মশালের রক্তিম আভা

Representative Image

আলিগড়ে কি শৈশবে এমনটাই শীত পড়ত? বা যৌবন আঁকড়ে বেঁচে থাকা দিল্লি ইউনিভার্সিটির রাতগুলো কি এমনই জড়োসড়ো? স্টিফেন কলেজের কৃতি ছাত্র। চাইলেই কাটাতে পারতেন সুখের দশটা-পাঁচটার নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। দিল্লিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রেস ইনফরমেশন অফিসার হিসাবে কাজও করেছেন তিন বছর। কিন্তু নাড়া দিল রাজনীতি ও উত্তাল সময়। অফিসে তাঁর দপ্তরটি হয়ে থাকত প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিকদের অবাধ চারণভূমি। আগত অনেকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন নোনা ধরা দেওয়ালের দিকে। ঝুলত পাগলাটে চেহারার খোঁচা-খোঁচা দাড়ির আরেক ভবঘুরের চিত্রকর্ম। তলায় ক্যাপশন— ‘দ্য আনপ্যারালালড ফিল্ম জিনিয়াস।’ ঋত্বিক ঘটক। ততদিনে আচরণগত সমস্যার কারণে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ খুইয়েছেন পরিচালক। কিন্তু তাতে কী! জিনিয়াসরা এমনই হন।

শিষ্যর মাথাতেও ততদিনে ছটফট করছে নাটকের ভূত। সামান্য সময়ের জন্য অধ্যাপনা করলেন  গাড়োওয়াল, কাশ্মীর ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংগ্রহ করছেন অভিজ্ঞতা, সংগ্রহ করছেন মানুষ। ছটফট করছে ভেতর-ভেতর কিছু বলতে চাওয়ার অদম্য বাসনা। অবশেষে একদিন বুঝলেন, এভাবে হবে না। গ্রাস করে আসা শৈত্যকে দূরে ঠেলে উঠে বসলেন গা-ঝেড়ে। চাকরি ছেড়ে হয়ে গেলেন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। অন্যদিকে তৈরি করলেন নিজের নাট্যদল, ‘জনম’ অর্থাৎ জননাট্য মঞ্চ।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্র এখনও গিগ-কর্মীদের শ্রমিক তকমা দেয়নি কেন? লিখছেন রোদ্দুর মিত্র

সাত-আটের দশক শুধু বাংলা নয়, গোটা ভারতের ইতিহাসেই খুব উত্তাল সময়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সাধারণ দর্শকদের জন্য প্রসেনিয়াম ও স্ট্রিট থিয়েটার মঞ্চস্থ করত জনম। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে, রাজনৈতিক নাটক করা ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৭৮ সালে স্ট্রিট থিয়েটারের বৃহত্তর পরিসরে নেমে পড়ে জনম। দিকে-দিকে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠ হয়ে উঠতে থাকে সফদর হাশমির কলম। ‘মেশিন’ নাটকটি দু’লক্ষেরও বেশি ট্রেড ইউনিয়ন সভায় মঞ্চস্থ হয়। এরপর একে-একে মঞ্চস্থ হয় ‘গাঁও সে শহর তক’, কৃষকদের দুর্দশার ধারাভাষ্য শোনা যায় থিয়েটারের মঞ্চে। ফ্যাসিবাদের ভয়ঙ্কর রূপের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে ‘হত্যা রে’ কিংবা ‘অপহরণ ভাইচারের কে’, লক্ষ্মী সেহগাল-রেনু চক্রবর্তীর দেশে নারী-দুর্গতির দর্পণ হয়ে উঠল ‘অওরাত’। সঙ্গে বাড়ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ’৮৪ সালে নিহত হলেন ইন্দিরা গান্ধী। দেশ জুড়ে কারফিউ। নির্বিচারে মারা হচ্ছে শিখদের। রাজধানীর বুকে জ্বলছে হিংসার লেলিহান শিখা। সেই অস্থির সময়ে বার্তা দিলেন সম্প্রীতির। নরমেধ যজ্ঞের শুষ্ক-হিংস্র মরসুমে এক অন্য বসন্তের ডাকপিওন সফদর। দাঙ্গাবিরোধী মিছিলে প্রথমসারিতে তিনি। আশ্রয় দিচ্ছেন ঘরপোড়াদের। গান বাঁধছেন, থিয়েটার করছেন, কলম ধরছেন। ভাঙা মানচিত্র জুড়ছেন দু’হাতে ক্ষুদ্র প্রয়াসে। ‘কমিটি ফর কমিউনাল হার্মনি’র কনিষ্ঠতম নেতা তিনি।

কিছু বছর পরে নড়েচড়ে ওঠে রাষ্ট্র। এহেন জনপ্রিয়তার আলোকের দীপ্তিমান শরিক হতে চান তাঁরাও। অগত্যা পুরস্কার ঘোষণা দশ হাজার টাকার। মনে রাখতে হবে, আটের দশকে এই মূল্য কিন্তু মোটেই সামান্য নয়। কিন্তু সফদর বিশেষ গা করেন না এসবের। পুরো অর্থ নিজের নাট্যদলকে উৎসর্গ করার বার্তা দেন। কমরেডরাই তো লড়েছে, তাঁর ব্যক্তি লড়াই তো সামান্যই। সরকার সেই শর্ত মেনেও নেয়। কিন্তু গোল বাধে পুরস্কার ঘোষণার পরে। দেখা যায় পুরস্কার তুলে দিতে আসবেন, তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী, কংগ্রেস সাংসদ, হরি কৃষ্ণ লাল ভগৎ। ’৮৪ সালের শিখ নিধনে যাঁর হাত রক্তাক্ত। শাণিত, ক্রুর, বুদ্ধিদীপ্ত চাল রাষ্ট্রের।

দ্বিতীয়বার ভাবেননি, সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন সফদার। প্রত্যাখ্যানের কারণ জানাতে জানুয়ারি মাসের দু’তারিখ প্রেস কনফারেন্স ডাকা হয়। প্রেস কনফারেন্সটি অনুষ্ঠিত হয় ও সেখান থেকেই প্রথমবার দেশবাসীর উদ্দেশ্যে সম্প্রচারিত হয় সফদর হাশমির মৃত্যু সংবাদ। উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় নাট্যজগতের তিন দিকপাল— হাবিব তানভির, গোবিন্দ দেশপান্ডে, এম. কে. রায়না। ভারত জানল, রাষ্ট্র খুন করেছে সফদারকে। যেমন খুন করেছে গৌরী লঙ্কেশকে, যেমন খুন করেছে স্ট্যান স্বামীকে, যেমন খুন করেছে রোহিত ভেমুলা বা কয়েকশো কৃষককে। আদতে এরা প্রত্যেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’।

সফদর একাধারে কাজ করছেন ম্যাক্সিম গোর্কির সৃষ্টি নিয়ে, যাঁর ‘এনিমিজ’-এর রূপান্তরে মিশে যাচ্ছিল নিজস্ব ভারতীয় ঘরানা। অন্যদিকে হাবিব তানভিরের সঙ্গে জোট বেঁধে করছেন ‘মোটেরামের সত্যাগ্রহ’। ক্ষমতার অলিন্দে আঘাত হেনেছেন বারবার। অন্যদিকে হাত বাড়িয়েছেন সাহায্যের।

দিল্লির লেডি শ্রীরাম কলেজের ছাত্রী বঙ্গকন্যা সোহিনী ঘোষ তখনও তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসাবে পরিচিতি পাননি। নিতান্তই কলেজের ফিল্ম সোসাইটির মেম্বার। ফিল্ম স্ক্রিনিংয়ের জন্য প্রয়োজন ফিল্ম ক্যান। তখনই সোহিনী, অভিষ্টের লক্ষ্যে পাড়ি দেন খড়ক সিং মার্গের দপ্তরে। নির্দ্বিধায় জোগাড় করে দেন সফদর। উপরমহল ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু এসব কবেই বা কানে তুলেছেন সফদর। যেমন কানে তোলেননি নতুন বছরে মুকেশ শর্মার হুঙ্কার।

এমনই শীত পড়েছিল সে-বছর। যেমন শীত ছিল ’৯২-এর অভিশপ্ত ডিসেম্বরে। আদতে তখন থেকেই খোলনলচে বদলাচ্ছিল ভারতীয় রাজনীতির। পাকাপাকিভাবে নিজের অধিকার স্থাপন করছিল ‘ঘৃণা’ নামক শব্দবন্ধ। তেমনই পিছিয়ে যাওয়া তিন বছর। আটের দশকের শেষে বাড়ছে গ্লোবালাইজেশনের শৈত্যপ্রবাহ। আর কিছুদিন বাদেই ভেঙে পড়বে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অবশ্য সে আঁচ হিমালয় পার করে শস্যশ্যামল ভূখণ্ডে আসতে ঢের দেরি। আমরা তখনও জানি না যে— শৈত্যের আঁচ, আঁচড়ের মত শাণিত থাবায় বিদ্ধ করবে আমাদের। জানতেন না সফদারও। রাজধানী থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে শাহিদাবাদ। নববর্ষের প্রথম দিন। গাজিয়াবাদ পৌরসভার নির্বাচনে শাহিদাবাদের সিপিআই(এম) প্রার্থী রামানন্দ ঝাঁয়ের সমর্থনে পথনাটিকা। থিয়েটার ‘হাল্লাবোল’।

ভারত জানল, রাষ্ট্র খুন করেছে সফদারকে। যেমন খুন করেছে গৌরী লঙ্কেশকে, যেমন খুন করেছে স্ট্যান স্বামীকে, যেমন খুন করেছে রোহিত ভেমুলা বা কয়েকশো কৃষককে। আদতে এরা প্রত্যেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’।

ঘড়ির কাঁটা সকাল ১১টা পেরিয়েছে। হঠাৎই এসে উপস্থিত নির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী মুকেশ শর্মা ও তাঁর দলবল। নাটক থামাতে হবে। তাঁদের যাওয়ার রাস্তা আটকে নাটক হচ্ছে। চোয়াল শক্ত করে সফদর বোঝালেন, অপেক্ষা করতে অথবা অন্য রাস্তা ধরতে। সফদর ভুলে গেছিলেন, শাসক ঔদ্ধত্য হজম করে না। শুরু হয় এলোপাথাড়ি আক্রমণ। লোহার রডের বাড়িতে ওখানেই লুটিয়ে পড়তে থাকেন জনমের শিল্পীরা। দর্শকরাও প্রহৃত হন কংগ্রেসের সন্ত্রাসবাহিনীর হাতে। সিটু কর্মী রাম বাহাদুরের ওখানেই মৃত্যু হয়। রক্তাক্ত সফদারকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।

বাঁচেননি তিনি। আসলে সফদররা বাঁচে না। তাঁর মশালের রক্তিম আভাটুকু বেঁচে থাকে। যে-আভায় ভর করে ওই স্থানেই থিয়েটারকে আঁকড়ে ধরে মলয়শ্রী হাসমি, সফদারের অর্ধাঙ্গিনী। আর সলিলের মূর্ছনায় সফদারের খুব পছন্দের যে-সুর ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম পেরিয়ে নগর-বন্দর-কারখানায় কিংবা গোটা মানচিত্রের মেহনতি মানুষের কণ্ঠে… ‘বুরহি হ্যায় আগ পেট কী; বুরহে হ্যায় দিল কে দাগ ইয়ে, না দব্ সকেঙ্গে এক দিন; বানেঙ্গে ইনকিলাব ইয়ে!’