
বাংলার বাইবেল : পর্ব ৬
সারা পৃথিবীর মতো ভারতেও দীর্ঘদিন ধরেই একটি নিজস্ব খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ধারা সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে। আমরা হুতোমের লেখায় কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ আগেই দেখলাম। তিনি ভারতীয় থিওলজির একজন আদিপুরুষ।

সারা পৃথিবীর মতো ভারতেও দীর্ঘদিন ধরেই একটি নিজস্ব খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ধারা সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে। আমরা হুতোমের লেখায় কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ আগেই দেখলাম। তিনি ভারতীয় থিওলজির একজন আদিপুরুষ।

‘‘এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, বাইবেল একবার নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও এত পার্থক্য কেন? এর কারণ বাইবেল কেন্দ্রীয়ভাবে একরকম নির্দিষ্ট হলেও স্থানীয় ভাবে নানান প্রভাব এসে পড়ত। প্রেস তো ছিল না! আবার গোড়ার যুগেও অনেক স্থানীয় অনুবাদ হত। আর সেগুলোর চটজলদি ‘কপি’ ও তৈরি হয়ে যেত খুব অল্প সময়ে।’’

‘‘বাংলা বাইবেল-সংক্রান্ত প্রথম বিজ্ঞাপনটি আমারা পাই ১৭৮৩ সালের ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া গেজেট’ পত্রিকায়। বেশ রহস্যের ঢঙে লেখা সেই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলায় ধর্মগ্রন্থ (স্ক্রিপচার্স) অনুবাদে কেউ আগ্রহী এবং যোগ্য হলে, তাঁকে আর্থিক সাহায্য করা হবে।’’

‘হতদরিদ্র অসহায় কৃষ্ণ পালকে হুগলির জলে নিমজ্জন করা এক জিনিস, কিন্তু পরমাত্মাকে যেভাবে কেরি ডোবালেন, তাতে অনেকেই আঁতকে উঠেছিল। মনে রাখতে হবে যে, এই নিমজ্জনের মধ্যে দিয়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষার ব্যাপারটা ব্যাপ্টিস্টদের একটি জরুরি সাম্প্রদায়িক আচার হলেও, সবার কাছে নয়।’

‘বাংলা বাইবেল অনুবাদে এক আশ্চর্য বিতর্কের জন্ম হয়, যার ঢেউ গিয়ে পড়ে এদেশ ছেড়ে আমেরিকার মাটিতে। একটিমাত্র শব্দকে কেন্দ্র করে বাইবেল সোসাইটির উত্থান প্রশ্নাতীত হয়ে যায়।’

‘অদ্রীশ বর্ধনের অনুবাদের উপরে অভিযোগ এসেছে যে— বঙ্গীকরণ করতে গিয়ে তিনি বহু অংশ বাদ দিয়েছেন। অদ্রীশ যখন অনুবাদ করতেন, তখন বাঙালি পাঠকের কাছে ইংল্যান্ড-আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের দৌলতে এতটা কাছে চলে আসেনি। সাত ও আটের দশকের শিশু-কিশোররা এই অনুবাদগুলির মাধ্যমেই বিশ্বসাহিত্যের এবং পাশ্চত্যবিশ্বের স্পর্শ পেত।’

কত বিচিত্র পথে হেঁটেছেন ফরিদ। জন্মস্থান থেকে কাবুল গেছেন ধর্মতত্ত্ব পড়তে— তাঁর গুরু ফকির কুতবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি প্রথমে তাঁকে শিষ্য হিসেবে মেনে নেননি, বলেছিলেন আরও লেখাপড়া শিখে এসো বাপু, তবে ছাত্র করে নেব তোমায়। ফরিদ তাই গিয়েছিলেন কাবুল। কিছুকাল পড়াশোনা করে ফিরে আসেন। শিষ্যত্ব মেলে। ফরিদ দিল্লি এসেছেন অনেকবার।

‘নয়ের দশকের লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে ছাপা হওয়া গদ্যে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার যে একধরনের ছায়া ও ছাপ দেখা যায়, সে নিয়ে আমরা কোনও আলোচনা করি না বটে, কিন্তু আজ মনে হয়, সেই ছাপ তৈরি হয়েছিল মানববাবুর অনুবাদে এই বিরাট লাতিন আমেরিকার সাহিত্য-সম্ভার বাংলা ভাষায় আমাদের কাছে আসার গতিতে।’

‘সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে এদেশে এলেও তাঁর ভাষাবিদ ও অনুবাদক সত্তা ধর্মীয় কার্যকলাপকে অচিরেই ছাপিয়ে যায়। যে-‘বিধর্মী’দের উদ্ধারের জন্য তাঁর স্বদেশ ত্যাগ, সেই ‘হিদেন’দের সঙ্গে দীর্ঘ সহবাসের ফলে তাদের ভাষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে কেরির মুগ্ধতা ও মমত্ব আমাদের চমকিত করে।’

‘যেহেতু বানুর লেখাকে নারীবাদী বলে দেওয়া হচ্ছে, বলে দেওয়া হয়েছে তাঁর গল্পে মহিলাদের সচেতন মনোভঙ্গি (agency) ফুটে উঠছে, আমরা যেন বানুর লেখায় একলপ্তে চেনা ধর্ম বনাম নারীবাদী চেতনার খোঁজ না করি।’

‘শিশিরকুমার একাধিক লেখায় ফিরে-ফিরে বলেছিলেন ‘ভাবগত আধুনিকতার’ কথা। যে-আধুনিকতা চরিত্রগতভাবে ঔপনিবেশিক নয়। যে-আধুনিকতা নিছক পাশ্চাত্যমুখীও নয়। যে-আধুনিকতার মধ্যে যুগ থেকে যুগান্তরে এক জাতের বহমানতা আছে। যে-আধুনিকতা বিশ্বজনীন।’

‘এই অনুবাদের প্রাণভোমরা হল সেই আবেগ। যা পেরিয়ে যায় দেশ-কাল-ভাষার সীমানা। চিঠিগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়, যেন বাংলা ভাষাতেই লিখিত হয়েছিল।’
This Website comprises copyrighted materials. You may not copy, distribute, reuse, publish or use the content, images, audio and video or any part of them in any way whatsoever.
©2026 Copyright: Vision3 Global Pvt. Ltd.