রাগের ব্যাকরণ
পাঁচ বছরের এক শিশু। তার অপরাধ— না বলে অন্যের গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে নেওয়া। শাস্তি— তাকে গাছে বেঁধে মারা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে হিমাচল প্রদেশে। অন্য প্রান্তে, একুশ বছরের এক যুবক। তার অপরাধ— ক্রিকেট ম্যাচের রান-আউট নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা কাটাকাটি থেকে মারামারি এবং সেই মারামারি গিয়ে পৌঁছয় ছুরি বসিয়ে দেওয়াতে। শাস্তি— মৃত্যু। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে বিশাখাপত্তনমে। এই দুটো ঘটনা ঘটেছে ভারতের দু-প্রান্তে। দুটো দুরকম ঘটনা। কিন্তু খুব আলাদা কি? এগুলো এই অস্থির, দিশেহারা সময়ের অভিজ্ঞান। এই বর্তমান সময়, যেখানে রাগ কেবল আবেগ নয়, এক সামাজিক ভাষা।
অবশ্য আমরা যদি পৃথিবীর মানচিত্রে একবার চোখ বুলিয়ে নিই, তাহলে বুঝতে পারব এই ভাষা কেবল আমাদের একার নয়। আমেরিকায় ‘রোড রেজ’ এখন প্রায় স্বীকৃত এক শব্দবন্ধ। ছোট্ট গাড়ি ঠেকার ঘটনাও গুলির লড়াইয়ে গড়িয়েছে বহুবার। ফ্রান্সে পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; রাস্তায় আগুন, ভাঙচুর। ব্রিটেনে ফুটবল ম্যাচ হারলে সমর্থকদের ভয়ানক হিংস্রতা। জাপানে, যেখানে সামাজিক সংযম দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি, সেখানে ‘কারোশি’— অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যু— নিঃশব্দ রাগের এক চরম রূপ। অর্থাৎ, রাগের প্রকাশ আলাদা, কিন্তু উৎস প্রায় একই— চাপ, অপূর্ণতা, এবং অদৃশ্য ক্লান্তি।
সমাজবিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই একটি কথা বলে আসছেন— সমাজে যখন প্রত্যাশা দ্রুত বাড়ে, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণের পথ সংকুচিত হয়, তখন তৈরি হয় ‘ফ্রাসট্রেশন অ্যাগ্রেশন লুপ’। অর্থাৎ, অপূর্ণতা জমে রাগে, আর সেই রাগ বেরয় হিংসা হয়ে। এই তত্ত্ব বইয়ের পাতায় ছিল। এখন তা প্রকাশ্যে মস্তানি করছে।
সত্যজিৎ রায়কেও আজ মাপতে হবে জাতীয়তাবাদের দাঁড়িপাল্লায়?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২৩
আসলে, এখনকার মানুষের মধ্যে এক গভীর মানসিক ফাঁক লুকিয়ে আছে— বাইরের পৃথিবী আর ভেতরের অভিজ্ঞতার মধ্যে ফাঁক। সহজ করে বললে— আমরা এমন এক সময়ে বেঁচে আছি যেখানে ‘সম্ভব’ শব্দটা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, কিন্তু ‘পারি’ ব্যাপারটা সবচেয়ে কম অনুভূত হয়। মহান সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সামনে প্রতিদিন এমন এক পৃথিবী তুলে ধরে, যেখানে সবাই সফল, সুন্দর, প্রতিষ্ঠিত। এই প্রদর্শনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে যখন মাপা হয়, তখন যে ফাঁকটা তৈরি হয়, সেটাই ক্ষোভের জন্ম দেয়। আবার সমাজ আমাদের শেখায়— ব্যর্থতা ব্যক্তিগত।
কিন্তু রাগ? সেটি প্রকাশ করা যায় অন্যের ওপর।
এখানেই আসে রাগের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। কিছু রাগকে সমাজ মেনে নেয়, এমনকী, উৎসাহ দেয়। যেমন রাজনৈতিক রাগ, জাতীয়তাবাদী রাগ, ‘ন্যায়বিচারের’ নামে রাগ। আবার কিছু রাগকে সমাজ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে চিহ্নিত করলেও তেমন শাস্তি বা উপশম কোনওটাই হয় না। যেমন একটি শিশুর ওপর অত্যাচার, বা তুচ্ছ কারণে খুন। সুতরাং বিছিন্ন ঘটনার তকমায় দুই রকমের রাগই বহাল তবিয়তে বিরাজমান। আর সেই কারণেই বোধহয়, এই দুইয়ের মাঝের সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
হিমাচলের ঘটনায় প্রাক্তন সেনার রাগ ব্যক্তিগত। বিশাখাপত্তনমে ক্রিকেট মাঠের রাগ তাৎক্ষণিক। কিন্তু দুটোর ভেতরেই আছে একই অভ্যন্তরীণ কাঠামো— নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি, এবং সেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা। এই চেষ্টার সবচেয়ে সহজ পথ— অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা।
একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, রাগ সবসময় নিচের দিকে নামে। যার ক্ষমতা কম, যার প্রতিরোধ কম, যার সামাজিক অবস্থান দুর্বল— রাগ তার ওপরেই প্রয়োগ হয়। এই কারণেই শিশুরা নিরাপদ নয়। এই কারণেই বন্ধুত্ব মুহূর্তে শত্রুতায় বদলে যায়।
একসময় রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সমাজে নানা অনুশীলন ছিল— ধর্মীয় আচার, পারিবারিক সংযম, সামাজিক লজ্জা। এখন সেই জায়গাগুলি এখন অনেকটাই ফাঁকা। তার জায়গায় এসেছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি। কেউ কিছু বলল— সঙ্গে সঙ্গে উত্তর। কেউ বিরোধিতা করল— সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ। আমার নিজের কোনও ব্যক্তিগত কারণে রাগ হল, আর আমি সেটা উগরে দিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। এর ফলে ধৈর্য শব্দটা এখন অভিধান থেকে প্রায় বাদ পড়তে চলেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হল, আমরা রাগকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মানতে শুরু করেছি। খবর পড়ে আমরা অবাক হই না, বরং বলি— এ তো হতেই পারে। বা, ‘কী যে হচ্ছে আজকাল সব’, এটাই আমাদের সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া। এই ‘হতেই পারে’—এটাই আসলে সমাজের নীরব অনুমোদন।
তাহলে কি রাগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা উচিত? না। রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। অন্যায় দেখলে রাগ হবে, প্রতিবাদও হবে। সমস্যা রাগে নয়, সমস্যাটি তার দিকনির্দেশে। যে রাগ অন্যায় ভাঙতে সাহায্য করে, তা সামাজিক শক্তি। যে রাগ দুর্বলকে আঘাত করে, তা সামাজিক ব্যর্থতা।
আজকের সংকট তাই কেবল আইন দিয়ে মাপা যাবে না। এটি এক মানসিক ও সাংস্কৃতিক সংকট। আমরা কি আমাদের রাগের উৎসকে চিনতে পারছি? না কি তাকে যুক্তির মোড়কে ঢেকে বৈধতা দিচ্ছি?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব ব্যক্তিগত হয়েই ফিরে আসে— আমি কি সত্যিই ওই মানুষটার ওপর রেগে আছি? না কি আমি আমার অপূর্ণ জীবন, আমার ব্যর্থতা, আমার ক্লান্তির ওপর রেগে আছি?
যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে দেওয়া যাবে, সেদিন হয়তো একটি শিশু পেয়ারা পেড়ে বাড়ি ফিরতে পারবে, আর একটি ক্রিকেট ম্যাচ শেষ হবে শুধুই খেলা হয়ে। তার আগে পর্যন্ত— রাগ আমাদের বহিঃপ্রকাশের অন্যতম ভাষা হয়ে থাকবে, আর আমরাই হয়ে উঠব সেই ভাষার ক্রমশ অশিক্ষিত বক্তা।




