বাস্তুহারা কারা?

শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘বাস্তু’-র অর্থ লেখার সময় জানিয়েছিলেন, ঋগ্বেদেও ‘বাস্তু’ শব্দটা আছে, আর তার অর্থ হল ‘সুখনিবাস-যোগ্য স্থান’। ‘বাসযোগ্য স্থান’-কেও বাস্তু বলেছেন তিনি। কিন্তু ঘটনাক্রমে ‘বাস্তুহারা’ বা ‘ছিন্নমূল’ শব্দগুলো ঐতিহাসিক ভাবে পূর্ব বাংলা থেকে আসা মানুষদের ওপরে সেঁটে গিয়েছে। এর পিছনে সম্ভবত এক রাজনৈতিক কারণটাই বড় হয়ে হয়ে ছিল। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে একটা স্লোগান এই বাংলার দিকে দিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে সেই জায়গাগুলোয়, যেখানে পূর্ব বাংলা থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি— ‘আমরা কারা? বাস্তুহারা!’ এই তিনটে শব্দের মধ্যে তাদের আকুতি, কান্না, জেদ, অভিমান, হতাশা মিশে ছিল। এতটাই জনপ্রিয় হয় এই স্লোগান, যে, শহর থেকে গ্রামে, বাংলার বাইরে সব জায়গায় এই স্লোগান পাড়ি দিয়েছিল। ফেলে আসা দেশ, বাড়ি সব হঠাৎ করে অতীত হয়ে গিয়েছিল যে মানুষদের কাছে, যে বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক শুধু রয়ে গিয়েছিল শুধু তাদের স্বপ্নের মধ্যে, ‘বাস্তুহারা’ শব্দের মধ্যে দিয়ে সেই স্মৃতিতে অবিরত ধাক্কা দেওয়াতেও পিছপা হয়নি রাজনীতি, কিন্তু কিন্তু এই শব্দের সেই অভিঘাত রাজনীতির ঊর্ধ্বেই রয়ে গিয়েছিল।

ধৃতিমান শৈশব কাটিয়েছে মধ্য কলকাতার ফরডাইস লেনে পৈতৃক বাড়িতে এক যৌথ পরিবারে। কৈশোর আর যৌবনের শুরুর দিনগুলো সল্টলেকে বাবার বানানো বাড়িতে। সে এখন ব্রিটিশ নাগরিক। প্রতি বছর বারদুয়েক কলকাতায় আসে বয়স্কা মা আর শাশুড়িকে দেখতে। ফরডাইস লেনের বাড়িতে কাকাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সেই বাড়ির ছাদে আর সামনের গলিতে গিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে শৈশবকে ছুঁয়ে আসে। সল্টলেকের পথে-ঘাটে ঘুরে বেরিয়ে আর বিভিন্ন জায়গায় খেয়ে রাতে বাড়িতে রান্না করা স্ট্যু খায় তার চেয়ে দশ বছর ছোট টেবিলে ব’সে। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে সে লন্ডনে তার নিজের বাড়িতে ফেরত যায় নিজের বাস্তুর স্পর্শ গায়ে মেখে, আর সেখান থেকে হোয়াটসঅ্যাপে বন্ধুদের বলে, ‘তোরা ইন্ডিয়ানরা…।’

আরও পড়ুন : কালীঘাটের ছায়াপথের শুরু হত পটুয়াপাড়ায়!
লিখছেন জয়ন্ত দে…

টুঙ্কুকে লন্ডন বা ফরডাইস লেন কোথাও যেতে হয়নি। যে বাড়িতে জন্মেছে, সেই বাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাজারে যায় আজও। সেদিনের মতো ঢোলা পাজামা, শার্ট পড়ে হাতে বাজারের ব্যাগ দুলিয়ে— আজও। লাব্বু গত তিরিশ বছর ধরে কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরে মানিকতলা হকার্স কর্নারের পিছনে লাকি-তে এককাপ চা খেয়ে এসে বাড়ির চেম্বারে মক্কেলদের সঙ্গে বসে। লাকি-র চা না খেলে ওর মাথা খেলে না, আজও।

পিণ্টু আর কিট্টু মাসতুতো ভাই। তাদের বাবারা চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়েছেন। যেখানে থেকেছেন, ভাড়া বাড়িতেই থেকেছেন, আর নিজের একটা বাড়ি তৈরি করার স্বপ্ন মনের কোণে সযত্নে লালন করেছেন। সব জায়গায় ভাল ইস্কুল ছিল না বলে তাদের কৈশোরেই তাদের মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় আর সেখান থেকেই তারা ইস্কুলের গণ্ডি পেরোয়। সেই মামার বাড়ি ছিল এক প্রাচীন মফসসল শহরে, আর বাড়িটা ছিল দুশো বছরের পুরনো। শহরের মাঝখানে সেই বাড়ির প্রতিটা ঘরের সঙ্গে ছিল লাগোয়া ছাদ আর অনেক অনেক গল্প। অনেকের সঙ্গে বড় হয়ে তারা ইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে অন্য শহরে পড়তে গেল, কিন্তু তাদের বাড়ি বলতে সেই মামার বাড়ির স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে তাদের বাবারা নিজেদের বাড়ি বানালেও সেই বাড়ি কোনওদিন পিণ্টুর আর কিট্টুর হয়ে ওঠেনি। তাদের কাছে তাদের মামার বাড়ি-ই তাদের শৈশবের শিশুশয্যা আর যৌবনের উপবন থেকেছে, তাই সুযোগ পেলেই সেই মামার বাড়িতে ফেরত যেত তারা। এরপরে জীবিকার জন্য একসময়ে তারাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, আর সেই কারণে যেতে পারত না সেই স্মৃতির শহরে, স্মৃতির বাড়িতে। যখন সময় পেল, আর দুই ভাই ফেরত গেল অনেক পরিকল্পনা করে, সেখানে কয়েকদিন থাকার বাসনা নিয়ে— তারা ফেরত গিয়ে দেখল সেই বাড়ির খোলনলচে বদলে গিয়েছে আর সেই বাড়ির অর্ধেক অংশ এক বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা— টোটো আর রিকশার পার্কিং স্থান। এই বাড়িতে যে শরিকি সড়কি ছিল, সেটা তারা জানত না। তাই পিণ্টু আর কিট্টুর ‘বাস্তু’ বলে কিছু রইল না, যা থাকল— সেটা পুরোটাই স্বপ্নে আর স্মৃতিতে। প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে স্মৃতির জায়গাগুলোয় পা ফেলতে গিয়ে পায়ে কাঁটার খোঁচা খেয়ে পা গুটিয়ে বাবু হয়ে বসে স্মৃতিচারণ— ‘তোর মনে আছে, ছাদের সিঁড়ির ওই কুলুঙ্গিতে…।’ এরা কি বাস্তুহারা নয়? 

এক সান্ধ্যকালীন আড্ডায় আমরা যখন সেই সময়, এই সময়, বেলা অবেলা কালবেলা আর ছোটবেলার দিনগুলোয় ফিরে যাওয়া নিয়ে আড্ডায় মশগুল, এক বন্ধু (নাম বিশেষ কারণে উল্লেখ করছি না) এক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল।  এই বন্ধুর উত্তর কলকাতার বাড়িতে আমাদের বিস্তর আড্ডা বসত। সেই ভাড়া বাড়ি ছেড়ে তারা নব্বই দশকের গোড়ায় নিজেদের বাড়িতে চলে যায় আর স্বাভাবিকভাবেই সেই পুরনো পাড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার সেই অভিজ্ঞতা  উত্তম পুরুষেই বলছি, কারণ এটা হয়তো তার একার গল্প নয়, যিনি এই লেখাটা পড়ছেন, তাঁরও গল্প।

“অফিসের একটা ছেলের বিয়ের রিসেপশনে নেমন্তন্ন ছিল। সপরিবার। ছেলেটা শুনেছি উত্তর কলকাতার, আর আমার বেশ স্নেহভাজন, তাই না করতে পারিনি। অনুষ্ঠান বাড়ির ঠিকানা খেয়াল করিনি, বাড়ির নামটা বেশ সুন্দর আর গুগল ম্যাপ দিয়ে দিয়েছিল। গিন্নি আসতে পারেনি শেষ মুহূর্তে, তাই বাপ আর মেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মেয়ে পিছনে বসে কার্ডে আঁকা লোকেশন ম্যাপ স্ক্যান করে আমাকে navigate করছিল আর আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম। একসময় দেখি আমি আমার পুরনো পাড়ায় পৌঁছে গিয়েছি। মেয়ে যেখানে গাড়ি থামাতে বলল, সেখানে Vallet parking-এর সুবিধে ছিল, তাই পার্কিং নিয়ে চাপ না নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে একটু হেঁটে এগিয়েই থমকে গেলাম। যে-বাড়িটায় অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেটা আমার পুরনো বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িটা। সাহেবি কেতায় তৈরি যে বাড়িকে লোকে ‘কুন্ডু বাড়ি’ বলে জানত। জানতাম না, সেই বাড়ি কবে বিক্রি হয়ে গিয়েছে আর এখন অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভাড়া দেওয়া হয়। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। এক সময়ে এই বাড়ি আমার ভীষণ পরিচিত ছিল। আমার শৈশবের বিকেলগুলো ওই বাড়িতে কেটেছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর বাদে সেই বাড়িতে ঢুকে উপহার হাতে তুলে দিয়ে কিছু লৌকিকতা সেরে কেমন একটা স্বপ্নতাড়িত হয়ে বাড়ির মধ্যে হাঁটতে লাগলাম। কনে যেখানে বসেছিল, সেটা তো নটেকাকার ঘর ছিল! পাশে গ্যাঁড়াজ্যেঠুর ঘর। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে বৈঠকখানায় গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে অভ্যাগতরা অনেকে বসে গুলতানি করছেন। মেঝের মোজাইক আর জানালার খড়খড়ি একইরকম রয়ে গিয়েছে। এই ঘরে বাড়ির গিন্নি পানের ডাবা নিয়ে বসতেন দুপুরে। আর আমি জানলার পাশের ধাবিতে বসে খড়খড়ি নিয়ে খেলতাম। পরম মমতায় সেই খড়খড়িতে হাত বুলিয়ে দিলাম। আমার মেয়ে অবাক হয়ে আমায় দেখছিল। একসময়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এই বাড়িতে আগে এসেছ, না!’ হেসে ঘাড় নেড়ে আমি আস্তে আস্তে সামনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বাড়ির সামনে লম্বা ড্রাইভ-ওয়ের ডানদিকে অন্ধকারে যে-বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, সেই বাড়ির দোতলায় আমার তিন বছর বয়স থেকে তেইশ বছর বয়স অবধি কেটেছে। কানে এল ছোটদির গলা, ‘দেখো মা, বাবু পড়ার বইয়ের তলায় শুকতারা নিয়ে পড়তে বসেছে।’ মা-র গলা কানে এল, ‘তোমার বাবা অফিস থেকে ফিরুন, তোমার আজকে হচ্ছে!’ কানে এল রেডিওতে বিবিধ ভারতী-র গান। মা বলছেন ‘ওপরের জেঠিমাকে বলো পাম্প চালাতে, কলে জল নেই যে!’ জেঠিমা বলে উঠলেন, ‘নাঙ্কু, পাম্পটা চালিয়ে দে!’ ঝাপসা দেখলাম, পাশের গলিতে বাবার মতো কেউ একজন ব্রিফকেস হাতে আমাদের সেই বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। ঘড়ির কাঁটা যদিও বেশ গড়িয়ে গিয়েছে, তবু যেন কানে শাঁখের আওয়াজ কানে এল। চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে এসেছে বুঝিনি, চল্লিশ পেরলেই চালসের জন্য, না কি অন্য কোনও কারণে? জানিস, আমি এখনও স্বপ্নে আমাদের ওই বাড়িতে ঘুরে বেড়াই। যে-বাড়িতে এখন থাকি, সেখানে তিরিশ বছর কাটিয়ে ফেললাম। কিন্তু যে-বাড়িতে আর ফেরত যাওয়ার উপায় নেই, সেই হারিয়ে যাওয়া বাড়ি বারবার স্বপ্নে ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া মানুষজনের সঙ্গে। স্বপ্নে কিন্তু আজকের বাড়ি আসে না। বাস্তু আসলে কোনটা রে আমার?”

কিন্তু লাব্বু, টুঙ্কু, ধৃতিমানরা সংখ্যাতে লাখে কয়েকজন। যেমন লিনি। আমেরিকার নিউ জার্সিতে রয়েছে গত তিন দশক। প্রত্যেক বছর কলকাতায় আসে শহরের টানে। মা-বাবা-ভাই সবাই চলে গিয়েছে, বাড়ি এখন প্রায় ধ্বংসস্তুপ, তাই এসে মধ্যমগ্রামে তার মাসির বাড়িতে ওঠে কিংবা হাওড়ায় শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু বারবার ফেরত যায় উত্তর কলকাতায় তার পুরনো পাড়ায়। বাড়ির দেওয়াল আর দরজা ছুঁয়ে দেখে। হারিয়ে যাওয়া বাস্তুর স্পর্শ নেয় বারবার। পটাই বিদ্যাসাগর স্ট্রিটের পাশের গলিতে পুরনো পাড়ায় গিয়ে দেখে বাড়িগুলো চেনা আর বাকি সব অচেনা, মানুষ থেকে মানসিকতা, সব। তমাল বাস্তুর খোঁজে রবিবারের সকালে ক্রিক রো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ডাক্তার লেন পৌঁছয়। সেখান থেকে এন্টালি বাজার। তার ছেলেবেলায় অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বাড়ির হেঁশেলের বাস আর প্রার্থনার সুর, দূরদর্শনে প্রচারিত রামায়ণ, মহাভারতের সুরের সঙ্গে আর হিং ফোড়নের বাসের সঙ্গে মিশে এক অনির্বচনীয় পরিবেশ তৈরি করত আর তাতে বুঁদ হয়ে তমাল যে-পথে হেঁটে যেত, সেই পথে আজ বাড়িগুলো চেনা, মানুষ অচেনা, ভাষা দুর্বোধ্য। হাওয়ায় শুধু ধর্মান্ধতা আর অসহিষ্ণুতার সুর। দুপুরে শ্রান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতে বিজয়া মুখোপাধ্যায় মনে এসে যায়— 

‘বাড়ি ফিরে দেখি বাড়িতে বাড়ি নেই
একটা বড় দরজা
কয়েকটা বখাটে জানালা।
নড়ে চড়ে জিগগেস্ করল।
কাকে চাই?
ভেবে দেখতে হবে কাকে চাই।
বাড়ি ফাঁকা, বাড়িতে বাড়ি নেই।
কাঠের চেয়ারে ভাড়াটের মত
অনাহুত অতিথির মত
বুঝে ফেলি।
চোখে দ্বিধা, পায়ে ভর কম।’

ওই যে প্রথমে বললাম, ‘সুখনিবাস-যোগ্য স্থান’-ই বাস্তু। শুধু রাজনৈতিক কারণে বাস্তুহারা নয়, হাজারে-হাজারে, লাখে-লাখে যে-সব মানুষ নিজেদের শৈশবের/কৈশোরের/যৌবনের সুখের নিবাস থেকে ঠাঁই-নাড়া হয়েছে, তাদের সুখনিবাস থেকে বিতাড়িত হয়েছে, ছিটকে পড়েছে শহরের, দেশের, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তরে— তারাও কি বাস্তুহারা নয়!