গঙ্গা তুমি কার?
১৭ মার্চ, ২০২৬। রমজান মাসের বিকেল। বেনারসের গঙ্গাবক্ষে, বোটের ওপরে চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে রোজা ভাঙছিলেন ১৪ জন যুবক। ঘটনাটির ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপর-ই ভারতীয় জনতা পার্টি-র বেনারসের শাখার যুব-মোর্চার সভাপতি রজত জয়সওয়াল-এর অভিযোগের ভিত্তিতে, সেই যুবকদের গ্রেপ্তার করে কোতয়ালি থানার পুলিশ।
জয়সওয়ালবাবুর ‘সওয়াল’, ‘গঙ্গা বেনারসের ধর্মীয় চেতনার ধারক-বাহক; দেশের নানা প্রান্ত থেকে, হাজার-হাজার মানুষ আসেন কাশী-বিশ্বনাথ দর্শনে। এহেন পরিস্থিতিতে গঙ্গাবক্ষে বিরিয়ানি খাওয়া এবং তার অবশিষ্টাংশ জলে ফেলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘হিন্দু-ধর্মের ভাবাবেগে আঘাত করা।’
মোদ্দা কথা ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’— এই ভয় থেকেই এই পদক্ষেপ।
ভাবতে অবাক লাগে, এ-দেশে গঙ্গা-দূষণ নিয়ে এই তথাকথিত সনাতনিদের মাথাব্যথা-ভয় নেই। প্রতিনিয়ত মণিকর্ণিকা ঘাট-এ দাহকাজ শেষ হওয়ার পর, কত পরিমাণ জল-দূষণ হয়, তার হিসেব নেই, নেই বেনারস থেকে প্রতিদিন কত পরিমাণ প্লাস্টিক গঙ্গায় মিশছে তার হিসেবও। ‘নমমি গঙ্গে’— গালভারী নামের প্রকল্প রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের। কিন্তু তার পরেও, রিল-দুনিয়ার দেখনদারিতে, কীভাবে প্রতিদিন মণিকর্ণিকা-দশাশ্বমেধ-অসসি ঘাটে বাণিজ্যিক বিলাসতরীর থেকে দূষিত তেল গঙ্গায় মেশে এবং তার ফলে কীভাবে গঙ্গার জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে— সেসব নিয়েও অতিসচেতন সনাতনি, হিন্দুদের মাথাব্যথা নেই এবং এমনই মাথা, যে লজ্জায় হেঁটও হয়ে যায় না।
চিনের রোবট আমাদের রোবট?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২০...
এসব ক্ষেত্রে সারা বিশ্ব তথা দেশ থেকে আগত দর্শকদের কাছে ‘সনাতনি সংস্কৃতি’ আঘাত পায় না না? যত দোষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের।
স্পষ্টই বোঝা যায়, যত না গঙ্গা নিয়ে মাথাব্যথা, তার থেকে বেশি উদ্দেশ্য ধর্মীয় মেরুকরণ-প্রচেষ্টা।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৯৮, ২৯৯, ১৯৬(১), ২৭০, ২৭৯ এবং জলদূষণ প্রতিরোধ আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল সেই যুবকদের বিরুদ্ধে। দু’টি বাদে এই ধারাগুলির প্রতিটিই— ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া সংক্রান্ত। দু’টি শুধু দূষণ ও বিশৃঙ্খলা-কেন্দ্রিক।
এখন প্রশ্ন, একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষ নিজস্ব ধর্মাচরণ করছে, তা সে গঙ্গাবক্ষে করুক আর মসজিদে। কার তাতে কী! সবচেয়ে জরুরি কথা, গঙ্গায় আমিষ ফেলা তো কোনও আইনবিরুদ্ধ কাজ নয়। মজার বিষয়, স্থানীয় আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ গত সোমবার তাঁদের জামিনও খারিজ করে দিয়েছে।
এক্ষেত্রে আপত্তিটা ঠিক কোথায়? এমন তো কোনও নিয়ম কোথাও লেখা নেই যে গঙ্গাবক্ষে আমিষ খাওয়া যাবে না বা ইসলাম-ধর্মাবলম্বী মানুষেরা গঙ্গা ব্যবহার করতে পারবেন না আমোদ উদযাপনে। তাহলে? একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের মানুষ ক্রমাগত তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে যাবেন, সেখানে দেশের আদালতও সায় দেবেন? সাম্য, ন্যায়— এই শব্দগুলো এই দলের দাপাদাপিতে অভিধানের মধ্যেই থেকে যাবে? আদালতের প্রতি সম্মান রেখেও যে জরুরি প্রশ্ন উঠে আসে— বিচারপতির যে-বেঞ্চ এই জামিন খারিজ করার এই রায় দিয়েছিলেন, সেখানে কি একজনও মুসলমান বিচারপতি ছিলেন? তা না হলে মোটা দাগে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রসঙ্গ এক্ষেত্রেও উঠে আসবে।
এক্ষেত্রে সমস্যা আসলে বহুস্তরীয়। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা ফলাও করে লেখা থাকলেও, গত কয়েক বছর যাবৎ বারবার ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রহসন হিসেবে তুলে ধরার একটি প্রয়াস জারি রয়েছে। যেন ভারতের জাতীয় আদর্শের আদত শত্রু ধর্মনিরপেক্ষতাই। মাইকে আজান, রাস্তা আটকে নামাজ পড়া ইত্যাদি নিয়ে যে সাধারণ্যের আপত্তির সূত্রগুলো তুলে ধরা হয়, তা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই প্রযোজ্য হয় না। এক্ষেত্রেও গঙ্গার দূষণের থেকেও ধর্মীয় শুচিবাইগ্রস্ততাকেই প্রায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মান্যতা দেওয়া হল।
দ্বিতীয়ত, গঙ্গাকে ঘিরে শুদ্ধতার যে ধারণা নির্মিত হচ্ছে, তার মধ্যে ধর্ম না পরিবেশ, দাঁড়িপাল্লার ওজনে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে রয়েছে? পরিবেশগতভাবে গঙ্গা নিয়ে কথা উঠলে এই প্রশ্নও উঠে আসবে, গঙ্গা নদীকে পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে আদৌ কতটা কঠোর প্রশাসন? গঙ্গায় প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে কি এতটাই তৎপর হতে দেখা যায় প্রশাসনকে? কলকারখানার বর্জ্য থেকে বিষাক্ত রাসায়নিক যে জলজ প্রাণীজগৎকে নিয়ত বিপন্ন করে চলেছে, তাই নিয়ে কি আমরা এতটাই সচেতন?
তৃতীয়ত, ধর্মীয় মেরুকরণের বাইরেও, আমিষ-নিরামিষ নিয়ে একমুখী সনাতনি শাস্ত্রীয় প্রচারের অংশ হিসেবেই কি এই গ্রেপ্তারি ও আইনি পদক্ষেপ? ভারতে বিগত কয়েক বছর ধরেই তো মাঝেমধ্যেই এমন ভাবাদর্শ প্রচারের হিড়িক উঠছে, যেখানে আমিষ বিষয়টিকেই বিধর্মী আচারের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে না তো? উল্লেখ্য, তিন বছর আগে, গঙ্গাতীরে আমিষ রান্না নিয়ে অভিযোগ ওঠার পরেও পুলিশি তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। অঙ্কটা মেলানো কি খুব কঠিন?
শুক্রাচার্য অভিমুক্তেশ্বরানন্দর উক্তিটি এক্ষেত্রে বেশ মজার। তিনি গঙ্গাবক্ষে মাংস-মদিরা নিয়ে আপত্তি তুলেও একথা বলেছেন, গঙ্গা আর পৌরাণিক মায়ের তকমাধারী নয়, ব্যবসায়িক উপার্জনের মাধ্যম এখন। তাই তার ওপর ক্রুজে হোটেলও চলে। এই অভিযোগের তির কি কেবলই ইফতার-আয়োজকদের দিকে ধাবমান হয়, না কি সরকারিভাবে গঙ্গাকে পণ্য করে তোলার চেষ্টাও সমালোচিত হয় এই মন্তব্যের ভেতর দিয়ে?
প্রসঙ্গত, ক’মাস আগেও বেনারস ঘিরে বিতর্ক সামনে এসেছিল। মণিকর্নিকা ঘাটে অবস্থিত বহু শতাব্দীপ্রাচীন মন্দির ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় উন্নয়নের নামে। ইতিহাস নষ্টহলে সনাতনিদের ক্ষতি হয় না? গঙ্গাবক্ষে আমিষ ফেললেই সনাতনিদের জাত যায়?
