মৃত্যুর রং নীল
‘…হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে আছে আকাঙক্ষার— তবুও তো চোখের উপরে/
নীল মৃত্যু উজাগর…’
জীবনানন্দ দাশ
আধুনিক সমাজের সবচেয়ে বহুল শ্রুত বিষ হয়তো সায়ানাইড। প্রেম হোক বা বিপ্লব, হনন কিংবা আত্মহনন, এই বিষকে ঘিরে রক্ত গরম করা রোম্যান্স-রোমাঞ্চ কাহিনির কমতি নেই। সায়ানাইড, রহস্য কাহিনিতে বহুলচর্চিত, বিখ্যাত বিষ, রহস্য-কাহিনির লেখক-লেখিকাদের অন্যতম পছন্দের খুনের অস্ত্র। আগাথা ক্রিস্টি তাঁর প্রায় গোটা দশেক কাহিনি-প্রসঙ্গে পটাশিয়াম সায়ানাইড ব্যবহার করেছেন। হেমেন রায়ের গল্প-উপন্যাস খুঁজলেও পটাশিয়াম সায়ানাইড মিলবে। লোক-মানসে এর অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তা। সায়ানাইড তার অলীক রোম্যান্সের মোহে, বাকি বিষদের অনায়াসেই টেক্কা দিয়েছে।
‘সায়ানাইড’ শব্দটির উৎপত্তি, গ্রিক শব্দ ‘সায়ানোস’ থেকে। যার অর্থ গাঢ় নীল। ঘটনাচক্রে আধুনিক সভ্যতায় সায়ানাইডের প্রবেশ ঘটেছিল, মনোরম নীল রঙের হাত ধরেই। রেনেসাঁ যুগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্মে, নীল রঙের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। ছবিতে ব্যবহৃত নীল রঙ ছিল— মুক্তি, পবিত্রতা, পরিত্রাণ, মনুষ্যত্ব-বোধ ও গভীর বিষাদের দ্যোতক।
এমনকী, রেনেসাঁ পরবর্তী সময়েও মানব-সত্তার বিভিন্ন আঙ্গিকের আত্মপ্রকাশে, নীল রঙ ব্যবহৃত হয়েছে। সে-যুগে ছবিতে ব্যবহৃত নীল রঙের নানা উৎস থাকলেও, নয়নাভিরাম নীল রঙের জন্য শিল্পীদের অন্যতম ভরসা ছিল এক ধরনের রঙিন খনিজ-পাথর। নাম, লাপিজ-লাজুলি। কিন্তু এটি বেশ মূল্যবান হওয়ায়, শিল্পীরা সবসময়ে ব্যয়ভার বহন করতে পারতেন না। এমনভাবেই চলেছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী।
কিন্তু, আঠারো শতকের প্রথমার্ধে বার্লিনের এক রঙ ব্যাবসায়ী জোহান ডিসবাক, রঙ তৈরি করার সময়ে হঠাৎই আবিস্কার করে বসলেন— এক গাঢ় দৃষ্টিনন্দন নীল রঙ। তখন জার্মানির প্রুশিয়া প্রদেশের রাজধানী ছিল বার্লিন। এই রঙ প্রয়োগ করা হল প্রুশিয়া প্রদেশের সৈন্যদের পোশাকে। সেই থেকেই এই নতুন নীল রঙের নাম হল ‘প্রুশিয়ান-ব্লু’।
আরও পড়ুন: দেশজুড়ে জাল ওষুধের মতো নকল ছবিরও মহা কারবার ছড়িয়ে? লিখছেন সুশোভন অধিকারী…
এতদিনে চিত্রকরেরা নীল রঙের জন্য, লাপিজ-লাজুলির উপযুক্ত বিকল্প পেলেন, যা দৃষ্টি-নান্দনিকতায় লাপিজ-লাজুলির সমতুল্য, অথচ তার চেয়ে সুস্থায়ী ও সহজলভ্য। তারপর রঞ্জক হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রুশিয়ান ব্লু-র জয়যাত্রা। বহু রঙ-ব্যাবসায়ী সেকালে প্রুশিয়ান ব্লু বেচে, লাভের মুখ দেখেছিলেন; আর সেই রঙের ছোঁয়ায় প্রাণ পেয়েছিল কানালেটো, গেইন্সবারো, হকুসাই, ভ্যানগখ থেকে বিংশ শতকের পাবলো পিকাসোর মতো চিত্রশিল্পীদের শিল্পকর্ম।

আঠারো শতকে প্রুশিয়ান ব্লু-র জয়গাথা যখন ঊষা লগ্নে, তখনও কেউ জানতেন না, এই দেবসুন্দর নীল রঙের অন্দরে ঘাপটি মেরে রয়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যুর শমন, মূর্তিমান সায়ানাইড। প্রুশিয়ান ব্লু আবিষ্কারের প্রায় আট দশক পর, প্রুশিয়ান ব্লু থেকে সায়ানাইড উদ্ধার হল সুইডিশ কেমিস্ট কার্ল উইলিয়াম শিলি খ্যাপামির কল্যাণে। এই খ্যাপাটে বিজ্ঞানীর কাছে আধুনিক রসায়ন ঋনী। গুরুত্বপূর্ণ সব মৌল, বিভিন্ন জৈব ও অজৈব যৌগের আবিষ্কার, চিহ্নিতকরণ, নিষ্কাশন ও পৃথকীকরণের কাণ্ডারি এই খামখেয়ালি কেমিস্ট।
প্রুশিয়ান ব্লু থেকে সায়ানাইড উদ্ধারও, শিলির জ্ঞানপিপাসা ও খামখেয়ালের ফসল। সে-সময়ে শিলি বাজার চলতি বিভিন্ন রঙ নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন, নতুন কোনও রঙের সন্ধানে। খেয়ালবশতই তিনি ‘প্রুশিয়ান ব্লু’-এর মধ্যে সালফিউরিক অ্যাসিড মিশিয়ে উত্তাপ দেন। সঙ্গে-সঙ্গে এই দ্রবণ থেকে নির্গত হয় মৃদু ঝাঁঝালো গন্ধের এক গ্যাস। এমন গ্যাসের অস্তিত্ব সেকালের বিজ্ঞানী সমাজের কাছে তখনও অজ্ঞাত। শিলি তাই জলের মধ্যে গ্যাসটাকে সংগ্রহ করলেন। দেখলেন, তার জলীয় দ্রবণ আম্লিল। অর্থাৎ সেটি একটি অ্যাসিড।
প্রুশিয়ান ব্লু থেকে উদ্ভূত হওয়ায়, শিলি তার নাম রাখলেন প্রুসিক অ্যাসিড। এই প্রুসিক অ্যাসিডই, অধুনা বিশ্বের বহুল পরিচিত হাইড্রো সায়ানিক অ্যাসিড কিংবা হাইড্রোজেন সায়ানাইড গ্যাস— যার সঙ্গে জড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের বিভীষিকা। ‘প্রুশিয়ান ব্লু’-এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সায়ানাইড, সেদিন সালফিউরিক অ্যাসিডের ছোঁয়ায় হাইড্রোজেন সায়ানাইডের বিষবাষ্প হয়ে বেরিয়ে এসেছিল।
পটাশিয়াম সায়ানাইড, সোডিয়াম সায়ানাইড আর হাইড্রোজেন সায়ানাইড— সায়ানাইডের এই তিনটি রূপই মূলত বহুল পরিচিত। প্রথম দু’টি সায়ানাইড লবণ, আর শেষরটি গ্যাস। তিনটিই মারাত্মক বিষ। কিন্তু শেষেরটি এই ত্রয়ীর মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত। বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যায় এর বহুল ব্যবহার হয়েছিল।
সায়ানাইড নিয়ে জার্মানদের কিংবদন্তি রয়েছে। তাদের হাতেই প্রুশিয়ান ব্লু-র আবিষ্কার, আবার যুদ্ধ অপরাধে হাইড্রোজেন সায়ানাইডেরও ব্যবহার। অসউইজের মতো সেইসব কুখ্যাত কন্সট্রেশন ক্যাম্প, ইউরোপীয় ইহুদিদের গণস্মৃতিতে এক জ্বলন্ত বিভীষিকা। এই সব কন্সট্রেশন ক্যাম্পে লক্ষ-লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদি আর যুদ্ধ-বন্দিদের রেখেছিল জার্মান বাহিনী। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে তাদের মিলত অনাহার আর অকথ্য অত্যাচার। আর বাসস্থান হিসেবে জুটত পশুর মতো ছোট-ছোট খোপ।

বন্দিদের মধ্যে যারা কর্মক্ষম, তাঁরা অন্তত প্রাণ ভিক্ষাটুকু পেত! কিন্তু বয়স্ক, অসুস্থ, শিশু আর গর্ভবতী নারী— এদের কর্মক্ষমতা কম। তাই জার্মান বাহিনীর কাছে এরা নিতান্তই বোঝা, অন্ন ধ্বংসকারী। আর প্রতিদিনই হাজার-হাজার বন্দিদের নিয়ে আসা হচ্ছে ক্যাম্পে। অত বন্দিদের স্থান-সংকুলান করাও বড় দায়। অতএব অকর্মণ্যদের পোকা-মাকড়ের মতো নিঃশেষ করে দেওয়াই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। এই নিধন-যজ্ঞে, জার্মানরা ব্যবহার করল কীটনাশক— সাইক্লোন বি (Zyclon B), যার মূল উপাদান হাইড্রোজেন সায়ানাইড। তারপর একদিন ধারাস্নানের (শাওয়ার) লোভ দেখিয়ে, অসহায় অকর্মণ্য মানুষগুলোকে ঢুকিয়ে দেওয়া হল মৃত্যুকক্ষ, অর্থাৎ গ্যাস চেম্বারে। ঘরের ভেতরে ছুঁড়ে দেওয়া হত সাইক্লোন বি-এর কৌটো। মুহূর্ত কয়েক মৃত্যুযন্ত্রণার কোরাস। তারপর নিঃসীম নৈশব্দ। ঘরের বাতাস তখনও ভারী হয়ে আছে বিষবাষ্পে। মেঝেতে হাজার-হাজার কঙ্কালসার লাশের স্তূপ, মেঝে পিচ্ছিল তাদের মল, মূত্র, বমি, রক্ত আর অ্যামনিওটিক তরলে।

আদিকাল থেকে আধুনিক সময়, যুদ্ধ-অপরাধের উদাহরণ প্রচুর রয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি সংঘকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, যুদ্ধ অপরাধ এখনও নানা ভাবে চলছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট , জার্মান-কৃত নির্লজ্জ, পাশবিক গণহত্যা মানব সভ্যতার এক চিরস্থায়ী অবিস্মৃত কলঙ্ক।
প্রসঙ্গত, প্ৰকৃতিতে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহেও সায়ানাইডের উপস্থিতি আছে। এমনকী আমাদের অতি পরিচিত ভিটামিন B12 এর মধ্যেও সায়ানাইড আয়ন লুকিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, আলসার, হৃদরোগ কিংবা মানসিক সমস্যার অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধেও রয়েছে সায়ানাইডের উপস্থিতি।
শিল্পের অনিন্দ্যসুন্দর মনোবিলাস, জীবজগতে প্রকৃতির দান থেকে কীভাবে সায়ানাইড হয়ে উঠল গণহত্যার অভিসম্পাত, আপোসহীন বিপ্লবের মৃত্যুঞ্জয়ী বীজমন্ত্র? এর উত্তর রয়েছে সায়ানাইডের রাসায়নিক চরিত্রে। যত সমস্যার গোড়া ওই সায়ানাইড মূলক, (CN) আয়নটি। আমাদের শরীরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ক্ষতিকর। সায়ানাইড মূলকের গঠনটি লক্ষ করলে দেখা যাবে, এখানে কার্বন তার তিনটে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে আছে নাইট্রোজেনকে। কার্বনের চারটি হাত থাকে। অতএব, আরেকটি হাত তার এখন মুক্ত।
কার্বনের ওই খোলা হাতটি কত জোরে অপর কোনও অণুকে আঁকড়ে ধরছে, তার উপরই নির্ভর করে সেই যৌগটি মানুষের জন্য নির্বিষ, না কি বিষাক্ত। দেখা গেছে, অপর কোনও কার্বন অণু পেলে, সায়ানাইডের কার্বনের ওই খোলা হাতটি সহজেই খুব জোরে তাকে আঁকড়ে ধরে, অর্থাৎ জাতভাইয়ের সঙ্গে একটা খুব সুস্থিত রাসায়নিক বন্ধন গড়ে তোলে এবং এই বন্ধন ছেড়ে, সায়ানাইড আয়নটিও সহজে বেরোতে পারে না। ফলে এই ধরনের যৌগ আমাদের শরীরে প্রবেশ করলেও, সায়ানাইড আয়নটির আমাদের ক্ষতি করার কোনও ক্ষমতা থাকে না। ঠিক এ-কারণেই আলসার, হৃদরোগ, মানসিক সমস্যার ওষুধ ডাক্তারের নির্দেশমতো আমরা নিশ্চিন্তে গ্রহণ করতে পারি।
আবার, কোবাল্ট আয়রনের মতো অনুগুলোর সঙ্গেও সায়ানাইড আয়নের খুব সুস্থির বাঁধন। এদের সঙ্গেও সায়ানাইড আয়ন খুব সহজেই গাঁটছড়া বাঁধতে পারে। ভিটামিন B12 এর মূল হল কোবাল্ট, ‘প্রুশিয়ান ব্লু’ ও আয়রন ও আয়রন ঘটিত সায়ানাইড যৌগের যুগলবন্দি। এই দু’ক্ষেত্রেই অনুর গঠনে সায়ানাইডের দশা ‘পিঞ্জরে আবদ্ধ পক্ষীর ন্যায়’। ডানা ঝটপট করেও আনবিক খাঁচা থেকে সায়ানাইডের মুক্তি নেই। তাই ভিটামিন B12 আর প্রুশিয়ান ব্লু দুই-ই মানুষের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ।
সায়ানাইডই যখন পটাশিয়াম বা সোডিয়ামের দিকে যখন বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়, তা নিখাদ স্বার্থহীন বন্ধুত্ব নয়। এই মেকি বন্ধুত্বের আড়ালে, সায়ানাইডের আপন স্বার্থসিদ্ধিই মূল উদ্দেশ্য। তাই সামান্য অস্থিরতা, প্রতিকূলতাতেই এই বন্ধুত্বের বন্ধনে চিড় ধরে, সায়ানাইডও খুব সহজেই এই বন্ধন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তখনই তা বিষময় হয়ে ওঠে। সায়ানাইডের কুসঙ্গে পড়ে এভাবেই সোডিয়াম, পটাশিয়াম, হাইড্রোজেনের মতো কেমিস্ট্রির ‘গুডবয়’-রাও হয়ে উঠেছে এক-একটি ডাকসাইটে বিষ।
পৃথিবীতে এক শ্রেণির ব্যাকটেরিয়া আছে, যারা টিকে থাকার জন্য তাদের বিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে সায়ানাইড উৎপাদন করে। কেন্নো, বিছের মতো প্রাণীরাও শিকারি প্রাণীদের থেকে আত্মরক্ষার্থে দেহ থেকে সায়ানাইড নিঃসরণ করে। এদের জন্য তো সায়ানাইড প্রকৃতির আশীর্বাদ।
সায়ানাইডই যখন পটাশিয়াম বা সোডিয়ামের দিকে যখন বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়, তা নিখাদ স্বার্থহীন বন্ধুত্ব নয়। এই মেকি বন্ধুত্বের আড়ালে, সায়ানাইডের আপন স্বার্থসিদ্ধিই মূল উদ্দেশ্য। তাই সামান্য অস্থিরতা, প্রতিকূলতাতেই এই বন্ধুত্বের বন্ধনে চিড় ধরে, সায়ানাইডও খুব সহজেই এই বন্ধন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তখনই তা বিষময় হয়ে ওঠে। সায়ানাইডের কুসঙ্গে পড়ে এভাবেই সোডিয়াম, পটাশিয়াম, হাইড্রোজেনের মতো কেমিস্ট্রির ‘গুডবয়’-রাও হয়ে উঠেছে এক-একটি ডাকসাইটে বিষ।
আমন্ড, চেরি, আপেলের মতো আমাদের পরিচিত ফলেও সেঁধিয়ে থাকে সায়ানাইড। আমন্ড বাদাম, চেরি ও আপেলের বীজে অ্যামিগডালিন নামে এক ধরনের গ্লাইকোসাইড থাকে। এর রাসায়নিক গঠনের মধ্যেই রয়ে যায় সায়ানাইড গ্রূপ। এক্ষেত্রে আমন্ড বাদাম, কিংবা আপেলের বীজ পেটে গিয়ে পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের স্পর্শে অ্যামিগডালিন থেকে সায়ানাইড মুক্ত হয়ে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করে। তাহলে, আমন্ড বাদাম খেলে, কিংবা আপেল খাওয়ার সময়ে অসাবধানতাবশত কয়েকটি আপেলের বীজ চিবিয়ে ফেললে, তা পেটে গিয়ে কি আমাদের বেঘোরে মৃত্যুও হতে পারে? এর উত্তর খুঁজতে চোখ রাখতে হবে উনিশ শতকের এক হত্যাকাণ্ডে—
সেকালে ইংল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের এক সম্প্রদায় ছিল কোয়াকার। সমাজে লোকজন এদের বেশ সম্মান করে চলত। এই সম্প্রদায়েরই একজন ছিলেন জন টয়েল। খামখেয়ালি টয়েল ঝোঁকের বশে, মেরি নামের এক বিধর্মী মহিলাকে বিয়ে করে কোয়াকারের সম্মান হারালেন। মেরি আর টয়েলের দুই সন্তানও হল। কিন্তু রোগভোগে তারাও বেশিদিন বাঁচল না। সন্তান হারানোর দুঃখে মেরি-ও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার ধরা পড়ল যক্ষা। সে-কালে যক্ষা হওয়া মানে অসহায়ভাবে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গোনা। সে-কালে যক্ষার তো কোনও চিকিৎসা ছিল না, শয্যাশায়ী মেরির চিকিৎসা করতে আসল তরুণী নার্স— সারা হার্ট। সারা হার্ট হৃদয়হরণ করল টয়েলের। মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রীর অলক্ষ্যে টয়েল আর সারার প্রেমপর্ব দিব্যি চলতে লাগল। মেরি যখন মারা গেল, সারা তখন সদ্য অন্তঃসত্ত্বা। যথা সময়ে সারা সেই সন্তানের জন্ম দিল। কিন্তু টয়েল সারাকে বিয়ে করতে নারাজ। টয়েল, তার হৃত সামাজিক সম্মানের পুনরুদ্ধারে বদ্ধ পরিকর। মেরিকে বিয়ে করে যে ভুল সে করেছে, সে ভুল দ্বিতীয়বার আর সে করবে না। তবে টয়েল, সারা আর তার সন্তানের জন্য সপ্তাহে এক পাউন্ড বরাদ্দ করল। সপ্তাহান্তে সে সারা আর সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে যায়, তখন সপ্তাহের বরাদ্দ সারার হাতে দিয়েও আসে। এই গোপন অভিসারেই জন্ম নিল আরও একটি সন্তান।
টয়েল বুঝল, দুই সন্তান-সহ সারাকে লন্ডনে রাখা মোটেই আর নিরাপদ নয়। লোক জানাজানি হলে, বিতর্কের অন্ত থাকবে না। টয়েল লন্ডন থেকে বেশ কিছুটা দূরে, স্লাওয়ের কাছে সল্ট হিলে, একটা কটেজ ভাড়া নিয়ে সেখানেই সারা আর দুই সন্তানকে রাখলেন। সেখানেই মাঝেমধ্যে টয়েল তাদের সঙ্গে দেখা করে আসে, সাপ্তাহিক খোরপোষটুকু সারাকে দিয়ে যায়।
ওখানকার স্থানীয় লোকজনও বিশেষ সন্দেহ করল না। কারণ, টয়েল তো আর নিজেকে সারার স্বামী, দু’সন্তানের বাবা বলে পরিচয় দেননি! তার সঙ্গে সারার বয়সের যা ফারাক, তাতে স্বামী বলে পরিচয় দিলেই বরং লোকজন সন্দেহ করত। টয়েল নিজেকে সারার শ্বশুর বলে পরিচয় দিয়েছে। স্থানীয়দের তিনি বলেছেন— তার ছেলে কর্মসূত্রে বাইরে থাকে। এক কারখানায় কাজ করে। সংসারে যা টাকা-পয়সা পাঠায়, তারই কিছু তিনি বউমাকে দিতে আসেন!
এভাবেই গোপনে কাটছিল দিন। এর মধ্যেই সঙ্গোপনে আরও একটি কাণ্ড ঘটিয়েছে টয়েল। নিজের সামাজিক সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য কোয়াকার সম্প্রদায়ের এক মহিলার সঙ্গে বিয়েও সেরেছেন। সারা এবং এই নতুন বউ— কেউ-ই পরস্পরের ব্যাপারে কিচ্ছুটি জানে না। দ্বিতীয়পক্ষেরও দু’টি সন্তান জন্মাল। দুটো সংসারের খরচ টয়েলকে টানতে হচ্ছে। তার অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে।
১৮৪৪ এর শেষের দিকে, টয়েলের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পড়ল যে— নিজের সংসার সামলে সারাকে সাপ্তাহিক খোরাকিটুকু দিতেও সে অসমর্থ। সারার কাছে যাতায়াত তার কমতে থাকল। সারা অবশ্য ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সে-ও টয়েলকে খুব শাঁসিয়েছে— খোরাকি বন্ধ হলে, সে তাদের আসল সম্পর্কের ব্যাপারে সব্বাইকে জানিয়ে দেবে। এবার কিছু একটা ফয়সালা করতেই হবে টয়েলকে। দুই নারীর মধ্যে বেছে নিতে হবে যে-কোনও একজনকে। টয়েলর সামাজিক সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠার চাবিকাঠি তার নতুন স্ত্রী। তার তো কোনও ক্ষতি করা চলে না। অতএব, সারাকেই মরতে হবে!
১৮৪৫ এর ১ জানুয়ারি। বছরের প্রথম দিন। সমস্ত ইংল্যান্ড মেতে রয়েছে নতুন বছরের উদ্যাপনে। সেদিন বিকেলের দিকে টয়েল প্যাডিংটন থেকে স্লাওয়ের ট্রেন ধরল। ট্রেন ধরার আগে এক ফার্মাসিস্টের দোকান থেকে দু বোতল শিলি’স অ্যাসিড কিনেছে সে। শিলি’স অ্যাসিড, হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিড বা প্রুসিক অ্যাসিডের লঘু দ্রবণ। সে-কালে হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিডের এমন লঘু দ্রবণ টুকটাক শারীরিক সমস্যার টোটকা হিসেবে ব্যবহৃত হত। ফার্মাসিষ্টের দোকানে নানা নামে ওভার দ্য কাউন্টার মেডিসিন হিসেবে বিক্রি হত। শিলি’স অ্যাসিডও তাই। তবে তাতে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের পরিমাণ ৪-৫%, বাজারে উপলব্ধ প্রুসিক অ্যাসিডের অন্য সলিউশন গুলোর তুলনায় একটু কড়া। তাই খুব হিসেব করে ডোজ না নিলে, হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
শিলি’স অ্যাসিড প্রয়োগে, অসাবধানতাবশত সেকালে বহু লোকের মৃত্যুও ঘটেছে।
শোনা যায়, প্রথম ভ্যাম্পায়ার কাহিনির প্রণেতা তরুণ ডাক্তার জন পলিডরি নাকি মাত্রাতিরিক্ত শিলি’স অ্যাসিড নিয়েই আত্মহত্যা করেছিলেন। ১৯১১ নাগাদ অধুনা উত্তরাখণ্ডের মুসৌরির স্যাভয় হোটেলে গারনেট ওর্মের রহস্য মৃত্যুই নাকি ছিল আগাথা ক্রিস্টির প্রথম রহস্যোপন্যাস— ‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার্স অ্যাট স্টাইলস’
এর অনুপ্রেরণা। সেই গারনেট ওর্মেরও মৃত্যুর কারণও ছিল শিলি’স অ্যাসিডের মতোই প্রুসিক অ্যাসিডের কোনও সলিউশন। সেদিনও প্রুসিক অ্যাসিড সলিউশনকেই পথের কাঁটা তুলতে ব্যবহার করেছিলেন টয়েল।
স্লাওতে নেমে, সল্ট হিলে যাওয়ার পথে দোকান থেকে টয়েল দু’বোতল লোকাল বিয়ার কিনলেন ।
সেদিন সন্ধ্যায় সারার কটেজে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পর, সারা যখন ঘরের কাজে ব্যস্ত, বাচ্চারা যখন ঘুমাচ্ছে ; টয়েল সকলের অজ্ঞাতেই সারার বিয়ারের বোতলে মিশিয়ে দিল শিলি’স অ্যাসিড। সেকালের পণ্ডিতরা হিসেব করে দেখেছিলেন, এক চা-চামচের চারভাগের মাত্র একভাগ পরিমাণ শিলি’স অ্যাসিড সলিউশনে যে-পরিমাণ হাইড্রোজেন সায়ানাইড দ্রবীভূত থাকে, তা একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। টয়েল অবশ্য সারার বিয়ারে মিশিয়েছিল অনেকটাই। হত্যার উদ্দেশ্য থাকলে কে আর অত হিসেব-নিকেশ করে! দ্রুত কার্যসিদ্ধি হলেই তো মঙ্গল।
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ সারার কটেজ থেকে অদ্ভুত গোঙানির শব্দ পেয়ে, বৃদ্ধা প্রতিবেশী সারার কটেজে এসে দেখেন— অচৈতন্যপ্রায় সারা মেঝেতে পড়ে রয়েছে, তার মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে আর টয়েল হন্তদন্ত হয়ে বাগানের গেট খুলে পালাচ্ছে। প্রতিবেশী ভদ্রমহিলার তৎপরতায় দ্রুত হাজির হল এক ডাক্তার। কিন্তু সারার শরীরে তখন এক বিন্দুও প্রাণের চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।
এই দুষ্কর্মটি যে টয়েলের কীর্তি, ততক্ষণে তা বুঝতে আর কারও বাকি নেই।
টয়েল কটেজ থেকে খুব বেশিক্ষণ আগে বেরোয়নি। স্থানীয় রেভারেন্ড ছুটলেন স্টেশনে টয়েলকে পাকড়াও করতে। কিন্তু স্টেশনে আসা মাত্র তিনি দেখলেন— টয়েল ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস ক্যারেজে চেপে বসেছে, আর সন্ধ্যের ট্রেন হুইসেল দিয়ে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এখন কী করা! খুনি তো নাকের ডগা দিয়ে পগারপার! রেভারেন্ড সাহেবের উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ করতেই হবে।
তখন মাত্র বছর কয়েক হল ইংল্যান্ড জুড়ে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। স্লাও, প্যাডিংটনের মতো দু’একটা স্টেশনেও টেলিগ্রাফ বসেছে। রেভারেন্ড সাহেব সংক্ষেপে পরিস্থিতির গুরুত্ব জানিয়ে টায়েলের বর্ণনা-সহ একটা টেলিগ্রাম প্যাডিংটন স্টেশনে পাঠালেন। ট্রেন প্যাডিংটন পৌঁছানোর আগেই টেলিগ্রাম পৌঁছে গেল। টেলিগ্রাম পেয়ে একজন পুলিশ সার্জেন্ট সিভিল ড্রেসে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। ট্রেন প্যাডিংটন থামতেই তিনি নির্দিষ্ট কামরায় উঠে পড়লেন। কোয়াকারের লং কোট পরিহিত টয়েলকে চিনতে পুলিশ সার্জেন্টের অসুবিধা হল না। সারারাত পুলিশ সার্জেন্ট টয়েলের পিছু নিলেন, তার গতিবিধির উপর নজর রাখলেন। আর পরদিন সকালেই টয়েল গ্রেপ্তার হল। টেলিগ্রামের সহায়তায় অপরাধী ধরার ঘটনা এই প্রথম। এইটি যদি এই অপরাধ কাহিনির প্রথম চমৎকারিত্ব হয়, দ্বিতীয়টি রয়েছে আদালতের সওয়াল-জবাবে।
আদালতে টয়েলের মামলা মাত্র মাস দুয়েক চলেছিল। সমস্ত তথ্য প্রমাণই তার বিরুদ্ধে। টয়েল যখন একেবারে কোণঠাসা, তখন তার উকিল এক চাল দিলেন। বিচারককে বললেন, হুজুর আমার মক্কেলকে মিছিমিছি দোষারোপ করা হচ্ছে। মৃতা সারা হার্ট অবশ্যই প্রুসিক অ্যাসিডের বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন। কিন্তু সে-বিষ আমার মক্কেল দেয়নি। আপনারা হয়তো জানেন না, মৃতা আপেল খেতে বড় ভালবাসত। আর নতুন বছরের প্রথমদিনে উৎসবের মেজাজে একটু বেশিই আপেল সে খেয়ে ফেলেছিল। ব্যস, আর কী! অতগুলো আপেলের বীজ পেটে গিয়েই এই বিপত্তি!


আপেলের বীজ পেটে গিয়েও যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, অন্তত খাতায়-কলমে এমন একটা সম্ভাবনা যে রয়েছে, এ-ব্যাপারটা ততদিনে অনেকেরই জানা। সুতরাং, বিবাদী পক্ষের উকিলের কথা একেবারে অগ্রাহ্য করাও চলে না। অতএব, উকিলের এই মত যুক্তিগ্রাহ্য কি না, তা বিচার করতে সেকালের বিষ-বিজ্ঞানীরা খাতা-কলম নিয়ে বসে গেলেন। তারা হিসেব কষে দেখলেন— আপেলের বীজ পেটে গিয়ে যৎসামান্যই হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করে। কিন্তু তা ন্যূনতম মারণমাত্রার পরিমাণে পৌঁছাতে গেলে, কোনও ব্যক্তিকে কয়েক হাজার আপেল একসঙ্গে খেতে হবে। যা বাস্তবিক একেবারেই অসম্ভব। সুতরাং, বিবাদী পক্ষের উকিলের যুক্তিও খারিজ হয়ে গেল।
তারপর আর কী? টায়েলের ফাঁসি হল, টায়েলের উকিল তাঁর এই অদ্ভুত যুক্তির জন্য বাকি জীবন সহকর্মীদের টিটকিরি সইলেন, আর শোনা যায় ইংল্যান্ডে সেবছর নাকি আপেল বেজায় সস্তা হয়ে গেছিল। তাই আমরা সাধারণত যে-পরিমাণ আপেল খাই, তাতে গোটা কয়েক আপেলের বীজ চিবিয়ে ফেললে, পেটে চলে গেলেও ক্ষতির কোনও সম্ভাবনা নেই। সাধারণ আমন্ড বাদামের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে, একধরনের আমন্ড বাদাম আছে, তেঁতো আমন্ড। সেসব আমরা সাধারণত খাই না। এই তেঁতো আমন্ডে, সাধারণ মিষ্টি আমন্ড ও আপেলের বীজের তুলনায় অ্যামিগডালিনের পরিমাণ অনেকটাই বেশি থাকে। তাই এই আমন্ড একটু বেশি খেলে, বিপদের সম্ভাবনা আছে বৈকি!
তবে সাধারণ আমন্ড আর আপেলের বীজের ক্ষেত্রে ক্ষতির কোনও সম্ভাবনাই নেই। এদের অ্যামিগডালিন পাকস্থলিতে গিয়ে যে যৎসামান্য হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করে, ওটুকু সায়ানাইড আমাদের যকৃত সামলে নিতে পারে। আমাদের যকৃতে রডেজ নামক এক উৎসেচক থাকে, তা, ওই যৎসামান্য সায়ানাইড সামাল দিতে সক্ষম। কিন্তু যখন মারণ মাত্রার সায়ানাইড প্রবেশ করে শরীরে, তখন কী হয়? কোন বিক্রিয়ায় বা সায়ানাইড রচনা করে তার সংহার কাব্য? সে-কথা পরের পর্বে…




