দৃশ্যের ভাষা

বিদেশি নাটক বাংলা ভাষায় মঞ্চস্থ করার সময় আমরা দু’রকম পদ্ধতি দেখতে পাই সচরাচর। একটি হল, বিদেশি নাটকের বঙ্গীকরণ, অর্থাৎ বিদেশি কোনও একটি নাটককে বাংলার প্রেক্ষিতে ভাবা। আর দ্বিতীয়টি, সরাসরি বঙ্গানুবাদ। ‘কোরিওলেনাস’, ‘গন্তব্য’ (নর্মান বেথুনের জীবন অবলম্বনে), ‘মেফিস্টো’, ‘রাজা লিয়র’— আমার নির্দেশিত এই পূর্ণাঙ্গ নাটকগুলি সবক’টিই কিন্তু অনুবাদ। আবার আধুনিক জার্মান নাট্যকার মরিস ভন মায়ানবুর্গের ‘ফয়েরগিশিস্ট’ বা ‘ফায়ারফেস’-কে বাংলার প্রেক্ষিতে লিখেছিলেন ব্রাত্য বসু। ‘আগুনমুখো’ নামে। সেই নাটক আমি করেছি। আবার ‘যারা আগুন লাগায়’ ম্যাক্স ফ্রিশের নাটকের সরাসরি অনুবাদ. অনুবাদ করেছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। আবার সম্প্রতি করেছি ‘ভানু’, যা চেখভের ‘আঙ্কল ভানিয়া’ থেকে ‘অ্যাডপ্ট’ করা। ২০১০ সালে ‘রাজা লিয়র’ করলাম, যা অনুবাদ।

যে-ক’টা অনূদিত নাটক করেছি, বা যে-ক’টা অ্যাডপ্টেশন করেছি— ভাষার নানারকম বদল ঘটেছে। যেমন ধরা যাক, ‘কোরিওলেনাস’ করেছি আমি ১৯৯১ সালে। সেই সময় ভাষার গত যেমন ছিল, আমাদের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক যেমন ছিল, ২০১০ সালে এসে তো তা বদলে গিয়েছে। ফলে, শেক্সপিয়রের ‘কিং লিয়র’ যখন অনুবাদ করেছি, তখন সেই বদলে যাওয়া ভাষার সঙ্গে সমঝোতা করেই তা করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার বদলের অনুষঙ্গ তো অনুবাদের মধ্যে আসবেই। কিন্তু শেক্সপিয়র অনুবাদ করার সময় ভয়ংকর কোনও আধুনিকীকরণও কিন্তু আমরা করছি না। শেক্সপিয়র এখন ইউরোপেও যাঁরা করছেন, তাঁরা কিন্তু ভাষার প্রায়োগিক দিকটিতে অনেকগুলি বদল এনে ফেলেছেন। আমরা যখন লিয়র অনুবাদ করতে বসি, আমি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও দেবাশিস মজুমদার, তখন আমাদের মাথায় রাখতে হয়েছে দর্শকের কান কীসে অভ্যস্ত, কীসে নয়, ভাবতে হয়েছে ভাষার সঙ্গে তাদের সংযোগ কী। ভাষার স্থাপত্য, যা শেক্সপিয়রে রয়েছে, তাকে অক্ষুণ্ণ রেখে, আবার খুব ‘আর্কেইক’ বা প্রাচীন বাংলার আদল না রেখে আমাদের সংলাপ ভাবতে হয়েছিল। সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে অনুবাদকে কিছুটা বদলে অভিনেতার ভাষা তৈরি করেছিলাম। একথাও ঠিক, শেক্সপিয়রীয় ভাষার যে মাধুর্য, সেই ভাষার যে গড়ন, তার সঙ্গেই কিন্তু তার নাট্যবয়ান জড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন: কলকাতার ভাষার মধ্যেও কি আঞ্চলিকতা নেই? লিখছেন অভীক মজুমদার…

‘ভানু’ নাটকের একটি দৃশ্য

আবার ‘ভানু’ বঙ্গীকরণ হলেও, তাকে আমরা চেখভীয় বয়ান থেকে বিচ্যুত করিনি। ‘আগুনমুখো’-র সময় ব্রাত্যও মায়ানবুর্গের কাঠামো কোথাও ভাঙেনি। নবারুণদা যেমন ‘দ্য ফায়ার রেজার্স’ বা ‘বাইডেরম্যান উন্ড ডাই ব্র্যান্ডস্টিফটার্স’ অনুবাদ করলেন ‘যারা আগুন লাগায়’ নামে, অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ সেই অনুবাদ। সেই অনুবাদ নবারুণদার সঙ্গে কথা বলে হয়তো কিছুটা সময়োপযোগী করে তোলা হয়েছে। একটা জিনিস সবসময়েই মাথায় রাখতে হয়েছে, নাট্যকারের অভিপ্রায় যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। ভাবতে হয়েছে, ভাষা যেন কোথাও আরোপিত না মনে হয়।

শৈশব-কৈশোর থেকে ‘নান্দীকার’ উৎসবে নাটক দেখেই বড় হওয়া। তখন তো কোনও ‘সাবটাইটেল’ পাইনি। সেই উৎসবে ‘ঘাসিরাম কোতোয়াল’ দেখেছি, আবার রীতিমতো ‘ভার্বোজ’ বা সংলাপনির্ভর নাটকও দেখেছি। মহেশ এলকুঞ্চোয়ারের ‘ওয়ারা চিরেবন্দি’ যেমন দেখেছি, তেমনই দক্ষিণের বিজয়শ্রীর নাটকও দেখেছি, যা কিছুটা লোকায়ত আঙ্গিকের সঙ্গে জড়িত। সেগুলো আমরা আস্বাদন করেছি। হয়তো অনেককিছুই না-বোঝা থেকে গেছে। কিন্তু নাট্যভাষের সঙ্গে সংলাপে অসুবিধে হয়নি, তার একটা নিজস্ব জোর আছে।

‘ওয়ারা চিরেবন্দি’ ছিল মারাঠি ভাষার নাটক। বিজয় মেহতার নাটক! বিজয় মেহতা নিজে করেছিলেন এই নাটকের বৃদ্ধা মায়ের চরিত্র। নাট্যের অভিঘাত কতটা জরুরি, সেই নাটক দেখতে গিয়ে বুঝেছিলাম। একটা পুরনো বাড়ি ভেঙে পড়ার আখ্যান। সেখানে ওই বৃদ্ধা প্রায় নির্বাক। তিনি নানা জায়গায় নানা সময় বসছেন। ভাষা হয়তো বুঝতে পারছি না, কিন্তু দৃশ্যভাবনাই কল্পনাশক্তি উসকে দিচ্ছে। ভাষা, নাটকের ভাষার জোর কিন্তু সেখানেই। কল্পনাকে সে আরও সজাগ করবে।

শৈশব-কৈশোর থেকে ‘নান্দীকার’ উৎসবে নাটক দেখেই বড় হওয়া। তখন তো কোনও ‘সাবটাইটেল’ পাইনি। সেই উৎসবে ‘ঘাসিরাম কোতোয়াল’ দেখেছি, আবার রীতিমতো ‘ভার্বোজ’ বা সংলাপনির্ভর নাটকও দেখেছি। মহেশ এলকুঞ্চোয়ারের ‘ওয়ারা চিরেবন্দি’ যেমন দেখেছি, তেমনই দক্ষিণের বিজয়শ্রীর নাটকও দেখেছি, যা কিছুটা লোকায়ত আঙ্গিকের সঙ্গে জড়িত। সেগুলো আমরা আস্বাদন করেছি। হয়তো অনেককিছুই না-বোঝা থেকে গেছে।

নাটকের সেই অভিঘাত থাকলে সহজেই এই জোরের জায়গাটা তৈরি হয়। পৃথিবীজুড়েই এই অনুভূতি এক। নিউ ইয়র্কে বসে জাপানি ভাষার নাটক যখন দেখেছি, বা সুইডিশ নাটক দেখছি, বা জার্মানিতে গিয়ে জার্মান ভাষায় নাটক দেখছি— তখন তো ভাষা আমাকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করছে না, নাট্যভাবনা আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রযোজনার জোর সেখানেই।

রতন থিয়াম যখন মহাভারতের আখ্যানকে সংস্কৃত থেকে মণিপুরিতে নিয়ে আসছেন, ‘ঊরুভঙ্গম’ যখন করছেন, বা ‘চক্রব্যূহ’— তখন আমাদের জানা মহাকাব্যের আখ্যান ভাষার গন্ডি টপকে আমাদের কাছে আসছে দৃশ্যভাষেরই মাধ্যমে। মলিয়ের যখন করছেন হাবিব তনবির, ভাষার সীমা বিলীন হয়ে যাচ্ছে দৃশ্যভাষে।

নাট্যকারের সঙ্গে ভাষার যোগাযোগ গভীর। কিন্তু দৃশ্যভাষ স্বতন্ত্র।