অপহরণের নেপথ্যে

ভেনেজুয়েলার বিষয়টি ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে এল, জনৈক ব্যক্তি লিখেছিলেন: ‘আমাদের তেল সকাল-বিকেল রাখে চাঙ্গা। আমাদের তেল পাবে নোবেল, আসছে স্যামদা’।

এতদিনে সবাই জেনে গিয়েছেন যে, সমকালীন স্যামদা, ওরফে ডোনাল্ড ট্রাম্প, গভীর রাতে সৈন্য পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে প্রায় ‘অপহরণ’ করেছেন। সেই ঘটনার ছবি সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, আমেরিকা এখন থেকে ভেনেজুয়েলার সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করবে, যতদিন না গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং তাঁরা এ-ও ঠিক করবে, ভেনেজুয়েলা তাঁর তেলের ব্যবসা কাদের সঙ্গে করতে পারবে। খবরে জানা যাচ্ছে, এই ঘটনায় বেজায় খুশি হয়েছেন ভেনেজুয়েলা-র সদ্য শান্তি পুরস্কারজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো এবং মার্কিন মুলুকে বসে থাকা কয়েকজন নির্বাসিত ভেনেজুয়েলার নাগরিক। একই সুর শোনা গেছে ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স, ইজরায়েল-সহ একাধিক দেশের নেতাদের মুখে। ট্রাম্পের বন্দনা শোনা গেছে, খোদ লাভিন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেইয়ের গলায়। তবে বাকি লাতিন আমেরিকার দেশগুলি নিন্দা করেছে এবং এক অভূতপূর্ব যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে ওই অঞ্চলে। অপহরণের নিন্দা করেছে চিন, রাশিয়া, স্পেন-সহ আরও কিছু দেশ। এমনকী, খাস আমেরিকায় ট্রাম্পের নিন্দা করেছে একাধিক সেনেটর-সহ বিরোধী নেতৃত্ব। তবে, ভারত বিশেষ কিছু বলেনি, শুধু জানিয়েছে যে, তাঁরা ‘চিন্তিত’।

অনেকেই, যাঁরা ভাবছেন হঠাৎ করে ট্রাম্প মাদুরোকে বন্দি করলেন কেন, তাঁদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছেই, আমেরিকা কি শুধুই তেলের খনির দখল চায়, না কি মাদুরো সত্যি একজন সন্ত্রাসবাদী। তাদের জন্য বলে রাখি, মানবসভ্যতার ইতিহাসে কোনও ঘটনা হঠাৎ ঘটে না; কোনও ঘটনা নতুনও হয় না; ঘটনা ফিরে ফিরে আসে, সমান নয়, সমতুল্য ঘটনার সাক্ষী হই আমরা। ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যাবে যে, আমেরিকা তাঁর সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করতে বহুবার এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়। ট্রাম্পের মুখে উঠে আসা ‘মনরো ডকট্রিন’ (Monroe Doctrine) প্রসঙ্গ পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি এবং মাদুরোর অপহরণ একই সুতোয় বাঁধা পড়বে। এখানে মাদক পাচার, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদির প্রশ্ন আদৌ জড়িত নয়।

আরও পড়ুন: মারিয়া কোরিনা মাচাদো ও নোবেল শান্তি পুরস্কারের নীল নকশা!
লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…

মনরো ডকট্রিন এবং মাদুরো অপহরণের গতিপ্রকৃতি

মনরো ডকট্রিন হল আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যা ১৯২৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা করেন। যার মূল কথা হল, ‘আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য’, অর্থাৎ, ইউরোপীয় দেশগুলি যেন আমেরিকা মহাদেশে তাঁদের উপনিবেশ স্থাপন বা হস্তক্ষেপ না করে, অন্যথায় তা আমেরিকার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। এর সঙ্গে এও উল্লেখ ছিল যে, পশ্চিম গোলার্ধে (উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা) একক কর্তৃত্ব ও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা হবে আমেরিকার উদ্দেশ্য। এই ডকট্রিনের উল্লেখ বারংবার শোনা গেছে ট্রাম্পের বক্তৃতায়, বিশেষ করে ২০২৫-এ মাদুরো পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে। তবে এ নতুন কিছু নয়, ২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতায় আসে, মার্কিন সরকার তখন থেকেই মাদুরোকে দুর্নীতিপরায়ণ, স্বৈরাচারী শাসক আখ্যা দিয়ে এসেছে। মাদুরো আবার মার্কিনীদের ষড়যন্ত্রকারী এবং সাম্রাজ্যবাদী বলে আক্রমণ শানিয়েছে। যদিও শ্যাভেজের সময় থেকেই উভয়ের মধ্যে রাজনৈতিক এবং মতাদর্শগত টানাপোড়েন চলে আসছে। একসময় আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এমন পর্যায় গিয়েছিল, যে, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি গভীর সংকটের মুখে পরে যায়, পরিস্থিতি এমন জটিল হয়ে ওঠে যে, কয়েকশো মানুষ দেশ ছেড়ে পালতে বাধ্য হয়েছিল।

মার্কিন সেনার দ্বারা অপহৃত নিকোলাস মাদুরো

তবে শ্যাভেজ এবং মাদুরো কেউ-ই হার মানার পাত্র নয়, তাঁরা তাঁদের তেল এবং খনিজ সম্পদের ওপর ভরসা রেখে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। চিন এবং রাশিয়া হয়ে ওঠে মূল খরিদ্দার। প্রথমে ভারত তেল আমদানি শুরু করলেও, ২০১৯ সালের পর থেকে নয়াদিল্লি এই আমদানি কমিয়ে নিয়ে আসে। মূল কারণ অবশ্যই ছিল, আমেরিকার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে না পারা এবং ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল কিনে পরিশোধন করার বিপুল খরচ ভারতের জন্য লাভজনক হচ্ছিল না। তবে, চিনের সঙ্গে ব্যবসা করে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি গতি পেতে শুরু করে; অন্যদিকে চিন আমেরিকা-বিরোধী, তাই ভেনেজুয়েলার বন্ধু— এই আখ্যান একদম মিলে যায়। বন্ধুত্ব শুরু হয় ইরান, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও। লাতিন আমেরিকায় চিনের ক্ষমতাবৃদ্ধি চিন্তার ভাঁজ ফেলে মার্কিন প্রশাসনের মাথায়।

২০২০ সাল থেকেই আমেরিকা ক্রমাগত মাদুরোকে সন্ত্রাসবাদী বলে আক্রমণ শানাতে শুরু করে। আমেরিকার ঘনিষ্ঠ সংবাদ এবং সমাজমাধ্যম মাদুরোর সঙ্গে মাদক-মাফিয়ার যোগের কথা সামনে আনে, এমনকী, তাঁকে ‘কারটেল ডে লস সোলেস’-এর (Cartel De Los Soles) নেতা বলে প্রচার শুরু করে। তাদের মতে, এই সংগঠনের কাজ হল আমেরিকার যুবসমাজের মধ্যে কোকেনের নেশা ছড়িয়ে, আমেরিকা-কে ধ্বংস করে দেওয়া। ট্রাম্প বারবার তাঁর ভাষণে এই বিষয়টি আওড়াতে থাকেন। ২০২৪-এর নির্বাচনে সিআইএ-র ব্যাপক চেষ্টার পরেও মাদুরো যখন ২০২৫-এ ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তখনই হয়তো আমেরিকা তাঁকে বলপূর্বক অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আমেরিকা বলতে শুরু করে যে, দুর্নীতির মাধ্যমে মাদুরো ক্ষমতায় এসেছেন, এবং একাধিক আমেরিকার বন্ধু দেশ তাঁকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মানতে অস্বীকার করে। তার বিরোধী মাচাদো-কে শান্তি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়, যদিও ট্রাম্প স্বয়ং ওই সম্মানের দাবি করে বসেছিলেন। আসলে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে মাচাদোর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যদি কখনও সময় আসে তাঁকে যেন ক্যারাকাসের মসনদে নির্দ্বিধায় বসানো যায়।

২০২৫-এ ট্রাম্প নতুন অর্থনৈতিক নিযেধাজ্ঞা আরোপ করে, যাতে অর্থনীতি একদম দুরমুশ করে দেওয়া যায়। ঘোষণা করা হয় যে, মাদুরো সন্ত্রাসবাদী, তাই তাঁর খবর দিতে পারলে ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলার পুরস্কার পাওয়া যাবে। মার্কিন নৌ-সেনা ক্রমাগত হামলা শুরু করে ভেনেজুয়েলার জাহাজের ওপর এবং ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র খবর অনুযায়ী ২ জানুয়ারি, ২০২৬ অবধি প্রায় ৩৩টি ভেনেজুয়েলার জাহাজ ধ্বংস করেছে আমেরিকা। এবং অবশেষে অপহরণ। এই ক্রোনোলজি বুঝতে কারও আর অসুবিধা নেই।

ভেনেজুয়েলার সরকার তাঁদের বক্তব্যে জানিয়েছে যে, ইজরায়েলও এই অপহরণের সাথে যুক্ত রয়েছে। যদিও এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু লেই, কারণ আমেরিকা ইজরায়েলকে সঙ্গে নিয়েই এইসব কুকীর্তি করে থাকে। যারা আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্ক নিয়ে চর্চা করেন, তাঁরা জানেন যে, সিআইএ-র অনেক গোপন অভিযানের দায়িত্বে থাকে ইজরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’। মাদুরো ছিল ইরানের বন্ধু, তা যে নেতানিয়াহু-র একদমই হজম হবে না, তা স্বাভাবিক, তাঁর ওপর ট্রাম্পের সমর্থনেই তেল আভিভের মসনদে এখনও বসে রয়েছেন নেতানিয়াহু, তাই তাঁরও তো দায় বর্তায়।

আগেই বলেছি, যে, ইতিহাস ফিরে দেখলে বোঝা যাবে যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা বারবার গ্লোবাল সাউথের সেই সমস্ত নেতা-নেত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে অথবা নিকেশ করেছে, যারা তাঁদের সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছে। কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, কামাল নাসিরের থেকে সুয়েজ খাল পুনর্দখল করার জন্য ইজরায়েলকে পাঠায় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। যুদ্ধ শুরু হতেই শান্তির বাণী বিতরণ করার অজুহাতে সুয়েজ দখল করতে যায়, তবে শেষমেশ তা সার্থক হয় না। ১৯৬১ সালে ফিদেল কাস্ত্রো সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে সিআইএ ভাড়াটে বাহিনী পাঠায়, তবে তা প্রতিহত করা হয়। তথ্য অনুসন্ধান করে জানা গিয়েছে যে, ১৯৬০-’৬৫-র মধ্যে প্রায় আটবার ফিদেল-কে হত্যা করার চেষ্টা করে সিআইএ, তবে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ২০০২-এ হুগো শ্যাভেজের সরকারকে উৎখাত করার অপচেষ্টা করে জুনিয়র বুশ-এর প্রশাসন, কিন্তু সফল হয়নি। ২০০৬-এ সাদ্দাম হুসেনকে হত্যা করা হয়, তাঁর অপরাধ, তিনি তাঁর তেলের খনি আমেরিকার হাতে সঁপে দিতে চাইনি। ২০১১-তে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় গদ্দাফি-কে, তারপর যথারীতি হত্যা। সাদ্দাম এবং গদ্দাফির বিরুদ্ধে আমেরিকা যে অভিযোগ এনেছিল, তার কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

২০১৮ সালে ওবামা সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুলা-কে জেলবন্দি করা হয়, তবুও তাঁকে রুখে দেওয়া যায়নি। এরকম ঘটনা বহু রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আঘাত লাগলেই আমেরিকা যে কোনও দেশের সার্বভৌমত্বকে পিষে ফেলতে বেশি সময় ব্যয় করে না।

তেল এবং সার্বভৌমত্বর প্রশ্ন

ইতিহাসবিদ পেরি অ্যান্ডার্সন লিখেছিলেন, ‘হতে পারে রক্ত জলের থেকে ঘন, তবে সব থেকে ঘন হল তেল’। তেলের মায়া বহু যুগ ধরে আমেরিকাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তেল খুঁজতে কখনও ছুটে গেছে ইরাক, কখনও সুদান, সিরিয়া, নাইজেরিয়া আবার কখনও লাতিন আমেরিকা, এবং ধ্বংস করে দিয়েছে তাঁদের দেশের রাজনৈতিক বাতাবরণ, মানুষের জীবন-জীবিকা। সৌদি এবং কুয়েত সরকার-কে তো আগেই পকেটস্থ করেছে, এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে মধ্য এশিয়া-র দেশগুলির দিকে। এই চাহিদার কারণেই যে মাদুরো-কে তাঁর ক্ষমতা হারাতে হল, এই নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি ভেনেজুয়েলার সব তৈলখনির দায়িত্ব নেবে, যার ফলে মার্কিন সরকারের এক পয়সাও ব্যয় হবে না দেশটি চালাতে।

এই যে খনিজ পদার্থের লোভে বারংবার এক-একটি দেশের সার্বভৌমত্বের জলাঞ্জলি যাচ্ছে, সেই নিয়ে কতগুলি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন তুলছে? আজকে যেভাবে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাদুরো-কে অপহরণ করা হল, তা শুধু আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী নয়, এটি হল জাতিসংঘের সনদের ওপর সজোর কষাঘাত। খুল্লমখুল্লা বুঝিয়ে দেওয়া যে, ক্ষমতাশালীদের আইনের তোয়াক্কা করার দরকার নেই, সব আইন শুধু রয়েছে ক্ষমতাহীনদের জন্য। আমেরিকার এই ব্যবহার ভয়ংকর উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে, যে কোনো ক্ষমতাশালী দেশ চাইলে তুলনামূলকভাবে হীনবল দেশের রাষ্ট্রনায়ককে অপহরণ অথবা খতম করে দিতে পারে। এই পথকে পাথেয় করেই তো ইজরায়েল প্যালেস্টাইনে হত্যালীলা চালিয়ে যাচ্ছে। কে বলতে পারে, আগামিদিনে আমেরিকা হয়তো গ্রিনল্যান্ড অথবা কিউবা হামলা করে বসল। চিন হামলা করলো তাইওয়ানের ওপর অথবা অরুণাচল দখল করার সম্পূর্ণ প্রচেষ্টা শুরু করল। যে ভয়ংকর যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হবে, তাঁর জন্য কে বা কারা দায়ী থাকবে? রাষ্ট্রসংঘ কি আদৌ কিছু ভাবছে? গ্লোবাল সাউথের ছোট দেশগুলি বরাবর বলে আসছে যে, নিউক্লিয়ার বোমা ছাড়া তাঁদের টিকে থাকা অসম্ভব, অর্থাৎ, শক্তি-সাম্য তৈরি করতে গেলে নিউক্লিয়ার বোমার প্রয়োজন রয়েছে। এতে আমেরিকার লাভ হবে বটে, তবে দেশে দেশে মারণাস্ত্র তৈরি হলে তাঁর পরিণাম কী হতে পারে, আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

ইতিহাস ফিরে দেখলে বোঝা যাবে যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা বারবার গ্লোবাল সাউথের সেই সমস্ত নেতা-নেত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে অথবা নিকেশ করেছে, যারা তাঁদের সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছে। কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, কামাল নাসিরের থেকে সুয়েজ খাল পুনর্দখল করার জন্য ইজরায়েলকে পাঠায় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। যুদ্ধ শুরু হতেই শান্তির বাণী বিতরণ করার অজুহাতে সুয়েজ দখল করতে যায়, তবে শেষমেশ তা সার্থক হয় না। ১৯৬১ সালে ফিদেল কাস্ত্রো সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে সিআইএ ভাড়াটে বাহিনী পাঠায়, তবে তা প্রতিহত করা হয়।

চিন-কে নিয়ে দু-চার কথা

আমেরিকার চাপ থেকে বাঁচতে গিয়ে ভেনেজুয়েলা চিনের হাত ধরেছিল। অপহরণের একদিন আগে মাদুরো চিনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। যতদূর জানা যায় যে, রাষ্ট্রদূত তাঁকে সবরকম সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছিল। পরেরদিন মাদুরো বন্দি। তাহলে সেই আশ্বাসে কী লাভ হল? রাজনীতির ময়দানে ‘অ্যাসেট’ (এই শব্দটির বাংলা করলে, গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে)-এর পাশে না দাঁড়ালে গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। ইরানের পাশেও চিন সেভাবে দাঁড়ায়নি, যখন আমেরিকা আর ইজরায়েল বোমা বর্ষণ করছিল। শুধু মৌখিক সান্ত্বনা এবং অনুদান হয়তো যথেষ্ট নয় গ্রহণযোগ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য। ঠিক না কি ভুল সিদ্ধান্ত তা সময় বলবে, তবে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা অ্যাসেটের কদর করে। এই ছোট ছোট দেশগুলির এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে চিন-এর সঙ্গে সম্পর্ক সমালোচনামূলকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।

বিখ্যাত লেখক মিলন কুন্ডেরার বক্তব্য দিয়ে শেষ করি যে ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম হল, স্মৃতির সংগ্রাম’ অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদীরা যতই ভুল বোঝাক, সভ্যিকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন আমরা যেন সলে রাখি যে মাদুরো সহ গ্লোবাল সাউথের একাধিক রাষ্ট্রনায়কেরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামনে মাথা নত করেনি। এবং যদি সাজাই দিতে হয়, সেটা দেওয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র তাঁদের দেশের মানুষের রয়েছে, কোনো আঙ্কেল ম্যাম-এর নয়।।