নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা পরে মঞ্চে এলেন তিনি। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল দর্শকবৃন্দ, তাঁর জন্য। অথচ তিনি এসে পৌঁছননি ঠিক সময়ে। এর ফলে দর্শকদের মনে তৈরি হচ্ছে মৃদু উষ্মা আর কিঞ্চিৎ বিরক্তি। তিনিও বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু মঞ্চে এসে ক্ষমা না চেয়ে অম্লানবদনে দাবি করলেন যে তিনি একেবারে ঠিক সময়ে, ঘড়ির কাঁটায়-কাঁটায় এসেছেন মঞ্চে। দর্শকদের বললেন, তাঁর কথা যদি বিশ্বাস না হয় তো সবাই দেখুক তাদের হাতঘড়ি! দর্শকরা তাকালেন যে যার ঘড়ির দিকে— চমকে উঠল প্রেক্ষাগৃহের সবাই। সত্যিই তো, একেবারে ঠিক সময়ে এসেছেন! কিন্তু এ কীভাবে সম্ভব, এই সময় তো তারা পেরিয়ে এসেছেন বেশ কিছুক্ষণ আগেই। দর্শক হতভম্ব আর তাঁর মুখে খেলে যাচ্ছে অদ্ভুত এক হাসির ঝলক। ঘোর ভাঙলে হাততালিতে ফেটে পড়ল প্রেক্ষাগৃহ। এমন জাদুর খেলা তারা দেখেনি কখনও। এই দর্শকদের মধ্যে ছিল বছর-দশেকের এক কিশোর, আজ তিনি মধ্য-আশিতে। জাদুকর প্রতুলচন্দ্র সরকারকে নিয়ে লেখা একটি বই আমাকে পড়তে দেখে তাঁর হঠাৎই মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার সেই দিনের কথা। আর যখন তিনি বললেন এই ঘটনার কথা, তখনই চোখে পড়ল এই বইয়ে লেখা আছে, ‘এই জাদুকর তাঁর মায়াবলে সত্যি ঘড়ির সময় পালটে দিতে পারেন।’
বুঝতেই পারছেন, এই প্রতুলচন্দ্র সরকার হলেন সিনিয়র পি সি সরকার, আর বইটি লিখেছেন তাঁর পুত্র আরেক পি সি সরকার, তবে তিনি জুনিয়র। দুই ম্যাজিশিয়ান যখন জড়িয়ে থাকেন কোনও বইয়ে, তখন সেখানে ম্যাজিকের কথা আসবেই। এই বইয়ে এসেছেও, কিন্তু এছাড়াও এসেছে এমন সব কথা, যেখানে ম্যাজিকের থেকে বড় হয়ে গেছে ব্যক্তিগত জীবনের ম্যাজিক, লড়াইয়ের ম্যাজিক, দুনিয়া জয় করার ম্যাজিক।

আরও পড়ুন : রামায়ণের অনালোচিত দিকে আলো ফেলে এই বই! লিখছেন গৌতমকুমার দে…
এই বইয়ের নামকরণ কোনও বিশেষ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে হলেও, সেই ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রেখে এসেছে সরকার পরিবারের অন্য সদস্যরাও। সিনিয়র পি সি সরকারের বাবা ভগবানচন্দ্রের সময় থেকে এই বইয়ের সূচনা। প্রথম দিকে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে তাঁর কথা। তবে সে-কথা লেখার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে স্বয়ং সিনিয়র পি সি সরকারের লেখার দীর্ঘ উদ্ধৃতিগুলি, আমরা তাঁর থেকেই জানতে পারি, সরকার পরিবারের সেই সময়ের ইতিহাস। তিনি লিখছেন, “পূর্ববঙ্গে আশকপুর গ্রামে আমাদের বাড়ী ছিল। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত অর্থাৎ সহজ কথায় ‘গরীব’ ছিলাম।” এই প্রসঙ্গেই জানা যায় যে, সরকার পরিবারে জাদুর চর্চা ছিল কয়েক পুরুষ ধরেই। যেমন সিনিয়র পি সি সরকারের বাবা ভগবানচন্দ্র, তাঁর পিতা দ্বারকানাথ সরকার এবং পিতামহ রমাকান্ত সরকারও জাদুবিদ্যায় পারদর্শী হলেও সামাজিক কারণে তাঁরা জনসমক্ষে তা দেখাতেন না। এর কারণ হিসেবে পি সি সরকার জুনিয়র লিখেছেন, ‘তখন বৌদ্ধতন্ত্রের দশমহাবিদ্যার সঙ্গে হিন্দুতন্ত্রের দশমহাবিদ্যার লড়াইয়ে কে বেশি শক্তিমান, কার কত বেশি অলৌকিক শক্তি আছে, সেই ধর্মযুদ্ধ চলছে আর ম্যাজিক তার হাতিয়ার। রক্তক্ষয়ী লড়াই তখন তুঙ্গে। পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রচার ও অপপ্রচারের ঢল নেমেছে। নাথপন্থী জাদুকর সন্ন্যাসীরা তখন ধর্মপ্রচারে ম্যাজিক ব্যবহার করতে ব্যস্ত। রূপকথার মঞ্চরূপ ইন্দ্রজাল বিদ্যার রোমান্টিক দিকটা বা কল্পবিজ্ঞানসুলভ চেহারাটা ধর্মের লোকাচারে চাপা পড়ে গিয়েছে। ম্যাজিশিয়ানরা তখন সমাজের চোখে পিশাচসিদ্ধ লোভী কুমতলবি মানুষ। মনোরঞ্জন নয়, জাদুকররা তুকতাক করে নাকি মানুষের ক্ষতি করে হাসিমুখের আড়ালে।’ এই উদ্ধৃতির মধ্যে সমসাময়িক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ থাকলেও, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মঞ্চ, বিজ্ঞান এবং মনোরঞ্জনের প্রসঙ্গ। আর এখানেই সিনিয়র পি সি সরকারের কৃতিত্ব।

তাঁর আগে, গণপতি চক্রবর্তীদের সময়েও, মঞ্চে শুধু ম্যাজিক দেখানোর অবকাশ ছিল না। যেমন বোসের সার্কাসে জাদু দেখাতেন গণপতি, পরে তিনি নিজে বোসের সার্কাস ছেড়ে দিয়ে নিজে একটি সার্কাসের দল খোলেন, নামে সার্কাস পার্টি হলেও সেখানে ম্যাজিকই ছিল প্রধান বিষয়।
‘তখন সেই সমাজে যে কোনো জাদুকর ছিলেন না, তা নয়। গণপতি চক্রবর্তী, রয় দ্য মিস্টিক থেকে শুরু করে রাজা বোস, প্রফেসর যতীন সাহা, মান্না দ্য গ্রেট প্রমুখ জাদু-ব্যক্তিত্বগণ স্বমহিমায়, তাঁরা নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত প্রতিভাবান কৃতী সন্তান। কিন্তু ইতিহাসে স্থান করে নিয়ে শিল্প, সাহিত্য এবং সংবাদের শিরোনামে উঠে ম্যাজিককে হাতিয়ার করে রূপকথাময় জীবন বানাতে কেউই লোককথা, লোকগান এবং কল্পলোকের নায়ক হওয়ার মাত্রায় গিয়ে পৌঁছতে পারেননি।… গণপতিবাবু ম্যাজিক দেখিয়েছেন সার্কাসের তাঁবুতে, একটা উপাঙ্গ হিসেবে। সার্কাসের ট্রাপিজ শিল্পীদের বা চাকার ওপর চলা মনো-সাইকেল চালক শিল্পীদের নাম যেমন কেউ জানে না, তেমনই সমাজে, সাহিত্যেও অবহেলিত ছিল ছিল ম্যাজিক। কেউই পেশাদার জাদুশিল্পী হিসেবে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে, পোস্টার ছাপিয়ে, অন্যান্য মঞ্চশিল্পের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান করে সদর্পে বুক চিতিয়ে নিজেকে মেলে ধরেননি।’
এমন অদ্ভুত, দিশাহারা অসহায়তার মধ্যেই প্রতুলচন্দ্র ঠিক এই কাজগুলিই করলেন এবং তিনি যে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছিলেন, তাঁর জীবনই এর প্রমাণ।
আর এই কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োগ করলেন বিজ্ঞানকে, প্রতিটা ম্যাজিক হয়ে উঠল কৌশলকেন্দ্রিক, অথচ লোকের সামনে তৈরি হল অলৌকিক এক রহস্য। মোহিনী মায়ায় আবিষ্ট করে ফেলতেন দর্শককে। এক অস্বচ্ছল আর অবহেলিত জীবনকে শুধু অক্লান্ত পরিশ্রম করে ম্যাজিকের মতো একটা তথাকথিত ‘অসম্মানের’ শিল্পকে আঁকড়ে বিশ্বজয় করে ফেললেন।
তাঁর এই বিশ্বজয়ের পথ স্বাভাবিকভাবেই খুব সুগম ছিল না। নিজের পরিবার, নিজের দল থেকে শুরু করে দেশ ও বিদেশে নানা চক্রান্তের সামনে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিছু কিছু চক্রান্তের জাল ছিল ভয়ংকর, যে-কোনও ক্রাইম ফিকশনকে হার মানাতে পারে সেসব। যেমন ধরুন, প্যারিসের থিয়েটার ‘দ্য লা আঁতোয়াল’-এর ঘটনা। এই অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল স্টেজ থেকে একটা হাতিকে অদৃশ্য করে দেওয়া। অনুষ্ঠান শুরু দু’দিন আগে স্থানীয় কর্পোরেশন নোটিশ পাঠাল যে, স্টেজে হাতি তোলা যাবে না, এতে স্টেজের ক্ষতি হতে পারে। অনেক অনুরোধ করেও যখন তা ব্যর্থ হল, তখন তিনি ঠিক করলেন স্টেজ থেকে একটা মোটর গাড়ি অদৃশ্য করে দেবেন। এবার আপত্তি জানাল ফায়ার ব্রিগেড। শেষ পর্যন্ত গাড়ির খোলস তোলা হল স্টেজে। সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে শুধু সাংবাদিক আর সমালোচকদের জন্য কিছু স্থান সংরক্ষণ করা ছিল। মঞ্চের পর্দা খুলতেই দেখা গেল সমস্ত হল ফাঁকা, সামনে বসে আছেন কয়েকজন সাংবাদিক। বুঝলেন বড় রকমের চক্রান্তের মধ্যে পড়ে গেছেন তিনি। নিমেষে বুদ্ধি খাটিয়ে বললেন যে, আজকের অনুষ্ঠানটি আসলে তিনি দেখাতে চাইছেন সাংবাদিক আর রসজ্ঞ মানুষদের সামনেই। তারপর শুরু করলেন তাঁর জাদু-প্রদর্শন, মুগ্ধ হয়ে গেলেন উপস্থিত সবাই। পরে জানা গেল জার্মানির প্রখ্যাত জাদুকর হেলমুট স্ক্রুবার ওরফে ‘কালানাগ’, যিনি আবার প্রতুলচন্দ্রের বেশ বন্ধুও বটে, তিনিই কলকাঠি নেড়ে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপ দিয়ে এবং নিজেই সব টিকিট কিনে নিয়ে এই অন্তর্ঘাতটি করেছিলেন। তিনি চাননি ইউরোপের মাটিতে প্রতুলচন্দ্র সফল হোন। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছিল তাঁর জীবনে।

তাঁর পুত্র এই বইয়ে প্রতুলচন্দ্রের জাদুর কৌশল, চেনা ম্যাজিকের মধ্যে নানারকম ইম্প্রোভাইজেশন এবং জাদু-প্রদর্শনের মাধ্যমে সারা পৃথিবী মাতিয়ে দেওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন। অত্যন্ত সুখপাঠ্য সেই সব অংশ। কিন্তু ম্যাজিশিয়ান সত্তা ছাড়াও তাঁর চরিত্রের আরও কিছু দিক এখানে এসেছে, যা বোধহয় তাঁকে সত্যি সত্যি লৌকিক থেকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত করে। পরাধীন ভারতকে স্বাধীন করার জন্য একইভাবে তৈরি করেছিলেন নিজেকে। তাঁর ডায়েরিতে আছে, কীভাবে তিনি লাঠি খেলা আর ছোরাখেলায় হাত পাকিয়েছিলেন। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে গোপনে পাচার করতেন রেকর্ড বা নথিপত্র। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথায় ইংল্যান্ডের শো বাতিল করে জাপানে গেলেন রাসবিহারী বসুকে সাহায্য করার জন্য। দেশমাতৃকার শৃঙ্খল ছিন্ন করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ম্যাজিককেও। তিনি যেন জাদুকরের খোলসে লুকিয়ে থাকা এক দুর্দান্ত অনমনীয় বিপ্লবী।
শেষে একটি ঘটনার উল্লেখ করি। যোধপুরের মহারাজা হনবন্ত সিং ছিলেন জাদুপ্রেমী এবং প্রতুলচন্দ্রর বন্ধু। ম্যাজিকের যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনিয়ে জাদু দেখাতেন মাঝে-মধ্যে। একবার ঠিক করলেন যে, বন্ধু রাজাদের সামনে তিনি জাদু দেখাবেন। সেই মতো শুরু করলেন তাঁর প্রদর্শন। কিছুক্ষণ পরে শেষ করলেন তিনি, কিন্তু বন্ধুরা গোলমাল পাকালেন, তাঁদের দাবি ‘আরও চাই’। হনবন্ত সিং তখন বললেন যে, বন্ধু প্রতুলচন্দ্র তাঁর হয়ে খেলা দেখাবেন। বেঁকে বসলেন রাজারা, তাঁরা কোনও সাধারণ লোকের খেলা দেখবেন না। ড্রেসিং রুম থেকে পোশাক পরিবর্তন করে মঞ্চে এলেন প্রতুলচন্দ্র। রাজার বেশে এসে দাঁড়ালেন তিনি আর হনবন্ত সিং বললেন, ‘নাউ আই প্রেজেন্ট দ্য মহারাজা অফ ম্যাজিক।’
এই একই কথা বলা যায় ‘আমার বাবা পি সি সরকার’ বইটি সম্পর্কেও। এই বইয়ের লেখক পি সি সরকার জুনিয়রও বইটি পাঠকের সামনে রেখে বলতে পারেন, ‘নাউ আই প্রেজেন্ট দ্য মহারাজা অফ ম্যাজিক’, তবে এই মহারাজার রাজত্ব কোনও ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়, তিনি অধিকার করে আছেন সারা পৃথিবীর মানুষের মনোজগৎ।




