আত্মপ্রকাশ
কার্ল মার্কস শ্রমিকদের বিচ্ছিন্নতার ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, শ্রম একজন শ্রমিকের কাছে একটি যান্ত্রিক ও বাধ্যতামূলক কাজ হয়ে দাঁড়ায় যেহেতু, সেই শ্রমিক নিজের সহকর্মী ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে ক্রমশ কমতে থাকে তার নিজস্ব সৃজনশীলতা ও মানবিক সত্তাও। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় এই দৃশ্য আমাদের চেনা। কর্পোরেট-সংস্কৃতি আরও তা পরিষ্কার করে দেখিয়ে চলেছে। আইটি-র ভাইটি বা বোনটি সকালে গলায় কার্ড ঝুলিয়ে কোথায় যে হারিয়ে যায়, তার তল পাওয়া কঠিন। ঘড়ির কাঁটা ধরে মিটিং, কিউবিকলের মাঝে কি-বোর্ডের ঘটঘটাং, বসের মন জুগিয়ে চলা— শেষে ধুঁকতে-ধুঁকতে বাড়ি ফিরে এসে ঘুম। কখনও মাঝরাত অবধি ল্যাপটপ খুলে কাজ। ব্যক্তির ‘সামাজিক ভূমিকা’ চাপা পড়ে যায়, এই প্রযুক্তিনির্ভর কৃত্রিম দুনিয়ায়।
২০২৩ সালে লারসেন অ্যান্ড টুবরো-র চেয়্যারম্যান এসএন সুব্রহ্মণ্যম ও ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণমূর্তি প্রস্তাব করেছিলেন, দেশের উন্নতির জন্য তরুণদের সপ্তাহে ৭০ থেকে ৯০ ঘণ্টা কাজ করা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হল, নিজের উন্নতিই যদি না ঘটে, একজন মানুষ কী উপায়ে দেশের উন্নতি ঘটাবেন? রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, দেশের উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন একজনের আত্মিক বিকাশ ঘটে। চাকরি যদি জীবন থেকে সমস্ত সময় শুষে নেয়, জীবনের কোমলতাগুলোকে গলা চেপে ধরে— আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক নয় কি! ‘কাজের চাপ’ সামলাতে না পেরে তাই হায়দরাবাদে ৩১ বছর বয়সি সতীশ কুমারকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়। সতীশেরই মতো আরও অসংখ্য মানুষ অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় দিন কাটায়। জাঁতাকলে পিষে যেতে থাকে হৃদয়ের অনুভূতিমালা। দম বন্ধ হয়ে আসে।
তবে, এত অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখায় কেউ-কেউ। যেমন, রাকেশ নামক এক ব্যক্তির গল্প অনেকের মনেই সাহস সঞ্চার করেছে। রাকেশ একসময়ে এমন একটি পেশায় ছিলেন, যাকে অনেকেই স্বপ্নের কেরিয়ার বলে মনে করেন। উচ্চ বেতন, আরামদায়ক অফিস— স্বাচ্ছন্দ্যের কোনও অভাবই ছিল না। তবু এই সাফল্য এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার মাঝেও রাকেশের নিজেকে অসুখী এবং বিচ্ছিন্ন মনে হতে শুরু করে। কর্পোরেট দুনিয়া তৈরি করতে থাকে এক অপার ক্লান্তি। রাকেশের কথা অনুযায়ী, ‘আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে একই বিষয় বারংবার ভাবতাম। প্রায় বাইরে বেরনোই বন্ধ করে দিয়েছিলাম।’
আমাদের রাগের উৎস কী, আমরা কি আদৌ জানি?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২৪
নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ যখন নিজের হাতে আর থাকে না, প্রতিটা দিন-রাত্রি যেখানে অন্যের শর্তে বাঁচতে হয়— মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তা কতটা গভীর প্রভাব ফেলে, টের পেয়েছিল রাকেশ। মানসিক অবসাদ কাটিয়ে উঠতে জীবনযুদ্ধে লড়াই শুরু করে সে। বাইরের বৃত্ত থেকে সরে এসে নিজের ভাল-মন্দ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে থাকে। মনের যত্ন নেয়। কেবল নিজেকে বোঝা নয়, মানুষের আচরণের সূত্রে জীবন-অভিজ্ঞতার নানান খুঁটিনাটি বুঝতে মনোবিজ্ঞান পড়তে শুরু করে সে। পাশাপাশি শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকেও মন দেয় রাকেশ। মার্শাল আর্টে প্রশিক্ষণ তাকে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করে।
অন্যের অধীনে উচ্চপদে কাজ করার চেয়ে, রাকেশ চেয়েছিল জীবনে স্বাধীনভাবে কিছু করতে। তাই সে কোনও কাজ করতেই দ্বিধা করবে না— এমন ভাবনাই ছিল তার। প্রতিটা কাজকেই সে মনে করেছে সম্মানজনক। গৌরবময়। সে যেমন ফুড ডেলিভারির কাজ করেছে, তেমনই জিমে সহকারী হয়ে মেঝে পরিষ্কার করার কাজও করেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে নিজের মর্যাদা এবং স্বাধীনতার অনুভূতি ফিরে পেতে সাহায্য করেছে। সমস্ত দাসত্ব থেকে, পরাধীনতা থেকে সে এই প্রক্রিয়ায় মুক্তির টিকিট অর্জন করেছে। তার নিজের আগ্রহ নাচ এবং ছবি আঁকা— উপার্জনের পাশাপাশি সে সেসব নিয়ে সময় কাটায়।
বর্তমানে রাকেশ বেঙ্গালুরু শহরে বৈদ্যুতিক অটো-রিকশা চালায়। ইনস্টাগ্রামে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ২৬,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের শেষদিকে সে একটি ভিডিও পোস্ট করে লেখে, ‘Motivating myself for tomorrow. Trying to help anyone who is about to quit.’ এবং ওই ভিডিওতেই ফুটে ওঠে একটা বাক্য— ‘Auto driver, not a corporate slave anymore.’
রাকেশের জীবন বদলের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের সুখ সবসময়ে বেতন বা সামাজিক মর্যাদা থেকে আসে না; বরং তা আসে নিজেকে খুঁজে পাওয়া এবং নিজের শর্তে জীবনযাপন করার মধ্য দিয়ে।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত যেভাবে তাঁর কবিতায় ‘ফুটো ও ফাটল’কে নানা নকশায় প্রসারিত করে ‘জানালা’-য় রূপান্তরিত করে ফেলেছিলেন, রাকেশের মতো যদি অনেকে আজ জীবনবোধ দিয়ে নিজেদের জীবনকে তেমনই বদলে ফেলতে পারেন— চারপাশে ক্রমশ আরও রং ছড়িয়ে পড়বে। আনন্দের, বৈচিত্রের, সৃষ্টিশীলতার।




