চড়াই সম্বাদ

চড়াই একটি কমেনসাল প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত প্রাণী। অর্থাৎ মানুষের ঘর, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করেই তাদের অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় যে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে, তার সরাসরি অভিঘাত পড়েছে এই পাখির ওপর। নগরায়ণ এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। পুরনো দিনের বাড়িগুলিতে কার্নিশ, টালির ছাদ, জানলার ফাঁক— এসব ছিল চড়াইয়ের বাসা বানানোর আদর্শ জায়গা। কিন্তু আজকের শহরে কংক্রিটের মসৃণ দেওয়াল, সিল করা জানলা, কাচে মোড়া বহুতল ভবন সেই সমস্ত প্রাকৃতিক আশ্রয়কে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে চড়াইয়ের জন্য নিরাপদ বাসস্থান প্রায় অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, কাচের বিল্ডিং পাখিদের জন্য এক অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। কাচের দেওয়ালে প্রতিফলনে বিভ্রান্ত হয়ে তারা ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারাচ্ছে, যা শহুরে পাখির মৃত্যুর একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। খাদ্যের অভাবও চড়াইয়ের সংকটকে আরও তীব্র করেছে। আগে বাড়ির উঠোনে শস্য, বাজারে খোলা চাল-ডাল বিক্রি— এসবের ফলে চড়াই সহজেই খাদ্য পেয়ে যেত।

আজ সবকিছু প্যাকেটবন্দি ও নিয়ন্ত্রিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিক্ষেত্রে ও শহরে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, যার ফলে পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গিয়েছে। অথচ চড়াইছানাদের প্রধান খাদ্যই হল এই পোকামাকড়। ফলে খাদ্যশৃঙ্খলের এই পরিবর্তন সরাসরি তাদের বংশবিস্তার ও টিকে থাকার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।

মোবাইল টাওয়ারের ক্রমবর্ধমান বিস্তার আজ চড়াইপাখির মৃত্যুর একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, গত দুই দশকে ভারতের শহরাঞ্চলে চড়াইয়ের সংখ্যা প্রায় ৬০–৮০% পর্যন্ত কমে গিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ‘বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি’-র পর্যবেক্ষণেও মুম্বই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরে চড়াইয়ের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন চড়াইয়ের মতো ছোট পাখিদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, উচ্চমাত্রার রেডিয়েশনের সংস্পর্শে থাকা পাখির ডিমের হ্যাচিং রেট ৩০–৪০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আবার পাখিরা যেহেতু পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যে দিকনির্ণয় করে, তাই অতিরিক্ত কৃত্রিম তরঙ্গ সেই স্বাভাবিক ক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটিয়ে তাদের দিকভ্রান্ত করে তুলতে পারে। এর ফলে তারা বাসা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়, দীর্ঘ সময় উড়তে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, এমনকী, মৃত্যুর মুখেও পড়ে। যদিও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও এই বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তৈরি হয়নি, তবুও চড়াইয়ের দ্রুত হ্রাস এবং মোবাইল টাওয়ারের বিস্তারের মধ্যে যে একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে, প্রযুক্তির এই অগ্রগতির মূল্য কি শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকেই দিতে হচ্ছে?

আরও পড়ুন: মানুষের লোভ ও পণ্যসভ্যতার শিকার প্রাণীজগৎ?
লিখছেন জয়দীপ ঘোষ…

‘বিশ্ব চড়াই দিবস’ প্রতি বছর ২০ মার্চ পালিত হয়। পরিবেশ সংস্থা ‘নেচার ফরএভার সোসাইটি’-র উদ্যোগে এই দিনটির সূচনা হয় ২০১০ সালে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ দিলাবার শহরাঞ্চলে চড়াইপাখির দ্রুত কমে যাওয়া দেখে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হন এবং এই ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পাখিটিকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন অনুভব করেন। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় বিশ্ব চড়াই দিবস, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পায় এবং আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়।

এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র একটি পাখির জন্য নয়, বরং একটি বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। চড়াইপাখি মানুষের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক নগরায়ণ, প্রযুক্তির বিস্তার, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং বাসস্থানের অভাবে ক্রমশ বিলুপ্তির পথে এগচ্ছে। তাই এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে যদি আমরা প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারি, তবে তার ফল একদিন আমাদেরই ভোগ করতে হবে। বিশ্ব চড়াই দিবস সেই দায়বদ্ধতারই এক প্রতীক, যেখানে একটি ছোট পাখির মাধ্যমে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে শিখি। 

চড়াইপাখির বৈজ্ঞানিক নাম প্যাসার ডোমেস্টিকাস। এই ছোট্ট পাখিটি হাজার-হাজার বছর আগে থেকেই মানুষের বসতির আশেপাশে বাস করতে শুরু করে। যখন মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করল, কৃষিকাজে মন দিল, শস্য সংরক্ষণ করল ঠিক তখনই চড়াই সেই পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিল। ইউরোপ ও এশিয়া থেকে শুরু করে পরে বিশ্বের নানা প্রান্তে এই পাখির বিস্তার ঘটে এবং একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছয় যে, চড়াইকে মানুষের ছায়াসঙ্গী বললেও অত্যুক্তি হয় না। বাংলার গ্রামীণ জীবনেও এই পাখির উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। টালির ছাদ, কার্নিশের ফাঁক, খড়ের চাল কিংবা জানলার কোণে তারা সহজেই বাসা বাঁধত, আর মানুষের জীবনের সঙ্গে এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে থাকত। কিন্তু আধুনিক নগরসভ্যতার দ্রুত পরিবর্তনের ফলে এই দীর্ঘ সহাবস্থানের সম্পর্ক আজ ভেঙে পড়ছে।

চড়াইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু একটি পাখির অনুপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামগ্রিকভাবে পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। চড়াই মূলত পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে এবং এইভাবেই তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। তারা কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফসলকে রক্ষা করে, অর্থাৎ এক অর্থে তারা প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে। ফলে চড়াইয়ের সংখ্যা কমে গেলে পোকামাকড়ের আধিক্য বাড়তে পারে, যার ফলস্বরূপ কৃষিতে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ে। এই অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার আবার মাটি, জল এবং অন্যান্য জীবের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে ফলে একটি ছোট পরিবর্তন থেকে শুরু হয়ে বড় ধরনের পরিবেশগত সংকট তৈরি হয়।

এর পাশাপাশি চড়াই খাদ্যশৃঙ্খলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা যেমন পোকামাকড় খায়, তেমনই আবার নিজেরাও বড় পাখি বা অন্যান্য শিকারির খাদ্য হয়ে ওঠে। ফলে চড়াইয়ের সংখ্যা কমে গেলে খাদ্যজালের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চড়াইকে পরিবেশের স্বাস্থ্যের একটি সূচক হিসেবেও ধরা হয়। যেখানে চড়াই থাকে, সেখানে সাধারণত পরিবেশ তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও বাসযোগ্য থাকে। তাই চড়াইয়ের হারিয়ে যাওয়া আসলে একটি সতর্ক সংকেত যে, আমাদের চারপাশের পরিবেশ ধীরে ধীরে ভারসাম্য হারাচ্ছে।

১৯৫৮ সালে চিনে মাও জে-দং-এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া ‘দ্য গ্রেট স্প্যারো ক্যাম্পেইন’ ছিল এক অভূতপূর্ব সামাজিক ও পরিবেশগত অভিযান, যা বৃহত্তর ‘Four Pests Campaign’-এর অংশ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। এই অভিযানে চড়াই পাখিকে কৃষির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ ধারণা ছিল, তারা শস্য নষ্ট করে। ফলে সাধারণ মানুষকে চড়াই নির্মূলের কাজে সরাসরি যুক্ত করা হয়। তাদের বাসা ধ্বংস করা, ডিম নষ্ট করা হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ চড়়াইপাখি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের কথা তখন ভাবা হয়নি। চড়়াইপাখি শুধু শস্যই খেত না, তারা বিপুল পরিমাণ পোকামাকড়ও নিয়ন্ত্রণ করত। চড়াই কমে যাওয়ার ফলে পঙ্গপাল-সহ নানা ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়, যা ফসলের ওপর আরও মারাত্মক আঘাত হানে। ফলস্বরূপ কৃষি উৎপাদন ভেঙে পড়ে এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। এই পরিবেশগত বিপর্যয় পরবর্তীতে ‘Great Chinese Famine’-এর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যাভাবের শিকার হন। অবশেষে সরকার এই ভুল উপলব্ধি করে এবং চড়াই হত্যার অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এমনকী, পরে চিনকে আবার চড়াইপাখি আমদানি করতে হয়েছিল পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য।

এই ঘটনাটি এখনও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে এবং সেই ভারসাম্যে অযাচিত হস্তক্ষেপের ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্ব চড়াই দিবস কেবল একটি দিবস নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসা সম্পর্কের এক মর্মস্পর্শী স্মারক। যে চড়াই একসময় আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিল, তারই অনুপস্থিতি আজ আমাদের উন্নয়নের সীমাবদ্ধতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।