ডাকাতের দেশ
এরপর আমরা তহশিলদার সিংকে খুঁজতে লাগলাম, তহশিলদার সিংও আমাদের খুঁজতে লাগলেন। খেরা রাঠোর গ্রামে মান সিং-নবাব সিংয়ের বাড়িতে গিয়ে মান সিং-পুত্র তহশিলদার সিংয়ের দেখা পাইনি, ব্যস্ত মানুষ, বিনোবা ভাবে-জয়প্রকাশ নারায়ণের সংস্পর্শে সর্বোদয়ী হয়েছিলেন। সে-সময়, ওই ১৯৮০-’৮১ সালে সর্বোদয়ী নেতা তহশিলদার সিং সারা চম্বল মুলুক ঘুরে বেড়াচ্ছেন শান্তিপ্রয়াসে। সেই শান্তিপ্রয়াসে সর্বোদয়ী নেতা তহশিলদার সিংয়ের কাজ ছিল মধ্যস্থতাকারীর, বেহড়ে আত্মগোপন করে থাকা মালখান সিং, ফুলন দেবীদের মতো ‘খুঁখার’ (ভয়ংকর) বাগি নেতাদের আত্মসমর্পন করানো। এই সঙ্গে কোথাও কোনও গ্রামে হিংসার উদ্রেক হলেই ছুটে যেতেন সর্বোদয়ীরা। শান্তির বারি বর্ষণে। কখনও-কখনও আমরা চম্বলের দু-চারটি গ্রামে ওইরকম ছুটন্ত, ধাবমান সর্বোদয়ীদের দেখেছি। চম্বলের গ্রামসমাজে তাঁরা ছিলেন খুবই সম্মানীয়। ওই গ্রামসমাজেই তৎকালে আমি শুনেছিলাম, মালখান সিং আত্মসমর্পণে ইচ্ছুক, কিন্তু গোঁ ধরে আছেন ফুলন দেবী, সারেন্ডারে নারাজ তিনি।
তা, আমরা যখন মান সিং-পুত্র তহশিলদার সিংয়ের খোঁজখবর করছি, তখন জানতে পারলাম মুরেনা জেলাতেই জউরায় রয়েছে কারাবন্দি বাগিদের জন্য চমকপ্রদ একটি কারাগার— খুলা জেল! অর্থাৎ, মুক্ত কারাগার! কীরকম সেটি? অম্বা থেকে বাসে জউরা গিয়ে তাজ্জব বনে গেলাম। জউরায় একটি উপনগরীই গড়ে দিয়েছে প্রশাসন, সম্ভবত বিনোবা ভাবের পরামর্শই ছিল এমনটি। বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে গড়ে তোলা আবাসনগুলিতে থাকেন সাজাপ্রাপ্ত বাগিরা। নামডাকওয়ালা বাগি নেতারা নন, তাঁদের দলবলের সদস্যরাই থাকেন এইসব আবাসনে। পাঁচিলঘেরা উপনগরীতে আছে সিনেমা দেখানোর প্রেক্ষাগৃহ, খেলার মাঠ, দোকান-বাজার, সাঁতার কাটার পুকুর, বাগান, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান ইত্যাদি-ইত্যাদি। মোহর সিংয়ের দুই সাগরেদের সঙ্গে ক্যারম খেললাম আমি আর সৌগত। ওরা হারল। ফেরার পথে অম্বায় দেওয়াললিখন দেখলাম নতুন একটি দলের— পদ্মফুল এঁকে তলায় লেখা ‘ভা জ পা’। অবশ্য আগেই আমি মুরেনা স্টেশনে অদূরে দেওয়ালে দেখেছিলাম এসইউসি দলের হিন্দিলিখন: নীহার মুখার্জির জনসভার। নীহার মুখার্জি আসছেন চম্বলে জনসভা করতে! বঙ্গীয় সুখানুভূতি জেগেছিল আমার।

অবশেষে আমাদের কাছে খবর এসে গেল অমুক দিন মুরেনা শহরটিতে আসবেন তহশিলদার সিং। আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন সরকারি গেস্টহাউসে। সেদিন সকালবেলায় আমরা মুরেনা পৌঁছে গেলাম। শীতের রোদে গেস্টহাউসের লনে বসে আমাদের কথা। পাঁচের দশকে ধরা পড়ার সময় পুলিশের গুলি পায়ে বিঁধেছিল। আমাদের সঙ্গে তহশিলদার সিংয়ের দেখা হয় যখন, তাঁর তখন ষাটোর্ধ্ব বয়স। মস্ত সাদা গোঁফ, সুদর্শন, শান্ত মানুষটির চোখেমুখে সর্বোদয়ের স্নিগ্ধ আলোর প্রলেপ লেগে গেছে। সর্বোদয়ের শান্তি প্রয়াস নিয়ে অনেক কথা বললেন। তিনিও বললেন, মালখান সিং হাজির (আত্মসমর্পণ) হবে বলছে। কয়েকদিন আগেই মালখান সিংয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ফুলন রাজি হচ্ছে না। আমরা কি মালখান সিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারি? শুধিয়ে বসলাম তহশিলদার সিংকে? মান সিং-পুত্র হেসে বললেন, ঘুমো, ঘুমো, মিল যায়েগা।
তবে ফুলন সড়কের কাছাকাছি আসবে না। ওর দেখা পাওমা শক্ত। চম্বলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ঘুরছেন তহশিলদার। সর্বোদয়ীদের শান্তিপ্রয়াস নিয়ে অনেক কথা বললেন। কিন্তু যখন তরুণ তহশিলদার কাঁধে আগ্নেয়াস্ত্র ঝুলিয়ে বাবা মান সিংয়ের ‘লাডলা বেটা’ হিসেবে বেহড়ে-বেহড়ে ঘুরেছেন, সেই বাগিজীবন নিয়ে তেমন কিছু বললেন না। মনে হল, খেরা রাঠোরে মান সিংয়ের শতোত্তীর্ণ বড় ভাই নবাব সিংয়ের তেজের ছিটেফোঁটাও তাঁর ষাটোর্ধ্ব ভ্রাতুষ্পুত্র তহশিলদারের নেই, সর্বোদয়ের শান্তির বারিতে ধুয়ে গেছে। ও হরি, আমাদের সঙ্গে কথা বলতেই লনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি উটের পিঠে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন মান সিংয়ের বেটা, স্পট জাম্প মনে হল। লনে কয়েক চক্কর ঘুরলেন, তারপর ফের লাফিয়ে নেমে আমাদের সামনে বসে হেসে বললেন, শরীর ঠিক রাখতে উট, ঘোড়ার সওয়ার হই, নাহলে সাঁতার কাটি, কুস্তিও লড়ি কখনও-কখনও, বচপনের অভ্যেস…।

তহশিলদারের আশপাশে মাঝে-মাঝেই দু-চারজন লোক ঘুরছিলেন, পেটাই চেহারার ওই মানুষজন আমাদের নাস্তা খাওয়ালেন, ‘চায়’ দিলেন। তাঁরা তহশিলদার সিংকে ‘নেতাজি’, ‘নেতাজি’ সম্বোধন করছিলেন। আমার এবং সৌগতর চোখমুখ দেখে বিষয়টি খেয়াল করে তহশিলদার বললেন, আপলোগ স্রিফ সুভাষচন্দ্র বসুকে নেতাজি বলেন, তাই না? বলে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে সুভাষচন্দ্রের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানালেন মান সিংয়ের বেটা। (পরে উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবকেও লোকে ‘নেতাজি’ বলছে, দেখেছি।)
কলকাতা গিয়েছেন কখনও, আমার এ-প্রশ্নে তহশিলদার বললেন, না যাননি, বাবা মান সিংও যাননি, নবাব সিং গিয়েছেন।… এরপর হঠাৎ যেন মনে পড়ল, এমনভাবে তহশিলদার বললেন, কলকাতায় তান্নো আছে। কলকাতায় শাদি হয়েছে ওর। কথাটা আমার মাথায় গিঁথে গেল।
পাঁচের দশকে মান সিংয়ের সময়েই পুতলিবাঈ হয়ে উঠেছিলেন মূর্তিমতী হিংসা। চম্বলের ইতিহাসে প্রথম নারীদস্যু পুতলিবাঈ। সেই পুতলিবাঈয়ের মেয়ে তান্নো। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে পিনহাট থেকে চম্বল নদী সাঁতরে পেরোতে গিয়ে উসেতঘাটে পুলিশের গুলিতে মারা যান পুতলিবাঈ। তান্নো ছিল তখন নাবালিকা। তহশিলদার জানালেন, উপযুক্ত বয়সে গ্রামসমাজই তান্নোর বিয়ে দিয়েছে।
পুতলিবাঈকে আপনি দেখেছেন? হেসে তহশিলদার বললেন, দু-বার।
পায়ে পুলিশের গুলি, আহত অবস্থায় ধরা পড়ার পর তহশিলদার সিং নিজের পরিচয় গোপন করেছিলেন। সাজা কমানোর জন্য তিনি যে মান সিংয়ের ছেলে, পুলিশকে তা জানাননি, পুলিশের কাছে তাঁর কোনও ছবিও ছিল না। দলের লোকেরাও বিষয়টি গোপন রেখেছিল। তহশিলদারের পরিচিতি নিয়ে মামলা সুপ্রিম কোর্ট অবধি গড়িয়েছিল। যখন জানা গেল তিনিই তহশিলদার! মান সিংয়ের ছেলে, দিল্লিতে হইহই পড়ে গেল। বেহড়ে-বেহড়ে আকাশে গুলি ছুড়ল তৎকালে নবাগত মাধো সিং, মোহর সিং, পান সিংয়ের দলবল।
স্বল্পকালের কারাবাসের পর বিনোবা ভাবে এসে মুক্ত করে দিলেন তাঁদের সকলকে।

(তবে ওই যে স্পটজাম্পে উটের পিঠে ওঠা, ওই ষাটোর্ধ্ব বয়সে তহশিলদারের এই তৎপরতা, আমার ভারি মনে ধরেছিল। এছাড়া চম্বলে আমি দেখেছি কুস্তির আখড়া, সাঁতার, দুর্দান্ত ভলিবল— এসব। চম্বলের ৬০ দশকের বাগি সর্দার পান সিং টোকিও অলিম্পিকে অ্যাথলেটিকে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন। তখন পান সিং ছিলেন সেনাবাহিনীর হাসপাতাল কর্মী, এরপর সেসব ছেড়ে বন্দুক হাতে চলে গিয়েছিলেন বেহড়ে। চম্বল সফরের মাসকয়েক পর আমি যখন কাঠ বেকার, ইতিউতি ঘুরছি, সেই তখন, ‘আজকাল’-এর ক্রীড়া সম্পাদক অশোক দাশগুপ্তকে একটি লেখা দিয়ে এসেছিলাম: ‘প্রশিক্ষণ দিলে চম্বল থেকে আসতেন পদকজয়ী ক্রীড়াবিদরা’। দু-একদিনের মধ্যে তা ‘আজকাল’-এ ছাপা হয়েছিল।)
তা, সারাদিন মুরেনায় সরকারি অতিথিশালায় তহশিলদারের সঙ্গে কাটিয়ে, রছেড় গ্রামে আমাদের আস্তানায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। আমি যেমন যত্রতত্র ঘুমিয়ে পড়তে পারি, সৌগত একটু আয়েসি, সে সর্বদা তার হোল্ড-অলটি বহন করে, তাতে বিশ্বসংসার ভরে। আমরা বাসে মুরেনা থেকে অম্বা পৌঁছলাম সন্ধেবেলা। অম্বা বাসঘাঁটিতে রাতের খাবার খেয়ে সিগারেট টানতে টানতে অম্বা থেকে আগ্রা যাওয়ার লাস্ট বাসে চড়ে বসলাম। এই বাসই মধ্যপথে আমাদের নামিয়ে দেবে রছেড় গ্রামটিতে। দিলও। দু’জনে জোড়া টর্চ জ্বেলে হাইওয়ে ছেড়ে মেঠো পথ ধরে রছেড় গ্রামে আমরা যে ঘরটিতে থাকি, তালা খুলে ঢোকার সময় হাভেলির বারান্দা থেকে রণবীর বলল, লট আয়া বাংগালি ভাই লোগ? মুখেচোখে জল দিয়ে শোয়ার তোড়জোড় করছি, অপর খাটিয়ায় বসে সৌগত চেঁচাল, আমার হোল্ড অল! আমার হোল্ড অল!
আমি বললাম, অম্বায় বাসে যখন উঠলাম, তুই তো সেই বাসের ছাদে তুলে দিলি, ওরা দড়িদড়া দিয়ে বেঁধেও দিল। সে বাস তো এতক্ষণে আগ্রা চলে গেছে। রছেড়ে নামাসনি!
কাঁদো কাঁদো গলায় সৌগত আর্তনাদ করতে লাগল, ওতে আমার ইয়াশিকা ক্যামেরা আছে, লেন্স আছে, অতগুলো ট্রাভেলার্স চেক… ডাকাতের দেশ…
সারারাত আমার ঘুম হল না সৌগতর বিলাপে…. আর্তনাদে, আমার ইয়াশিকা ক্যামেরা… ক্যাননের লেন্স… চারদিকে ডাকাত… ওহহ… ডাকাতের দেশ…



