কনটেন্ট, ট্রেন্ড, নারীমুক্তি

কলকাতার ধর্মতলা-সংলগ্ন এলাকায়, ৮ মার্চের মিছিলে হাঁটছি, নয়-নয় করে প্রায় চার বছর তো হল নিশ্চয়ই। নির্দিষ্ট কোনও নারী-সংগঠনের প্রতিনিধি হয়েই হাঁটছি যে, তা নয় ঠিক। এমনিই হাঁটছি। এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, দেরি হল খুব। আরও আগে, আরও অনেক, অনেক আগে থাকতে, পা-মেলানো উচিত ছিল আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের মিছিলে। আমাকে, আমাদের সবাইকেই। হয়তো-বা, জন্মের অব্যবহিত পর থেকেই। এই যে হাঁটছি, হাঁটছি, আর নারীমুক্তির গান গাইছি— কী ঝিম-ধরানো সুর তার। কতকটা ঘুম-পাড়ানি গানের মতো। ঘুমটাই যা উড়ে যাবে সংগত কারণে, গাইতে-গাইতেই; ধ্রুব একটা ঘোর লেগে থাকবে মাথায়, মনে।

আমরা, যারা মাত্রায় আরামপ্রিয়, আমরা, যারা, মানবাধিকার কর্মী স্বপ্নাদি হতে পারব না একজন্মে, কখনও, কোনওদিন, তাদের কারও-কারও পায়ে আশ্চর্য একরকম ব্যথা হয় মিছিলে হেঁটে, বাড়ি ফেরার পথে। যেন কত দীর্ঘ পথ হাঁটলাম, জিরানো একান্ত প্রয়োজন। আমাদের সেই কারও-কারও এই জিরানিরই ফাঁকে-ফাঁকে, ট্রামে-বাসে-গাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে, বাড়ির বৈঠকখানায়, অথবা শোওয়ার ঘরে, অভ্যেসের বশেই ঢুকে পড়ে এসে অতিকায়, অপরিহার্য, অত্যাশ্চর্য সোশ্যাল মিডিয়াটা। তাই দেখি ঘেঁটে-ঘেঁটে। এর লেখা পড়ি, ওর লেখা পড়ি। এই ছবি দেখি, ওই ছবি দেখি। সঙ্গে-সঙ্গে, চোখ-কান পাশাপাশি খোলা রাখতে পারলে, কত-শত ছোট-ছোট ভিডিও-ও— স্থায়িত্ব যেসবের কয়েক-মুহূর্ত মাত্র, দ্রুতগ্রাহ্য তবু নিশ্চিত। নতুন লব্জে যাকে বলে, ‘সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট’।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, এক্স (টুইটার)-সহ, আরও নানা প্ল্যাটফর্মে, সংক্ষিপ্ত, তথাপি আকর্ষণীয়, তাৎপর্যপূর্ণ, প্রতিক্রিয়া-উস্কানো, জনমত-গঠনে-পারদর্শী এসব কনটেন্ট আপলোড করা হচ্ছে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে। কনটেন্ট নিজেই একটা ভাষা হয়ে উঠেছে যেন-বা। কনটেন্টই ইদানীং বাজারটা চালাচ্ছে, কনটেন্টই চালাচ্ছে দুনিয়াটাও। আমার মতো, ডিজিটাল জগতে গড়ের চাইতেও কম দখল যাদের, অথচ একটা ফোন আছে হাতে, ফোনে ইন্টারনেট আছে যথেচ্ছ, তারাও তো জানতে-অজান্তে তথ্য, জনমত, বিনোদন, সামাজিক বার্তা-টার্তার খোঁজ পেতে, ‘ট্রেন্ডিং’ কনটেন্টের দ্বারস্থ হচ্ছি প্রায়শই। ‘ট্রেন্ডিং কনটেন্ট’— বিষয়-বৈচিত্রের ভারে, যে ধাঁচার কনটেন্ট হঠাৎই জ্বলে উঠে, নিভে যাচ্ছে না মাটির তৈরি হেমন্তের পিদিমের মতো। অবিশ্বাস্য একরকম বিস্তার পাচ্ছে বরং। দর্শকের মন-বুঝে, মতি-বুঝে, সময়-সুযোগ করে জেঁকে বসতে পারছে তাদের বাহিরে; আড়ালেও। যেমন ধরা যাক ‘প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট’। সাম্প্রতিককালে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষভাবে, বিশেষ আঙ্গিকে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বলে দেখছি-শুনছি। যত দেখছি, যত শুনছি, হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে। কাউকেই, কিছুই বলতে পারছি না। গিলে নিচ্ছি। একদিন সব ভীতি, সব সংশয়, সব প্রশ্ন কোথাও উগরে দিয়ে হালকা হব, সেই আশায়।

আরও পড়ুন: ভিমা কোরেগাঁও থেকে কেজরিওয়াল! নীল নকশা কি একই? লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…

প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট— আপাতদৃষ্টিতে, মনোগ্রাহী একটি শব্দবন্ধ, যা ‘আদর্শ সমাজে’ সিস্-হেট্ নারী-পুরুষের প্রেমমূলক, অথবা বৈবাহিক সম্পর্কের সমীকরণ কেমন হবে, তারই আড়ম্বরপূর্ণ, অপরূপ রূপকল্প এঁকে দিচ্ছে যত্নে। স্পষ্টই বলে দিচ্ছে, নারী হবেন সুন্দর (অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসারে, সে-প্রসঙ্গে পরে আসছি), সুরক্ষিত, আদৃত, নির্ভার; পুরুষ থাকবেন শ্রমের দায়িত্বে, হবেন যোগানদাতা, রক্ষক, সিদ্ধান্ত-নির্মাণকারী। যে নারীকে ইতিহাস স্বস্তিতে শ্বাস নিতে একদিনের জন্য হলেও তিলমাত্র জমি ছাড়েনি, জমকালো এই শর্তগুলো সেই নারীরই নামে আচমকাই লিখে দিচ্ছে, লিখিয়ে নিচ্ছে যাবতীয় আদরের, স্নেহের, বিলাসের, বৈভবের, আতিশয্যের, জৌলুসের প্রতিশ্রুতি। একশ্বাসে, একসঙ্গে। সেসব প্রতিশ্রুতিই গণপরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে হু হু করে। হাজার বছর ধরে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোযোগের, যত্নের, সংবেদনশীলতার যে প্রত্যাশা কেবল মেয়েদের কাছেই রাখা হয়েছে, সেই ছবিকে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টের বাহ্যিক ‘উদারতা’ ঘেঁটে দেয় সামান্য। সহজে চোখ-ধাঁধিয়ে যাওয়া তাই একরকম স্বাভাবিকই ধরে নিচ্ছি। কিন্তু কতক্ষণ?

একটু ভেঙে উল্লেখ করি এই ট্রেন্ডিং কনটেন্টের বহুস্তরীয় বৈশিষ্ট্যগুলি। নামে যা ধরা দিচ্ছে, তার সারে কী, সে-কথাই আরও একবার জানতে-বুঝতে: ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে, প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট সম্পর্কে যা বুঝেছি এযাবৎ— মৃদু আলোর মাদকতায় মজে থাকা কোনও শৌখিন রেস্তোরাঁ, মুখোমুখি বসে থাকা এক যুগল, সান্ধ্যকালীন তাঁদের ‘ডেট’-এর যাবতীয় পরিকল্পনা, আয়োজন আগাগোড়াই করেছেন পুরুষটি; একা। রেস্তোরাঁ পর্যন্ত পৌঁছনোর পথটুকু তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে পেরিয়ে এসেছেন, প্রেমিকাকে পাশে নিয়ে। প্রেমিকা তখন ‘প্যাসেঞ্জার প্রিন্সেস’, গোলাপি সিটে বসে, কফিতে চুমুক দিতে-দিতে উপহার গ্রহণ বই দায়িত্ব নেই তাঁর। অন্য কোনও গন্তব্যে পৌঁছে, পুরুষটি তড়িঘড়ি গাড়ি থেকে নেমে, দরজা খুলে ধরেছেন তাঁর জন্য, অন্যপারে। সঙ্গে দামি ফুল এনেছেন, আদুরে সম্বোধনে তাও বাড়িয়ে দিচ্ছেন প্রকাশ্যেই। হতেও-পারে, ‘সারপ্রাইজ’। বিনিময়ে কিছুই নিচ্ছেন না— অন্তত দৃশ্যত।

রেস্তোরাঁর এসির ঠান্ডা মাত্ৰা ছাড়ালে, নিজের জ্যাকেটটাই খুলে চাপিয়ে দিচ্ছেন প্রেমিকার গায়ে। একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার সমগ্র পরিকল্পনা করছেন, সিনেমা দেখতে যাওয়ার জন্য নিজের উদ্যোগে হল বুক করছেন, প্রেমিকার অনলাইন-অফলাইন ‘উইশলিস্ট’-এর খোঁজ রাখছেন নিয়মিত— এর সবই পুরুষের নিজের দায়িত্ব। সঙ্গে, ছোটখাট দৈনন্দিন আদর-যত্নের ভারও তাঁরই, যা-কিনা চিরাচরিতভাবে মেয়েদের ভার বলেই বেঁধে দেওয়া হয়েছে এর আগে, এ-সমাজে। যেমন, অস্থির, গতিময় দিনের শেষে, মুখের সামনে চা-কফি ধরা, হঠাৎ-খিদেতে চটজলদি, মুখরোচক খাবারের ‘ব্যবস্থা’, ঘুমের আগে মাথায় আলগা আঙুল বুলোনো। এমনটাই নাকি ঘরে-ঘরে ঘটে আজকাল— ‘বেয়র মিনিমাম’ নয়, প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টই তাই মন-পাওয়ার, মন ধরে রাখার একটিমাত্র চাবিকাঠি। এমনটাই দেখা যায়, শোনা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘন-ঘন; যদিও বাস্তবে কতবার, কী-কী প্রকারেই বা, তাই নিয়ে একাংশের মনে একটা সন্দেহের অবকাশ থেকে যায় নিশ্চয়ই। মোটের ওপর, সম্পর্কটিকে জিইয়ে রাখতে মানসিক, শারীরিক, আর্থিক— সবরকম শ্রমই যথার্থ ব্যয় করেন পুরুষ। এমনই ভঙ্গিতে, যেন এই একপাক্ষিক নিঃশর্ত যত্নই দু-জনের সম্পর্কের প্রধান উপকরণ। শুনতে বেশ রাজকীয় হলেও, খানিক দূরে সরে এসে এমন সমস্ত কনটেন্টের দিকে তাকালে মনে হয়, এ যেন-বা যত্নের পাশাপাশি সামান্য অভিনয়ও, যে অভিনয় পূর্ণতা পায় দর্শক থাকলেই কেবল। যদিও ভাবনা এখানেই থেমে যায় না।

সত্যি কথা বলতে কি, এই বিশেষ ধারার ট্রেন্ডিং কনটেন্টকে আমার ঘোর রাজনৈতিক মনে হয়। স্রেফ নান্দনিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টকে দেখার জন্য যে সাহস লাগে, সে সাহস আমার নেই বোধহয়। তাই নানাবিধ সংশয়ে ভুগি, ভয় পাই, কল্পচিত্রটি যত্ন, আদর, সৌজন্যের মায়াভরা গপ্প ফেঁদে নারীবাদের হাত ধরতে চাইলেও, আদপে বকলমে ‘অবাধ্য’ মেয়েকে পিতৃতন্ত্রের শাস্ত্র-মাফিক ফের একবার ছকে বেঁধে, সৌন্দর্যের, শালীনতার পাঠ দেওয়ার খেলা। তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়।

ওই যে বলছিলাম, দৃশ্যত কিছুই চাইছেন না পুরুষটি। সবই চাইছেন প্রত্যাশী নারী একাই। পাচ্ছেনও। পুরুষে কি কিছুই চাইছেন না সত্যিই? চকচকে চেহারা, সুদর্শনা, কোমল-চিত্ত, নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে ‘অক্ষম’ একটি স্ত্রী-লোক চাইছেন না? যার আনুগত্য তিনি ভোগ করবেন? যার হয়ে কথা বলবেন একাই? শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবেন যেমন-তেমন? দেশ এবং দশ, মিছিল-মিটিং, যার জীবনের ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে দেবেন তিনি নিজে? যাকে জয় করার বিজ্ঞাপন তিনি দিয়ে বেড়াবেন পৃথিবীর কাছে? বিশ্বব্যাপী অনেকেই এখন এমন সম্পর্ককে, সে-সম্পর্কের খটমট এই ভাব-ভঙ্গি-ভালবাসাকে পড়তে চাইছেন একটু অন্য আঙ্গিকে। নারীচরিত্রের ‘স্বাভাবিক’ কোমলতা-নমনীয়তার কাছে ফিরে গিয়েও, যা প্রাপ্য তা অর্জন করে আনতে পারার মধ্যেই আরেকরকম নারীবাদী প্রতিরোধের আখ্যান তাঁরা খুঁজে পাচ্ছেন। কিন্তু মনে রাখার, কোমলতা, নমনীয়তা সবই আমাদের শেখানো, আমাদের নারী-অবস্থানের পারফরমেন্স হিসেবে। জুডিথ বাটলার বলছেন।

কিন্তু প্রশ্নটা কোমলতা-নমনীয়তার হারানোর, বা তা পুনরুদ্ধারে নামার নয়ই মনে হয়। প্রশ্ন হল, এমন সম্পর্কের হিসেবে, এমন প্রতিরোধের ভাষায় আসলে লাভ হয় কার? নারীর? নারী আন্দোলনের, সর্বতোভাবে, বা আংশিক?

এমন সম্পর্কের হিসেবে, এমন প্রতিরোধের ভাষায় আসলে লাভ হয় কার? নারীর? নারী আন্দোলনের, সর্বতোভাবে, বা আংশিক?

পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিশেষ একটি লগ্নে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টের জন্ম। অনেকেই বলেন, নারীকে ঘরে-বাইরে সদা শ্রম ব্যয় করতে হতে হবে যে, এমনই ধারণার বিরুদ্ধে সরব হতে, কর্পোরেট ‘বস-বেব্’ প্রোটোটাইপ থেকে ক্ষণিকের বিরতি নিতেই এমন সমস্ত কনটেন্ট নির্মাণের প্রচেষ্টা, যা আরামের জীবনকে ছোট চোখে দেখবে না কিছুতেই আর। শ্রম যদি হকের হয়, বিলাসও তবে হকেরই। সমান্তরালে, ব্যক্তিগত সম্পর্কে নারী-পুরুষের যে অনাবশ্যক, অকাঙ্ক্ষিত অসাম্য, তারও বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে, হকের দাবি ছিনিয়ে নেবে। অভিসন্ধিগত কোনও ফাঁক এতে নাও থাকে যদি, অ্যান্ড্রিউ টেটের মতো খতরনাক নারীবিদ্বেষী পুরুষ এতে সাময়িক শায়েস্তাই হবেন, তাও ধরে নিই যদি, তবু যে প্রশ্নটা থেকে যায়, যাওয়ার কথাও, তা হল— আমরাও শায়েস্তা হব না তো এই ট্রেন্ডিং কনটেন্টের প্রতিরোধের পদ্ধতিগত ফাঁকটাকে ঠিক-ঠিক পড়তে না পারি যদি? ভুলে যাই যদি, আমাদের সমাজব্যবস্থাটার মৌলিক কার্যকর কৌশলগুলোরই একটি, নারীকে অবজেক্ট থেকে সাবজেক্ট, বা বিষয় থেকে বিষয়ীতে পরিণত না হতে দেওয়া? নারীর এমনই এক সত্তা গঠন করার, যার মূল্যায়ন করা হবে, যাকে সংজ্ঞায়িত করা হবে ‘অন্যের’ (পুরুষের) দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই? পৃথিবী নারীকে কীভাবে দেখবে, পুরুষ নারীকে কীভাবে কল্পনা করবে, চাইবে, তার ওপর ভিত্তি করেই শত-সহস্র বছর ধরে নিজেকে দেখতে যে শিখেছে নারী নিজেও?

নারীবাদের বিবর্তনের আত্মায় যে-ইন্টারসেকশন, সেই ইন্টারসেকশনকে রাতারাতি অস্বীকার করে, পুরনো সেই মায়াভরা বুদবুদটায় আমাদের বাস করতে উসকে দেয় না এসমস্ত ট্রেন্ডিং কন্টেন্ট? বলা বাহুল্য, সম্পর্কের এ-হেন চেহারা-ছবি এমন এক সামাজিক বাস্তবতাকে ছুঁয়ে থাকছে কেবল, যে বাস্তবতায় সময়, অর্থ, অবকাশ এবং নির্দিষ্ট লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক সংকেত, ভূমিকাগুলি পূর্বেই স্থির করা আছে। সকলের ক্ষেত্রে কি তার সবটা সমানভাবে প্রেরণ করা, স্বীকার করা সম্ভব? শ্রেণির লড়াই, ভিন্নধর্মী অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নগুলিকে কার্যত ‘ভ্যানিশ’ করে দিয়ে, আদর্শ সম্পর্কের এই নয়া-লিখনে এমন এক জীবনযাত্রার অনুমান নিহিত, যাতে অনন্ত অবকাশ আছে, রিসোর্স আছে, প্রেমের সম্পর্ককে, বৈবাহিক সম্পর্ককে, সেই সম্পর্কের অন্দরের যত্ন-ভালবাসাকে দৃশ্যমান করে তোলার সুযোগও আছে বিস্তর। আমরা, যারা ভারত-রাষ্ট্রে থাকি, অধিকাংশ সেসব মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতাটা আসলে দীর্ঘ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত আয়, যাতায়াতের পথে, ঘামে-ভেজা শরীরের ক্লান্তির। এই মাটিতে, এই সমাজব্যবস্থায়, এই রাজনীতিবোধের পরিধিতেই থেকে গিয়ে, এমনধারা যত্নের আচার তৈরি করা, রক্ষা করা, প্রেরক, বা প্রাপক হিসেবে, কারও কারও ক্ষেত্রে কম সম্ভব, তো কারও কারও ক্ষেত্রে সম্ভবই নয়। ফলে, বলতে দ্বিধা নেই, প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট এক ধরনের উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত রোমান্টিক কল্পনাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছে— বাস্তবের সঙ্গে যার যোগসূত্র বড়ো দূরের। এমন ট্রেন্ডিং কনটেন্ট-এর টোপ গিলে, সামর্থের মধ্যে সেই ট্রেন্ডিং কনটেন্টকেই ‘রিক্রিয়েট’ করতে চেয়ে, ব্যর্থ হয়ে, অবসাদে ভুগছেন কিছু অংশের কনটেন্ট কনজিউমার। আমার খুব করে মনে হয়, মেয়েদের ঐক্যকে ভেঙে ফেলে, তাদের পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে দেওয়ার রাজনীতিও এটা। কে কত বেশি আদৃত? কার ঘর কত বেশি সুন্দর? মেয়ে হিসেবে, কার যোগ্যতা বেশি? কার রিলের গ্রহণযোগ্যতা বেশি? এ তো পরীক্ষিত সত্য, যে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট সব নারীর জন্য নয়। বাছাই কিছু নারীর জন্য মোটে— সৌন্দর্যের, কোমলতার, শ্রেণিচরিত্রের ওপর যা নির্ভর করে থাকে মূলত। ভারতীয় ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে অনেকেই, ধীরে-ধীরে এই ট্রেন্ডিং কনটেন্টকে ট্রেন্ড হিসেবে স্থাপন করার জমি তৈরি করছেন। হয় বুঝে-শুনে। নইলে, না-বুঝেই।

যে নারী-সংহতি তৈরি হয়েছে অতি-কষ্টে, সে সংহতিকে মুহূর্তে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে চেষ্টা করছে এই কনটেন্ট, নির্দিষ্ট সৌন্দর্য-ছাঁচকে একমাত্র কাঙ্ক্ষিত ধরে নিয়ে। ‘প্রিন্সেস’ বলতেই কল্পনা করা হচ্ছে এমন এক নারীকে, যাঁর বয়স তেমন হয়নি এখনও, প্রচলিত মানদণ্ডের বিধি মেনে, সে সুন্দর, নারীসুলভ, স্নেহ-প্রার্থী, বিলাস-প্রত্যাশী, এবং অবশ্যই, হেটেরোনরমেটিভ সম্পর্কে অবস্থানকারী। ফলে দরজা খুলে দেওয়া, বিলাসী ডেটের আয়োজন করা, বা সমস্ত খরচ বহন করার মতো আচরণগুলি পারস্পরিক স্নেহ বা সমতার প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং সৌন্দর্যের বিনিময়ে প্রাপ্ত একজাতের পুরস্কার হিসেবেই বিলানো হচ্ছে। এসব ভোগমূলক পূর্বশর্ত মিলছে না যেসব নারীদের ক্ষেত্রে, ‘স্বাভাবিকভাবেই’ তাঁরা এই প্রাপ্তির আওতার বাইরে পড়ছেন। এতে তৈরি হচ্ছে আরেক বিড়ম্বনা— আরেকটি ভ্রান্ত ধারণা— যারা এই ‘প্রিন্সেস’ ভূমিকায় নাম-লেখানোর ‘সুযোগ্য’ নন, আগ্রহী নন, তাঁরা ‘উগ্র, র‍্যাডিকাল’। আমরাও যে যার মতো করে, যে যার মতাদর্শ ধরে রেখে, লড়ে পড়ছি তৎক্ষণাৎ। পিতৃতন্ত্র দাঁত বের করে, খ্যাক-খ্যাক করে হাসছে, আর বলছে, ‘বহত খুব। এই তো চেয়েছিলাম।’ প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌনতার বৈচিত্র্যও এই ছকের কোথাও প্রায় নেই বললেই চলে। সমপ্রেমের সম্পর্ক, নন-বাইনারি বা জেন্ডার-ননকনফর্মিং মানুষের সম্পর্ক, অথবা ধরা যাক এমন সম্পর্কই, যত্নের, আদরের ভূমিকা দুই পক্ষের মধ্যে ঘুরে-ফিরে আসে যেখানে— সবই পড়ে থাকে বাইরে, দূরে। এই প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট আসলে তাই ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, মোক্ষম, অব্যর্থ ঘোড়ার চাল, যে-চালে পিতৃতন্ত্র নিজেকে নব্য, অথবা নব-নব নান্দনিকতায় পুনর্গঠন করে ফেলছে অবলীলায়। আমরাই উল্টে ছিটকে যাচ্ছি এদিক-ওদিক, একে-অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি একটু-একটু করে। নারীবাদ আদপে বিপরীত কথা বললেও, নতুন-প্রজন্ম নারীবাদীদের কেউ-কেউ এই সাধারণ সত্যকে দেখতে-বুঝতে, ধারণ করতে অপারগ হয়ে উঠছেন কেন ক্রমশ?

কেবল ক্ষমতা কেন, সরাসরি স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নও এখানে আলবাত জড়িত। কাউকে ‘রাজকন্যা’ করে রাখতে পারলে, তাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া ততই সহজ-সম্ভব হয় যেমন, রাজকন্যা সম্পর্কে উপস্থিত, মানের প্রাপক, দানের প্রাপক, কিন্তু সম্পর্কেরই সক্রিয় অংশীদার নয় সে। ফলে সমতার বদলে সম্পর্কটি অসম বিন্যাসকেই বাঁচিয়ে রাখতে পারে, টেনে-হিঁচড়ে। সমসাময়িক নারীবাদী সামাজিক আলোচনায় অনেকেই বলেন তাই, প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট ভালবাসার ভাষাই নয় আদপে; কেবল এমন একটি সাংস্কৃতিক জট, যা রূঢ় বাস্তবতাগুলির সুপরিকল্পিত সরলীকরণ করে, আমাদের ভুলিয়ে দিতে চায়, নারীমুক্তির স্লোগান কেন উঠেছিল প্রথম।

লক্ষ্যও করতে হবে না, এমনিই নজর কাড়বে, আজকাল প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট হোক, ট্র্যাড-ওয়াইফ হোক, যে-কোনও রিলেই ১২-১৪ সেকেন্ড খেয়ে নিচ্ছে— অমুক অ্যান্টি-এজিং ক্রিম লাগাও, তবে তুমি ‘ল্যাজকাটা প্রেমিকের ডানাকাটা পরী’, ভালবাসার, আদরের যথাযত দাবিদার। অমুক সামগ্রী তোমার ছোট্ট, সুন্দর সংসারটাকে করে তুলবে আরও মায়াময়। আদর্শ সম্পর্ক প্রচারের সঙ্গে বাজার, বাজারের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টের কী নিবিড় যোগাযোগ! অথচ, কী অদ্ভুত কথা, শুরুটা নাকি হয়েছিল এই বাজারের চাপকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে, আরামকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদে।

এরই সংশ্লিষ্ট আরেক ধরনের ট্রেন্ডিং কনটেন্ট প্রচারের আলো কেড়ে নিচ্ছে তুলনায় বেশি— ‘ট্র্যাডিশনাল ওয়াইফ’, ওরফে, ‘ট্র্যাড ওয়াইফ’। সেই ঘরানার কনটেন্টও নারীবাদের নামে, কোমলতার নামে, নির্ভরতার স্বপ্নালু, শান্ত, স্থিতিশীল ছবিকে নতুন-মলাটে পুনর্স্থাপন করছে। উগ্র, রুক্ষ, নারীবাদের কানে-কানে গুঞ্জন তুলছে, ‘রিক্লেইম’— গৃহকেন্দ্রিক, গৃহিণীসুলভ, তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী’ ভূমিকায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান করছে মেয়েদের। কঠোর আনুগত্যেই যেন মেয়েদের সুখে থাকার মন্ত্রটি। পিতৃতন্ত্রকেই জায়গা করে দিচ্ছে যাবতীয় স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার। এমনকী অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও, অর্থাৎ সমকাজে পুরুষের সমান মজুরির দাবি— যা-কিনা নারীবাদী আন্দোলনের প্রাথমিক দাবিগুলোরই একটি!

আমার মিডিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এক বন্ধু বলছিলেন, উভয় ট্রেন্ডের ক্ষেত্রেই উগ্র-নারীবাদের বিপরীতে, একটা ‘পিরিয়ড নস্টালজিয়া’ কাজ করছে— যেন মিডল-হাই রোমান্স পেরিয়েই ১৯৫০-এ আমরা এসে পৌঁছেছি, মহামন্দা কাটিয়ে উঠছি আমরা, বিশ্ববাসী। উপভোগ করার, জিনিস কেনার প্রবণতা দুমদাড়াক্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞাপন তৈরি করা হচ্ছে বিপণন-সামগ্রী এবং ঘরোয়া মেয়েদের ‘লোভনীয়’ ছবিকে পাশাপাশি বসিয়ে। ফের মনে পড়ে গেল, পুরুষের চোখে ধর্ষকাম চরিতার্থ করবার নিছক একটি অবজেক্ট বই কিছুই নন নারী।

লক্ষ্যও করতে হবে না, এমনিই নজর কাড়বে, আজকাল প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট হোক, ট্র্যাড-ওয়াইফ হোক, যে-কোনও রিলেই ১২-১৪ সেকেন্ড খেয়ে নিচ্ছে— অমুক অ্যান্টি-এজিং ক্রিম লাগাও, তবে তুমি ‘ল্যাজকাটা প্রেমিকের ডানাকাটা পরী’, ভালবাসার, আদরের যথাযত দাবিদার। অমুক সামগ্রী তোমার ছোট্ট, সুন্দর সংসারটাকে করে তুলবে আরও মায়াময়। আদর্শ সম্পর্ক প্রচারের সঙ্গে বাজার, বাজারের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টের কী নিবিড় যোগাযোগ! অথচ, কী অদ্ভুত কথা, শুরুটা নাকি হয়েছিল এই বাজারের চাপকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে, আরামকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদে।

একনজরে, উক্ত ট্রেন্ডদু’টি ভিন্ন-ভিন্ন হলেও, সামান্য তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যায়, দু’টি ট্রেন্ডই মূলত নারী-পুরুষের প্রথাগত সম্পর্কের ঘুন-ধরা পুরনো কাঠামোটাকেই ফের সামান্য সাজিয়ে-গুছিয়ে, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উপস্থাপন করছে সমাজে— হাত শক্ত করছে এসে যার নয়া-উদারবাদ, কনজিউমারিজম। শ্রম-শোষণ, লিঙ্গবৈষম্য, পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির ক্রমাগত বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মেয়ে শ্রমিকদের জান-কবুল লড়াইকে ভুলিয়ে দিচ্ছে।

ইতিহাস নারীকে শিখিয়েছে, তুমি কোমল, তাই যা-কিছু কোমল, তা তোমারই দায় পৃথিবীকে দেওয়ার। পৃথিবীর তোমাকে কিচ্ছুটি দেওয়ার নেই। তাই তো এই সামান্য যত্নের লোভ, হাতছানির সঙ্গে বিপজ্জনক নৈকট্যে দিন কাটাই আমি, আমরা কেউ-কেউ, কোনও-কোনওদিন। ভাবি, কোন ট্রেন্ড ফেলব, আর রাখব কোন ট্রেন্ড। কিন্তু এই ট্রেন্ডের অতল থেকেও কেউ না কেউ, পুরুষের ওই কুৎসিত হাঁ-মুখ থেকে সমশ্রমের মর্যাদা ছিনিয়ে আনুক, রুটি-গোলাপের ইশতেহার ছিনিয়ে আনুক। আনবেই।

মেয়েদের শ্রমকে চিরকালই আড়াল করা হয়েছে। মর্যাদা দেওয়া হয়নি। মেয়েদেরও দায় যে মোবিলিটি, তাকেই ভুলিয়ে দিতে, আমরা হয়ে উঠি ক্ষমতার হাতের প্যাসেঞ্জার প্রিন্সেস। ভুলিয়ে দেওয়া হয় আমাদের, আমাদেরই দায়, মেয়েদের, প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌন পরিচিতির মানুষের দায়, ব্যাগ-পত্র কাঁধেই রাখা। যখন ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে, বেরিয়ে পড়া। যখন ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে, ঘর বাঁধা। নিজের শর্তে, নিজের ঘর। নিজের সঙ্গে, বন্ধুদের ঘর। মর্জিমতো, সেসব ঘরে তালা ঝুলিয়ে, ফের বেরিয়ে পড়া। অন্য কোথাও, অন্য কিছুর খোঁজে।

আসল সংগ্রামটা আমাদের কাছে অবজেক্ট থেকে সাবজেক্ট হয়ে ওঠার লড়াই। নিজেকে একটি সক্রিয়, চিন্তাশীল, মননশীল সত্তায় বদলে ফেলার সংগ্রাম। নিজের এমন এক সত্তা গড়ে তোলার সংগ্রাম, যে দেখে, শেখে, লড়ে, ভুল করে, ভেঙে পড়ে, ক্ষত-বিক্ষত হয়, নিজেকেই ঠিক উঠে দাঁড়ায়, নিজের ভরসায়। সংহতির, সাহচর্যের, কমরেডশিপের ভরসায়। পিতৃতন্ত্রের খেলার পুতুল, ঘুমন্ত রাজকন্যা হয়ে থাকবার ভরসায় নয়, আঘাত এসে লাগবে না যার গায়ে। কাহারও সুযোগ্যা কন্যা, স্ত্রী, অথবা মা হয়ে থাকবার ভরসায়ও নয়— নিজেকে, নিজেরই পূর্ণতায় খুঁজে পাওয়ার পথ চেনা ভরসায়।

আন্দোলনের বন্ধু, প্রিয়স্মিতাদির কাছে একটা কবিতা শুনেছিলাম একবার। ভিখারী ঠাকুরের ভোজপুরি কবিতার বাংলা রূপান্তর। কে যে অনুবাদ করেছিলেন!—

‘মেয়েরা হাজার হাজার বছর ধরে / কিছু একটা খুঁজে চলেছে
জঙ্গলে শাক খুঁজেছে / চুলোর জন্য ইঁট
রুটির জন্য আগুন খুঁজেছে / ভিড় ট্রেনে খুঁজেছে সিট…
…খোঁজ করতে করতে / দৃষ্টি হয়েছে জোরালো
ছোটবেলা থেকে বাধ্য হতে শেখা মেয়েরা
হাজার বছর ধরে অবাধ্য হয়েছে
খুঁজেছে কোনটা খারাপ / আর কোনটা ভাল।’

আজ ৮ মার্চ। ১১৬তম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস। জানি, রাস্তাজুড়ে মেয়েদের ছোটখাট হাঙ্গামা ট্রাফিক রুখে দেবে ঠিক খানিকক্ষণের জন্য। বাড়ি ফিরে, আমাদের কারও কারও পায়ে একটা ব্যথা হবে ফের। কত দীর্ঘ পথ হেঁটেছি, কত দীর্ঘতর পথ-হাঁটা বাকি। এমনিতেই দেরি হল খুব।

নারীমুক্তি, ক্যুইয়ার মুক্তি, ট্রান্সমুক্তির লড়াই তাও চলবে।