জীবন বনাম সিনেমা
সন্ধে সাতটা। দক্ষিণ কলকাতার একটা পুরনো সিঙ্গল স্ক্রিন হলের সামনে বিশাল ভিড়। পোস্টারে নায়কের গলায় গাঁদা ফুলের মালা ঝুলছে। সবে একটা শো ভেঙেছে, বোঝাই যাচ্ছে হাউসফুল গেছে। লোকেদের উচ্ছ্বাস আর ভাজা বাদাম বিক্রেতাদের হাঁকডাক ডিঙিয়ে, হেঁটে আসছে নীলা।
পাশ থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর: মুখটা এরকম গম্ভীর কেন? চিরতার জল খেয়ে বেরিয়েছ না কি?
নীলা এই কটাক্ষ পাত্তা দেয় না : তুমি কি হল থেকে বেরলে না কি?
নীলাব্জ: ওই, একজন বলল, ভাল হয়েছে…তাই…
নীলা: ভাল তো লাগবেই। অলীক, অবাস্তব জিনিসপত্র তো ভাল লাগবেই।
নীলাব্জ: একটু অবাস্তব, কিন্তু সিনেমা তো আসলে জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
নীলা: একদমই না। সিনেমার পুরো ব্যাপারটাই মিথ্যে। আর সিনেমা জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, জীবন আসলে কিছু বাজে সিনেমার প্রতিচ্ছবি।
নীলাব্জ: ওহ্! উডি অ্যালেন ঝাড়ছ? লাইফ ইমিটেটস ব্যাড টেলেভিশন? সেও তো সিনেমারই লোক।
নীলা: হতে পারে, কিন্তু এই কথাটা মন্দ বলেননি।
নীলাব্জ: সিনেমা তো মিথ্যে সবাই জানি, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? জীবন কি পুরোটা সত্যি না কি?
নীলা: জীবন অন্তত নিজেকে শিল্প বলে চালায় না। জীবন নিজেকে মহান কিছু বলে বিক্রি করে না।
নীলাব্জ: কিন্তু আমি আবার বলছি, সিনেমা তো জীবনকেই নকল করে। আমাদের জীবনে যা ঘটে তার…
নীলা: না। সিনেমা জীবনকে সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যে বলে। আর মানুষ সেই মিথ্যেটাকেই সত্যি ভাবতে শুরু করে।
নীলাব্জ: ওহ্ এবার গদার ঝাড়ছ?
নীলা: মানে?
নীলাব্জ: সিনেমা ইজ দ্য মোস্ট বিউটিফুল ফ্রড ইন দ্য ওয়ার্ল্ড!
নীলা: বিউটিফুল ব্যাপারটা সাব্জেক্টিভ। মোদ্দা কথা, আই হেট সিনেমা!
ওরা দু’জন কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটতে থাকে। নীলাব্জ, সাহস ফিরে পেতে একটু সময় নেয়।
নীলাব্জ: মানে… আমি বলছিলাম যে, এত তীব্র ঘৃণা কেন? শুধু একটা ইলিউশন তৈরি করে বলে?
নীলা: ইলিউশন অর্থাৎ মিথ্যে মায়া, মিথ্যে আশ্বাস যে— শেষে সত্যের জিত হয়। শেষমেশ সব ঠিক হয়ে যায়। দুনিয়া এরকম? জীবন এরকম?
নীলাব্জ হাসে: তুমি কি চাও সবাই কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরুক?
নীলা: আমি চাই মানুষ অন্তত বাস্তবটা বুঝুক। জীবনে কোনওদিন ‘সব ঠিক’ হয় না। এখানে শুধু আঘাতের পর আঘাত চলতে থাকে। ক্ষত শুকনোর আগেই আবার আঘাত আসে। যদি বা ক্ষত শুকোয়, দাগ কিন্তু থেকে যায়। সিনেমা দাগটা দেখায় না, মেকআপ লাগিয়ে রাখে।
নীলাব্জ: তাই বলে সিনেমাকে দোষ দেবে? সিনেমা একটা ভাষা। ভাষাহীন জীবনকে একটা পোয়েটিক জাস্টিস দেয় সিনেমা। সিনেমা সেই সত্যির ভাষা।
নীলা: ভাষা? না পারফিউম। দুর্গন্ধ ঢাকতে সুগন্ধি।
নীলাব্জ: উফ! তোমার কথায় মনে হয়, পৃথিবীতে কোনও ভাল জিনিস নেই।
নীলা: ভাল জিনিস অনেক আছে। কিন্তু এই সিনেমা যে ভাল সেজে ক্ষতি করছে মানুষের, এটা মানুষ কবে বুঝবে?
নীলাব্জ: কী ক্ষতি?
নীলা: তুমি বুঝতে পারছ না? সিনেমা কীভাবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মানদণ্ড বানায়, তুমি জানো না? মানুষ লার্জার দ্যান লাইফ ভাবতে শুরু করে— প্রেম মানে এরকম। সফলতা মানে এরকম। নায়ক মানে এরকম। ব্যথা মানে এরকম। বিয়ে মানে এরকম। তারপর বাস্তবটা যখন ওই মাপে মেলে না, তখন তারা হতাশ হয়, বিষণ্ণ হয়, অন্যদের দোষ দেয়, নিজের জীবনকে ছোট ভাবে।
আমি চাই মানুষ অন্তত বাস্তবটা বুঝুক। জীবনে কোনওদিন ‘সব ঠিক’ হয় না। এখানে শুধু আঘাতের পর আঘাত চলতে থাকে। ক্ষত শুকনোর আগেই আবার আঘাত আসে। যদি বা ক্ষত শুকোয়, দাগ কিন্তু থেকে যায়। সিনেমা দাগটা দেখায় না, মেকআপ লাগিয়ে রাখে।
নীলাব্জ: এটা তো মানুষের সমস্যা, সিনেমার নয়।
নীলা: তার মানে তুমি বলছ দর্শক বোকা। আর বোকা মানুষকে আরও বোকা বানিয়ে রাখার একটা বড় চালাকি হল সিনেমা। তাহলে আমার জীবনে এই ফালতু সিনেমার কোনও জায়গা নেই।
নীলাব্জ: তোমার মিথ্যে নিয়ে খুব সমস্যা দেখছি। সিনেমাতে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে অনেক কিছুই দেখানো হয়, মানছি। কিন্তু আমাদের জীবনেও তো মিথ্যে আছে। সেগুলো নিয়েই তো চলি। কোন খবরটা বিশ্বাস করতে পারো? রাষ্ট্রনেতারা যে বিভিন্ন ভাবে মারা যায়, খবরে আসে নানান কথা, কোনটা বিশ্বাস করতে পারো? বিজ্ঞানের কতকিছুই তো দশ বছর বাদে ভুল প্রমাণিত হতে পারে, সেই মিথ্যেগুলো নিয়েও তো বেঁচে আছি, তাই না? হয়তো স্কুলের পাঠ্য-পুস্তকে মিথ্যে লেখা হচ্ছে, সেগুলো পড়েও শিশুরা বড় হচ্ছে। সেটা জীবন নয়? হেরে যাওয়া মানুষকে আর একবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন যে দেখাতে চায়, তার উপর তোমার এত রাগ?
নীলা: মিথ্যে স্বপ্ন নীলাব্জ। হ্যাপি এন্ডিং নামের একটা নেশা। জীবনে যে হ্যাপি এন্ডিং নেই, সমাপতন নেই। কোনো নায়ক নেই, খলনায়ক নেই। কেউ ক্ষমা চাইবে না, যে যার মতো অপরাধ করে বেরিয়ে যাবে। কেউ বিচার করার নেই, কোনো শাস্তি নেই।
নীলাব্জ: এটা সিনেমার দোষ না। এটা মানুষের মনস্তত্ত্ব। তুমি নিজেই তো তোমার জীবনের ডিরেক্টর। মেমরি কি মন্তাজ নয়? তুমি নিজেই কাটছাঁট করো, ড্রামাটাইজ করো। তাহলে সিনেমাকে দোষ দিচ্ছ কেন?
নীলা: আমার স্মৃতি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। সিনেমা জনতার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সিনেমা একটা ইন্ডাস্ট্রি। ওরা জানে কীভাবে মানুষের মাথায় ঢুকতে হয়। প্রেমকে প্যাকেট করে বিক্রি করতে হয়। বেদনাকে সাউন্ডট্র্যাক দিয়ে চকচকে করে তুলতে হয়। গায়কের অভিনয় ক্ষমতা দুর্বল হলে বা চেহারা ঝাঁ-চকচকে না হলে, সুপুরুষ নায়ক এনে তাকে শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে মিথ্যের পর মিথ্যে সৃষ্টি করে সিনেমা। কল্পনা সাজিয়ে-সাজিয়ে সাধারণ জীবনকে অপমান করে।
নীলাব্জ: সাধারণ জীবনকে অপমান করে?
নীলা: হ্যাঁ। কারণ সিনেমা দেখার পরে মানুষ নিজের জীবনকে ‘কম’ মনে করে। নীরব ভালবাসা বোরিং লাগে। ধীরে-ধীরে গড়া সম্পর্ককে ‘স্পার্ক’ নেই বলে ছুঁড়ে ফেলে। স্বাভাবিক দিনকে অর্থহীন লাগে। সিনেমা সুখ না, সুখের প্রতি অবজ্ঞা তৈরি করে। দু’ঘণ্টায় কি জীবন দেখানো সম্ভব নীলাব্জ?
নীলাব্জ: তুমি বলছ সিনেমা মানুষকে অসন্তুষ্ট করে। কিন্তু আমার মনে হয়, মানুষ এমনিতেই অসন্তুষ্ট। সোশাল মিডিয়াতে যে-গতিতে মানুষ স্ক্রোল করে চলেছে, তাতে সিনেমার কি দোষ বলো?
নীলা: ওই আর এক ফেক জিনিস! ওখানেও তো মিথ্যে স্বপ্ন বেচা হচ্ছে।

নীলাব্জ: তোমার এরকম সারাক্ষণ সত্যি চাই, সত্যি চাই করে বেড়ালে কিন্তু মুশকিল আছে। বাস্তব বহু মানুষকে পিষে দেয়। সিনেমা তাদের একটা জায়গা দেয়, যেখানে তারা অন্তত একটু অনুভব করতে পারে।
নীলা: অনুভব? না, ভুলে থাকতে পারে?
নীলাব্জ: ভুলে থাকা কখনও-কখনও বাঁচার উপায়। তুমি যাকে পালিয়ে থাকা বলছ, আমি তাকে সারভাইভাল বলছি।
নীলা একটু চুপ করে যায়। এই সারভাইভাল-এর ব্যাপারটার সঙ্গে নিজেও কিছুটা একমত, তাই আর কথা বাড়ায় না।
নীলাব্জ: আচ্ছা, তুমি যে বলছ, সিনেমা মানুষকে অনুকরণ করতে শেখায়— এ তো সব শিল্পেই হয়। গান শুনে মানুষ প্রেমে পড়ে, কবিতা পড়ে মানুষ কাঁদে। তাহলে কি গান, কবিতাকেও ঘৃণা করো?
নীলা: কবিতা নিজেকে জীবন বলে দাবি করে না। কবিতা জানে সে কবিতা। সিনেমা নিজেকে বাস্তব বলে চালায়। বিশেষ করে যখন ব্যাবসা ঢুকে যায়।
নীলাব্জ: তাহলে এখন তুমি আসলে সিনেমাকে না, বাজারকে ঘৃণা করছ। প্রোডাক্টটাকে। ফর্মুলাটাকে।
নীলা: হ্যাঁ, কারণ সিনেমা বেশিরভাগই প্রোডাক্ট। অনুভূতির ওপর ঝাঁ-চকচকে বিজ্ঞাপন।
নীলাব্জ: তুমি অফিসে কী করো? প্রেজেন্টেশান বানাও। নিজেকে প্যাকেজ করো। কেরিয়ার বানাও। ওখানে কি অভিনয় নেই? বিজ্ঞাপন নেই? নিজে যদি ১০-এ ৫ হও, নিজেকে ৭ বলে প্রোজেক্ট করা নেই?
নীলা: সেটা সারভাইভাল নীলাব্জ। তুমিও জানো।
নীলাব্জ: সিনেমা আয়না দেখায় নীলা! আয়নায় মুখ খারাপ দেখালে আয়নাকেই ভেঙে ফেলবে?
নীলা: আবার আয়না কোথা থেকে নিয়ে আসলে?
নীলাব্জ: আমার মনে হয়, তোমার সিনেমা নিয়ে রাগটা আসলে সিনেমার উপর না। নিজের জীবনের উপর।
নীলা রেগে যায় : আমার জীবন?
নীলাব্জ: হ্যাঁ, তুমি এত তীব্রভাবে ঘৃণা করছ, কারণ কোথাও একটা তুমি বিশ্বাস করতে ভয় পাও। সিনেমা তোমাকে আশা দেখায়, আর তুমি সেই আশাকেই ভয় পাও।
নীলা: আমি আশাকে ভয় পাই না। আমি মিথ্যে আশাকে ঘৃণা করি।
নীলাব্জ: আশার আবার সত্যি-মিথ্যে কী? সেই আশাতেই তো মানুষ বাঁচে।
নীলা হেসে ফেলে: তুমসে না হো পায়েগা নীলাব্জ। হিন্দুস্তান মে যবতক সিনেমা হ্যায়, লোগ চুতিয়া বনতে রাহেঙ্গে।
নীলাব্জ: এই তো আবার সিনেমা। গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর! রামাধির সিং!
নীলা: সবাই নায়ক-নায়িকা হতে চাইছে নীলাব্জ। গঙ্গার ধারে যাও, পার্কে যাও, সবাই সারাক্ষণ রিল বানাচ্ছে। সবাই বিখ্যাত হতে চাইছে, সিনেমা স্টার হতে চাইছে। এটা যে কী বড় ব্যাধি সমাজের, তোমাকে কী করে বোঝাই?
নীলাব্জ: তাতেই-বা সিনেমার কী দোষ বলো? তুমি যদি ভাবতে না শেখো, শুধুমাত্র দেখে বিশ্বাস করতে শেখো, তাহলে দোষটা কার? সিনেমার?
নীলা হাসে: তাহলে শেষ কথা কী দাঁড়াল? সিনেমা না দেখলেও মানুষ বোকা। দেখলেও বোকা। আর সিনেমা হলো ধোয়া তুলসী পাতা?
নীলাব্জ: না, ধোয়া তুলসী পাতা কেউ না। সিনেমা একটা মাধ্যম। তুমি যেভাবে ব্যবহার করবে সেভাবে কাজ করবে। কেউ ছুরি দিয়ে ফল কাটে, কেউ খুন করে। দোষটা কিন্তু ছুরির না।
নীলা: আর তুমি ভুলে যাচ্ছ, ছুরিটা কারা বানায়, কারা ধার দেয় আর কার হাতে তুলে দেয়।
নীলাব্জ: এখানেই তো যুদ্ধ।
নীলা: আমি যুদ্ধ চাই না নীলাব্জ। আমি শুধু সত্যির আলোটুকু চেয়েছি।
নীলাব্জ: মানুষের বাঁচার জন্য যতটুকু আলো দরকার সে যেন পায়। কিন্তু সত্যি দিয়ে তো সব আলো আসে না।
নীলা হেসে বিদায় জানায়।
নীলাব্জ: কোথায় চললে?
নীলা: বাস্তবের কাঁটায় ঘেরা পথটাই বেছে নিলাম নীলাব্জ। আর তুমি?
নীলাব্জ: আমার এই বিউটিফুল ফ্রড-টাই যে ভালো লাগে নীলা।
ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী




