জিরাফের ভাষা
একটি পোস্টকার্ড। সামান্য কয়েক লাইনের চিঠি। তাতে বারংবার ক্ষমা চাওয়া।
পড়তে বেশিক্ষণ সময় লাগে না। পড়ার পর, আগাপাশতলা বুঝতে না-পেরে, চুপ করে থাকা। চিঠিটি লিখেছেন কবি ভাস্কর চক্রবর্তী, প্রাপক সুবিমল বসাক। এবং ভাস্করের লেখা এই একটিই চিঠি রয়েছে সুবিমলের সংগ্রহে। মনে পড়ছে, বেশ কয়েক বছর আগে সুবিমল আমায় জানিয়েছিলেন, ভাস্করের একটি চিঠি আছে তাঁর কাছে, আর সেটি ক্ষমাপ্রার্থনার। তবে, তখন চিঠিটি দেখাননি সুবিমল। পরবর্তীতে খুঁজে পেয়ে, বয়ান পড়ে থমকে যাই।
শুধুমাত্র চিঠি পড়ে, প্রেক্ষিত ও ঘটনাক্রম বোঝা সম্ভব নয়। সে-কারণে উঁকি দিতে হয় সুবিমলের ডায়রি ও প্রাসঙ্গিক অন্য দু’টি চিঠিতে। সেসবে প্রবেশের আগে, ভাস্করের চিঠিটি পড়ে নেওয়া যাক—
২৩-৪-৭৮
ভাই সুবিমল,
আজ ঘুম থেকে উঠেই, বিপজ্জনকভাবে, অসুস্থ বোধ করছি। গতকাল সন্ধেবেলা কফি-হাউসের ঘটনার জন্যে, আমি সত্যি, লজ্জিত। দুঃখিত। মনস্তাপ, এখন আমাকে পরিষ্কার করছে।— আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি।— আপনি ঘটনাটা অবশ্যই ভুলে যাবেন। এবং, আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, জানবেন, আমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বো।
বিনীত—
ভাস্কর চক্রবর্তী

‘ভাই সুবিমল’ বলে সম্বোধন করলেও, ভাস্কর ছিলেন সুবিমলের থেকে বছর ছয়েকের ছোট। তবে নাম ধরেই যে ডাকতেন, তা ডায়রি পড়েও বোঝা যায়। চিঠির বয়ান থেকে স্পষ্ট, ‘গতকাল’, অর্থাৎ ২২ এপ্রিল কফিহাউসে কোনও গণ্ডগোল হয়েছিল, তারই ফলশ্রুতি এই চিঠি।
কিন্তু কী সেই গণ্ডগোল? বোঝা যায় সুবিমলের ডায়রির এন্ট্রি (২২.০৪.৭৮) থেকে—
‘অনেকদিন পর কফিহাউস গেছি। অনেকে এসেছিল, গালগপ্পো হল। শক্তি চট্টোকে দেখা গেল। আসার সময় সুব্রতকে দেখা গেল পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত। ভাস্কর চক্রবর্তীও বসে। আমি সেই টেবিলে বসার কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ ভাস্কর উত্তেজিত হয়ে অনেক কথা বলতে লাগলো। আমাকে accuse করলো মোটামুটি। ও মদ্য পান করে এসেছিল। আমাকে বলতে লাগলো, কলকাতায় প্রকাশিত ‘ঋত্বিক’ সম্পর্কে লেখাটা নিয়ে সন্দীপন বলে বেড়াচ্ছে— সুবিমল তিন লাইন লিখেছে, বাকীটা সন্দীপনের। ভাস্কর নাকি নিজের চোখে দেখেছে। আমিও বললুম— তুমি মিথ্যে কথা বলছো। ওটার ১টা অংশ ছাপা হয়েছে মাত্র। এবং আমি প্রতিবাদ করেছিলুম— যার জন্য উৎপলের টেবিলে এখন আমি বসি না। ভাস্করকে বল্লুম, তোমার প্রতিবাদ লিখে দেখাও। মুখে বললে হবে না। প্রতিবাদ আমি জানি, কৃত্তিবাসের ‘রেণু সংখ্যার’ বারোটা বাজিয়ে দিলুম। ভাস্কর জানালো, সন্দীপনকে একদিন মেরেছে, ১ রাত্রি বরাহনগরে হাজত বাস করেছে। আমি বল্লুম, পনেরো বছর আগে আমরা যা করেছি— ভাস্কর এখন করছে। ও আমাকে অশিক্ষিত, মূর্খ, অসাহিত্যিক অনেক কিছুই বললো। আমিও স্বীকার করে নিলুম। শেষে মার দেবার কথা উঠলো, টেবিলে চটি। আমারও রাগ ধরেছে। চটি আমিও দেখাই। সুব্রত ছিল, কিছুই বললো না। শেষে আমিও রাগ করে উঠে আসি। সুব্রতর সঙ্গে কোন কথা হলো না। ভাস্করের ব্যাপারে মনে হলো, ও সন্দীপনের বিরুদ্ধে প্ররোচীত করতে চাইছে। আমি ওকে জানালুম, সন্দীপনের সে চামচে, অধুনা গোলমালে ১০০ টাকা নিয়েছিল। আনন্দবাজারে ‘রিভ্যু’ ছেপেছে।
মনখারাপ হয়ে চলে এলুম।
ডায়রিতে উল্লিখিত দু-চারটি বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। জ্যোতির্ময় দত্ত সম্পাদিত ‘কলকাতা’ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা, ১৯৭৭-’৭৮ সালে, সম্পাদনা করেছিলেন উৎপলকুমার বসু। সম্ভবত সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ও পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন সেই পর্বে। ঋত্বিক ঘটক-সংক্রান্ত সুবিমলের যে-লেখাটি নিয়ে বিতর্ক, সেটির শিরোনাম ‘চলচ্চিত্র চিন্তা’, বিষয় ঋত্বিকের চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’।

পরের দিন, তেইশে এপ্রিল, ডায়রিতে লেখা— ‘ভাস্কর আমার বন্ধু নয়, এমনকি খুব ঘনিষ্ঠতাও নেই। কালকের ঘটনায় mood খারাপ হলো। কলকাতায় প্রকাশিত লেখাটা সম্পূর্ণ বার করা দরকার— কলকাতাকে আক্রমণ করতে হবে, সঙ্গে সন্দীপন ও ভাস্করকেও।’
এবং ২৫ এপ্রিল, ভাস্করের চিঠিটি পাওয়ার পর— ‘…বাড়ীতে এসে দেখি, ভাস্করের একটা পোষ্টকার্ড এসেছে। শনিবার কফি হাউসের ঘটনায় মর্মাহত, ক্ষমা চেয়েছে। আমি যেন ক্ষমা করি। ভাস্করের সঙ্গে আমার কখনও পত্র-ব্যবহার হয়নি। সেও লেখেনি।’
কফিহাউসের সেদিনের ঘটনার রেশ ভাস্করের ক্ষমাপ্রার্থনার পরেও যে মেটেনি, তা দু-সপ্তাহ পরের ডায়রির এন্ট্রি ও প্রাসঙ্গিক কয়েকটি চিঠিপত্র থেকে বোঝা যায়। ৬ মে ১৯৭৮, ডায়রিতে সুবিমল লিখছেন—
‘কফিহাউসে দু-শনিবার যাইনি। যে সন্দেহ ছিল, তাই হলো— আজ অরুণ আইনের সঙ্গে ঢুকতেই দূর থেকে ভাস্কর ডাকলো। আমি না গিয়ে অন্য টেবিলে বসলুম। ভাস্কর এলো একটু পরে। এসেই জিজ্ঞেস করলো— আমার পোস্ট কার্ড পেয়েছো? সেদিন ফিরে গিয়ে, পরদিন সকালে অসুস্থ মনে করতে তোমায় চিঠি দিয়েছি। আমি জানালুম— পাইনি। ঐ ঠিকানায় বাড়ীঅলার চিঠি থাকে— এবং পাইনি। ও তখন বললো— আচ্ছা, ভুলে যাও ওসব কথা। আমিও কি বলেছি মনে নেই, খুব অনুতপ্ত। আমি জানালুম— সন্দীপনকে আমি চিঠি দিয়েছি। ভাস্করকে চিন্তিত মনে হলো। একটু পরে চলে গেলো। প্রশান্ত মাজী বললো— সন্দীপন হয়তো সামান্য সম্পাদনা করেছেন। সুব্রত চক্রবর্তীও বলছিল, এবং মদ খেয়ে সেও ছিল, তাই কিছু বলেনি।’

ভাস্করকে বললেও, সন্দীপনকে তখনও চিঠি লেখেননি সুবিমল। লেখেন সেদিন রাতে, পাঠান পরের দিন সকালে। সেই চিঠির খসড়া খুঁজে পেয়েছি আমরা—
১৮ বিবেকানন্দ নগর, বেলঘরিয়া
কলকাতা – ৭০০০৫৬
৬.৫.৭৮
সন্দীপনদা,
‘কলকাতা’য় প্রকাশিত ‘ঋত্বিক ঘটক’ সম্পর্কে লেখাটিতে আমার নাম ও তিন-লাইন গদ্য ছাড়া সম্পূর্ণ লেখাটি আপনার তৈরী। মূল পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে আপনি সর্বত্র প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। ভাস্কর, ভাস্কর চক্রবর্তী তা স্বচক্ষে দেখেছেন এবং স্ব-কর্ণে শুনেছেন। একথা তাঁর মুখে শোনার পর, এক শনিবার, কফিহাউসে তার সঙ্গে তুমুল বাকযুদ্ধ ঘটে।
আমি জানতে চাই, আপনি এ রকম একটা আরব্যগপ্পো প্রচার করেছেন কিনা। আপনার বয়ানের ওপর এ সম্পর্কে আমার লেখা নির্ভর করবে।
ইতি
সুবিমল বসাক

দিনকতক পরে, কবি দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চিঠিতেও একই প্রসঙ্গের উল্লেখ—
১০/৫/৭৮
সুবিমলদা,
আমি এসেছিলুম। কিছুক্ষণ বসে চলে গেছি। আপনার সঙ্গে ভাস্করের ব্যাপার শুনেছি। আমার সমর্থন কাকে আপনি ভালোই বুঝবেন।
ভাস্করকে বলাতে ভাস্কর আমাকে জানাল ও নাকি বারবার আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। ভাল কথা। কিন্তু কেন গোলমাল করে কেনই বা ক্ষমা চায় বোঝা বড় শক্ত। ভাস্করের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছে, যা ওকে ভদ্রতা থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই দুঃখের। আপনি দু/তিন দিন গেছিলেন। দেখা হয়নি বলে খারাপ লাগছিল। আমি আর প্রশান্ত আগের দিনও আপনার ও অরুণের খোঁজে এসেছিলাম। ভালবাসা জানবেন—
দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
বুধবার
‘ভাস্করের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছে, যা ওকে ভদ্রতা থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে’— দেবপ্রসাদের এই মন্তব্য কি শুধু সুবিমলের সঙ্গে ঝামেলা নিয়েই? মনে পড়ে ডায়রিতে পূর্বোল্লিখিত একটি বাক্য— ‘ভাস্কর জানালো, সন্দীপনকে একদিন মেরেছে, ১ রাত্রি বরাহনগরে হাজত বাস করেছে।’ এই ঘটনার উল্লেখ সুবিমলের ডায়রিতে এসেছে আগেও, সে-বছর বইমেলা চলাকালীন যা শুনেছিলেন সুবিমল (২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮)— ‘…শুনলুম, ভাস্কর চক্রবর্তী নাকি সন্দীপনকে প্রচন্ড মারধোর করেছে। ‘কলকাতা’য় প্রকাশিত ১টি লেখায় সন্দীপন কাটছাঁট করেছে বলে ভাস্করের ক্ষোভ।’
অপ্রাসঙ্গিক হলেও, একই বছরে, ঝামেলার দিনকয়েক আগেও (১০ এপ্রিল) ভাস্করের উল্লেখ রয়েছে ডায়রিতে— ‘…বিশ্ববাণীতে গেলুম— এমনিই। হিন্দী অনুবাদটা বেরোবে কিনা জানিনে। গিয়ে দেখি, সুনীল গঙ্গোর স্ত্রী ও ভাস্কর চক্রবর্তী বসে। সুনীলের বই সংগ্রহ করতে এসেছে মনে হলো। ভাস্কর ও স্বাতী নেমে গেল একটু পরে। …আমি ভাবছিলুম, ভাস্কর তো সুনীলের বিরুদ্ধে অনেক সময় বলে, অথচ লাইন টা অন্য দিকে। বেশ আছে কিন্তু!’

ভাস্করের সঙ্গে সুবিমলের আলাপ নতুন নয়। ছয়ের দশক থেকেই যোগাযোগ। পত্রবিনিময় না হলেও, একাধিক ডায়রিতে রয়েছে ভাস্কর-প্রসঙ্গ। আমরা, ভাস্করের চিঠির সূত্র ধরে, ১৯৭৮ সালের ডায়রিতে তল্লাশি চালালাম কেবল। সে-বছর ভাস্কর সম্পর্কে শেষ যে-এন্ট্রি, তা ডিসেম্বর মাসের (৭ ডিসেম্বর)। তবে এতগুলো মাস পেরিয়েও সেই ঝামেলার কথা ভুলতে পারেননি সুবিমল। ভাস্করও কি পেরেছিলেন!
‘বিকেলের দিকে কলেজ স্ট্রীটে গেলুম— একটা বইয়ের খোঁজে। পৃথিবীর নিষিদ্ধ সাহিত্যগ্রন্থ। ভাস্কর চক্রবর্তীকে দূর থেকে দেখে আমি পেছনে সরে এসেছি। দেখলুম, ওই এগিয়ে ‘কি সুবিমল কেমন আছো?’ জিজ্ঞেস করলো। ২/৩ বার। আমিও ভদ্রতা করলুম। আগে দেখা হলে এমন করতো না। মনে হয়, সেদিনের ব্যাপারে সে বড় বেশী আন্তরিকতা দেখাতে চায়। শুনছি, আনন্দবাজারে চাকরী পাচ্ছে।’
কয়েক লাইনের একটি চিঠি, আর তার সূত্র ধরে খোঁজ চালাতে চালাতে উঠে এল বিতর্ক ও ভুল-বোঝাবুঝি। ‘কলকাতা’ পত্রিকা ও ভাস্করকে আক্রমণ করে একটি লেখাও তৈরি করেছিলেন সুবিমল। কিন্তু ততদিনে মাসখানেক পেরিয়ে যাওয়ায়, সে-লেখা আর পাঠাননি কোথাও— জানা যায় ডায়রি থেকে। অন্যদিকে, প্রকাশ্যে ভাস্কর-সুবিমল দন্দ্ব হলেও, মনে হয়, ভাস্করও বানিয়ে বলেননি কিছু। গোড়ায় কলকাঠিটি নেড়েছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ই। অন্তত, অমন কথা রটিয়ে বেড়ানো সন্দীপনের পক্ষে অসম্ভব নয়।
পরিশেষে, যে-লেখা নিয়ে এত বিতর্ক, নাতিদীর্ঘ সেই নিবন্ধটি তুলে ধরা হল—
চলচ্চিত্র-চিন্তা
সুবিমল বসাক
সম্প্রতি ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ রিলিজ করে। ১৯৫২-এ শুরু এই ছবিটি শেষ করতে সময় লেগেছিল মাত্র এক বছর, রিলিজ হতে ২৭ বছর লাগল। ঋত্বিকের বয়স তখন ২৭, ছবিটি তৈরি হবার কিছু পরেই শোনা গেল, প্রোডিউসার-সেন্সর-ডিস্ট্রিবিউশন— এই-সব নানাবিধ হোঁচটে শেষতক ছবিটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে কোনো-এক লাশকাটা ঘরে। পড়ে থেকে পড়ে থেকে ছবিটি একসময় পচে ঢোল হয়ে গেল। ভাগ্যিস, ঋত্বিক মরিয়া প্রমাণ করলেন যে তিনি মরেন নাই। ফলে, আরেকবার মড়া কান্না উঠল উথলে— সংবাদপত্রে চিঠি-চাপাটি, চেঁচামেচি ইত্যাদি— এ-সবের ফলে ছবিটির উদ্ধারকার্য দ্রুত হয়। কেবল কঙ্কাল থেকে কোনো রকমে অবয়বে দাঁড় করানো হল।
ছবিটি তাই পুরনো দলিলের মতোই বিবর্ণ ও অস্পষ্ট; তবুও আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না দলিলের মাথায় কত দামের স্ট্যাম্প, তার মুসাবিদা, এবং বিষয়। তার পার্চমেন্ট। যেটুকু উদ্ধার হয়েছে, দেখার পর, সহজেই ভাবা চলে— পঁচিশ বছর পূর্বে সাতাশের-ঋত্বিক তখনই— সে কত-না আধুনিক! সেই সুদূর ’৫২-তেই— মাত্র ২৭ বছর বয়সের এই গর্বিত যুবা না-জানি কোন্ জন্ম-জন্মান্তরবোধে টের পেয়ে গিয়েছিল— শুধু মাটি নয়, বস্তুত, আকাশও এক কারাগার— চলচ্চিত্র নির্মাণের সকল ক্লিশে পদদলিত করে চেন ছিঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল আমাদের পাগল প্যান। আজ, অবশেষে, জানা গেল।
তাঁর শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ একই সময়ে প্রদর্শিত হল। ছবিতে নায়ক : ঋত্বিক, বয়স ৫৩, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ভাঙাচোরা মুখ, সরু সরু ক্যাঙারু পা, কাঁধ-ছেঁড়া পাঞ্জাবি, হাতে বোতল, মাতাল একটি! গ্ল্যামার-সর্বস্ব ভারতীয় ছবির গালে একটা বৈদ্যুতিক থাপ্পড়।
প্রথম সৃষ্টির সঙ্গে যে-কোনো স্রষ্টা-শিল্পীর অসামান্য দুর্বলতা, মমত্ববোধ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, স্পর্শকাতরতা, ভয়, উদ্বেগ, বিহ্বলতা সব-কিছু জড়িয়ে থাকে— স্বর্গের দিকে রাবণের সিঁড়ি ঐ ভিত্তিভূমি থেকে উঠে যায়। ঋত্বিক তাঁর জীবদ্দশায় এই ছবি প্রদর্শিত হতে দেখে যেতে পারেন নি। এ নয় যে, তখন ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসনে। ছ-বছর আগেই স্বাধীনতা পেয়েছে দেশ, সংবিধান রচিত হয়েছে, গণতন্ত্রমতে অধিকারও বিলি হয়েছে— এমন-কি, একবার সাধারণ নির্বাচনও হয়ে গেছে। মঙ্গলগ্রহ থেকে পরিক্রমা করে ফিরে আসতে সময় নিচ্ছে মাত্র সাতদিন।
হাটি-হাটি পা-পা করে স্বাধীন ভারত যুবক হয়েছে, এই যুবক পঁচিশ বছরে হোঁচট খেতে খেতে তারপর এই যুক্তি তক্কো গপ্পে :—
‘১৫ই আগষ্ট— স্বাধীনতা— ফু!’
ঋত্বিকের ‘আমার লেনিন’ অদ্যাবধি রিলিজ করে নি। গত যুক্তফ্রন্ট আমলে তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট লোক ও মন্ত্রীপ্রবরদের ছবিটি দেখিয়ে, স্বাভাবিক কারণে জানাতে চেয়েছিলেন— সেন্সর ও রিলিজের জটিলতা। কোনো সংবাদ, পরবর্তীকালে, এ বিষয়ে আর শোনা যায় নি।
এই দুই-টি ছবির প্রথম দর্শনে স্পষ্ট ধরা পড়ে, ঋত্বিক তাঁর সমসাময়িকদের থেকে বরাবরই তারকা-দূরত্বে।

ভাস্কর-প্রসঙ্গ থেকে সরে, পরের ব্যক্তির চিঠিতে যাওয়া যাক। তিনি কবি দেবীপদ মুখোপাধ্যায়। সুবিমলের থেকে ন-বছরের ছোট হলেও, চিঠি পড়ে মনে হয়, বন্ধুসুলভ অন্তরঙ্গতা ছিল তাঁদের। দেবীপদ-র যে-চিঠিগুলি তুলে ধরব, সেগুলি তার টেক্সটের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওই বছরগুলির ডায়রি খুঁজে না-পাওয়ায়, সুবিমলের জবাব বা ভাবনাচিন্তা তুলে ধরে গেল না সমান্তরালে।
প্রিয় সুবিমল, বাঁকুড়ায় থাকাকালীন তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলুম। আশাকরি তা পেয়ে থাকবে। গত ২০শে জানুয়ারী ফিরেছি।
তুমি লিখেছিলে ২৪শে জানুয়ারী ফিরছো। কোথায় কোথায় ঘুরলে জানাবে।
আমরা প্রত্যেকেই একা ও স্বতন্ত্র। তাই মুক্তিমেলা বা কফিহাউসে গেলেও নিজেকে সহজেই আলাদা করতে পারি।
এতদিনে বুঝেছি—
কবিতা, গল্প ইত্যাদি এতদিন ধরে লিখেও কারুর একগাছা ছিঁড়তে পারিনি।
এ্যাপ্রিশিয়েশনের কথা বলেছি। তোমরা এখনো লিখে যাচ্ছো দেখে ঈর্ষা বা নিজের অক্ষমতার কথা মনে হয় না। আসলে আমিও যেমন কাউকে ছুঁতে পারিনি, তেমনি কেউই আমাকেও ছুঁতে পারেনি। আমরা পরস্পর অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও একা। মানুষের ধর্ম নিয়ে চেঁচামেচি দেখে আজ মনে হয় এরা কিছু একটা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইছে। সহায় সম্বলহীন মানুষের মত।
ক্রমশ মানুষ ও সভ্যতার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি গোপনে। কেননা এটা বুঝতে পেরেছি মানুষ বা সভ্যতা বা বিজ্ঞান বা ধর্ম বা নারী
এরা আমাকে এতদিনে কিছুই দিতে পারেনি। আমিও নয়।
সুতরাং ব্যবহারহীন হয়ে থাকার অগৌরবের মধ্যে কেন নিজেকে আশান্বিত করা?
কিছুই ভালো লাগছে না সুবিমল।
আমি ভাল নেই। ভালবাসাসহ—
দেবীপদ মুখোপাধ্যায়.
৩/২/৬৯

চিঠিতে উল্লিখিত ‘মুক্তিমেলা’ প্রকৃতপক্ষে মুক্তমেলা; আয়োজিত হত ছয়ের দশকে, কার্জন পার্কে। পরে গড়ের মাঠে স্থানান্তরিত হয়। সাহিত্যবিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হত সে-মেলায়।
১০ই জুন/৭০
প্রিয় সুবিমল/ ক’দিনের উপর্যুপরি বৃষ্টিতে হাঁফিয়ে উঠেছি। বাড়িতে চুপচাপ বসে। গত রবিবার সকালে K.T.-তে গিয়েছিলুম, কমলদা আসেননি, উনি সম্ভবত আর ওখানে যাবেন না কারণ শক্তি চট্টো: একদিন কমলদার ‘গেস্ট’ সঞ্জয় সেনকে অপমান করে, এতে উনি খুবই দুঃখিত হয়েছেন। সঞ্জয়কে চেনো নিশ্চয়ই? অপর্ণার স্বামী।
বুকপোস্ট-এ আবহ পেয়েছি। ধূর্জটির লেখাটা সন্দীপন চট্টো:র এবং আমার ভালো লেগেছে, ওঁকে ধন্যবাদ জানিও।
‘এবং’ কবে বেরুচ্ছে? অমিয়ভূষণের বইটা নিয়ে শনিবার ৩টের সময় কলেজ ষ্ট্রীট মোড়ে পাতিরামের দোকানের সামনে এসো, অনেক কথা আছে। গল্পটাও শোনাতে পারি। সুবো প্রতি সপ্তাহে সন্দীপন চট্টো:কে চিঠি লিখছে, বাংলাদেশের লোক ওকে এখনো চিনলো না বলে ওর দুঃখ, বাংলা কবিতায় রাঁবো হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা ও চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী কোন একটা মিনিবুক-এর ওর লেখার ভীষণ ইচ্ছে। বন্ধুরা স্কলেই ভালো আছে, তাদের সদ্যকামানো মুখ দেখে তাই মনে হয়।
সম্প্রতি JOICE-এর DUBLINERS আবার পড়লুম। ওর ধারণা ডাবলিন যদি কখনো ধ্বংস হয়ে যায় এই বই থেকে নতুন ডাবলিন তৈরী হবে।
তুমি বৃষ্টিতে অফিসে আসছো কি— তোমার মিসেসকে খিচুড়ি পাঁপরভাজা করে রাখতে বললে রবিবার সকালে হয় যেতে পারি, শনিবার যদি দেখা হয় ফাইনাল কথা দেবো। বৃষ্টির দিনে কি কি ভালো লাগে তার একটা তালিকা প্রস্তুত করেছি। তার মধ্যে আছে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুমার ঝুলি’ ও ‘ঠাকুদার ঝুলি’ এবং ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব মার্ডার’ ‘দি এ্যানশিয়েন্ট গ্রীক মিথ’ ইত্যাদি বই। চুরুট ও চারমিনার। ভালোবাসা জেনো।
দেবী
K.T.— খালাসিটোলা, কমলদা অর্থাৎ কমলকুমার মজুমদার। অপর্ণা— অপর্ণা সেন, সুবো— সুবো আচার্য। এবং— ধূর্জটি চন্দ সম্পাদিত পত্রিকা।
দেবীপদ মুখোপাধ্যায়ের অনেকগুলি চিঠি থাকলেও, মাত্র দু’টিই তুলে ধরলাম। বর্তমানে প্রায়-অশীতিপর তিনি, কিন্তু স্মৃতিশক্তি চাঙ্গা। ফোন করায়, উঠে এল সংশ্লিষ্ট আরও বিভিন্ন প্রসঙ্গ। নিরসন করলেন বেশ-কিছু কৌতূহলেরও। আসলে, এই ধারাবাহিকে যে-সমস্ত সাহিত্যিকের চিঠি আলোচিত হচ্ছে, তাঁদের প্রায় সকলেই প্রয়াত— বেঁচে আছেন হাতে গোনা কয়েকজন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, চিঠির সূত্র ধরে উঠে আসে সেকালের স্মৃতিও। সেসব শোনার অভিজ্ঞতাও তো ফেলনা নয়!




