চোখ-কান খোলা : পর্ব ২০

সারমেয় সম্বাদ

যেহেতু হাঁস ছিল সজারু, ব্যাকরণ না-মানলে তা সহজেই হাঁসজারু হয়ে যেতে পারে। দিল্লির গালগোশিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের কীর্তিকলাপ কিছুটা তেমনই ইঙ্গিত করছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে চলছে ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’। আর সেখানেই কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে একটি সারমেয়। যে-সে সারমেয় নয় কিন্তু, এদেশি নয়, বিদেশি। নামও গালভরা, ‘ইউনিট্রি জিওটু’। আর সবচেয়ে বড় কথা, সারমেয়টি একটি ‘রোবোডগ’। অর্থাৎ, স্বয়ংক্রিয় কুকুর। এমন একটি সারমেয় তৈরি হয়েছে চিনে। কিন্তু খোদ এআই সম্মেলনে গিয়ে নয়ডার এই বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করে বসেছে, এটি তাদেরই বানানো! তাদের তরফে নাম বদলে দেওয়া হয়েছে সারমেয়টির; নাম রাখা হয়েছে ‘ওরিয়ন’। কিন্তু গালগোশিয়াসের এমন গালগল্প অবশ্য ধোপে টেকেনি। এই সম্মেলন থেকে কার্যত ঘাড়ধাক্কা খেয়েছে তারা। তাঁদের স্টলের বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিনা বাক্যব্যয়ে, এবং স্টল ফাঁকাও করে দিতে হয়েছে তাদের।

গালগোশিয়াসের কর্মকাণ্ড অবশ্য এইখানে শেষ হয়নি। একটি ‘সকার ড্রোন’-এরও প্রদর্শনী করেছে তারা। অনেকেরই দাবি, এই বিশেষ ড্রোনটি দক্ষিণ কোরিয়ার হেলসেল গ্রুপের ড্রোন, নাম স্ট্রাইকার ভিথ্রি এআরএফ। ভারতের বাজারেও এই স্পোর্টস ড্রোনটি লভ্য বলে দাবি করেছেন অনেকে। যদিও গালগোশিয়াসের বক্তব্য, তারা ওই রোবোডগটিকেও নিজেদের বানানো বলে দাবি করেনি। কিন্তু বাস্তবতা অন্যতর। জানা যাচ্ছে, আড়াই লক্ষ টাকা দিয়ে এই বিশেষ সারমেয়টি কিনে এটিকে নিজেদের সাড়ে তিনশো কোটি টাকার এআই বাস্তুতন্ত্রর অংশ বলে দাবি করেছে তারা।

এই প্রদর্শনী বেঙ্গল স্কুলের অন্যধারার সন্ধান দেয়!
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ১৯…

‘আপনার তো তাও আছে, আমার তো সব পরের দ্রব্য। টপ টু বটম!’ ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে মন্দার বোস একটি দৃশ্যে ডক্টর হাজরাকে বলে। এখন কি ‘পরের দ্রব্য’-ই তবে মোক্ষলাভের উপায়? কিন্তু পরস্মৈপদী হওয়ার শুরু তো গালগোশিয়াস দিয়ে নয়! সিঙ্গাপুরের হাইওয়ে উত্তরপ্রদেশের সরকারের বিজ্ঞাপন আলো করে বসে আছে, এই দৃষ্টান্তও তো আমরা আগে দেখেছি! আর কথায়-কথায় এরোপ্লেনের উৎসও খুঁজে পাওয়া যায় পুষ্পক রথে, এমনটাও তো আমাদের অজানা নয়! রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়র, বিবেকানন্দ থেকে শুরু করে টলি-বলির অভিনেতাদের যে কথামৃত সাজানো আছে সমাজ মাধ্যম জুড়ে, তা-ও তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় না। ‘নেতাজি বলেছেন’ বলে পাড়ার পাঁচুদারাও হয়তো কথা শুরু করত এককালে, কিন্তু সমাজমাধ্যমে এই সবই সহজে ‘পোস্ট ট্রুথ’ হয়ে যেতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর মুখচ্ছবির পাশে যদি কোনও গভীর জীবনদর্শন লেখা থাকে, আমরা তো তাও গান্ধী-উবাচ হিসেবেই বিশ্বাস করে নিতে শিখেছি এখন।

পটলডাঙার রোয়াকে বসে টেনিদার গোরা সাহেব পেটানোর কিসসা হোক, বা বনমালী নস্কর লেনে বসে ঘনাদার খোদ হিটলারের গেস্টাপোবাহিনীকে মোকাবিলা করার কাহিনি— গুলের ঐতিহ্য আছে, মৌলিকতাও আছে। কিন্তু এই সোশ্যাল মিডিয়া-মুখরতার আমলে ‘মৌলিকতা’ নিয়েই যতরকমের ঝঞ্ঝাট! ‘সংগৃহীত’ লেখা একটি ফেসবুক স্টেটাস নিয়ে যে-পরিমাণ তুলকালাম বাধে, মাঝারি মানের বা তার চেয়েও খারাপ কোনও স্থিরচিত্রর গায়ে ওয়াটারমার্ক বসিয়ে যেভাবে স্বত্ব কায়েম করতে হয়, কখনও উল্লেখ ছাড়াই যেভাবে কোনও বিদেশি চিত্রকরের ছবি কোনও বঙ্গজন নাম না দিয়েই নিজের সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে সেঁটে দেন অবলীলায়, ও প্রশংসাও কুড়িয়ে নেন খানিক— সেভাবেই সহজে চিনের রোবটও আমাদের রোবট হয়ে যায়। তার নিচে ‘সংগৃহীত’ লিখে দিলেই ঝামেলা মিটে যায়।

এআই সম্মেলনে এই ঘটনা নেহাতই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে নোয়াম চমস্কির একটি মন্তব্য স্মরণে রাখলে। এআই বিষয়টিকেই চমস্কি একবার ‘প্ল্যাজিয়ারিজম’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, মানুষের বুদ্ধি ধার করেই তো তার সংসার চলে। তবে, সুকুমার রায়ের কথামাফিক গোঁফ কারও কেনা না হলেও, এআই-এর মালিকানা যে বেশ শক্তপোক্ত, তা এই ঘটনায় আরও একবার পরিষ্কার।

তবে একথা ঠিক, গালগোশিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ নিয়ে যতটা উদ্বেল হয়েছে, ততটা হয়েছে বোধহয় রোবোডগটি চিনের, একথা জানাজানি হয়েছে বলে। পরীক্ষার খাতা থেকে থিসিস, প্রবন্ধ থেকে চিত্রনাট্যর নিচে চ্যাটজিপিটি-র সাক্ষর থাকলে যেমন সহজেই ধরে ফেলা যায় জুয়াচুরি, এও কিছুটা তেমনই কেস! কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে খালি চোখে অনেককিছুই দেখা যায় না। যেমন, মার্কিন দেশের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সংসদ উত্তাল, বিরোধী ও নিন্দুকদের বক্তব্য, এই চুক্তির দরুন, ভারতের কৃষিপণ্যর লাভের গুড় খেয়ে যাবে আমেরিকাই। সাদামাঠাভাবে দেখলে, এটি রাষ্ট্রীয় বোঝাপড়া মাত্র। কিন্তু বাস্তবেও কি তাই?

যেমন কুকুর, তেমন মুগুর ফেরত পেয়েছে বটে গালগোশিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু মুগুরের ঘা দিতে গেলে, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবে না তো?