১৮৮১ সাল। ছেপে বেরুলো মূলশঙ্কর তিওয়ারি ওরফে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর লেখা ‘অথ গোকরুণানিধিঃ’ নামের একটি বই, যেখানে লোকহিতের জন্য গরুকে মা-এর সমান মর্যাদা দিয়ে ‘গৌমাতা’ বলে উল্লেখ করা হল। বইটির প্রথম পরিচ্ছেদেই দয়ানন্দ জানাচ্ছেন যে, বেদে যেহেতু গরুকে ‘অঘ্ন্যা’ (অর্থাৎ, যে প্রাণি কোনও অবস্থাতেই হত্যার যোগ্য নয়) বলা হয়েছে, সেহেতু গো-রক্ষাই হলো প্রত্যেক ‘আর্যের’ পরম ধর্ম। আর গো-কূলের যেহেতু ‘কৃষি প্রধান’ সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, এবং গরুর দুধ, ঘি ইত্যাদি যেহেতু মানুষের বুদ্ধি ও বল বৃদ্ধি করে, তাই গরু মানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং মায়ের মতোই পবিত্র। সুতরাং গরুর মতো উপকারী প্রাণীদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করা একটি পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক কর্তব্য। আর যে-মানুষ গরুর মতো পবিত্র ও পরোপকারী প্রাণীকে হত্যা করে, সে ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত হয়।
লক্ষণীয়, দয়ানন্দ কিন্তু প্রচলিত পৌরাণিক পুজোর চেয়ে গরুর উপযোগিতা-ভিত্তিক পবিত্রতার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। গো-রক্ষা দয়ানন্দের বয়ানে নিছক ধর্মীয় কর্তব্য নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক আবশ্যকতা। এর পরের বছর ১৮৮২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করবেন গোরক্ষিণী সভা। গোকরুণানিধি-র তত্ত্বভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই সভার প্রধান কাজ ছিল গো-হত্যা বন্ধ করা, গরুর জন্য চারণভূমি রক্ষা করা এবং কৃষকদের গোরু পালনে উৎসাহিত করা, কারণ দয়ানন্দ মনে করতেন যে— ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য গো-রক্ষা অনিবার্য।
এরপর ১৯৪০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘হরিজন’ পত্রিকায় মহাত্মা গান্ধী লিখবেন, গরুর উপযোগিতার প্রসঙ্গ; তবে সেখানে গরু নেহাৎ মা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই জন্মদাত্রী মায়ের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর।
গোরক্ষিণী সভার হাতে ‘গরু’ হয়ে উঠল একটি রাজনৈতিক অক্ষ। মনে রাখতে হবে, আধুনিক ‘হিন্দুত্ব’-এর যে বয়ান, তা কিন্তু দয়ানন্দের বলা সেই উপযোগিতাবাদী দৃষ্টিকোণের ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই অবলা প্রাণীটিকে বিপুল জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতীক হিসেবে এবং মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত গো-নিধন প্রথার বিরোধিতার জন্য ব্যবহার করা হল, যার অনিবার্য ফলস্বরূপ, ১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশক জুড়ে দেখা গেল পর-পর কয়েকটি ঘোরতর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। বিষয়টা আরও ঘোরালো হয়ে উঠল, যখন ১৮৮৮ সালে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের উচ্চ ন্যায়ালয় ঘোষণা করল যে ‘গরু কোনও পবিত্র বস্তু নয়’। এরপর গো-হত্যা বন্ধের দাবিতে সময়ে-সময়ে ছোট-বড় বহু আন্দোলন হলেও, মাঝের কয়েক দশক জুড়ে তা ভারতের রাজনৈতিক আঙিনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি।

তবে প্রায় এক দশক জুড়ে— গরু আবার দেশীয় রাজনৈতিক পরিসরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু মৌলবাদী শক্তি গোরক্ষা এবং গরুর পবিত্রতার যে প্রসঙ্গটিকে বর্তমানে ‘সনাতন হিন্দু’-র ধর্ম-সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে কার্যত ‘হিন্দুত্ব’-এর একধরনের ধর্ম-রাজনৈতিক মানদণ্ড নির্মাণের প্রচেষ্টা করছে, তা দাঁড়িয়েই রয়েছে অসত্য এবং অর্ধসত্য নামক দুটি অক্ষের ওপর। প্রাণীসম্পদ মন্ত্রকের পর্যবেক্ষণে থাকা এই প্রাণীটির প্রতি শ্রদ্ধা বর্তমানে পরিবর্তিত হয়ে গেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর সাম্প্রদায়িক সত্তার প্রতীকে। আর এই অন্ধ-মৌলবাদী শক্তিরা একথা মোটে মেনে নিতে চান না যে, বৈদিক এবং তার পরবর্তী ভারতীয় ঐতিহ্যে গরুর পবিত্রতা একেবারেই চিরকালীন নয় এমনকী তার মাংসও অন্যান্য আর পাঁচটা প্রাণীর মাংসের মতোই ছিল ভারতের প্রাচীন হেঁশেলের হিস্সা। অথচ জানুয়ারি, ২০২৬-এ ওড়িশার সুন্দরগড়ে গো-মাংস বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি এতোটাই উত্তেজক হয়ে ওঠে যে, সেখানে কারফিউ জারি করে এবং ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাছাড়া গতবছর অক্টোবর মাসে তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদের সীতাফলমান্ডি এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় গোমাংস পরিবেশনের অভিযোগ উঠলে একদল লোক রেস্তোরাঁয় ঢুকে ম্যানেজারের ওপর চড়াও হন।
সম্প্রতি, খাস কলকাতার বুকে পার্ক স্ট্রিটের একটি রেস্তোরাঁয় গোমাংস পরিবেশন করার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও উস্কানিমূলক পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্রেতার দেওয়া অর্ডারের পরিবর্তে অন্য খাবার পরিবেশন করা নিশ্চিতভাবেই পরিষেবাগত ত্রুটি কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টিকে যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে বিস্তর গোলমেলে ব্যাপার আছে। আর এই সমস্ত ঘটনা থেকে যে-ছবিটা জনসমক্ষে উঠে আসছে তা থেকে স্পষ্ট যে মৌলবাদী শক্তিরা তাঁদের মিথ্যে বিবৃতি প্রচার এবং প্রসারের মাধ্যমে যে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক স্নায়ুটিতে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, তাতে তাঁরা অনেকটাই সফল হয়েছেন। ‘হিন্দু খত্রে মৈ হ্যে’-র শিরোনামে চলা কল্পভীতির বিষক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, এবার ভিষক হয়ে সেই বিষ ঝেড়ে ফেলার নামে লোটা হবে রাজনৈতিক মুনাফা। এ অবশ্যি নতুন কিছু নয়, রাজনৈতিক পরিসরে এরকম ঘটনা হরদম দেখা যায়। এখন মজার কথা হল এই যে, বর্তমানে ‘হিন্দুত্ব’-এর অন্যতম প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে যে গোমাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকার কথাটা আর এস এস-এর মতো বিভিন্ন ‘হিন্দু’ সংগঠন কিংবা একালের ধর্মগুরুদের মুখে আকছার শোনা যায় তার মধ্যে কতটা খাদ রয়েছে।
খাস কলকাতার বুকে পার্ক স্ট্রিটের একটি রেস্তোরাঁয় গোমাংস পরিবেশন করার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও উস্কানিমূলক পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্রেতার দেওয়া অর্ডারের পরিবর্তে অন্য খাবার পরিবেশন করা নিশ্চিতভাবেই পরিষেবাগত ত্রুটি কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টিকে যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে বিস্তর গোলমেলে ব্যাপার আছে।
তথাকথিত ‘হিন্দু’ব্যবস্থার মূলে যে আসমানি কিতাবটির কথা সকলেই কার্যত এক বাক্যে স্বীকার করে নেন, সেটা হল ‘অপৌরুষেয়’ ঋগ্বেদ (আঃ ১৫০০–১০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ)। সেই বেদের দশম মণ্ডলে দেখা যাবে, ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে বলদ, মহোক্ষ (বড়ো ষাঁড়) কিংবা মহিষের মাংস অগ্নিপক্ক, সোজা কথায় আগুনে ঝলসে কাবাব করে উৎসর্গ করা হচ্ছে। আবার ঋগ্বেদের অষ্টম মণ্ডলে বলা হবে যে উক্ষণ (বলদ) ও বশা (বন্ধ্যা গাভী) হলো অগ্নি-র খাদ্য। আবার পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যের অন্যতম গোপথ ব্রাহ্মণে একুশখানা যজ্ঞের উল্লেখ রয়েছে যেখানে ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে একটি বৃষভ, মরুৎদের উদ্দেশ্যে একটি গরু এবং অশ্বিনদের উদ্দেশ্যে একটি তামাটে রঙের গরু উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া অশ্বমেধ, রাজসূয় কিংবা বাজপেয়র মতো বারোয়ারি যজ্ঞের আগে ‘অগ্ন্যাধেয়’ নামক প্রস্তুতিপর্বে হত্যা করা হতো গরুকে। লুই রেনোর লেখা Vedic India বইতে অশ্বমেধ যজ্ঞের বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে যে, সেখানে ৬০০-র বেশি পশু-পাখি এবং শেষ পর্বে ২১টি নির্বীজকৃত গরুকে বলি দেওয়া হত; যদিও তৈত্তিরীয় সংহিতা (৫|৬|১১-১২)-র মতে ঘোড়া, ষাঁড়, গরু, ছাগল (মহাজ), হরিণ, নীলগাই-সহ মোট ১৮০টি পশুওকে বলির কথা বলা হয়েছে। সুতরাং যা-ই হোক না কেন, রাজসূয় কিংবা বাজপেয়র মতো যজ্ঞে যে ‘গোসব’ (গো-বলি) একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তা অস্বীকার করা যায় না।
তবে আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র (২২|১২|১২–২০, ২২|১৩|১–৩)-এ বলা হয়েছে যে গোসব পালন করার পর সেই ব্যক্তিকে পশুব্রত (গবাদি পশুর মতো আচরণ) পালন করতে হত। এমনকী এই সময়ে সেই ব্যক্তিকে নিজের মায়ের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক করতে হত। অবশ্য, শতপথ ব্রাহ্মণে গরু-বলদকে পৃথিবীর ধারক হিসেবে উল্লেখ করে তাদের মাংস খেতে নিষেধ করা হয়েছে বটে, তবে ঠিক এর পরেই সেখানে রয়েছে যাজ্ঞবল্ক্যের একটি উক্তি— ‘যাজ্ঞবল্ক্যো শ্নাম্যেবাহমাংসলং চেদ্ভবতীতি’ অর্থাৎ কিনা সেই গো-মাংস যদি নরম বা পুষ্টিকর হয়, তবে তিনি তা খাবেন। এই টেক্সটেই খানিক এগোলে দেখা যাবে যে, সেখানে অতিথি আপ্যায়নের (অর্ঘ্য) জন্য বড় একটি বলদ বা পাঁঠা উৎসর্গ করার কথা বলা হচ্ছে। আর তাই সে-সময়ে অতিথির আরেক নামই হল গোঘ্ন, সোজা কথায় গরুর হত্যাকারী। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে অতিথিগ্ব নামে এক বীরের কথা পাওয়া যায়, যিনি অতিথিদের জন্য মাথাপিছু একটি করে গরুর জবাই করতেন।
তবে শুধু অতিথি সেবাতেই নয়, বৈদিক সমাজে বিয়ের মতো অনুষ্ঠানেও জবাই হতো গরু। ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ৮৫তম সূক্তের ১৩ সংখ্যক মন্ত্রে বলা হচ্ছে, সূর্য্যার (সূর্যকন্যার) বিয়ে উপলক্ষে সবিতা যে যৌতুক পাঠিয়েছিলেন, তা যাত্রা শুরু করল। মঘা (অঘা) নক্ষত্রমণ্ডলে গাভীগণ চালিত হয় এবং অর্জুনী (ফাল্গুনী) নক্ষত্রমমণ্ডলে কনের বিবাহযাত্রা সম্পন্ন হয়। আর এই অর্ঘ্য-ই জৈমিনিয় উপনিষদ-ব্রাহ্মণে পরিচিতি পাবে মধুপর্ক নামে। আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘নাসমাংসো মধুপর্কো ভবতি’ অর্থাৎ, মাংস ছাড়া মধুপর্ক হয় না। আবার পারস্কর গৃহ্যসূত্রে বলা হচ্ছে, বিয়ে বা অন্য যে-কোনও শুভ অনুষ্ঠানে যখন বরণীয় অতিথি আসেন, তখন সেই অতিথির জন্য ‘গৌ’ (গরু) উৎসর্গ করা মধুপর্কের অংশ। এমনকী মনুস্মৃতিও বলছে যে, যজ্ঞে এবং মধুপর্কের সময়ে পশু হত্যা করা শাস্ত্রসম্মত— ‘মধুপর্কে চ যজ্ঞে চ পিতৃদেবতকর্মণি’। আর এই মনুবচনের ব্যাখ্যায় মেধাতিথির মতো প্রাচীন টীকাকাররা বলছেন যে, এখানে মধুপর্কের সময়ে গোমাংসের ব্যবহারের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী কালে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাবে অহিংসা জনপ্রিয় হলে পশু বধের এই নিয়মে পরিবর্তন আসে। আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রেই বলা হয়েছে যে, অতিথি চাইলে মধুপর্কের জন্য উৎসর্গীকৃত গরুটিকে হত্যা না করে ‘মুক্ত’ করে দিতে পারতেন, সে-ক্ষেত্রে মাংসের বদলে অন্য খাবার ব্যবহৃত হতো। আর গৌ-সূক্ত পড়ে মধুপর্কের এই গোরুটিকে ‘অঘ্ন্যা’ বলে ছেড়ে দেবার বৃত্তান্তটি কিন্তু ১৯৬৫ সালের উত্তর প্রদেশেও দেখা যাবে। ১৯৬৫-র Uttar Pradesh District Gazetteers: Varanasi-তে বিয়ের এই মধুপর্কের প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, ‘The guest (bridegroom) then says to the cow: ‘O cow, I have no desire to kill thee’… and the father of the bride releases the animal which had been tied for the ceremony.’ শুধুমাত্র বিয়ে নয়, বরং গর্ভাবস্থার চতুর্থ মাসে পালনীয় ‘সীমন্তোন্নয়ন’ কিংবা ‘উপনয়ন’-এর অনুষ্ঠানেও লাগতো ষাঁড় বা বলদের চামড়া। আর এই চামড়া যে গো-হত্যা ছাড়া পাওয়া অসম্ভব সেটা বলাই বাহুল্য। আবার ‘আভ্যুদায়িক’ বা ‘নান্দীমুখ’ শ্রাদ্ধেও পূর্বপুরুষদের খুশি করতে অন্যন্য পশুর পাশাপাশি গরু কিংবা ষাঁড় অথবা উভয়ই বলি দেওয়ার চল ছিল। তবে অকারণ গো-হত্যা করলে অবশ্যই প্রায়শ্চিত্তের বিধান ছিল। কিন্তু বেদবিহিত যজ্ঞ তো আর অকারণ বা হিংসা নয়, তাই তাতে কারুরই বিশেষ আপত্তি-টাপত্তি নেই।

এ-ছাড়াও খ্রিস্টিয় অষ্টম শতকের বিখ্যাত নাট্যকার ভবভূতি-র ‘উত্তররামচরিত’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে (অঙ্গিরা আশ্রমে) বাল্মীকির আশ্রমে মহর্ষি বশিষ্ঠের আগমন উপলক্ষে আপ্যায়নের একটি দৃশ্য রয়েছে। সেখানে ছাত্র সৌধাতকি ও দাণ্ডায়নের কথোপকথনে জানা যায় যে, বশিষ্ঠের আগমনে আশ্রমে একটি গোরু বা বড় ষাঁড় (মহোক্ষ) উৎসর্গ করা হয়েছিল। সেই দৃশ্যে ছাত্র সৌধাতকি বিদ্রূপ করে বলে যে, বশিষ্ঠ আসার সঙ্গে সঙ্গেই আশ্রমের শান্ত বাছুরদের বিপদ ঘনিয়ে এল। সে রসিকতা করে মহর্ষিকে ‘গোগ্রাস’ বা মাংসভোজী হিসেবে উল্লেখ করে। দাণ্ডায়ন তখন তাকে শান্ত করে শাস্ত্রীয় রীতি হিসেবে ‘মধুপর্ক’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার কালিদাসের মেঘদূতের পূর্বমেঘ অংশে রাজা রন্তিদেবের যজ্ঞের বর্ণনা আছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, রন্তিদেবের যজ্ঞে এত অধিক সংখ্যক গোরু উৎসর্গ করা হয়েছিল যে, তাদের চর্ম অর্থাৎ চামড়া ধোয়া জল থেকে একটি নদীর উৎপত্তি হয়, যার নাম ‘চর্মণ্বতী’। মহাভারতের বনপর্বেও দেখা যাবে এই রন্তিদেবের গল্প। রাজশেখরের ‘বালরামায়ণম্’-এ (১০ম শতাব্দী) রাবণ এবং পরশুরামের সংলাপে অতিথিদের জন্য গরু উৎসর্গের প্রাচীন রীতির কথা পাওয়া যায়। ভবভূতির মতো এখানেও বশিষ্ঠের মতো মুনিদের আগমনে গরু বধের (মধুপর্ক বিধি) উল্লেখ ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তবে আদি-আধুনিক সময়পর্বের মৈথিলী সাহিত্যে গোমাংসের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত কৌতূহলউদ্দীপক। বিদ্যাপতি (১৪-১৫ শতক) তাঁর ‘কীর্তিলতা’ কাব্যের দ্বিতীয় পল্লবে সমকালীন জৌনপুর শহরের বর্ণনা দিতে গিয়ে হিন্দু ও তুর্কিদের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের ছবি এঁকেছেন। তিনি তুর্কি সেনাদের বাজার ও খাদ্যাভ্যাসের বর্ণনা প্রসঙ্গে গোমাংস ভক্ষণের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বিদ্যাপতি সেখানে হিন্দুদের পবিত্র জপমালা বা যজ্ঞোপবীতের বিপরীতে তুর্কিদের জীবনযাত্রার তুলনা করতে গিয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন। সেখানে তিনি মূলত হিন্দুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ বা উপহাসের অংশ হিসেবে গো-হত্যার দৃশ্যগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে বাচস্পতি মিশ্র কিংবা চণ্ডেশ্বরের মতো প্রাচীন মৈথিলী স্মার্তেরা গোমাংস ভক্ষণকে কঠোরভাবে ‘কলিবর্জ্য’ (কলিযুগে নিষিদ্ধ) হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বলা বাহুল্য, বাঙলার জীমূতবাহন কিংবা রঘুনন্দন-ও এর ব্যতিক্রম নন। কিন্তু মজার বিষয় হল— এই ‘কলিবর্জ্য’ নামক যে-ধারণাটির কথা স্মার্তরা ফলাও করে বলছেন তার প্রমাণ বচন হিসেবে উদ্ধার করছেন আদিত্যপুরাণের শ্লোক। মনে রাখতে হবে যে এই আদিত্যপুরাণের কোনওঁ পূর্ণাঙ্গ পুথি-ই এপর্যন্ত আবিষ্কার করা যায়নি। তবে দেবণ ভট্টের স্মৃতিচন্দ্রিকা-এ (১২-১৩ শতক) ‘কলিবর্জ্য’ হিসেবে গোমাংসের উল্লেখ বলে দেয় যে, মধুপর্কে তার আগেই গোমাংসের ব্যবহার কমতে শুরু করে দিয়েছিল। তবে এই গো-হত্যার নিষেধের গল্পটি যে একেবারেই সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে মান্য ছিল এমনটা একেবারেই নয়, কারণ এখনও বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধের কথা শোনা যায়।
আর এই ‘কলিবর্জ্য’-এর ধারণা ধরেই একালের ‘হিন্দু ব্রাহ্মণ’-এর ‘গো মাংস’ খেলে ধর্মনাশ হয়। আর খাবারের পরিবেশক যদি ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়, তাহলে তো সেটা ফুড-জিহাদ (‘লাভ-জিহাদ’-এর অনুরূপ)। তবে মুসলমান মাত্রেই যে গোমাংস লোলুপ তেমনটা একেবারেই নয়। ২০০৬ সালের ‘অধ্যাপক সুশোভনচন্দ্র সরকার স্মারক বক্তৃতা’-এ ঐতিহাসিক দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ ঝা তাঁর পঠিত ‘হিন্দু সত্তায় গোমাংস’ শীর্ষক প্রবন্ধে পাকিস্তানের দর্দিস্তানের শিন মুসলমানদের কথা তুলে ধরেছেন, যারা গরুর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ এড়িয়ে চলেন, গরুর দুধ, এমনকী গোবরের ঘুঁটেকেও ইন্ধন হিসেবে ব্যবহার করেন না। আবার যে-মোগলদের কারণে নাকি ‘হিন্দু খতরে মৈ হ্যে’ সেই মোগলদের রাজা আকবরই কিন্তু ‘হিন্দু’ প্রজার ভাবাবেগের কথা মাথায় রেখে গো-হত্যায় অঞ্চল বিশেষে লাগাম টানছেন, অন্তত আইন-ই-আকবরি-র বয়ান তো সে কথাই বলে। তাতে অবশ্যি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিশেষ কিছু যায় আসে না। তাই কখনও বিদ্বিষ্ট নীতি, কখনও ধর্মনাশের ভয় কিংবা অলীক ধর্ম রক্ষার হাতছানি দিয়ে একটি চতুষ্পদী প্রাণীর প্রতি মানবিক করুণা হয়ে যায় রাজনৈতিক আস্ফালনের সাম্প্রদায়িক চিহ্ন।



