্বটিও চলে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।