সোনার হরিণ চাই
সে এক আশ্চর্য বাসযাত্রা। নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ ব্রান্সউইক। নিউ জার্সির বাঙালিপ্রধান এলাকা। এর আগে নিউ জার্সি গিয়েছি ট্রেনে। বন্দে ভারতের আগের জমানা, তাই যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলাম সেই ঝাঁ চকচকে ট্রেনে চড়ে। ২০১৬ সালে নিউ ইয়র্কের পেন স্টেশন থেকে ঘণ্টাখানেকের জার্নির ভাড়া ছিল ১৪ ডলার। এখন নেটে দেখলাম ১৫-২৮ ডলার, দিনের ব্যস্ত সময়ে ভাড়া বাড়তির দিকে, অন্য সময়ে কমতি।
কয়েক বছর পর আবার যাচ্ছি নূপুরদি, ডঃ নূপুর লাহিড়ির বাড়ি। পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল থেকে সন্ধের বাসে চেপেছি। এটাও ঘণ্টাখানেকের যাত্রা। কিন্তু বিকেল থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল, শহর ছাড়তে-না-ছাড়তেই নামল বৃষ্টি। বাসের ভেতরে অন্ধকার, বাইরে হাইওয়ে অন্ধকার, উইন্ডস্ক্রিনে ঝোড়ো হাওয়া আর জলের ঝাপটা। তার মধ্যে নীরবতা পালনের কঠোর নির্দেশ। সামনের দিকে বসা কেউ একটু কথা বললেই, এমনকী ফোনেও, গোলগাল লালমুখো চালক ঠোঁটে আঙুল চেপে ধমক দিচ্ছেন, ‘সাইলেন্স’! ঠিক যেন কড়া ক্লাস টিচার। এদিকে চিন্তায় পড়েছি, ঠিক জায়গায় নামাবে তো? দেখছি, মাঝে-মাঝে বাস থামছে আর ঘন অন্ধকারের মধ্যে নেমে উধাও হয়ে যাচ্ছে যাত্রীরা। তারা নাহয় নিত্যযাত্রী, চেনে নিজের জায়গা। আমাদের তো কোনও ধারণাই নেই কেমন দেখতে আমাদের বাস স্টপ। যাদের নিতে আসার কথা, ফোনে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এই বৃষ্টিতে সে বেচারারা পার্ক করা গাড়ির মধ্যে বসে আছে, আমাদের জন্য ছাতা নিয়ে। যথারীতি একইরকম এক ঘুটঘুটে নিশ্চিন্দিপুরে বাস থামিয়ে ড্রাইভার জানালেন, এটাই আমাদের গন্তব্য।
নিউ ইয়র্কের প্রান্তিক অঞ্চলকে চেনা যায় না একঝলকে! পড়ুন: ডেট লাইন পর্ব ৩৯
নামলাম, কী ভাগ্যি, বেশি ভেজার আগেই অন্ধকার ফুঁড়ে বিশাল-বিশাল ছাতা নিয়ে হাজির অ্যান্ডর আর বিজয়েশ। নূপুরদির বন্ধু অ্যান্ডর এমন এক আশ্চর্য মানুষ, যার সম্পর্কে পরে বিস্তারিত বলতেই হবে। আপাতত এটুকু বলি, জার্মান আমেরিকান এই বৃদ্ধ সাহেবের আসল নাম অন্য কিছু। কিন্তু যেহেতু তিনি বিশ্বাস করেন যে— ইরেজি ভাষায় দু’টি মাত্র শব্দ, অ্যান্ড এবং অর, যাদের ব্যাকরণের পরিভাষায় বলে কনজাংশন, সব অভিব্যক্তির ভিত্তি, তাই নিজের নামটিকে বদলে নিয়েছেন। যাই হোক, কোনওমতে মাথা বাঁচিয়ে গাড়িতে উঠলাম আর হুশ করে আঁধার থেকে আলোয় উত্তরণ ঘটল। দূর থেকে নূপুরদির ঝলমলে বাড়ি দেখে মন নেচে উঠল। জানি, এই রাতে ওখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন একদল প্রবাসী বন্ধু, গান-কবিতা-আড্ডা-ভুরিভোজে গড়িয়ে যাবে মাঝরাত। তারপর আমি ডিশওয়াশারে প্রচুর এঁটো বাসন সাজাবো (আমার খুব পছন্দের কাজ, দেশে তো হাতে মাজি)। নূপুরদি তখন কিচেনের ছোট ডাইনিং টেবিলে শেষ ড্রিঙ্কটা নিয়ে বসে জিজ্ঞেস করবে, ‘আচ্ছা, লেক মার্কেটের বাইরে যে হারুর মা বসত নাডু-মোয়া নিয়ে, এখনও বসছে তো? বয়স হয়েছে, আগের বার বাতের ব্যথার মলম দিয়ে এসেছিলাম। ওকে বোলো আমি সামনের জানুয়ারিতে যাব। তখন আবার নিয়ে যাব।’

জুলাইয়ের ফুরফুরে বিকেল। যে-বিকেল ফুরোয় না। আমরা পুবের লোক। আমাদের দেশে ছ’টা-সাড়ে ছ’টায় অফিসবাবুর মতো নিয়ম মেনে সূর্য অস্ত যায়। যত পশ্চিমে যাই, ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁলেও সূয্যি ডোবে না, এ আবার কেমন অনাচার? তেমন এক কনে দেখা বিকেলে বাইরে না ঘুরে কেন যে আমরা বাড়ির পেছনে সুইমিং পুলে জলকেলি করছিলাম, কে জানে!
আসলে ব্যস্ত মনোবিদ নূপুরদি আমাদের আগমন উপলক্ষে ক’টা দিন পুরো ছুটির মুডে। তার ওপর দুপুরে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বাজার করতে গিয়ে চব্বিশটা ডিম ফ্রি পেয়ে লটারি জেতার মতো খুশি আমরা। সেলফ বিলিং-এর কিয়স্কে কিছুতেই ডিমের ট্রের বার কোড পড়তে পারল না কম্পিউটার। আমরা তখন কাউন্টারে গিয়ে অনুরোধ করলাম দাম নিতে। কিন্তু ম্যানেজার বললেন, টেকনিক্যাল কারণে ওরা তা পারবেন না এবং ডিমগুলো আমাদের নিতে হবে কারণ দোষ দোকানের সিস্টেমের। এরপরও কি খুশি না হয়ে পারা যায়? এইসব নানা তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে মন ভাল হওয়া সংক্রামক, নূপুরদির ধারেপাশে থাকলে যা হতে বাধ্য। নূপুরদির ক্লিনিকের নাম ‘লাইফ এনহ্যান্সমেন্ট ইন্সটিটিউট’। সঠিক নাম। আমেরিকায় যেহেতু সব বয়সের মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত, সরকার স্কুলে কলেজে পড়ুয়াদের নিয়মিত কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা রাখে, তাই বলা বাহুল্য নূপুরদির পসার দুর্দান্ত। অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটি লাতিন আমেরিকান। দু’বার বিয়ে ভেঙে তৃতীয়বার লিভ ইন সম্পর্কে রয়েছে। সেটা বিষয় নয়, অদ্ভুত ঘটনা হল, প্রেমিকের নাম ট্যাটু করা ওর নেশা। আগের দু’বারের নাম মুছতে গিয়ে শ্বেতির মতো দাগ হয়েছে গায়ে, তবু তৃতীয়জনের নাম লিখে ফেলেছে হাতে। নূপুরদির মতো নামকরা মনোবিদও ছাড়াতে পারেনি ওর এই ‘শরীরে লেখো নাম’ রোগ। যা বলছিলাম, নীল জলে শরীর ডুবিয়ে আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল, একজোড়া বা কয়েকজোড়াও হতে পারে, চোখ আমাদের দেখছে। সেটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ পুলের পাশের স্বচ্ছ ফাইবার দেওয়ালের ওধারেই একটা মাঝারি মাপের জঙ্গল। যেটা নূপুরদি কিনেছে এই বাড়ির সঙ্গে। রাতে গা ছমছম করে এদিকে এলে। নূপুরদিকে বলে লাভ নেই। একবার হাসতে-হাসতে গল্প করেছিল, পার্টি সেরে রাতে বাড়ি ফিরে দেখেছিল, গাড়ির শব্দ পেয়ে দোতলায় বেডরুমের স্কাইলাইট দিয়ে লাফ মেরে বেরিয়ে এল দুটো লোক। ঝাঁপ মেরে নামল, দৌড় লাগাল সামনের হাইওয়ে ধরে। সঙ্গে-সঙ্গে দোতলায় উঠে তদন্ত করে দেখল নূপুরদি, সদ্য নাকি ঢুকেছিল চোর, তেমন কিছু নিতে পারেনি। নিউ জার্সির এই অঞ্চলে এক-একটা বাড়ির মধ্যে যা দূরত্ব, চেঁচালেও কেউ শুনতে পাবে না। আমি ভয়ে-ভয়ে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, গোটা পাঁচেক জাম্বো সাইজের হরিণ দীঘল চোখ মেলে আমাদের দেখছে। ঐ জঙ্গলে সতেরোটা হরিণ, অজস্র খরগোশ, বেজি, অনেকরকম পাখির বাস। জঙ্গল কেনার ফলে তাদের ভরণপোষনের দায়িত্ব ডাঃ নূপুর লাহিড়ির। প্রশাসন থেকে নিয়মিত খোঁজ নেয় এদের কোনও অযত্ন হচ্ছে কিনা। জঙ্গলের মধ্যে একটা ভারি মিষ্টি তিরতিরে জলধারা বইছে। নূপুরদি বলল, ‘যাবে না কি পিকনিক করতে?’ যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমেরিকান হরিণরা এখানকার মানুষদের মতোই বড় সাইজের আর তাদের শিংগুলো খুব লম্বা। হঠাৎ তেড়ে এসে পেটে ঢুকিয়ে দিলে এফোঁড়-ওফোঁড়। তাই আর উৎসাহ দেখালাম না। কিন্তু সেই হরিণের খপ্পরেই পড়লাম পরদিন মাঝরাতে, এক বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন খেয়ে ফেরার পথে। নূপুরদির অসাধারণ একটা স্পোর্টস কার আছে, উজ্জ্বল হলুদ রঙের আলফা রোমিও। নিউ জার্সির প্রবাসী বাঙালিরা অনেকেই কখনও-না-কখনও জয় রাইডে বেরিয়েছেন সেটায় চড়ে। নেমন্তন্ন বাড়ি একটু দূরে বলে আমরা অন্য শক্তপোক্ত গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম ভাগ্যিস। পৌঁছনোর পরই ঋতুপর্ণা-পিনাকী আমাদের দেখাল, দুদিন আগেই রাতে হাইওয়ে দিয়ে ফেরার সময়ে মস্ত শিংওয়ালা হরিণের ধাক্কায় তাদের গাড়ির সামনেটা কেমন তুবড়ে গেছে। সাবধান করে দিল, ‘ফেরার সময়ে দেখে চালিও নূপুরদি। বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যায় হরিণের জন্য।’ সত্যি, বছরে নাকি পনেরো-কুড়ি হাজার এরকম দুর্ঘটনা হয় নিউ জার্সিতে। হরিণের সংখ্যা যখন খুবই বেড়ে যায়, শিকারের লাইসেন্স দেয় সরকার। শুনে খুব খারাপ লাগল। এত সুন্দর দেখতে হোয়াইট টেলড ডিয়ারকে গুলি করে মারছে মানুষ, দৃশ্যটা কী ভয়ঙ্কর! নূপুরদির মতো দু-চারজন পশুপ্রেমী ডিয়ার ম্যানেজমেন্ট অ্যাসিস্টান্স পারমিট নিয়ে নিজস্ব চৌহদ্দিতে হরিণ রাখে। বেশির ভাগ বাসিন্দাই তিতিবিরক্ত হরিণের উৎপাতে। কখনও বাগানের ফুল খেয়ে যায়, কখনও আচমকা গাড়ির সামনে এসে পড়ে বিপদ সৃষ্টি করে। ঋতুর বাড়িতে প্রচুর খানাপিনা, গানবাজনা, ওদের ছোট্ট মেয়ে মোমোর সঙ্গে খেলাধুলোর মাঝখানে ভুলেই গিয়েছি হরিণাতঙ্কের কথা। বেরোতে-বেরোতে বারোটা বেজে গেল। পাড়া ছাড়িয়ে ঘন অন্ধকার হাইওয়ে। কিছুটা এগোতেই তাঁর আবির্ভাব, পাশের জঙ্গল থেকে রাস্তা পেরচ্ছেন। ধীরেসুস্থে, তাই বাঁচোয়া। আচমকা পথের মাঝখানে দৌড়ে এলে মুশকিল। নূপুরদি স্টার্ট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সেই জাম্বো সাইজের হরিণ আমাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, নড়ার নাম নেই। একটু পরে তার ক’জন বন্ধু এল। তারা কিন্তু আমাদের এতটুকু পাত্তা দিল না। কৌতূহলী হরিণকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে গেল ওপারের জঙ্গলে। আমরা নিঃশ্বাস ফেলে রওনা দিলাম।
নিউ জার্সির এক একটা পাড়া বাঙালিময়। কোথাও বাংলো-টাইপ একলা বাড়ি, কোথাও বিশাল সিনিয়র লিভিং কমিউনিটি আবাসন। প্রবীণেরা যদি শক্তপোক্ত থাকেন তাহলে একরকম, নইলে তাঁরা বেছে নিতে পারেন অ্যাসিস্টেড লিভিং আবাসন যেখানে চিকিৎসা বা অন্য সব ধরনের সহায়তা মেলে। বয়স বাড়ায় নূপুরদি ওই রহস্যময় জঙ্গল লাগোয়া দুর্ধর্ষ বাড়িটি বিক্রি করে কমিউনিটি কমপ্লেক্সে চলে গেছে। সে-বাড়িতেও গিয়েছি পরে। প্রচুর খোলা জায়গায় মাপা দূরত্বে সাজানো একরকম অনেক বাংলো। আবাসন চত্বরে ক্লাব, জিম, দোকান, সুইমিং-পুল তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে একফালি জলাশয়। কাঠের সাঁকো পেরলেই জঙ্গল আর সেখানে হরিণের দল। মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে আবার একজনের মুখোমুখি, সেই নির্নিমেষে চেয়ে থাকা, ভয়ে পিছু হটলাম আমি, সে কিন্তু স্থির।

প্রিন্সটনের বাঙালিদের মধ্যে বেশ ‘বেঁধে বেঁধে থাকি’ ব্যাপারটা আছে। ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শুধু অনুষ্ঠান নয়, সবাই সবার ভালমন্দ খবরও পেয়ে যায়। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, দোল, নববর্ষের উৎসব তো হয়ই, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, নাট্যমেলা, লেগেই থাকে বছরভর। ‘কল্লোল’ নামে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক সংগঠনের খুব নামডাক। ভাল লাগল দেখে, কমবয়সি অনেক সদস্য আছে। নিয়মিত নাচ-গান-নাটকের ওয়ার্কশপ হয়, রিহার্সাল চলে। এছাড়াও উইকএন্ডে কারও-না-কারও বাড়িতে পার্টি লেগেই থাকে। পটলাকের খুব চল এখানে, সবাই কিছু না কিছু রান্না করে, না পারলে কিনে নিয়ে আসে। চানাচুর আর ওয়াইন, খিচুড়ি আর চিজকেক, কম্বিনেশন যা খুশি হতে পারে। প্রায় সব বাংলোর পেছনেই আছে একটুকরো বাঁধানো জায়গা যাকে বলে প্যাশিও। সেখানে চেয়ার-টেবিল-সোফা পাতাই থাকে। গরমকালে দারুণ আড্ডা হয়, চাইলে ডিনারও এখানে বসেই খাওয়া যায়। সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ আলোয় ভরা আকাশের নীচে বসে রাতের খাওয়া, কলকাতার বাঙালির অস্বস্তি হলেও কিছু করার নেই। সঙ্গে গান হবেই, কোরাসে। যদিও ব্লস স্প্রিংস্টিন, হুইটনি হিউস্টন, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, বন জোভির মত সুরের যাদুকরদের জন্মস্থান নিউ জার্সি, তবু সুদূর জোড়াসাঁকোর দীর্ঘদেহীর লম্বা ছায়া লুটোয় প্রবাসের উঠোনে ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’।




