চোখ-কান খোলা : পর্ব ২৩

নাম: খুশবু। নিবাস: যোধপুর। বয়স: ২১। দিনকয়েক আগেই সে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, ‘আমি চাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে।’ ২০২৬ সালে এসে, কেন এ-কথা ফলাও করে জানাতে হল তাকে? কোন পরিস্থিতি তাকে এই বিবৃতি দিতে বাধ্য করল? তার এই ইচ্ছের ওজন, সমাজে ঠিক কতটাই-বা গুরুত্বপূর্ণ? এমন কিছু-কিছু ঘটনা সামনে এলেই আমরা অস্বস্তিতে পড়ি, অন্তত তাৎক্ষণিকের জন্য। খুশবুর ঘটনাও ঠিক তেমনই একটা ঘটনা।

২০১৬ সালে খুশবুর বিয়ে হয় যোধপুর-নিবাসী এক ছেলের সঙ্গে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২। তার সমাজের লোকজনই তার বিয়ে দিয়ে দেয়। খুশবুর মা-বাবার কথার তেমন দাম ছিল না সমাজে। বিয়ের সময়ে সে কিছুই বুঝতে পারেনি, স্বাভাবিকভাবেই— কিন্তু কিঞ্চিৎ বড় হতে-না-হতেই বুঝতে পারে, সে বিবাহিত। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন তাকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তার কথায়, ‘আমি স্কুলে যেতাম, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারতাম না।’ অর্থাৎ, যে-দেশে ‘অধিকার’-প্রসঙ্গে আমরা নিয়ত সরব, সেই দেশে এখনও খুশবুরা বর্তমান— যাদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি, বিবাহের সম্মতিটুকুও নেওয়া হয় না। 

শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে স্বামীর সঙ্গে থাকার জন্য চাপ দিতে শুরু করলে, সে অ-রাজি হয়। রাজি হওয়ার কথা ছিল কি? সম্পূর্ণ অজানা পরিবেশে, অচেনা পুরুষের সঙ্গে সহবাস— হাসতে-হাসতে মেনে নেওয়া সম্ভব? খুশবু বিয়ে বাতিলের আবেদন জানায়। তার মনে হতে শুরু করে যে, সে এই বিয়েতে থাকতে চায় না। প্রাথমিকভাবে পরিবারকে জানানোর পর, তাকে থানার দ্বারস্থ হতে হয়। এবং সেখানেই আলাপ হয়, সারথি ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ও মনোবিজ্ঞানীড. কৃতি ভারতী-র সঙ্গে। তিনি-ই খুশবুর মামলা আদালতে দায়ের করেন। খুশবুর কথায়, ড. ভারতী তাকে জীবনের সবচেয়ে বড় সুখটা দিয়েছেন। তাঁর জন্যই খুশবু এখন দশম শ্রেণি, তাঁর জন্যই সে ‘ভাল কিছু’ করতে চায়।

মৃত্যু কি কেবলই দু-দিনের ঝোঁক?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২২

খুশবুর সঙ্গে ড. কৃতি ভারতী

বিয়ে বাতিলের আবেদন করার প্রায় ১৮ মাস পরে রায় আসে। বিচারক বরুণ তলওয়ার খুশবুর বিয়ে বাতিল করার সময়ে বলেন, ‘শিশুবিবাহ শিশুদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ— দুটোই ধ্বংস করে দেয়, তাই সমাজকে এই প্রথা বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ কিন্তু কে নেবে এই কঠোর পদক্ষেপ? কৃতি ভারতীর সঙ্গে দেখা না হলে, সে কি কোনওদিনও এই জাঁতাকল থেকে মুক্তি পেতে পারত?

খুশবুদের যে-সমাজ, সেখানে ‘মৌসর’ বা ‘নুক্তা’ নামক এক প্রথা আজও চালু রয়েছে, যেখানে পরিবারের কোনও মাতামহ বা পিতামহ মারা গেলে তাদের নাতি-নাতনিদের একসঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় এবং ‘মৃত্যুভোজ’ (মৃত্যু-পরবর্তী ভোজ) আয়োজন করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এতে মৃত ব্যক্তির আত্মা শান্তি পায়। এবং কোনও পরিবার যদি এতে রাজি না হয়, তাহলে তাদের জাতি বা সমাজ থেকে একঘরে করে দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ-ই যেখানে নিয়ম, সেখানে ড. ভারতীর মতো মানুষকে নারী-অধিকারের স্বার্থে কী কষ্ট করে লড়াই চালাতে হয়, ভাবলে অবাক লাগে। 

খুশবুর মতো আরও হাজার-হাজার মেয়ে, এখনও প্রতিদিন বাল্যবিবাহের শিকার হয়। যেমন রাজস্থানের খৈরতল এলাকার সরজিনা। তাদের সমাজে বছর পনেরোর মধ্যেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সরজিনারও হয়েছিল। ১১/১২ বছর তখন তার প্রায়। মনখারাপ, কান্নাকাটি পেরিয়ে বর্তমানে এক নির্লিপ্তি তাকে ঘিরে রয়েছে। কিছুটা ঔদাসীন্যও হয়তো-বা। সরজিনার মা-র বয়ান, ‘এটাই তো আমাদের রীতি। স্কুলে গিয়ে আর কী-ই-বা করত? একদিন তো বিয়ে করতেই হত, আগে করলে ক্ষতি কী!’ অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে, বহু ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকেও এ-ধরনের মনোভাব উঠে আসছে। রক্ষণশীল পরিবারের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে ‘প্রথা’, ইচ্ছা-অনিচ্ছা নয়। আবার অনেক সময়ে পরিবার প্রথমে পাশে দাঁড়ালেও পরে পিছিয়ে আসে। বাস্তবের ‘খাপ পঞ্চায়েত’ বাধা হয়ে দাঁড়ায় শিশুবিবাহ নির্মূলের ক্ষেত্রে।

কুর্নিশ জানাতেই হয় ড. কৃতি ভারতী-কে, যিনি এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তাঁর নির্ভীক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ছেলেবেলার অসহায়তা কী, তা ড. ভারতী খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর দশ বছর বয়সে এক আত্মীয়ের দেওয়া বিষে তিনি একবছর শয্যাশায়ী ছিলেন। সেই বন্দিদশার অনুভূতি, তিনি চান না অন্যদের জীবনে থাকুক। সবাইকে শোনাতে চান, শিকল ভাঙার গান। তাঁর এই লড়াই, তাঁর হারানো শৈশবের প্রতি একরকম প্রায়শ্চিত্ত। এক বছরের লক্ষ্মী সারগড়া-র সঙ্গে তিন বছরের রাকেশের বিয়ে হওয়ার ১৮ বছর পর যখন তা বাতিল হয় ড. ভারতীর কর্মতৎপরতায়, সারা বিশ্বে সাড়া পড়ে যায়। শিশুবিবাহ আইনিভাবে বাতিল হওয়ারপ্রথমদিকের ঘটনা এটি। বেশিদিন আগের কথা নয় অবশ্য— সময়কাল, ২০১২ সাল।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ নিবন্ধে বাল্যবিবাহকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘অশেষ ক্লেশ ও দুরপনেয় দুর্দশা’ বলে। আশঙ্কা করে লিখেছিলেন এও, ‘এই সংসারে দাম্পত্যনিবন্ধন সুখই সর্বাপেক্ষা প্রধান সুখ। এতাদৃশ অকৃত্রিম সুখে বিড়ম্বনা ঘটিলে দম্পতির চিরকাল বিষাদে কালহরণ করিতে হয়। হায়, কী দুঃখের বিষয়!…’

১৯৯৬ সালে যেখানে ১৮ বছরের আগেই ৫৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হত, ২০২১ সালে তা কমে হয়েছে ২৩ শতাংশ। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও কিছুটা কমেছে, নিশ্চিত। তবু সমস্যা পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি? ২০২৩ সালের মে মাসে ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি শিশুবধূ এখনও ভারতে—বিশ্বের প্রতি তিনজনের একজন এই দেশেই থাকে। প্রশ্ন জাগে, ড. ভারতী যে-সংবেদনশীলতায় কাজ করে যাছেন দীর্ঘ সময় ধরে, বা যেমন ভেবেছিলেন তামিলনাড়ুর এরোডে ভেঙ্কটাপ্পা রামস্বামী, সেই সংবেদনশীলতা সমাজের নানা অংশে চারিয়ে যাচ্ছে কি? ‘প্রথা’-র ঊর্ধ্বে কি মান্যতা পাচ্ছে ব্যক্তি-বাসনা?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ নিবন্ধে বাল্যবিবাহকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘অশেষ ক্লেশ ও দুরপনেয় দুর্দশা’ বলে। আশঙ্কা করে লিখেছিলেন এও, ‘এই সংসারে দাম্পত্যনিবন্ধন সুখই সর্বাপেক্ষা প্রধান সুখ। এতাদৃশ অকৃত্রিম সুখে বিড়ম্বনা ঘটিলে দম্পতির চিরকাল বিষাদে কালহরণ করিতে হয়। হায়, কী দুঃখের বিষয়! যে পতির প্রণয়ের উপর প্রণয়িনীর সমুদায় সুখ নির্ভর করে, এবং যাহার সচ্চরিত্রে যাবজ্জীবন সুখী ও অসচ্চরিত্রে যাবজ্জীবন দুঃখী হইতে হইবেক, পরিণয়কালে তাদৃশ পরিণেতার আচার ব্যবহার ও চরিত্র বিষয়ে যদ্যপি কন্যার কোন সম্মতি প্রয়োজন না হইল, তবে সেই দম্পতির সুখের আর কি সম্ভাবনা রহিল।’

মূল কথা, ‘সম্মতি’। সম্মতি যদি না থাকে, তাহলে জোর করে কাউকে দিয়ে কিছু করিয়ে নেওয়া এক ধরনের অপরাধ। যে-অপরাধ আজও দেশের নানা কোণে সংঘটিত হয়ে চলেছে। শিশুবিবাহ তারই একটি অংশ। বিদ্যাসাগর যেরকম আশা করেছিলেন ‘শুভদিনের শুভাগমন’, ড. কৃতি ভারতী-র মতো মানুষজনকে দেখে আমরা সেই দিনটির দিকে তাকিয়ে আছি। অধীর আগ্রহে।