নামে আসে-যায়
সিরিয়া-লেবানন তখন ছিন্নবিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে, সমাজমাধ্যম তখন উত্তাল ‘পোকেমন গো’ নিয়ে। যুদ্ধ আর গেম ক্রমে এক বিন্দুতে এসে মিলে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময়েই একটি ‘ইমেজ’ ভেসে উঠল। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় এক শিশু বসে রয়েছে, তার কোলে ওই ‘পোকেমন গো’-র পুতুলটি। আর চারপাশে ন্যাটোর বিমান থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া বোমার চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপেরা। ‘পোকেমন গো’-র উত্তেজনায় ক্লান্ত জনমন কিছুক্ষণের জন্য শরণাপন্ন হয়ে পড়ল ওই বানিয়ে তোলা দৃশ্যের। দৃশ্য, সে যুদ্ধ হোক বা রিল, একরকমের নিরাপদ আরামের মধ্যে থাকতে দেয় মস্তিষ্ককে। তাই সহজ-কঠিন দৃশ্যের কাছেই, বর্তমানের প্রতি যাবতীয় দায়বদ্ধতা জমা রাখা যায়।
‘পোকেমন গো’ মানুষ ভুলে গেছে, ভুলে গেছে ওই কাব্যিক দুঃখবিলাসী ছবিও। দৃশ্য ঢেকে দিয়েছে দৃশ্যকে। ভাইরাল এসে চাপা দিয়েছে ভাইরালকে। সেই কবে বদ্রিলার্ড বলে গেছেন, আমাদের আর কোনও ‘অ্যাবসোলিউট ইভেন্ট’ নেই। সেই বার্লিন দেওয়াল ভাঙার পর থেকে যা ঘটে চলেছে, সবই নন ইভেন্ট। তাই সিরিয়া-লেবাননও হয়তো ধীরে-ধীরে নন ইভেন্ট হয়ে গেছে। সিরিয়ার শিশুদের ক্ষত ইতিহাসে দগদগে হয়ে রয়েছে কি না, তা পৃথিবীর আরেক প্রান্তে বসে জানা-বোঝা মুশকিল, এই বিশ্বায়িত যোগাযোগের যুগেও। কিন্তু দৃশ্য থেকে চোখ সরলেই কি স্মৃতির বিলোপ ঘটবে? ছিল নেই মাত্র এই-এর খেলায় মাততে মাততে আমরা কিছু মনে রাখি না যেমন, তেমন জানতেও কি পারি আদৌ? দৃশ্যের আড়ালে থাকা সত্যি, সত্যের শাঁসে লুকনো তথ্য, তথ্যের মধ্যে থাকা বিশ্বাস— কোনওকিছুর কাছেই আমরা আদতে আর পৌঁছই না।
কিন্তু সকলে দৃশ্যতেই দায় সারেন না। কার্ডিনাল মাতেও জুপ্পি, ইতালিয় বিশপস কনফারেন্সের সভাপতি, যেমনটা করেননি। বিগত ১৪ আগস্ট ‘অ্যাসাম্পশন অফ মেরি’ নামে একটি ভোজ-উৎসবের ঠিক আগে, কার্ডিনাল জুপ্পি সেইসব হাজার-হাজার শিশুর নাম উচ্চারণ করে-করে পড়েছেন, ৭ অক্টোবর, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের অগাস্ট মাস অবধি যে শিশুরা নিহত হয়েছেন হামাস-ইজরায়েল দ্বন্দ্বে। ১৬ জন ইজরায়েলি শিশু, এবং ১২,২১১ জন প্যালেস্তিনীয় শিশুর নাম এবং বয়স সেদিন উল্লেখ করেছেন কার্ডিনাল-সহ বাকিরা।
একজনের মৃত্যু ট্র্যাজেডি, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু কেবলমাত্র পরিসংখ্যান। বলেছিলেন জোসেফ স্তালিন। কিন্তু এই বারোহাজারের বেশি শিশুর মৃত্যুকে পরিসংখ্যানে আটকে থাকতে দেননি মাতেও জুপ্পি-রা। শান্তির পক্ষে, যুদ্ধবিরতির পক্ষে লড়াই কোনওদিন সফল হবে কি না, কেউ জানে না। কিন্তু এই উচ্চারণ সভ্যতার ইতিহাসের, বিক্ষত সময়ের সঙ্গে মানুষের জুড়ে থাকার সামান্যতম অভিজ্ঞান।
কোভিড অতিমারী প্রথম থেকে তৃতীয় বিশ্ব, কাউকেই রেহাই দেয়নি। সেই অতিমারী পর্বেই প্রথমবার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জর্জ ফ্লয়েডের প্রশাসনিক হত্যা সেই পতনের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে ট্রাম্পের সমর্থনের ওই দুর্ভেদ্য দুর্গে চিড় ধরিয়েছিল একটি সাংবাদিকীয় চাল। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রথম পাতা সেদিন ঠিক করে পড়া যাচ্ছিল না। তারিখটা ২০২০ সালের ২৪ মে। সেদিন মার্কিন ওই সংবাদপত্রর প্রথম পাতা জুড়ে খুদে-খুদে অক্ষরে নথিভুক্ত হয়েছিল এক লক্ষর কাছাকাছি নাগরিকের নাম ও ঠিকানা। শিরোনামে লেখা ছিল, ‘অ্যান ইনক্যালকুলেবল লস’। উপশিরোনামে ছিল, ‘দে ওয়্যার নট সিম্পলি নেমস অন আ লিস্ট, দে ওয়্যার আস।’
এতগুলি নাম পড়তে কার্ডিনালের সময় লেগেছে সাতটি ঘণ্টা। দু-বছরের জমা লাশের প্রতি এই নিরলস সাতটি ঘণ্টা তিনি খরচ করলেন। একঝলকের দৃশ্যের চেয়ে কঠিন তো বটেই!
সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে এই ঘটনা মাইলফলক হয়ে ছিল যেমন, তেমনই এই সহমর্মিতাটুকুই একুশ শতকের এই তথ্যভারাক্রান্ত, ভাইরালজর্জর সময়ে আমাদের মনে রাখার প্রত্যয় দেয়, ভুলে যেতে দেয় না। ওই এক লাখ নাম, বা কার্ডিনালের উচ্চারণ করা ওই বারোহাজার নাম এরপরেও পৃথিবীর মুখস্থবিদ্যার উপকরণ হবে না। কিন্তু এই উল্লেখটুকু, ওই প্রায় অসম্ভবপাঠ্য পাতাটুকু শেখায়, ইতিহাসের কাছে এখনও আমাদের কিছু দাদন দেওয়া বাকি। কেবল খবরটুকু হজম করে, দৃশ্যের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আমাদের দায় মেটে না। কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনওভাবে প্রতিটি মৃত নামের কাছে আমাদের নত হতেই হয়। আর কোনও উপায় না থাকলে আমরা অন্তত উচ্চারণটা করতে পারি, উচ্চারণ করার আগে, উচ্চারণ করার জন্য জেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারি যুদ্ধে মৃতদের নাম। ইমেজ এবং সংখ্যা সহজে পাওয়া যায়, নিউ ইয়র্ক টাইমস যা করেছিল, কার্ডিনাল যা করলেন, তার জন্য খবর জানার চেয়েও একটু বেশি বোঝা ঘাড়ে নিতে হয়। তেমন বোঝা আমরা কি আদৌ নিতে শিখেছি? খবর, সংখ্যা আসবে, যাবে। আমাদের কি কিছুই এসে যায় না তাতে?
এতগুলি নাম পড়তে কার্ডিনালের সময় লেগেছে সাতটি ঘণ্টা। দু-বছরের জমা লাশের প্রতি এই নিরলস সাতটি ঘণ্টা তিনি খরচ করলেন। একঝলকের দৃশ্যের চেয়ে কঠিন তো বটেই!
মৃত্যু কেবল সংখ্যাও নয়, নামও নয়, সে অতিমারী হোক বা যুদ্ধের নামে গণহত্যা, এটুকু এই সময় দাঁড়িয়ে আবারও বিশ্বাস করতে শেখালেন কার্ডিনাল মাতেও জুপ্পি।