উত্তর কলকাতার কবি

২০২৫-এর ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কারের জন্য বাংলা থেকে নির্বাচিত হলেন কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘‘দে’জ পাবলিশিং’’ থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইটির জন্য। ‘বালি ও তরমুজ’ থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রাপথ, সেই ১৯৮৩ সালে, চার দশকের বেশি সময়ের কবিজীবন যাবৎ তা কেবলই উজ্জ্বল হয়েছে। ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’, ‘গুপ্তদাম্পত্যকথা’-সহ বিবিধ কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতার ইতিহাসের আখরে রয়ে যাওয়ার মতো। ‘উন্মেষগোধূলি’, ‘রামলীলা ময়দান’ থেকে ‘টুরিস্টকাহিনী’— প্রসূন বন্দ্যেপাধ্যায় স্বতন্ত্র হয়ে থেকেছেন বাংলা কাব্যভুবনে। ‘ভাষাত্মদর্শন’-এর মতো নিবিড় দর্শনের গ্রন্থও তাঁর সাহিত্যকীর্তির অভিজ্ঞান। সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পাওয়ার প্রেক্ষিতে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনে অভীক মজুমদার। সাক্ষী রইল ডাকবাংলা.কম

প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি শুনেছি ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ আপনার পূর্বপুরুষ, আপনার কবিতায় সবসময়ে একটা নাটকীয়তা থাকে। যেন একটা সংলাপ চলছে। সেটা নিজের সঙ্গেও হতে পারে, বাইরের কারও সঙ্গেও হতে পারে। কবিতায় এই নাটকীয়তার অনুপ্রবেশ কি উত্তরাধিকার সূত্রেই?

এটাকে সম্ভবত উত্তরাধিকারই বলা চলে। আমার অধিকাংশ কবিতাগুলোই যেন আমি বলছি না, অন্য কেউ বলছে। বেশিরভাগ সময়েই তাই ঘটে। আবার, আমিও আছি তার মধ্যে, কিন্তু মাঝে-মাঝে আমার সেই থাকা।

মানে আপনি বলতে চাইছেন চরিত্র ঢুকছে আর বেরিয়ে যাচ্ছে?

হ্যাঁ, একদম তাই। আমার কবিতায় চরিত্রের ক্রমাগত অনুপ্রবেশ আর প্রস্থান আছে। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ ভয়ংকরভাবে  আছেন তার মধ্যে। ওঁর শতবর্ষ পালিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। সে-সময়ে আমি নিমতিতা গিয়েছিলাম। নিমতিতা মুর্শিদাবাদের একটি গ্রাম। সে-গ্রামের বড় একজন মুরুব্বি মহেন্দ্র রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদের ভক্ত। তখন আমার ৭-৮ বছর বয়স। ওইখানে গিয়ে আমি ‘আলিবাবা’ নাটকটির কিছু অংশ পড়েছিলাম, সবাই খুব খুশি হয়ে প্রশংসা করেছিলেন। তখন থেকেই হয়তো আমার মধ্যে এই ব্যাপারটা রয়ে গেছে। তবে এটা কখনওই বলা যাবে না— ক্ষীরোদপ্রসাদের উত্তরাধিকার সূত্রেই আমি কবিতা লিখতে এলাম। বরং নাটকীয়তা ও সংলাপধর্মিতাকেই একটা প্রভাব হিসেবে ধরা যেতে পারে।

ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ

আপনি কীভাবে সম্পর্কিত ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের সঙ্গে?

আমার প্রপিতামহ ছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ। আমাদের আদি বাড়ি হরলাল মিত্র স্ট্রিট-এ। আমরা ওখানেই আগে থাকতাম। সেটা ক্ষীরোদপ্রসাদের-ই বাড়ি ছিল। কিন্তু ছ’য়ের দশকে ভারত-চিন যুদ্ধের সময়ে মিলিটারিদের যাতায়াতের রাস্তা তৈরির জন্য, সেই বাড়িটি ভাঙা পড়ে। তখন আমাদের বর্তমান ঠিকানায় উঠে আসতে হয়। গিরিশচন্দ্র ঘোষ-এর বাড়িটির অবস্থান বর্তমানে ঠিক যেমন রাস্তার মাঝখানে। ক্ষীরোদপ্রসাদ-এর বাড়িটিও ঠিক সেরকম রাস্তার মাঝবরাবর এক অবস্থানে ছিল। গিরিশচন্দ্রের বাড়িটিও কিন্তু আদি অবস্থায় নেই। বর্তমানে যে চেহারা আমরা দেখি, সেটা নেহাত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখা।

আমরা আজকের আড্ডায় তিনটি পর্বে কথা বলব প্রসূনদা। আপনার কবিতা লেখা, দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধ ও অন্যান্য লেখালেখি। তার আগে যদি একটু বলেন আপনার তুলনামূলক সাহিত্য পড়তে আসা কবে, কীভাবে?         

স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে থেকে বিএ অনার্স নিয়ে ইংরেজি পাশ করার পর মনে হল— ইংরেজি পড়ে আর কী হবে! কিছুই হবে না। তখন আমি যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়তে গেলাম। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন নরেশ গুহ। সে-সময়ে অমিয় দেব, নবনীতা দেবসেন, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত প্রমুখ বিভাগে পড়াচ্ছেন। শিবাজী (বন্দ্যোপাধ্যায়) আমার সহপাঠী ছিল, অনেক অলিগলি ঘুরেছি ওর সঙ্গে। শিবাজী খুব সচেতনভাবেই পড়তে এসেছিল। কিন্তু আমি তুলনামূলক নিয়ে পড়া শেষ করিনি। মাঝে স্কুলে চাকরি করতে ঢুকে যাই। মোট চারটে স্কুলে আমি পড়িয়েছি। সব শেষে পড়াই বাগুইআটির একটি স্কুল— চিত্তরঞ্জন কলোনি হিন্দু বিদ্যাপীঠে। সে-চাকরিটা পাই ১৯৮৫ সালে।

আপনার স্কুলজীবন কোন প্রতিষ্ঠানে?

মহারাজা কাশিমবাজার পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে।

সমর সেন যেখানে পড়তেন?

হ্যাঁ, সমর সেন পড়তেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়তেন।

বাবা! তাহলে তো কবিদের স্কুল! আচ্ছা, আপনার কবিতা লেখার শুরু কোন সময় থেকে?

এটা এভাবে বলা মুশকিল, কিন্তু ওই ১৬-১৭ বছর বয়স থেকে আমি কবিতা লিখতে শুরু করি। প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৮ বছর বয়সে। কবিতাটা কিন্তু ১৭ বছর বয়সে লেখা। সেই কবিতা আমি আর খুঁজে পাইনি, কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছে… ১৯৭৪-এ ছাপা হয়েছিল। এই কবিতাটা ধরলে ছাপার আকারে, আমার ১৭ বছর বয়স থেকে লেখার শুরু।

‘বালি ও তরমুজ’ অনেক পরে বেরল, প্রচ্ছদ করেছিলেন নন্দিনীদি (বন্দ্যোপাধ্যায়)। উৎসর্গে লেখা ছিল ‘ঝুপ্পি আর বন্ধুদের’। তখন প্রথম আমরা আপনার কবিতা পড়ছি। বইটা আমাদের কাছে ‘এল ডোরাডো’। ‘বিপ্রদাস এসো, ভাই মধুপুর মধুপুর খেলা করি’— উত্তেজনাময় সে-সব দিন। এই বইটা যখন বেরচ্ছে, আপনি সমকালীন কবিতাকে কী চোখে দেখছিলেন?

সমকালীন কবিতাকে আমার খুব জরুরি বলে মনে হচ্ছিল, এবং খুব ভাল লাগছিল। রণজিৎ দাশ, গৌতম চৌধুরী, মৃদুল দাশগুপ্ত, একরাম আলি প্রমুখ সকলেই খুব জরুরি কবিতা লিখছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই আমার বইটিকে কিছুটা হলেও আলদা বলে মনে হয়েছিল। কোথায় আলাদা, সেটা আমি বলতে পারব না। এই বইয়ের কবিতাগুলো ১৯৮০ সালের আগেই লেখা, বইটা বেরিয়েছিল ১৯৮৩ সালে।

প্রসূনদা, আপনি প্রথম বইতেই নিজের কবিতার ভাষা পেয়ে গেলেন, এই বইতে যেমন নকশালবাড়ি আন্দোলনের ছায়া রয়েছে, পাশাপাশি দ্বিধা, পালিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতাও আছে, একইসঙ্গে প্রকট হয়ে আছে নিজের সঙ্গে তর্ক এবং একটা সন্ধান। ‘বিপ্রদাস, ভাই আমি দেখতে চাই একজনের খেলা/ আরেক জন খেলতে পারে কি না’— এর মধ্যেই বিষয়টা নিহিত। এ নিয়ে কিছু যদি বলেন…

‘বালি ও তরমুজ’ বইটা খুবই জরুরি। এটা তুমি ঠিকই বলেছ যে—নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রতি একটা গভীর অনুভব আমার আছে, আবার আন্দোলন করে যে আদপে কিছু হয় না— সেটা আমি তখন থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে একটা অদ্ভুত খেলা লক্ষ করতাম। আমার কাছে খেলাটা আমার মতো করেই আছে, একজনের খেলা অন্যজন খেলতে পারে কি না এটা আমার একটা প্রশ্ন, যা আমি এখনও লালন করি নিজের ভেতরে। এই ‘খেলা’-র জায়গাতেই আমার কবিতাটি আটকে আছে।

এই বইটার পর থেকে আপনি আবার নতুন বাঁক আনছেন কবিতায়। আমার পাঠক হিসেবে মনে হয়, ‘উন্মেষগোধূলি’ কাব্যগ্রন্থে এসে এই বাঁকটা আরও প্রকট হচ্ছে। ‘বালি ও তরমুজ’-এর ‘কার্তুজ’ এবং ‘উন্মেষগোধূলি’র চিত্রকল্পগুলো এক নয়। আবার তার পরের বইতে সেগুলো আলাদা হয়েছে। এই যাত্রাপথটা ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’-য় এসে চূড়ান্ত রূপ নেয়। এর পর আপনার কবিতা যেন ‘সমাজসচেতন আধ্যাত্মিকতা’র দিকে চলে যায়।

 খুব জটিল শব্দ ব্যবহার করলে…

সাধারণভাবে আমরা যাকে ‘আধ্যাত্মচেতনা’ বলি, তার থেকে নিশ্চয়ই আলাদা, নইলে ‘মওলা হনুমান’-এর মতো কবিতা লেখা যায় না। আপনি যদি এই যাত্রাপথটা নিয়ে বলেন…

এটা জটিল প্রশ্নই হয়ে গেল। এ এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিকতা। ক্ষীরোদপ্রসাদেই এর সূত্র নিহিত। নিমতিতা-তেই একটা মাঠে, কোনও এক অনুষ্ঠানে ক্ষীরোদপ্রসাদ গিয়েছেন। মাঠে মুসলমান শ্রোতাদের জমায়েত হয়েছে। এদিকে ক্ষীরোদপ্রসাদ নিজে ব্রাহ্মণ। জমায়েত থেকে গুঞ্জন শুরু হল, কেন একজন ব্রাহ্মণ বলতে উঠেছে এই মর্মে! কিন্তু ক্ষীরোদপ্রসাদ যে-ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা অসাধারণ! বলেছিলেন, ‘ওঁ ভগবতে মহম্মদায় নমঃ’…

ওই সময়ে! উনিশ শতকে?  

হ্যাঁ, এটা শুনেই গোটা মাঠ চুপ করে গেল। তারপরে উনি একে-একে গীতা-কোরানের বক্তব্য বলতে লাগলেন। ১২ কিংবা ১৩ মিনিটের একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সারা মাঠ মুগ্ধ হয়ে শুনেছিল। সেটা আমার কাছে খুব বড় একটা ব্যাপার। ধ্যানবিন্দু প্রকাশিত ‘লালন’ বইয়ের ভূমিকায় আমি এই ঘটনার উল্লেখ করেছিলাম। তারপর আমার আধ্যাত্মিকতাটা এই খাতেই বয়ে গেছে, যা সমাজসচেতন তো বটেই, কিন্তু আধ্যাত্মিকতাকে বহন করেই চলছে।

বলা যায় বিভাজিত নয়, এটা সমন্বয়বাদী আধ্যাত্মিকতা…

হ্যাঁ, ঠিক তাই।

কবিতার ক্ষেত্রে ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ একটা মাইলফলক। এখানে ‘উত্তর কোলকাতা’ তো একটা রূপক। এ-নিয়ে যদি বলেন।         

উত্তর কলকাতার কবিতায় এসে আমার কবিতা একটা চূড়ান্ত রূপ পেল। এখানেই ‘আমার মেয়ের বিয়ের ঝলমলে’ কবিতায় ঠাকুরকে বিরিয়ানি ভোগ খাওয়ালাম, লিখলাম, ‘প্রাণভরে খেয়ে যাও আর আশীব্বাদ করো… আমাদের নাস্তিকতা যেন বেঁচেবর্তে থাকে।’ নারায়ণ শিলাকে বিরিয়ানি খাওয়ানোর কথা কেউ কিন্তু বলেনি কোনওদিন এভাবে।  

এবং সমগ্র ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ জুড়েই কিন্তু লোকের আনাগোনা চলতে থাকে। আমাদের চারপাশে যে-লোকগুলোকে আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই, তাঁদেরকেই দেখি। এই লোকগুলোকে আপনি নাটকের মতো দেখাচ্ছেন, তারা কবিতায় আসে, সংলাপ বলে এবং বেরিয়ে যায়।

হ্যাঁ, সরাসরি নাটকের প্রসঙ্গ এনে একটা কবিতাও আছে। কবিতাটার নাম— ‘যদি সত্যি নাটক হয়’। যার শুরুতে লিখছি, ‘লাস্ট সিনে… যদি সত্যি নাটক হয়… মঞ্চে নেমে আসবে/ এক গভীর বিষণ্ণতা…’ শেষে লিখছি, ‘দ্যাখ যদি পছন্দ হয় তো সাফসুফ বল নইলে মাইরী বলছি অন্য…’

এ এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিকতা। ক্ষীরোদপ্রসাদেই এর সূত্র নিহিত। নিমতিতা-তেই একটা মাঠে, কোনও এক অনুষ্ঠানে ক্ষীরোদপ্রসাদ গিয়েছেন। মাঠে মুসলমান শ্রোতাদের জমায়েত হয়েছে। এদিকে ক্ষীরোদপ্রসাদ নিজে ব্রাহ্মণ। জমায়েত থেকে গুঞ্জন শুরু হল, কেন একজন ব্রাহ্মণ বলতে উঠেছে এই মর্মে! কিন্তু ক্ষীরোদপ্রসাদ যে-ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা অসাধারণ! বলেছিলেন, ‘ওঁ ভগবতে মহম্মদায় নমঃ’…

কিন্তু নাটক সামগ্রিকভাবে আছেই, আছে ‘গঙ্গাধ্‌ধার’ ও পারিপার্শ্বিক চরিত্রগুলো। বর্তমান সময়ে বৌদ্ধিক জগতে কার্টগ্রাফির অর্থাৎ মানচিত্রবিদ্যার গুরুত্ব উঠে আসছে। বলা হচ্ছে, যে-কোনও মানুষের চিন্তাজগতে, ইতিহাসের তুলনায় ভূগোলের গুরুত্ব ও প্রভাব বেশি। বাংলা কবিতায় এই প্রথম কবির চেতনার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে উঠে এল ভূগোল।

হ্যাঁ, বাংলা কবিতার জগতে সচেতনভাবে ভূগোলচেতনা ও আবেদনের প্রয়োগ ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’-তেই প্রথম। এখানে প্রথম কবিতাটিতেই আছে—

‘অতিকাল যাও… আমার অপর এই গঙ্গাধ্‌ধারে
বটবৃক্ষমূলে দ্যাখো গামছা পেতেছে… বাঁকুড়ার
গোলাপী গামছা… আহা কী শীতল… অতিকাল
যাও… ওকে একটু শুতে দাও বিরক্ত কোরো না…
ক্ষমতা বাচনে ঘেরা সমসত্ত্বা থেকে দূরে
ঐ গামছাটি পাতা… যাবতীয় মাধ্যমের
উদ্বেজনা থেকে দূরে ঐ গামছাটি পাতা…
বাগবাজারের গঙ্গাধ্‌ধারে পক্ষীবিষ্ঠাময় কোনো
বটমূলে বাঁধানো চাতালে… থামো অতিকাল…
দূর থেকে গামছাটিকে প্রণাম জানাও’

এর মধ্যে দিয়ে আমি সরাসরি ভূগোলের মধ্যে ঢুকে গেলাম।

এবং আপনি বললেন, ‘আমার লাগে না ভাল তর্কসভা আর/ দেশ দশ ভালোমন্দ… ইতিহাসভার/ বরং উৎসবে ভাসি মানুষের ভীড়ে/ বাজিয়ে পাতার ভেঁপু পূরবী সমীরে’ অর্থাৎ তত্ত্ব থেকে নিষ্ক্রমণই আপনি চাইছেন, কিন্তু দৃশ্য দিয়ে কথাটা বলছেন।  আপনি পরের কবিতার বইগুলোতেও দৃশ্য দিয়েই কথা বললেনন। অথচ সমান্তরালভাবে আপনি তত্ত্ব-দর্শনের প্রবন্ধ লিখছেন। এবং সেখানে সোশিও মিনিং আর কগনিটিভ মিনিংকে আলাদা করছেন। ‘খিচুড়ি চাপাও বঁধু খিচুড়ি চাপাও’ তো কেবল দৃশ্য নয়! আড়ালে রয়েছে তত্ত্ব। কিন্তু কবিতার ভাষা হিসেবে আপনি দৃশ্য তথা সাধারণ জীবনের গল্পকেই বেছে নিলেন। এই দুই সত্তা আপনি একত্র করেন কীভাবে?

আমার স্পষ্টতই মনে হয়, সোশিও মিনিং আর কগনিটিভ মিনিং এক নয়। কবিতায় যে একসঙ্গে সোশিও আর কগনিটিভ মিনিং থমকে আছে, সেটা আমার হাতযশ হতে পারে। কিন্তু আমি যখন প্রবন্ধ লিখছি, আমি সোশিও মিনিংকেই গুরুত্ব দিয়েছি, কগনিটিভ মিনিংকে নয়। সেখানে আমি রাসেল-মার্ক্স-এর মতো তাত্ত্বিককে সবসময়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছি। ‘ভাষাত্মদর্শন’ বইটা এই মৌলিক প্রশ্ন করে।

এই বইতে আপনি এও  বলেছেন যে মার্ক্স-এর দর্শনের সময়ে অনেকক্ষেত্রে বিষয়মুখী ভাবনা কাজ করে। ভীষ্মদেব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আপনার আলাপ-আলোচনার কথাও আপনি সেখানে নিয়ে এসেছেন। এই সূত্রেই আপনি আবার রবীন্দ্রনাথে আসছেন। এই ভাবনাটা প্রসঙ্গে যদি বলেন… রবীন্দ্রনাথ কেন এতদিন পরে?

রবীন্দ্রনাথ তো সব সময়েই আছেন ভাই। রবীন্দ্রনাথ এই জায়গাটা শক্তভাবে ধরে আছেন। রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। আমার কগনিটিভ মিনিং খোঁজাতেও রবীন্দ্রনাথ এক নম্বরেই আসছেন। কিন্তু তাঁকে আমি সবসময় দেখাই না। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা বইটাও শেষ হচ্চেহ ‘পূর্ণস্য পূর্ণমাদায়’ দিয়ে। অর্থাৎ একটা পূর্ণচিন্তা সব সবময় ঘিরে থাকছে, এই পূর্ণতার বোধ আমার কবিতাতেও এসেছে। আমি মৃত্যুতে বিশ্বাস করি না, জীবনমুক্তিতে বিশ্বাস করি। ফলত আমার কবিতা এবং দর্শনচিন্তা শেষ পর্যন্ত আলাদা থাকে না। আমার কবিতায় প্রাত্যহিকতাকে একটা চিরন্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাই। সেটা দৈনন্দিনতার মধ্যেও আছে, আছে বেড়াতে যাওয়ার মধ্যেও।

দৈনন্দিন থেকে পাহাড়-জঙ্গলের মতো একটা বড় স্পেসে নিজেকে নিয়ে যাওয়া, এবং সেখান থেকেই কি ‘টুরিস্টকাহিনী’-র সূত্রপাত?

‘টুরিস্টকাহিনী’ আমি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরে লিখেছি। অবসর নেওয়ার আগে ও পরে দু’পর্বেই লেখা হয়ে চলেছে। এটা লেখার পর আমার বিরাট একটা ক্লান্তি এল। মনে হল এটাতেই তো আমার যা বলার ছিল, শেষ হয়ে গেল। আবার আমি কী লিখব? আমার কিছু লেখারই নেই আর। তারপরেই আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমি মনে করি, ‘টুরিস্টকাহিনী’ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখা। এবং সে-কারণে আমি মনে করি এটাই আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই। এর পরে আর কিছু সেরকম লিখিনি, যা লিখেছি, সেটাকে আগের লেখাকেই ঘষামাজা বলা চলে।

গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত আপনার ‘রাধাতপা চতুর্দশী’ বইটা কখনও প্রকাশিত হয়নি কেন? কখনও দেখিনি একটা অপ্রকাশিত বই কাব্যসংগ্রহের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। এর কারণ কী?

কেন বেরয়নি, সেই কারণটা এখন আর বলতে পারব না, হয়তো দিইনি কোনও প্রকাশককে। কিন্তু ওটাকে আবার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র মধ্যেও নিয়ে আসতে পারিনি।

একসময়ে আপনি সক্রিয়ভাবে ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আপনার বইপত্র প্রকাশের ইতিহাস দেখলেও এ-বিষয়ে আন্দাজ পাওয়া যায়। আপনি বা আপনাদের প্রজন্ম যেভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলেছেন, সে-নিয়ে আজকের একজন তরুণ কবিকে কী বলবেন?

আমরা যেভাবে এই আন্দোলন করেছি, এখনকার ছেলেমেয়েদের পরিস্থিতি সঙ্গে তা মিলবে না। তবে একদম প্রথম সারির কোনও পত্রিকার তাঁরা লিখবেন না, এটা আমি বুঝি। আমরা যেভাবে আন্দোলনটা করেছি, সেভাবে করলে আন্দোলনটা এখন বেঁচে থাকবে না। যে যেখানেই যাক না কেন, একটা নির্দিষ্ট অবস্থান থাকা জরুরি। এখন যারা প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন করবে, তাদের সেকথা মাথায় রাখা জরুরি।

পুরনো ‘অভিমান’-এ আমরা আপনার ‘কার্তুজ’ পড়েছিলাম যখন, সেই তখন থেকেই দেখছি, আপনার কবিতার প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দের পরিবর্তে আপনি নিরূপিত ছন্দ হিসেবে গদ্যস্পন্দ বা ভাঙা অক্ষরবৃত্তকে বেছে নিলেন কেন?

প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দে আমার যে লেখা নেই, তা তো নয়, ‘বালি ও তরমুজ’-এই আছে। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে তা গদ্যছন্দ-রূপে কবিতার বক্তব্যর জন্যই আবশ্যক হয়ে উঠেছে।

এটা কি একটা ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা’-র অঙ্গ?

আমার মনে হয় না, এটাকে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বলা যাবে, এটা লেখারই একটা অঙ্গ, বৈশিষ্ট্য কিংবা অভ্যেস হিসেবে থেকে যাবে।              

তাহলে কি ‘বাক্‌স্পন্দ’-কে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য?

এটা আমার পক্ষে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়, হয়তো-বা তাই…

আপনার আগের প্রজন্মের কবিদের মধ্যে কাদের আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?

আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় উৎপলকুমার বসুর লেখা। ‘পুরী সিরিজ’ আজও বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই, তবে এই একটি বইয়ের জন্যই উৎপলকুমার বসুকে আমার পছন্দের তালিকায় রাখব তা নয়, অন্য বইও সেই তালিকায় আছেন। উৎপলকুমার বসু যখন লিখতে এলেন, বিস্মিত করে দিলেন! আমার সমসাময়িকদের মধ্যে, কাছের মানুষের মধ্যে রণজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্ত, গৌতম চৌধুরীর কথা বলতে পারি। এছাড়া কিছুটা শক্তি চট্টোপাধ্যায় আছেন, ভাস্কর চক্রবর্তী আছেন।

এর মধ্যে ভাস্কর চক্রবর্তীই বোধহয় একমাত্র, যিনি জীবদ্দশায় কোনও স্বীকৃতি পেলেন না! কিন্তু যত সময় যাচ্ছে ভাস্করদা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছেন…

হ্যাঁ, এখন খুবই জরুরি হয়ে উঠছেন ভাস্কর। অথচ কোনও পুরস্কারই, এমনকী, কৃত্তিবাস পুরস্কারও পাননি ভাস্করদা।

লিট্‌ল ম্যাগাজিন আন্দোলন এবং এখনও যাঁরা লিট্‌ল ম্যাগাজিন করে যাচ্ছেন তাঁদের কী বলবেন আপনি?

আমি বলব এই করে যাওয়াটাকে বজায় রেখে যেতে হবে। কোনও খারাপ কাজ করছে না তাঁরা। এবং লিট্‌ল ম্যাগাজিন-এর বিষয় এখন ডিজিটাল মাধ্যমে নানাভাবে প্রকাশ পেলেও, পত্রিকাটাকে রেখে যেতে হবে। হয়তো ডিজিটাল মাধ্যমে বিষয় আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়বে, কিন্তু পত্রিকা যে-ক’জন মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে ছড়াবে, তাঁরা খাঁটি পাঠক।  হয়তো কয়েকটি কবিতাই থাকবে তাতে, কিন্তু তাই ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের লেখা তো তৎক্ষণাৎ ছড়ায়নি, কিন্তু সেভাবে না ছড়িয়েও আমার কবিতা তো ছড়িয়ে পড়ল।

একেবারে নতুন যে লিখতে এসেছে, তাঁকে আপনি কী বলবেন?

আমার একটি কবিতা আছে এই বিষয়েই সরাসরি। আমার মনে হয় সেই কবিতাটাই উদ্ধৃত করা যায়।

তরুণ কবিকে

ঘোলাজল… আদিম বচন

এ জলে প্রলুব্ধ হয়ে যারা আজ শিকারে নেমেছে
তারা নয় জাত ধীবর তাই তারা কেউই
রূপ ও রহস্য মৎস্য টেনে তুলতে পারবে না ডাঙায়
তাদের জালের টানে উঠে আসবে দেদার হাঙর

অবশ্য হাঙরের ফিসফ্রাই খেয়ে মুগ্ধ হওয়ার পার্টিও
কিছুই কমতি নেই এ ভবসংসারে… তারা তুলুক ঢেঁকুর
তবু এতে রসনাশিল্পের
বড় কোনো ক্ষতি হতে পারে বলে মালুম হচ্ছে না

তা সত্ত্বেও এই কোলাহল…
হুটোপাটি পাঁক মাখামাখি….
হে ধীবর এরই মধ্যে তোমাকেও ধরতে হবে নিজস্ব রূপোলি
কেবল মৎস্যতত্ত্বে মন দাও… দেখো
পাঁক তোমাকে স্পর্শ করবে না
সহ্য করো সহ্য করো
সত্য এমন নয় যে সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠবে
চলমান সময়ের লিটমাস কাগজে

আপনার ভাষা ব্যবহারে দেখা যায়, কোনও ছুঁৎমার্গ নেই। আপনি বাংলা ভাষার বেশ কিছু অচল শব্দকে যেন প্রাণ দিলেন। তার মধ্যে বিশেষত আরবি-ফারসিও রয়েছে। এই প্রবণতা আপনার প্রপিতামহ, মানে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে। আপনার ভাষাভাবনা একদিকে ‘ভাষাত্মদর্শন’, অন্যদিকে ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’। ভাষার দর্শনের পাশাপাশি ভাষার ঐতিহ্য, বিকাশ ধরা পড়ছে সেখানে। এটা কি সচেতনভাবেই?

এটা কিন্তু আলাদা কোনও ফর্ম নয়। এই ফর্মটা ভেতরে ছিলই। তাই সচেতনভাবেই এটা ব্যবহার করা। চতুর্দশপদী-র কাঠামো যেমন আছে, তাকে আমি ভেঙেও দিয়েছি। আর বঙ্গীয় চতুর্দশপদী জড়িয়ে ছিল বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের আন্দোলনের (‘বাংলার মুখ’) সঙ্গেও। এই বইয়ে ইস্তেহারধর্মিতা হয়তো আছে। কিছু কবিতা তার বাইরে চলে গেছে, আমি সেগুলোই রেখেছি। ‘ভাষাত্মদর্শন’ এক্ষেত্রে আলাদা, ওই যে সোশিও মিনিংয়ের কথা বলছিলাম একটু আগে।

কবিতা আর ইস্তেহারধর্মিতার এই সম্পর্কটা নিয়ে কী মনে হয়?

ইস্তেহারধর্মী কবিতা আমার এই বইয়ে কোনও মানে রাখে না, এটাই মনে হয়, এটুকুই বলতে পারি।

‘গুপ্তদাম্পত্যকথা’-য় আপনি পুংকণ্ঠ এবং স্ত্রী-কণ্ঠে কবিতাভাষ্য তুলে ধরলেন। পুংকণ্ঠের ভাষ্যে যতটা চেনা রসিকতা ছিল, স্ত্রী-কণ্ঠে ততটা চেনা কিন্তু লাগে না কবিতাগুলোকে…

আমি কিন্তু স্ত্রী-কণ্ঠেরটা হঠাৎই লিখতে শুরু করি। কীভাবে যে এসেছিল, জানি না। তবে দাম্পত্য তো উভয়তই। সে-কথাও বলতে হয়।

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়ে আপনার কেমন লাগছে?

খুবই ভাল লাগছে। এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা বলি! কোনও গোষ্ঠীর ভালবাসার তো কোনও দরকার আমার তো ছিল না, তাই পুরস্কার পাচ্ছি, এটা যেমন ভাল লাগার, তেমন পুরস্কার না পেলেও বোধহয় পাঠকদের ভালবাসা কি কিছু কম পেতাম?