সোসাইটি বনাম সোসাইটি
১৮১২। চৈত্রের মধ্যগগনে তীব্র তেজদ্দীপ্ত রবি। আর খ্যাতির মধ্যগগনে শ্রীরামপুর প্রেস। ষোলোটির ওপর ভারতীয় ভাষায় ধর্মগ্রন্থ— যার মধ্যে আছে বাইবেল, পুরাণ, কোরান, রামায়ণ-মহাভারত, বেদ-উপনিষদ, ব্যাকরণ, অভিধান থেকে কোর্টের ফর্ম ও কলেজের প্রশ্নপত্র। সবই ছাপছেন তাঁরা। কাগজ, কালি, ফন্ট— সব নিজেদের। আর সব দেশি হওয়ায় খরচও কম। তাই সব কাজই এসে পৌঁছয় শ্রীরামপুরে। রীতিমতো ‘ইন্ডাস্ট্রি’। আর তাতেই লাগল আগুন। লাগল, নাকি লাগানো হল কে জানে! তবে সে আগুন ভয়ানক! কাগজ-কালি, আঠা, বোর্ড— সমস্তটা মিলিয়ে গুদামঘরে এক জতুগৃহ তৈরিই ছিল। স্ফুলিঙ্গ পড়তেই প্রায় সব ছাই। তবে ফন্ট নষ্ট হলেও, ফন্টের ছাঁচ বেঁচে গিয়েছিল। আলাদা বাড়িতে থাকায়, বেঁচে গিয়েছিল ঐতিহাসিক মুদ্রণ যন্ত্রটিও। প্রাণহানিও সেরকম হয়নি। আর বেঁচে গিয়েছিল বাংলা গদ্য।
আরও পড়ুন: কীভাবে কলকাতা হয়ে উঠল ‘গির্জানগর’? লিখছেন রামিজ আহমেদ…
শ্রীরামপুর ও ফোর্ট উইলিয়ামের জোড়কলমী শৈলীর চোরাস্রোতে আটকে পড়ে সে খাবি খাচ্ছিল। ফলে বাঙালিরা অনেকেই খুশি হয়েছিলেন। তবে সে খুশি কিছুই নয়, যতটা খুশি ব্যাপ্টিস্ট সোসাইটির কেষ্টবিষ্টুরা হয়েছিলেন তাঁর তুলনায়। মানে ইংল্যান্ডে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের মাথারা, যাঁরা শ্রীরামপুর-ত্রয়ীর স্বাধীন কার্যকলাপে ক্রমেই তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্থানীয় প্রভাবের সামনে, চুপচাপ থাকা ছাড়া কোনও রাস্তা পাচ্ছিলেন না। বিশেষ করে কোম্পানির সঙ্গে কেরি সাহেব নিজগুণে এমন এক সুসম্পর্ক বানিয়ে নিয়েছিলেন, যা অবিশ্বাস্য। এমনিতে কোম্পানির লোকজনদের সঙ্গে এই সব ডিসেন্টর মিশনারিদের সম্পর্ক ছিল আদায়-কাঁচকলায়। ইংল্যান্ডে শ্রেণিবিভাজন ছিল ভয়ানক। এখানকার বর্ণব্যবস্থার থেকে কম কিছু নয়। তাই বড়-বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে আসা কোম্পানির বড়সাহেবদের কাছে সমাজের নিম্নবর্গ থেকে উঠে আসা এই সব প্রচারকরা ছিলেন এক উটকো অশান্তি। এঁদের ধর্মবোধ, বাইবেল-শিক্ষা, ভাষা ক্ষমতা সর্বোপরি সেই সব নবলব্ধ বিদ্যে চটজলদি নেটিভদের ওপর ‘প্রয়োগ’ করার ব্যাগ্রতা দেখে তাঁরা প্রমাদ গুনতেন। তবে, কেরিকে তাঁরা শ্রদ্ধা করতেন। তাই অগ্নিকাণ্ড অনেকের কাছেই খুশির কারণ হয়েছিল। অবশ্যই কেরি ছাড়া। তিনি সে-সময়ে শ্রীরামপুরে ছিলেন না। ছিলেন কলকাতায়। খবর নিয়ে যান মার্শম্যান। শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন কেরি। তারপর ধীরেসুস্থে পরের কার্যপ্রণালী ঠিক করে নেন।

উদ্বিগ্ন কেরি চিঠি লিখলেন তাঁর পেরেন্টবডিকে, আর জানিয়ে দিলেন এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা। জানান, তাঁদের এতদিনের সাজানো সাম্রাজ্য প্রায় ছাই হয়ে গেছে। একে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা অসাধ্যকর। কারণ, একে প্রবল অর্থের প্রয়োজন, পাশাপাশি তাঁদের আগের বয়স-উদ্যমও আর নেই। এমতাবস্থায় কী করণীয়, তা যেন সম্পাদকমণ্ডলী তাঁদের জানায়।
তবে কেরি শুধুমাত্র ব্যাপ্টিস্টদের জানিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড নানা জায়গায় এই বিষয়টি জানিয়ে লেখালেখি করেন। যা টাকা ওঠে, তা আশাতীত। কিছু বছরের মধ্যেই শ্রীরামপুর তাঁর আগের চেয়েও পোক্ত পরিকাঠামো তৈরি করে ফেলে এবং প্রচুর বই, গ্যাজেট ইত্যাদি ছাপায়। শেষাবধি প্রায় চুয়াল্লিশটি ভাষায় বাইবেল প্রকাশ করে শ্রীরামপুর মিশন। পুড়ে যাওয়া প্রেসটি অনেক বড় করে পুনরায় নির্মিত হয়। কিন্তু যা তাঁরা হয়তো আন্দাজ করেননি, তা হল এই বিশাল প্রকাশনা সাম্রাজ্য তাঁদের আরেক বিশাল আন্তর্জাতিক পুঁজিপুষ্ট প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল। ফলে বিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেই প্রতিষ্ঠান— আন্তর্জাতিক বাইবেল সোসাইটি ও তার স্থানীয় শাখা, যাকে ক্যালকাটা অক্সিলিয়ারি বলা হত। শুরুতে অবশ্য বিরোধ ছিল না। ছিল সহযোগিতা ও সহাবস্থান। ফান্ডিং সম্পর্কে কেরির গভীর অন্তর্দৃষ্টি ছিল। ফান্ডের প্রয়োজনও ছিল একটানা। তার উপায়ও ছিল, কিন্তু সময়-সুযোগ মতো আবেদন করে সেগুলোকে আনা এবং তার সদ্ব্যবহার করে সেই নথি প্রস্তুত রাখা— এই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে কেরি ছিলেন দর।

সারা পৃথিবীতে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে খ্রিস্টিয় ধর্মগ্রন্থ ও অনুদিত বাইবেল তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে ব্রিটিশ ও মার্কিন বাইবেল সোসাইটি স্থাপিত হয় ১৮০৪ সালে। তাঁরা নিজেরা অনুবাদ করবেন, আর যেখানে আগের থেকেই অনুবাদের কাজ চালু হয়ে গেছে, সেখানে তাঁরা আর্থিক সহযোগিতা করবেন। এ-বিষয়ে তাঁরা একটি বিজ্ঞাপন দেন, এবং থিতু হয়ে বসতে না বসতেই, সেখানে একটি চিঠি পৌঁছয় বাংলায় বাইবেল ছাপার জন্য ১০০০ পাউন্ড প্রার্থনা করে। তাদের প্রথম রিপোর্টের সূচিতেই তাদের বিস্ময় স্পষ্টঃ ‘A correspondence has been opened by your Committee, with some gentleman at Fort William in Bengal, and that the plan and regulation of the Society have been communicated to him.’ ইনি আর কেউ নন, উইলিয়াম কেরি। যিনি জানতেন এসব ক্ষেত্রে বিলম্ব হলে টাকা পাওয়া শুধু কঠিন নয়, কখনও-কখনও অসম্ভব হয়ে পড়ে। সোসাইটির ১৮০৭ সালের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে— কেরির চটজলদি রেসপন্সে খুশি হয়ে তাঁরা পাঁচটি ভারতীয় ভাষায় বাইবেল অনুবাদ বাবদ কেরিকে ১০০০ পাউন্ড অগ্রিম দেন এবং একটি লাইব্রেরী গড়ে তোলা, স্থানীয় সহকারীদের মাইনে দেওয়া আর ছাপানোর বিবিধ খরচ বাবদ— বোনাস হিসেবে আরও ১০০০ পাউন্ড মঞ্জুর করেন। স্পষ্টত, ফোর্ট উইলিয়মের মতো একটি সরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদনটি যাওয়ায়, তাঁরা আরও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অনুদানটি দেয়। শীঘ্রই ফোর্ট উইলিয়মে কেরিকে সদস্য রেখে একটি কমিটি তৈরি হয়, টাকাটির ব্যবহার তদারকি করার জন্য। এতে ফোর্ট উইলিয়মে একরকম সমস্যা হয় যদিও। আগে সেই গল্পটা করে নেওয়া যাক।
১৮০০ সালে বড়লাট ওয়েলেসলি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ পত্তন করেন, এদেশে আসা সাহেব অফিসারদের দেশি ভাষায় পটু করে তোলার জন্য। সেটি ভাষা চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে একইসঙ্গে বিতর্কেরও। যখন বাইবেল অনুবাদের খানিকটা উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন ভারতীয় শিক্ষকদের একাংশ প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। কেন সরকারি টাকায় সরকারি পরিসরে ধর্ম-প্রচারমূলক কাজ হবে এই নিয়ে। কর্তৃপক্ষ শঙ্কিত হন এই ঝামেলায় আসল কাজ, অর্থাৎ প্রশাসকদের ভাষা শিক্ষার কাজ না ডকে ওঠে। অতএব উদ্যোগটি ধামাচাপা পড়ে যায়। পরে ব্যবস্থাটি এরকম দাঁড়ায় যে— বাইবেল অনুবাদ করবে শ্রীরামপুর প্রেস, আর বাইবেল সোসাইটির অনুদান পর্যবেক্ষণ করবে ফোর্ট উইলিয়মস্থিত একটি কমিটি। আর কেরি এই দু’য়ের মধ্যে যোগাযোগ-সূত্র হিসাবে থাকবেন। স্পষ্টতই, প্রথম দিকে বাইবেল সোসাইটির কাজ ছিল সাহায্য ও সমর্থনের। সরাসরি অনুবাদের কাজে তাঁরা শ্রীরামপুরত্রয়ীর ওপরেই নির্ভরশীল ছিল। তবে এই অবস্থা পালটাতে সময় লাগেনি বেশি। বাইবেল সোসাইটির প্রাথমিক কেরি নির্ভরতার একটা কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, ১৮১৩ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে মিশনারি ক্রিয়াকলাপ শুধু যে অনভিপ্রেত ছিল তা নয়, রীতিমতো বেআইনি ছিল।

১৮১৩ সালের চার্টার কোম্পানির শাসনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নীতিগত পরিবর্তন আনে — ব্যবসায়, শিক্ষায় এবং মিশনারিদের ধর্মপ্রচারের অধিকারের ক্ষেত্রে। এরপর বিভিন্ন মিশনারি গোষ্ঠী তুলনায় স্বাধীন ভাবে ভারতে ধর্মপ্রচার করতে সক্ষম হয়। ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ, ছাপানোর বা বিতরণের কাজও স্বচ্ছন্দে হয়। যদিও সবসময়ে যে কোম্পানির উপরমহল, ব্যাপ্টিস্ট এবং অন্যান্য ডিসেন্টারদের প্রতি খুব সদয় হয়ে পড়েন তা নয়। তবে মিশনারি গোষ্ঠীগুলোর আর তত মন যুগিয়ে চলার প্রয়োজন থাকে না। ১৮১১ সালে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজেই বাইবেল সোসাইটির একটি কলকাতাস্থিত শাখা বা অক্সিলিয়ারি খোলার প্রস্তাবনা আনা হয়। এটি শুধু কলকাতা নয়, সমগ্র পূর্বাঞ্চলে সোসাইটির কর্মকাণ্ডের প্রধান কার্যালয় হবে। কেরি এবং শ্রীরামপুরের মিশনারিরা সিঁদুরে মেঘ দেখেন এবং এটিকে শুধু অপ্রাসঙ্গিক নয়, তাঁদের প্রস্তুত করা ক্ষেত্রে অনর্থক হস্তক্ষেপ মনে করেন। এ-বিষয়ে চিঠিও লেখেন। কিন্তু কোম্পানি এতে ভাল সুযোগ পায় ব্যাপ্টিস্টদের মতো ডিসেন্টর সংগঠনগুলির ক্রিয়াকলাপ খর্ব করার। সেটি এবং অবশ্যই পুঁজির জোরে শেষাবধি অক্সিলিয়ারিটি খুলেই ফেলা হয়। কিন্তু হঠাৎ এর প্রয়োজন হল কেন? এর বছর খানেক আগে, নামকরা মিশনারি হেনরি মার্টিন কলকাতায় আসেন আর কলকাতার ব্যাপ্টিস্টদের সভায় একটি ভাষণ দেন। তিনি বলেন ভারতে বাইবেলের আকাল, এবং শীঘ্রই ৯০,০০০ বাইবেলের প্রয়োজন। এক লাখ হলে আরও ভাল। মার্শম্যান অবশ্য বুঝে পান না, এত পাঠক মার্টিন পেলেন কোথায়! তাঁর হিসেবে ৫০,০০০-এর কিছু বেশি হলেই যথেষ্ট, তাও ক্যাথলিকদের ধরে যাঁদের অনুদিত বাইবেলে আগ্রহ কম। আর সেটুকু প্রয়োজন শ্রীরামপুরই মিটিয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু ততক্ষণে ডেভিড ব্রাউন, যিনি পাদ্রী, নীলকর সাহেব আর কোম্পানির ‘পেয়ারের লোক’, তিনি পেয়ে গেছেন সুযোগ। ইনিই সেই লোক, যার ওপরে বিশ্বাস করে জন টমাস প্রায় ঘটিবাটি বেচতে বসেছিলেন। তিনি কালক্ষেপ না করে বক্তৃতাটি ছাপিয়ে বিলি করে দেন এবং ফোর্ট উইলিয়ামে মিটিংও ডেকে ফেলেন। সেই মিটিংয়ে তিনি বলেন, এই বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটাতে, বাইবেল সোসাইটির একটি কলকাতা অক্সিলিয়ারি খোলা হোক; আর আগের ওই সমন্বয়কারী কমিটিকে ডিজল্ভ করা হোক, কারণ এখন বাইবেল সোসাইটি নিজেরাই তাদের অনুদান মনিটর করুক। আগের কমিটির আর কোনও দরকার না থাকায়, সেটিকে ভেঙে দেওয়া হোক এবং কেরি ও তাঁর সহকর্মীরা যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ওই পদ ধরে রেখেছেন তাঁরা স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিন। ক্ষুব্ধ কেরি বলেন, এই সব কমিটি ভাঙাচোরার ব্যাপারটা বাইবেল সোসাইটির পেরেন্টবডির ওপরেই ছেড়ে দেওয়া হোক। একজন মিশনারির একটি সভায় রাখা কিছু বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয়ভাবে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই। ব্রাউন বলেন — কেরি যেন শঙ্কিত না হন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রাচ্যে বাইবেল অনুবাদের মুখ। তাঁর মতো ব্যাপারটা কেউ বোঝে না। ফলে তাঁকে বাদ দিয়ে এই নতুন অক্সিলিয়ারি কাজ করতে পারবে না। তিনি যেন ওই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া কমিটিকে গুটিয়ে দিয়ে বাইবেল সোসাইটির অংশ হয়ে কাজ করেন। তাতে সব পক্ষই লাভবান হবে। বাইবেল সোসাইটি তাঁকে কতটা শ্রদ্ধা করে, তাদের আগের সহযোগিতাই তার প্রমাণ। কিন্তু কেরি মানতে চান না। তিনি ব্যাপ্টিস্ট হয়ে এসেছেন, তাঁদের হয়েই কাজ করতে চান। বাদানুবাদ চলতে থাকে। ক্রমে এরকম একটা সিদ্ধান্তে সবাই পৌঁছন যে— অনুবাদের কাজ শ্রীরামপুর যেমন করছে করুক, কিন্তু তার ফান্ডিং, মুদ্রণ ও বিতরণের কাজ বাইবেল সোসাইটি করবে। তারা অনুবাদে দখলদারী করবে না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাইবেল সোসাইটিকে বৃহৎ মার্কিন পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হয়। মুদ্রণের খরচও ছিল প্রচুর। তবু শ্রীরামপুরের একটা জোরের জায়গা ছিল। তাদের বিস্তৃত মুদ্রণ-পরিকাঠামো। এক বছরের মধ্যে সেখানে আগুন লাগে।
ব্রাউন বলেন যে, কেরি যেন শঙ্কিত না হন কারণ দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রাচ্যে বাইবেল অনুবাদের মুখ। তাঁর মতো ব্যাপারটা কেউ বোঝে না। ফলে তাঁকে বাদ দিয়ে এই নতুন অক্সিলিয়ারি কাজ করতে পারবে না। তিনি যেন ওই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া কমিটিকে গুটিয়ে দিয়ে বাইবেল সোসাইটির অংশ হয়ে কাজ করেন। তাতে সব পক্ষই লাভবান হবে।
১৮১৫ সালের বাইবেল সোসাইটির রিপোর্টে পাই, তাদের কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে সিংহল থেকে চিন অবধি এক বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে। প্রায় সমগ্র দক্ষিণপূর্ব এশিয়া তাদের বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে ১৮১৪ সালে বম্বে অক্সিলিয়ারি খুলে ফেলা হয়েছে। ব্যপ্টিস্টদের সঙ্গে সম্পর্কের চিড় জোড়েনি, তবে তাতে খানিক প্রলেপ পড়েছিল। কিন্তু শ্রীরামপুরের যেটা সবচেয়ে শ্লাঘার জায়গা, অর্থাৎ পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মিশনারি প্রেস ও বাইবেল অনুবাদক প্রচারক গোষ্ঠী, তাতে আঘাত লেগেছে অনেকটাই। যার জোরে এতদিন পেরেন্টবডিকে খানিকটা অবজ্ঞা করেই স্বাধীন ভাবে কাজ করছিলেন তাঁরা, তা কমে এসেছে। নিজেদের মধ্যে দলাদলির জেরে ১৮২৭ সালে ভেঙে যায় সোসাইটি। শ্রীরামপুর মিশন আলাদা হয়ে যায়। ব্যাপ্টিস্ট মিশন কলকাতায় হেড কোয়ার্টার তৈরি করে। এটি ভেঙে পরে একটি ক্যালকাটা ব্যাপ্টিস্ট মিশনও স্থাপিত হয়। বাইবেল সোসাইটি নতুন মিশনের হাত ধরে।
কিন্তু বাইবেল কোথায়? তাঁরা কি সেই পুরনো কেরির বাইবেলই ছাপাবে, যা শত কাজের মধ্যেও তিনি মাঝে-মাঝে পরিমার্জন করতে থাকেন। এখানেই বাইবেল সোসাইটি একটি ট্রাম্প কার্ড খেলে। তাঁরা কেরির প্রতিস্পর্ধী হিসেবে তুলে আনেন ব্যাপ্টিস্ট মিশনের এক তরুণ মিশনারিকে। উইলিয়ম ইয়েটস। তাঁর হাতেই রচিত হবে কেরি পরবর্তী বাংলা বাইবেলের এক গতিময় অধ্যায়। তবে এই হাতবদল খুব সহজে হবে না। কেরি ছিলেন সর্বতোভাবে অমায়িক। এদেশে আসা ইস্তক তাঁর পরিবার ছারখার হয়ে গিয়েছিল। পুত্র পিটারকে হারিয়েছিলেন শিশু অবস্থায়। মদনাবাটির শীতল মাটির নীচে সেই শিশু আজও শুয়ে আছে। ইয়েটসকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন কেরি। কেরি জানতেন, তাঁর চেয়ে শ্রেয় অনুবাদক আসবেন, তিনি শুধু শুরু করেছেন কাজটি। কিন্তু বাইবেল সোসাইটি জানত যে, কেরির জায়গায় ইয়েটসকে আনতে গেলে একটা জোরালো ইস্যু দরকার। সেটি তারা পেয়েও যায়। বাংলা বাইবেল অনুবাদে এক আশ্চর্য বিতর্কের জন্ম হয়, যার ঢেউ গিয়ে পড়ে এদেশ ছেড়ে আমেরিকার মাটিতে। একটিমাত্র শব্দকে কেন্দ্র করে বাইবেল সোসাইটির উত্থান প্রশ্নাতীত হয়ে যায়।




