দ্বন্দ্ব, তত্ত্ব ও হাবারমাস

‘ইয়ুর্গেন হাবারমাস, জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ, অত্যন্ত বিতর্কিত, পশ্চিমি ভাবাদর্শের প্রায় সমস্ত বিষয়ে তাঁর অধ্যাবসায়…. এবং যিনি সর্বতোভাবে মনে করেন যে, হিউম্যান rationality বা লোগোস মানব ইতিহাসের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে পারে।’ 

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মকরন্দ পরাঞ্জপে এই কথাগুলি লিখেছিলেন হাবারমাস প্রসঙ্গে, কয়েক বছর আগে। ইউরোপিয়ান আইডিওলজির হেন কোনও বিষয় নেই, যা নিয়ে নাকি হাবারমাসের লেখা পাওয়া যায় না: এমন কথা মজার ছলে উল্লেখ করেছিলেন অধ্যাপক। এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে যে, কলেজে পড়াকালীন ‘জনমত’ বা ‘জনপরিসর’ নিয়ে কোনও কথা উঠলেই হাবারমাস উদ্ধৃত করতেন অধ্যাপক, গবেষক বা স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীরা। তবে শুধুমাত্র গণপরিসরেই সীমাবদ্ধ নয় তাঁর রচনা বা মৌলিক গবেষণা। একটু সময় নিয়ে গ্রন্থপঞ্জি ঘেঁটে দেখলে বোঝা যাবে, হাবারমাসের তত্ত্ববিশ্ব যেমন বিস্তৃত, তেমনই বৈচিত্র্যময় (diverse) ও জটিল। তাঁর যে-কোনও বই বা প্রবন্ধে প্রায় দু-তিনটে বাক্যের পরে-পরেই  ফুটনোটের ছড়াছড়ি, হাবারমাস পড়তে গেলে তাই প্রাথমিক কিছু বিষয় জানা না থাকলে বেশ মুশকিলে পড়তে হয়, বারে-বারেই তথ্যসূত্র দেখে এদিক-ওদিক চোখ বোলানো। মার্ক্স, অ্যাডর্নো বা হরখেইমারের লেখাপত্র পড়ে দেখা, তারপর আবার ফিরে আসা মূল টেক্সটে, এই সবই সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমের কাজ। বলা হয়, এমন বিস্তারিত ‘রেফারেন্সিং’ জার্মান চিন্তাবিদদের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এবং এই পুঙ্খানুপুঙ্খ নোট আমাদের হাবারমাসের তাত্ত্বিক অবস্থান (theoretical postion) বুঝতে সাহায্য করে।

১৪ মার্চ তিনি প্রয়াত হয়েছেন, সমাজবিজ্ঞানের ধারায় যাঁর লেখা সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়, যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের যিনি এক প্রধান চিন্তক, তাঁর জীবন ফিরে দেখার চেষ্টা চলছে সর্বত্র। বিতর্ক তাকে কখনও ছাড়েনি, বারবার প্রশ্ন ওঠে, মার্ক্সীয় দর্শন তিনি কতটা অবলম্বন করেছিলেন? মার্ক্সিস্ট হয়ে কি জায়োনিস্ট হওয়া যায়? এমন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন জীবৎকালে, তাঁর প্রয়াণের পরেও ক্ষেত্রবিশেষে সেই প্রশ্নগুলি উঠে আসছে।  

আরও পড়ুন: সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গদ্য শানিয়েছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়!
লিখছেন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়…

ইউর্গেন হাবারমাস

১৯৬২ সালে তাঁর জনপরিসর নিয়ে লেখাপত্র প্রকাশ পায় এবং তারও কুড়ি বছর পরে ‘কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন থিওরি’। ১৯৮১ সালে তিনি লিখছেন যে স্বাধীন, সচেতন মানুষ নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করবে, তারা একত্রিত হবে জনপরিসরে এবং নিজেদের হিতে সমাজ বদলানোর কথা ভাববে, এই সত্তাই জরুরি আর আধুনিক সমাজের পথপ্রদর্শক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সমাজের মূল ভিত্তি বলতে নারাজ হাবারমাস। আর্থিক লেনদেন, সৈন্যসামন্ত, আমলা— সবই গৌণ তাঁর কাছে, মূল জায়গাটি হল বিচক্ষণ লোকজন একসঙ্গে বসে rational dialogue বা যৌক্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে, এটাই আধুনিকতার লক্ষণ এবং এই বৌদ্ধিক আদানপ্রদানকেই বলা হয় ‘কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন’। এমন ইতিবাচক কথাবার্তা কালক্রমে একটা সামাজিক সম্মতি বা consensus-এ পৌঁছতে সাহায্য করে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কমিউনিকেটিভ তত্ত্বের সঙ্গেই জড়িত তাঁর ‘Public sphere’-এর ধারণাটি।

কিন্তু ঠিক কোন মতাদর্শগত প্রেক্ষাপটে হাবারমাস এই কথাগুলি বলছেন? তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষা বা কী ধরনের দর্শন তাকে প্রভাবিত করছে, এই প্রশ্নও বোধহয় অনিবার্য হয়ে পড়ে। লেখককে বুঝতে হলে লেখক কী পড়ছেন, সেটা জানা আবশ্যক। 

১৯২৯ সালে জার্মানির রাইনল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন ইয়ুর্গেন হাবারমাস। ছোট থেকেই প্রোটেস্ট্যান্ট আবহে বড় হয়েছেন। বাবা ছিলেন নাৎসি দলের সদস্য আর তাঁর উদ্যোগেই বয়ঃসন্ধিকালে হিটলারের ইয়ুথ ব্রিগেডে যোগদান করেন ইয়ুর্গেন। যুদ্ধশেষে কিছুদিন সাংবাদিকতা করার পর ১৯৫৬ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে যোগদান করলে তাঁর জীবন আমূল বদলে যায়। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের অংশ হয়েও, কিছুদিনের মধ্যেই হাবারমাস এই স্কুল অফ থটের গতানুগতিক পন্থা এড়িয়ে যান। কলেজের অধ্যাপক এবং বিখ্যাত তাত্ত্বিক ম্যাক্স হরখেইমারের সঙ্গে তাঁর মতাদর্শগত বিরোধ সর্বসমক্ষে চলে আসে। এই বিবাদকে অনেকেই দুই প্রজন্মের অন্তর্ঘাত বলে চিহ্নিত করে থাকে। ফেলিক্স ওয়েলি, হরখেইমার কিংবা থিওডোর অ্যাডর্নো ছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের নির্মাতা, যারা বিংশ শতকের জার্মানিতে নিও মার্ক্সিস্ট মেথড প্রয়োগ করতেন তাদের লেখাপত্রে।

কী এই নয়া মার্কসীয় দর্শন?

এই ধারা ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’, অর্থাৎ সিনেমা, গণমাধ্যম, সংগীত ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজে পুঁজিবাদী/ভোগবাদী বা স্বৈরতন্ত্রের উত্থানকে বোঝার চেষ্টা করে। এই তত্ত্বের সঙ্গে অচিরেই কিছু ক্ষেত্রে বিরোধ তৈরি হয় হাবারমাসের। তিনি enlightenment বা ইউরোপীয় রেনেসাঁকে পুরোপুরি নাকচ করে দিতে পারেননি ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রতিষ্ঠাতাদের মতো। তাই আমরা দেখতে পাই যে ‘reason’, ‘rationality’ বা ‘rational dialogue’ শব্দগুলি বারবার ঘুরে ফিরে আসে হাবারমাসের লেখায়। এই যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা বা কগনিশনকেই তো মনে করা হয় পশ্চিমি ‘enlightenment’-এর দ্যোতক। হাবারমাসের গবেষণায় ‘rationality’ নিয়ে যে অবিমিশ্র পক্ষপাত, এই প্রবণতা আমাদের মাঝে মাঝে খুব অবাক করে। এখানে একটু বলে রাখি যে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় ‘র‍্যাশনালিটি’-র বাংলা প্রতিশব্দ খোঁজা বড় কঠিন, কারণ এই শব্দটিকে পাশ্চাত্য দর্শনে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে, সেখানে যুক্তিবোধ কথাটা প্রায়শই ফিকে পড়ে যায়। অনুবাদের এই জটিলতা শুধুমাত্র আভিধানিক কারণে নয়, বরং দু’টি সমাজ ও দর্শনের মধ্যে বৈপরীত্য থেকে আসে। কিংবা বলা যায়, ঔপনিবেশিক রাজনীতি যেভাবে ‘rational’-কে যুক্ত করেছে পাশ্চাত্য আধিপত্যের সঙ্গে, সেখানে ‘যুক্তি’ হিসেবে তাকে অনুবাদ করলে একটু কম বলা হয়।

এই নিয়ে পরের অংশে আলোচনা জরুরি, আপাতত বলা যায় যে, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের থেকে হাবারমাসের বিচ্যুতির কারণ বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে যে-ধরনের দাবিদাওয়া নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই স্কুল, তা বদলাতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৩৩-এর পর, বিশেষত নাৎসি বাহিনীর ক্ষমতা লাভের পরবর্তী সময়ে সমাজকে বোঝার পরিমাপকগুলো পাল্টে যাচ্ছে। যদিও হাবারমাস নিজেকে জীবনের শেষদিন অবধি একজন মার্ক্সিস্ট বলেই ঘোষণা করেছেন। ১৯৭৪ সালে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়: এত কিছুর পরেও কি আপনি নিজেকে মার্ক্সিস্ট বলবেন? উত্তরে তিনি বলছেন, ‘অবশ্যই… আমাকে বলা হয়েছে আমি মার্ক্সিস্ট ফিল্ডের বাইরে চলে গেছি অনেকদিন আগেই, কিন্তু এমন মন্তব্যের কোনও কারণ আমি খুঁজে পাই না।’

১৯৬২ সালে তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Structural Transformation of the Public Sphere’ প্রকাশ পায়। এখানে তিনি বলছেন যে, পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই এক আধুনিক জনপরিসর গড়ে উঠছে। আঠারো শতকের গোড়ার দিক থেকে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড বা জার্মানিতে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য কফি হাউস, সালোঁ বা বুক ক্লাবে বিদ্বজ্জনরা নিয়মিত দেখা করছেন, নানা আলোচনা বা তর্কবিতর্কের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে জনমত। এই পাবলিক স্ফিয়ার ট্র্যাডিশনাল বা পুরনো জনপরিসরের থেকে অনেকাংশে আলাদা। মধ্যযুগে পাবলিক স্ফিয়ার বলতে রাজার অনুগত, তার কোর্টে বা সভায় উপস্থিত একদল অভিজাত সম্প্রদায়কে ভাবা হত, কিন্তু অষ্টাদশ শতকের বুর্জোয়া পাবলিক স্ফিয়ার রাষ্ট্রের প্রতি সর্বদা আনুগত্য দেখাচ্ছে না। প্রথমদিকের বুর্জোয়া সমাজ ছিল সাহিত্যকেন্দ্রিক; উপন্যাস নিয়ে কথাবার্তা, বুক ক্লাব বা বিভিন্ন জার্নালে সাহিত্য-সমালোচনা চলত। কোন বিতর্কিত বই বাজারে এসেছে, তার মরালিটি বা নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠত, কিন্ত আস্তে আস্তে দেখা যায় যে, সাহিত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয়ও এসে পড়ছে এই বৌদ্ধিক আলোচনায়। শাসকের ভূমিকা, জাতিরাষ্ট্রের কর্মপন্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সবসময় যে ক্ষমতার পক্ষেই জনমত যাচ্ছে, তা কিন্তু নয়। শাসক যা বলছে, তা সমর্থন করতেই হবে, নতুবা পদোন্নতি হবে না, এমন বাধ্যবাধকতা রইল না। সুতরাং, এই জনপরিসর কিঞ্চিৎ স্বাধীন (অন্তত মধ্যযুগের সঙ্গে তুলনা টানলে) এবং এই স্বতন্ত্র অস্তিত্বের নেপথ্যে অবশ্যই কিছু কারণ আছে। প্রথমেই হাবারমাস দেখাচ্ছেন যে, জাতিরাষ্ট্র (nation-state) গঠনের সময় নবিলিটি বা রাজার করতলে থাকা অভিজাতদের পরিবর্তে আসছে স্বাধীন আমলা বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্যুরোক্র্যাট। এই রাজনৈতিক পটবদলের পাশাপাশি আর্থিক কাঠামোরও আমূল পরিবর্তন হচ্ছে। মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিজম বা বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ, যেখানে একদল ব্যবসায়ীর হাতে আসতে শুরু করছে প্রভূত পরিমাণ সম্পত্তি, অর্থ; যারা বাণিজ্য করেই ক্ষান্ত নয় বরং দেশের নিয়মনীতি কীভাবে তাদের আরও বেশি মুনাফা দিতে পারে, সেই নিয়ে চলছে বিস্তর চর্চা। হাবারমাসের থিওরিতে বুর্জোয়া পাবলিক স্ফিয়ার অবশ্যই এই বণিকশ্রেণির সঙ্গে একাত্ম, বা বলা ভাল, ব্যবসায়ীরাও এই জনমতে অংশগ্রহণ করছেন ও তা প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। তারা শুধু জিনিসের কী দাম হবে বা কোন পথ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ যাবে, সেই নিয়ে ভাবিত নয়। নিউজ শিট বা গ্যাজেটে রাষ্ট্রীয় নীতি, শুক্ল বা আর্থিক অনুদান নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে। পাঠকরা তা পড়ে মত বিনিময় করতে সচেষ্ট এবং এই পাবলিক ওপিনিয়ন, হাবারমাসের মতে, র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবাদকে প্রাধান্য দিচ্ছে। রাষ্ট্রের শাসক, সৈন্য কিংবা প্রথাগত ধনীরা, কাউকে তোষণ করে এই জনমত তৈরি হচ্ছে না, বরং বাস্তববুদ্ধি বা বিচক্ষণতার সঙ্গে আলোচনা চলছে। র‍্যাশনালিটির এই উত্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন হাবারমাস। বিষয়টা তাহলে এমন দাঁড়াচ্ছে যে, একদল স্বাধীনচেতা মানুষ (পাবলিক বডি) যারা নাগরিক রূপে, ক্ষমতার প্রতি আনুগত্য না দেখিয়ে, নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করছে লেখালিখি বা জনমত তৈরি করে এবং এইভাবেই তারা একটা র‍্যাশনাল জনপরিসর তৈরি করছে, যা অভূতপূর্ব বা আগে কখনও দেখা যায়নি।

এখন প্রশ্ন হল এই যে, র‍্যাশনাল শব্দটি ঘুরেফিরে হাবারমাসের লেখায় অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠছে, এখানেই আমাদের প্রথম ধন্ধ লাগে। শুধু হাবারমাস কেন, পশ্চিমি তত্ত্ববিশ্বের নানা ধারায় আমরা Rational, Progress, Morality, Liberal— এমন বিবিধ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার দেখি। এগুলো পড়ে মনে হয় যেন, এমন শব্দদ্বয় পক্ষপাতদুষ্ট কোনও বিষয় হতেই পারে না; দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, ঝকঝকে বা একপেশে এর অর্থ। আমরা জানি যে, ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসে  র‍্যাশনাল, মডার্ন, প্রোগ্রেস, সভ্যতা: এমন নানা ধারণা কখনওই ইনোসেন্ট বা নির্মল রূপে প্রতিপন্ন হয়নি। এগুলিকে ব্যবহার করে উপনিবেশের মানুষদের লুণ্ঠন করা, তারা কত পিছিয়ে আছে, সেই অজুহাতে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ চালানো হয়েছে তিন-চার শতক ধরে। তাহলে প্রশ্ন হল এই যে, ইউরোপীয় আধুনিক জনপরিসরের জয়গান, যাদের হাবারমাস র‍্যাশনাল, স্বাধীন, বা সুবিবেচক বলছেন— তারাই কিন্তু পশ্চিমি প্রভুত্ব, উপনিবেশ তৈরি করে ‘ড্রেন অফ ওয়েলথ’ বা বর্ণবাদের মতো ভাবনার সূত্রধর। তাঁর লেখা পড়ে মনে হয়, অত্যন্ত নিরপেক্ষ জায়গা থেকে একদল মানুষ যেন শুধু বিচক্ষণতার ওপর ভর করে, ক্ষমতার বিপক্ষে গিয়ে কথা বলছে। মনে রাখতে হবে, অষ্টাদশ শতকে জাতিরাষ্ট্রের শাসকের বিরুদ্ধাচরণ মানেই যে অত্যন্ত বিপ্লবী এক পদক্ষেপ, তা না-ও হতে পারে। একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে যে, বাণিজ্যিক পুঁজিবাদের ঊষাকালে একদল মানুষ, যাদের হাতে প্রভূত ক্ষমতা, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উপনিবেশ তৈরি করে আর্থিক প্রতিপত্তি যাদের হয়েছে— তারা যে রাজার অনুগত হবে না, প্রথাগত অভিজাতদের তোয়াক্কা করবে না, এ তো স্বাভাবিক! এমন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই জনপরিসর যখন শুল্ক, অনুদান বা আরও নানা সুযোগসুবিধা নিজেদের হিতে বানিয়ে নিতে চেয়েছেন, যা এশিয়া, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার মানুষের নিগ্রহের সহায়ক, সেখানে ‘র‍্যাশনালিটি’ বা ‘ক্রিটিকাল’ শব্দগুলি কি খুব প্রশংসার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়? হাবারমাসের তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে ভারতের জনপরিসরকে বিশ্লেষণ করাও অত্যন্ত কঠিন। তাঁর কথা অনুযায়ী পাবলিক (স্টেট) থেকে প্রাইভেট (পরিবার) যখন বিচ্ছিন্ন হচ্ছে আর তার মাঝখানে নাগরিক সমাজ (সিভিল সোসাইটি) স্বাধীনভাবে তাদের জনমত তৈরি করতে সক্ষম, তখনই আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের উত্থান সম্ভব হয়। মুশকিল হল, ভারতে পাবলিক বা প্রাইভেটের সংজ্ঞা পশ্চিমের মতো নয়, এই দু’টি শব্দের বাংলা করলে কী দাঁড়ায়? ঘর ও বাহির? বাহির বলতে পাবলিক অথরিটি বোঝানো গেল কি? এই অনুবাদের বিপত্তি শুধু শব্দের অভাবে তৈরি হয় না, সামাজিক কাঠামো বা সাংস্কৃতিক পার্থক্য এর মূলে। 

২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে, চারজন জার্মান দার্শনিক প্যালেস্টাইনে ঘটে চলা হিংসাকে একপ্রকার সমর্থন করে নিজেদের মন্তব্য পেশ করেন। Geothe University Frankfurt থেকে প্রকাশিত এই মতামতে শামিল ছিলেন হাবারমাসও। উনি বলেন যে হামাস-ইহুদি সংঘর্ষ যতই ব্যাপক আকার ধারণ করুক না কেন, এতে ইহুদিদের অধিকার বা ইজরায়েল গঠনের প্রয়োজনীয়তাকে কিছুতেই খাটো করে দেখা যায়না। আমেরিকার ইন্ধনে পশ্চিম এশিয়াতে চলা দীর্ঘকালীন যুদ্ধের জিগিরকে উপেক্ষা করে হাবারমাস মনে করেছেন যে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে ইহুদি সলিডারিটি এবং তারা হিংসার রাজনীতি করছে— এই অপবাদ অতিরঞ্জিত। ইলিয়ানয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসেফ বায়াত হাবারমাসের মন্তব্যকে কুযুক্তি মনে করেছেন। বায়াত বলছেন যে, হাবারমাসের বিখ্যাত তত্ত্বে পাবলিক স্ফিয়ারে র‍্যাশনালিটি, ক্রিটিকাল থিংকিং বা মুক্তচিন্তার জয়গান করা হয়েছে, তাহলে জার্মানিতে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগানকে নিস্তব্ধ করা বা ইহুদিদের যুদ্ধ প্ররোচনাকে নিন্দা করা কেন থামিয়ে দেওয়ার পক্ষে হাবারমাস? তার মানে এই যে, জনপরিসরে ‘র‍্যাশনাল ডায়লগ’-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এত তৎপর তিনি, তা শুধু একতরফাভাবে ইহুদিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? প্যালেস্তাইন রক্ষার পক্ষে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা বুঝি মুক্তচিন্তার ধারক নন?

আসলে এই ধরনের স্ব-বিরোধী কথাবার্তা হাবারমাসের মূল লেখাতেও পাওয়া যায়। যে-কথা আগেও উল্লেখ করেছি যে, এনলাইটেনমেন্টের ধারা অবলম্বন করে যে ইউরোপীয় আধুনিকতাকে উনি প্রশংসা করছেন, সেই rational, liberal, critical শব্দগুলোর মধ্যেই ঔপনিবেশিকতা বা বর্ণবাদের বীজ লুকিয়ে আছে। তাই পশ্চিমি বুর্জোয়া জনপরিসরকে প্রগতিশীল ভাবা (অষ্টাদশ শতকে) আর উল্টোদিকে তাদের উপনিবেশ তৈরির রক্তাক্ত ইতিহাসকে উপেক্ষা করা ওঁর লেখায় বিদ্যমান। ঠিক তেমনই ২০২৩-এ এসে ইহুদিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বপক্ষে কথা বলেও উনি প্যালেস্টাইনবাসীর সুরক্ষা বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভাবলেন না, এই অসংগতিও আমাদের ভাবায়।

কেউ বলতেই পারে যে, হাবারমাসের বেড়ে ওঠা, ছোটবেলায় হিটলারের ইউথ বাহিনীতে যোগদান বা পিতার অ্যান্টি-সেমিটিজম প্রত্যক্ষ করে তাঁর মতামত এমন তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত যে, এটা ১৯৫০-এর নয়, ২০২৩-এর মন্তব্য, যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি পুরোপুরি বদলে গেছে। জায়নবাদের আগ্রাসনে আর আমেরিকার পুঁজির দৌলতে পশ্চিম এশিয়ায় বিগত ৫০ বছরের হিংসার ইতিহাস অগ্রাহ্য করে শুধু ১৯৪৫-এর ঘটনাকে স্মরণ করা অন্যায্য। কোথাও গিয়ে মনে হয় যে, সত্যিই হয়তো, অন্তত আজকের পৃথিবীতে, জায়নবাদ ও মার্ক্সীয় দর্শন একসঙ্গে থাকতে পারে না। ঠিক যেমন ইউরোপীয় রেনেসাঁ বা এনলাইটেনমেন্টকে গৌরবান্বিত করে নিও-মার্ক্সিস্ট হওয়া মুশকিল।