ডাকবাংলা

এক ডাকে গোটা বিশ্ব

 
 
  

"For those who want to rediscover the sweetness of Bengali writing, Daakbangla.com is a homecoming. The range of articles is diverse, spanning European football on the one end and classical music on the other! There is curated content from some of the stalwarts of Bangla literature, but there is also content from other languages as well."

DaakBangla logo designed by Jogen Chowdhury

Website designed by Pinaki De

Icon illustrated by Partha Dasgupta

Footer illustration by Rupak Neogy

Mobile apps: Rebin Infotech

Web development: Pixel Poetics


This Website comprises copyrighted materials. You may not copy, distribute, reuse, publish or use the content, images, audio and video or any part of them in any way whatsoever.

© and ® by Daak Bangla, 2020-2022

A unit of Gameplan Sports Pvt. Ltd.

 
 

 রূপম ইসলামের নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস : শব্দ ব্রহ্ম দ্রুম

 
 
  • বাঙালি হারলেম


    সন্দীপ রায় (Sandip Roy) (July 18, 2022)
     

    বাঙালি হারলেম কোনও মানচিত্রে পাওয়া যায় না। ১৯৯৯ সালে তার প্রথম হদিশ পান পরিচালক বিবেক বাল্দ। তাঁর এক বাংলাদেশি-আমেরিকান বন্ধু, আলাউদ্দিন উল্লাহর কমেডি শো টেপ করতে যান বাল্দ, নিউ ইয়র্কের এক নামী ক্লাবে। আলাউদ্দিন উল্লাহর বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা এসেছিলেন, আরও হাজার হাজার অভিবাসীর মতো। বাবা বয়সে অনেক বড় ছিলেন মায়ের থেকে। স্কুলের বন্ধুরা যখন ভাবত উনি আলাউদ্দিনের বাবা নন, ঠাকুরদা, তখন আলাউদ্দিন ভারি লজ্জা পেতেন। বাবা মারা যাওয়ার পরে, তাঁর জীবন সম্বন্ধে আলাউদ্দিনের একটু কৌতূহল জন্মায়। তিনি বাল্দকে  বলেন, পারলে কখনও নিজের বাবার কাহিনি নিয়ে একটা তথ্যচিত্র বানাবেন। তারপর টুকরো টুকরো গল্প শোনান, আর বাল্দ বেশ তাজ্জব বনে যান। 

    আমেরিকাতে ভারতীয় অভিবাসন দুই খেপ-এ ঘটে। ১৯০৪ থেকে বহু ভারতীয় নাগরিক, প্রধানত পঞ্জাবের, ক্ষেত-খামারে কাজ করতে আমেরিকা যান। এখনও ক্যালিফোর্নিয়াতে পিচ এপ্রিকটের বাগানের মাঝে বেশ কয়েকটা গুরুদ্বার দেখা যায়। তারপর ১৯১৭ সালে সবকিছু বদলে গেল। আমেরিকা Asian Exclusion Act পাশ করল। এশিয়া থেকে অভিবাসন নিষিদ্ধ হয়ে গেল রাতারাতি। প্রায় ৫০ বছর আমেরিকার দরজা বন্ধ রইল এশিয়ানদের জন্য । ১৯৬৫ সালে আবার অভিবাসন নিয়ামাবলি সংশোধন হল। তখন শুরু হল ভারত থেকে ‘ব্রেন ড্রেন’। লাখে লাখে ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার ‘আমেরিকান ড্রিম’ খুঁজতে সাগর পাড়ি দিল।

     ‘আমি যতদূর জানতাম, ১৯১৭ থেকে ১৯৬৫, এই সময়টায় ভারত থেকে আমেরিকাতে অভিবাসন নগণ্য, প্রায় হয়নি বললেই চলে,’ বলেন বিবেক বাল্দ। ‘অথচ ঠিক এই সময়েই আলাউদ্দিনের বাবা আমেরিকা আসেন এবং থেকে যান।এরকম কাহিনি আমি আগে শুনিনি।’

    কিন্তু এই কাহিনি আলাউদ্দিনের বাবা হাবিব নিজেই সচরাচর কারুর কাছে বলতেন না। ‘আমি আড়ি পেতে শুনছিলাম একদিন, যখন বাবা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিলেন,’ বলেন আলাউদ্দিন। ‘তখন বাবাকে বলতে শুনেছি, উনি জাহাজে এসেছিলেন। জাহাজ থেকে পালিয়ে বাবা নিউ ইয়র্ক চলে আসেন। কোনও কাগজপত্র ছিল না। একটা ঘরে ছ-সাতজন কোনোমতে থাকতেন। বাসন ধোওয়ার কাজ পেয়েছিলেন একটা রেস্টুরেন্টে।’ অবশেষে হাবিব উল্লাহ নিজেই একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্টের মালিক হন। 

    কিন্তু এটা কি শুধু হাবিব উল্লাহর একক কাহিনি? বাল্দ এতই কৌতূহলী হয়ে পড়েন এই গল্প শুনে, উনি ভারতীয় অভিবাসন নিয়ে রীতিমত গবেষণা শুরু করেন। পিএইচ. ডি করে বাল্দ এখন এম আই টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ‘Bengali Harlem and the Lost Histories of South Asian America’ নামে একটা বইয়ের লেখক। বাল্দ বলেন, উনি অনেক নথিপত্র ঘেঁটে প্রাথমিক দুরকম ভারতীয় অভিবাসনের উল্লেখ পান। দুটোই বাংলা থেকে, দুটোই মুসলিম পুরুষদের । ১৮৯০ থেকে বহু মুসলিম ব্যবসায়ী হুগলির মতো জায়গা থেকে আমেরিকা যান, প্রধানত নিউ অরলিন্স-এর দিকে। তাঁদের মুল ব্যবসা চিকন সূচিকর্ম— শাল, রুমাল, বিছানার চাদর। এককালে কলকাতার মতো মহানগরে এইসব জিনিসের খুব চাহিদা ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ কলকারখানায় তৈরি জিনিসে যখন বাজার ক্রমশ ছেয়ে যায়, তখন তাঁদের আমেরিকার মতন নতুন বাজার খুঁজে নিতে হয়। সে যুগে আমেরিকাতে একটু ‘ওরিয়েন্ট’ নিয়ে মুগ্ধতা ও মাতামাতি চলছিল। আমেরিকান ক্যাবারেতে ‘Oriental nautch’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, ‘হিন্দু’ নামে তামাকের ব্র্যান্ড ছিল, নিউ অরলিন্সের বিখ্যাত মারডি গ্রা মিছিলে কখনো ‘Hindoo Heaven’, কখনো ‘Light of Asia’ নামে প্রদর্শনী  হত। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে ভারত থেকে অভিবাসন বন্ধ হয়ে গেল। ‘বলা যেতে পারে, ভারতপ্রীতি অর্থাৎ Indophilia এবং বিদেশি-বিদ্বেষ বা xenophobia-র মাঝে যে সংকীর্ণ সময়ের একটা গলি, তা দিয়েই এঁরা আমেরিকাতে ঢুকে পড়েন,” বলেন বাল্দ। 

    অভিবাসীর পরবর্তী ঢেউয়ে আসেন আলাউদ্দিনের বাবার মতন লোক, বাংলার গ্রাম থেকে। এখন সেসব গ্রাম বাংলাদেশে। সে যুগে তাঁরা কলকাতায় এসে জাহাজে লশকরের কাজ নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিতেন। সে সব জাহাজে কাজের পরিস্থিতি দুর্বিষহ ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, কোনোমতে আমেরিকা পৌঁছনো, তারপর জাহাজ থেকে পালিয়ে নিউ ইয়র্ক বা ফিলাডেলফিয়ার মতন শহরের জনসমুদ্রে মিশে যাওয়া। বাল্দের অনুমান, ১৯১০-১৯৪০’এর মধ্যে হাবিব উল্লাহর মতন  কয়েক হাজার অভিবাসী আমেরিকা আসেন অবিভক্ত ভারতবর্ষ থেকে। অনেকে কিছুদিন থেকে দেশে ফিরে যান, আবার আসেন, আবার যান— যাকে বলে চক্রাকার অভিবাসন। 

    কিন্তু কিছু অভিবাসী ফেরত যাননি। হাবিব উল্লাহর মতন অনেকে আমেরিকাতে নতুন জীবন শুরু করেন, সংসার পাতেন। কিন্তু সংসার পাতার জন্য পাত্রী তো চাই। নিউ অরলিন্স যাঁরা যান তাঁরা অনেকে আফ্রিকান-আমেরিকান মেয়েকে বিয়ে করেন, অনেকে ল্যাটিনো নারীকে বিয়ে করেন। নিউ ইয়র্কে হাবিব উল্লাহ এক পুয়ের্তো রিকান মহিলাকে বিবাহ করেন, সন্তান হয়, সংসার শুরু করেন। ‘আমার অনুমান, ৫০০-১০০০ বাঙালি পুরুষ নিউ ইয়র্ক এলাকায় বসতি স্থাপন করেন এবং সংসার পাতেন,’ বলেন বাল্দ।  

     ‘বাঙালি চাচা এবং পুয়ের্তো রিকান বা ব্ল্যাক চাচি! এখন শুনলে অদ্ভুত লাগে বইকি? কিন্তু তখন লাগত না,’ বলেন আলাউদিন উল্লাহ। ‘ওটাই আমার জগৎ ছিল, ওটাই স্বাভাবিক মনে হত।’ মনে আছে, ছোটবেলায় সবাই মিলে হয়তো ইব্রাহিম চাচা অথবা মাসুদ চাচার বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। সেখানে বাইরে জুতো খুলে ঢুকতে হত, সবাই একে অপরকে সেলাম আলেইকুম করতেন। ‘এখনও মনে আছে, বাড়িতে ঢুকলেই সেই বাসমতী চালের সুগন্ধ,’ বলেন আলাউদ্দিন। ‘গন্ধটা একদম বাংলাদেশি।’ কিন্তু ওই চাচা-চাচির ছেলেমেয়েদের নিজেদের ঘরে আর পাঁচটা আমেরিকান ছেলেমেয়ের মতন তখনকার তারকাদের ছবি টাঙানো—  হয়ত  ফারা ফসেট বা লুক স্কাইওয়কার। ‘মানে, বসবার ঘরে বাংলাদেশ, আর শোওয়ার ঘরে আমেরিকা আর কি,’ বলেন আলাউদ্দিন হাসতে হাসতে। 

    হারলেম আফ্রিকান-আমেরিকান পাড়া বলে জগত-খ্যাত হলেও, আরো বহু দেশ ও জাতির লোক সেখানে ঠাঁই পেতেন। আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান, চিন, ল্যাটিন আমেরিকা— পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লোক হারলেমে থাকতেন। অবিভক্ত ভারত থেকেও অনেক অভিবাসী ছিলেন। তাই নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে পুরোনো ভারতীয় রেস্টুরেন্টের মধ্যে বেশ কিছু ছিল হারলেমে। তাদের মধ্যে একটা আলাউদ্দিনের বাবার। নাম দিয়েছিলেন ‘বেঙ্গল গার্ডেন’। নানান দেশের লোকের মধ্যে হাবিবের মতন জাহাজ-পলাতক অভিবাসীরা অপেক্ষাকৃত ভাবে সহজে মিশে যেতে পারতেন। ‘এটা উল্লেখযোগ্য যে, সে  সময়ে আমেরিকা সরকারিভাবে এশিয়া থেকে অভিবাসীদের প্রত্যাখান করেছিল, তাদের এই দেশে এসে থেকে যাওয়া আইনত অপরাধ ছিল,’ বলেন বাল্দ। ‘কিন্তু এই আফ্রিকান-আমেরিকান এবং পুয়ের্তো-রিকান পাড়াগুলোতে তাঁরা স্থান পেয়েছিলেন, এখানে তাঁরা নতুন সম্প্রদায়, নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ পান।’ 

    বাঙালি হারলেম-এর শুরুর বাসিন্দা

    নতুন জীবন তো বটেই, তার সঙ্গে মাঝেমাঝে নতুন প্রেমও। কিছু কিছু বিয়ে হয়তো শুধু কাগজেকলমে বিয়ে ছিল, আইনি দলিলপত্র পাওয়ার পরে ভেঙে যায়। কিন্তু অনেক সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়। সেই সব ইব্রাহিম, হাবিব, মাসুদ-রা আজ আর নেই, কিন্তু তাঁদের পরিবারের কেউ কেউ এখনও আছেন, মনে রেখেছেন সেই সব দিনের প্রায় মুছে যাওয়া ইতিহাস। বাল্দ তাঁর ‘In Search of Bengali Harlem’ তথ্যচিত্রে তাঁদের কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। রুথ আলি এখন বিধবা, আফ্রিকান-আমেরিকান। কিন্তু তাঁর স্পষ্ট মনে পড়ে, কীভাবে এক সুপুরুষ বাঙালির প্রেমে পড়েছিলেন বহু বছর আগে। ‘আমি তোয়াক্কা করিনি উনি কোথা থেকে এসেছিলেন, বা ওঁর ধর্ম কী। আমার শুধু মনে হত, কী সুদর্শন চেহারা!’ হাসতে হাসতে বলেন রুথ আলি, বাল্দের তথ্যচিত্রে। আরেকজন স্মৃতিচারণ করেন, মাঝে মাঝে জাহাজ এলে অনেক নতুন চাচা তাঁদের বাড়িতে হঠাৎ উপস্থিত হতেন। দু-একজন থেকেও যেতেন। মা-বাবা বলতেন, সেই সব নতুন চাচার সম্বন্ধে কাউকে কিছু না বলতে। আরেকজন মহিলা, তাঁর নিজের জন্ম সাউথ ক্যারোলিনায়, তিনি স্বামীর সঙ্গে ভারতীয় রেস্টুরেন্ট খোলেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজেই রেস্টুরেন্ট চালান দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে। এটা এক ধরনের ভালবাসার গল্প ছাড়া আর কী? 

    আলাউদ্দিনের নিজের কাহিনি কিন্তু একটু আলাদা। ওঁর মা-বাবা দুজনেই বাংলাদেশি। হাবিব উল্লাহর প্রথম স্ত্রী, যিনি পুয়ের্তো রিকান ছিলেন, মারা যান। অনেক বছর পরে হাবিব উল্লাহ বাংলাদেশ গিয়ে পুনর্বিবাহ করেন। নতুন স্ত্রী বয়েসে অনেক ছোট, তাঁর আগে বিয়ে ছিল কিন্তু ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত হন। যখন হাবিবের সঙ্গে বিয়ে হয়ে, হাবিবের প্রথম পক্ষের সন্তানেরা সাবালক। প্রথম পক্ষের ছেলে হাবিব জুনিয়রের মনে আছে, মা-বাবার সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে পিকনিক করতে যাওয়ার কথা। অন্য সব পরিবার ফ্রায়েড চিকেন আর কোকাকোলা নিয়ে যেত। ‘আমরা নিয়ে যেতাম চিকেন কারি আর ভাত,’ বলেন হাবিব জুনিয়র। হাবিব উল্লাহ মাঝে মাঝে দেশে চিঠি লিখতেন এবং সেই চিঠিগুলোর খামের ওপর নাম-ঠিকানা লিখে দিতেন হাবিব জুনিয়র, কারণ তাঁর বাবা ইংরিজি লিখতে জানতেন না। সেই জন্য হাবিব জুনিয়র সুদূর বাংলাদেশে তাঁর আত্মীয়স্বজনকে নামে চিনতেন, তাঁদের গ্রামের নামগুলো শিখে গিয়েছিলেন। 

    যখন হাবিব উল্লাহ নতুন বউ নিয়ে আমেরিকা ফেরেন, তাঁর পুরোনো বন্ধুর স্ত্রীরা এই নবাগতা বাঙালি মেয়েকে নতুন দেশে ধাতস্থ হতে সাহায্য করেন নানাভাবে। আলাউদ্দিনের মতে, সেইসব মহিলার প্রভাব নিশ্চয়ই তাঁর মা’র উপর পড়েছিল। তখন ষাটের দশক— ব্ল্যাক পাওয়ার আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে। পাশের বাড়ির মহিলার কাছে তাঁর মা শোনেন সে যুগের বিখ্যাত গান, আরেথা ফ্রাঙ্কলিনের ‘Respect’। গানটা মনে বেশ দাগ কাটে। আলাউদ্দিনের মনে আছে, যখন  মা’র সঙ্গে বাংলাদেশ যান, এক মোল্লা তাঁর মাকে বিদ্রুপ করেন, ইসলামি প্রথা অনুযায়ী যথাযথ ভাবে নিজেকে না ঢাকার জন্য। তখন তাঁর মা বলেন ‘ধুৎ, নিকুচি করেছে। এত গরমে এসব পরতে পারব না। চল, এবার বাড়ি ফিরে যাই।’ বাড়ি অর্থাৎ হারলেম। 

    এই কাহিনি আমেরিকার বৈচিত্রময় অভিবাসনের কাহিনির একটা ছোট্ট অংশ। কিন্তু এর তাৎপর্য আছে, মনে করেন বাল্দ। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন নিয়মকানুন বানায়, যার দ্বারা নির্ধারিত হয় কে দেশের নাগরিক, কে নয়, কে দেশে আসতে পারবে, কে পারবে না। ‘কিন্তু মানুষ অদম্য,’ বলেন বাল্দ। ‘এত কঠোর নিয়ম সত্ত্বেও, সব পেরিয়ে লোকেরা নিজেদের জীবন গড়ে নিতে জানে।

    হাবিব উল্লাহর পুরুষপ্রধান অভিবাসী প্রজন্ম নিজেদের তেমন কিছু স্থায়ী নিদর্শন রেখে যেতে পারেনি। তাঁদের ছেলেমেয়েরা মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেনি, তাঁদের মা’দের মতো অধিকাংশই ক্যাথলিক। তাঁদের বাঙালি মুসলিম ইতিহাসের একমাত্র নির্শন তাঁদের পিতৃদত্ত পদবিগুলো। ২০১৩ সালে আরেকজন বাঙালি বংশধর আসেন কলকাতায় নিউ অরলিন্স থেকে। ফাতিমা শেখের ঠাকুরদা হুগলির কোনো গ্রাম থেকে নিউ অরলিন্স যান। সেই গ্রামের খোঁজে ফাতিমা কলকাতা আসেন। গ্রামের নামটুকু ঠিক জানতেন না। কিন্তু যেই কলকাতা বিমানবন্দরে নামেন, ফাতিমার মন হু-হু করে ওঠে। মনে হয় যেন তিনি নিউ অরলিন্স ফিরে গেছেন— সেই গরম, সেই ঘাম, সেই মশা! ‘আমার ঠাকুরদা যখন নিউ অরলিন্স পৌঁছন, হয়তো তাঁরও এরকমই মনে হয়েছিল,” বলেন ফাতিমা।

    এই কাহিনি আমেরিকার বৈচিত্রময় অভিবাসনের কাহিনির একটা ছোট্ট অংশ। কিন্তু এর তাৎপর্য আছে, মনে করেন বাল্দ। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন নিয়মকানুন বানায়, যার দ্বারা নির্ধারিত হয় কে দেশের নাগরিক, কে নয়, কে দেশে আসতে পারবে, কে পারবে না। ‘কিন্তু মানুষ অদম্য,’ বলেন বাল্দ। ‘এত কঠোর নিয়ম সত্ত্বেও, সব পেরিয়ে লোকেরা নিজেদের জীবন গড়ে নিতে জানে। সে জীবন সীমারেখার ঊর্ধ্বে, একাধারে যেমন এইসব হারলেমের পাড়ার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত, তেমনি বিশ্বব্যাপীও বটে, সুদূর বাংলার গ্রামগঞ্জের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।’

    বাল্দ শুনেছেন, এখনও নিউ অরলিন্সে একটা পরিবার আছে, যাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন বাঙালি চিকন ব্যাবসায়ী। আজও  এই পরিবার যখন একত্রিত হন, বিরিয়ানি রান্না করেন। অবশ্য সেই বিরিয়ানিতে আলু থাকে কি না, বলতে পারব না।

    Read in English

     
      পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা  
     

     

     



 

 

Rate us on Google Rate us on FaceBook
 

Rate us