বইয়ের নাম মানিকবাবু। বইয়ে সংকলিত লেখাগুলি যাঁর, সেই রাধাপ্রসাদ গুপ্ত সত্যজিৎ রায়ের প্রায় সমবয়সি বন্ধু, ব্যক্তিগত পরিসরে তাঁকে ‘মানকে’ও বলতেন। কিন্তু লিখতেন যখন, তখন হয় সত্যজিৎ নয় মানিকবাবু লিখতেন। বঙ্গসংস্কৃতির তখন অন্য সময় ছিল। প্রকাশ্য আর অপ্রকাশ্যের মধ্যে শোভনতার একটা বেড়া ছিল, একটা আত্মসম্পাদনা ছিল।
মানিকবাবু, শাঁটুলবাবু দু’জনেই আজ নেই। আছে তাঁদের বন্ধুত্বের সময়টা, তার ধাত্রী এই শহরটা; শাঁটুলবাবুর শব্দ-ছবিতে, যেমন, এ বইয়ের একটি লেখায়, ‘সত্যজিৎ রায় আমার বন্ধু ছিলেন। দীর্ঘদিনের। বলা যায় একেবারে আদি যুগের বন্ধুত্ব। চল্লিশ দশকের গোড়ায় আমরা পরস্পরকে দেখি। কিন্তু কোনো কথা তখন হত না। আলাপ হয় ১৯৪৩ সালে। পুরোনো কলকাতার তখন বেশ একটা অন্য ব্যাপার ছিল। একেবারে ফাঁকা রাস্তাঘাট, চারিদিক কেমন যেন পরিষ্কার-পরিষ্কারও লাগত। তার উপর হাতে কোনো কাজ ছিল না। পরিষ্কার কথায় বলতে গেলে বলা যায় বেকার। সারাদিন অফুরন্ত সময়। তাই মনোনিবেশ করে থাকতাম একমাত্র বইয়ের পাতায়। বহু বই তখন আমি পড়তাম। আর বইয়ের প্রয়োজনও হত প্রায় রোজই। সেই সুবাদেই যাতায়াত ছিল কলেজ স্ট্রিটে। মানিকবাবুর সঙ্গে ওখানেই দেখা। কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে ছিল তখন আমার নিত্য যাতায়াত। আর বড়ো ঠেক ছিল ডি. জে কিমারে।’
সার্কাসের রঙ, অভিনয়ের রঙ জীবনের রঙ এবং অঞ্জন দত্ত! পড়ুয়ার দপ্তর পর্ব ১: লিখছেন প্রিয়ক মিত্র
এ-লেখার নাম ‘মানিকবাবুর আড্ডাতে জুড়ি ছিল না’। দশটা লেখা আছে এ-বইয়ে। ন’টা সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে। আর-একটা লেখার নাম সন্দীপ রায়ের ফটিকচাঁদ। সে-ও অবশ্য মানিকবাবুকে নিয়ে নয় এমন বলা যাবে না। লেখাগুলোর সবই নানা পত্রপত্রিকায় নানা সময়ে প্রকাশিত। বেশির ভাগই আড্ডার ধরনে, আড্ডার কথা লেখা। সে-আড্ডায় কেবল মানিকবাবু আর শাঁটুলবাবু ছিলেন না। ছিলেন সেই ফুরনো কলকাতার আরও কিছু প্রদীপ— কমলকুমার মজুমদার, পৃথ্বীশ নিয়োগী, বংশী চন্দ্রগুপ্ত, হরিসাধন দাশগুপ্ত, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এবং কেউ ছিলেন না সে আড্ডার মধ্যমণি।

প্রদীপ নিবিয়া গেছে। সে নির্বাপণ অমোঘ। কিন্তু আলোর ইতিহাসটুকু ধরে রাখা হল না, দুঃখ এই। ‘সত্যজিৎ রায় আর কিছু পুরোনো দিনের কথা’য় রাধাপ্রসাদ লিখছেন, ‘কয়েক বছর আগে মানিকবাবুর জীবনী ‘দি ইনার আই’-এর লেখক যুবক অ্যান্ড্রু রবিনসন আমার বহুদিন আগের একটা ছোট্ট লেখা ‘দোজ কফি হাউস ডেজ’ পড়ে আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আমি বা আমাদের মধ্যে অন্য কেউ কফি হাউসে আড্ডার ডায়েরি গোছের কিছু লিখেছিলাম কি না। দুঃখের বিষয় আমাদের মধ্যে ‘পরিচয়ের আড্ডা’র শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষের মতন কেউ আমাদের আড্ডার বিচিত্র বিবরণের নোট রাখেননি বা স্মৃতিনির্ভর লেখার চেষ্টাও করেননি।
তবু শাঁটুলবাবুর মতোই কেউ-কেউ মাঝে-মাঝে লিখেছেনও। লিখেছেন বলেই এমন বই হাতে এল। কিন্তু মা যা হলেন, আর যা হতে পারতেন সে দুইয়ে বিস্তর ফারাক। কেন, সে কথা বলি। প্রকাশকের কথাটাই আগে পড়ি, ‘আরও একটি জরুরি কথা। কিছু কিছু লেখায় একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। সেইসব ক্ষেত্রে কোনো লেখাকেই আমরা আলাদা করে সম্পাদনা না করে এক রকমই রেখে দিয়েছি কেননা আমরা মনে করেছি তাতেই মূল লেখাটির চরিত্র ক্ষুণ্ণ হতে পারে।’

প্রয়াত লেখকের পূর্ব-প্রকাশিত লেখায় কাঁচি না-চালানোর সিদ্ধান্ত সংগত, কিন্তু কোনও লেখার কোনও প্রসঙ্গ-কথা থাকবে না কেন? বাঙালি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল সময়ের দলিল তো এ বই। সেই সময়টিকে গভীর ভাবে জানেন এমন কোনও সাংস্কৃতিক ভাষ্যকারকে দিয়ে এ বইকে সটীক করার প্রয়োজন ছিল। বইয়ের কথামুখ যিনি লিখেছেন, সেই শঙ্করলাল ভট্টাচার্য-ই কাজটা করতে পারতেন। করলে, এই ‘টকিং হিস্ট্রি’ সত্যিই উত্তরকালের জন্য একটা সংগ্রহযোগ্য চেহারা পেত। সে-চেহারা আরও উজ্জ্বল হত ছবি থাকলে। এ বইয়ের প্রায় প্রতিটি লেখা ছবির দাবি করে, আলোকচিত্র বা স্কেচ। সাদা-কালোয়, টেক্সটের সঙ্গেই ছাপা যেত সে-সব ছবি, আর্ট প্লেটের অতিরিক্ত খরচা না করেই। বইয়ের নামলিপিকার দেবাশীষ দেবকে দিয়েই কাজটা করানো যেত। শাঁটুলবাবুর পূর্বতন বইগুলি কিন্তু বাঙালির বই-তৈরির নিষ্ঠারও স্মরণীয় ফসল হয়ে আছে। তার চেয়ে বরং প্রকাশকের কথায় ভাষা-বিলাসে আগ্রহ বেশি। অসম্পাদিত, অসংযমী ভাষাবিলাস। যথা, ‘বাবু শ্রীরাধাপ্রসাদ গুপ্ত প্রণীত ‘মানিকবাবু’ গ্রন্থটি প্রকাশ-লগ্নে, দু’একটি বাত্চিৎ আবশ্যকহেতু এই লিখনের অবতারণা। প্রথমত এ-প্রবন্ধের নামকরণে স্বাভাবিক ভাবেই লেখক সম্মতি বা অসম্মতি কিছুই জানাতে পারেননি। প্রকাশক প্রায় একক সিদ্ধান্তে এ গ্রন্থের নাম স্থির করেছেন। এ স্পর্ধাজনিত ত্রুটি মার্জনীয়।’
প্রকাশকের উপর কমলকুমারের ভর হয়েছে বোঝা গেল। কিন্তু এ-বই ‘রাধাপ্রসাদ গুপ্ত প্রণীত’ হয় কী করে! শাঁটুলবাবু বেঁচে থাকলে যৎকিঞ্চিৎ কাঁচা প্রকাশকের প্রাপ্য হত নিশ্চয়। তবু আশা করতে ইচ্ছে করে, উচ্ছ্বসিত ব্লার্ব, সঙ্গতিহীন সম্পাদনা, ঘোলাটে ভাষা— সবই শাঁটুলবাবু-মানিকবাবুদের স্মরণ করে সংস্কৃতি পাবে পরবর্তী সংস্করণে। অন্তত, ‘অলমিতি বিস্তারেণ…’ ‘অলমতি’ হয়ে উঠবে।
মানিকবাবু। রাধাপ্রসাদ গুপ্ত। সপ্তর্ষি প্রকাশন। ৩৫০ টাকা




