
উল্টো দূরবিন : পর্ব ৩৮
‘দাদু খেতে এসো’ বলে ডাকলে দাদু বলতেন— ‘খাওয়া তো নয়, গেলা! যখন ফরিদপুরে ছিলাম, দাঁতগুলি অটুট ছিল, টাটকা মাছ-তরিতরকারি-দুধ— তখন করতাম ভোজন। এইপারে আইস্যা খাওন, এখন গেলন।

‘দাদু খেতে এসো’ বলে ডাকলে দাদু বলতেন— ‘খাওয়া তো নয়, গেলা! যখন ফরিদপুরে ছিলাম, দাঁতগুলি অটুট ছিল, টাটকা মাছ-তরিতরকারি-দুধ— তখন করতাম ভোজন। এইপারে আইস্যা খাওন, এখন গেলন।

‘আমার ডাকাডাকিতে মাধবীদের বারান্দায় আলো জ্বলে উঠল, শিবনাথ বাগানের ভেতর দিয়ে গেটের কাছে চলে এল, এবং ওইরকম দিন বলেই হয়তো মাধবীর বাবা ও মা বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আমি অবশ্য জানালাগুলির দিকে তাকিয়ে মাধবীর উঁক ঝুঁকি ঠাহর করে আশ্বস্ত হয়েছি।’

যেভাবে শিকড়ের টানে বাংলা ভাষার কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন মাইকেল, ঠিক সেভাবেই ফিরতে চেয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। সেটা ১৮৬২ সাল। দ্বিতীয় স্ত্রী ফরাসি আঁরিয়েতাকে নিয়ে নৌকো ভিড়িয়েছিলেন কপোতাক্ষ তীরে।

‘কুকুরপ্রত্যাশী এই মধুবন। দন্তনখশোভা/ তার বড় পছন্দের। গলার পট্টিটি খুলে দিলে/ যে-হুংকার লাফ দেয়, তাকে চাই ভীষণ। অথবা/ শরীরে শরীর দুমড়ে পিষে নিতে চাই অন্ত্যমিলে।’

‘পুরনো একটা বাড়ির নীচতলায় কাচের দরজা লাগিয়ে কোনওরকমে বানানো। ভেতরে কয়েকটা টেবিল দেখা যাচ্ছে। লোকজন বিশেষ নেই। নীলা মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে কীসব পড়ছিল। একবার রেস্টুরেন্টের দিকে তাকায়, আবার ফোনের দিকে। ঠিক তখন পেছন থেকে পরিচিত গলা।’

আমার নিজের দাদুর স্মৃতিশক্তি ছিল দুর্দান্ত। কবীরের দোহা, চার্বাকের শ্লোক, খনার বচন গড়গড় করে বলে যেতেন। পরে বুঝেছি, এইসব চরিত্ররা দাদুর ‘চরিতাভিধান’ বইতে ছিল, যেটার সঙ্গে দাদু জড়িত ছিলেন।

‘সারা রাস্তায় লরিট্রাকবাস-ভাঙা ছোট-বড়-মাঝারি কাচের টুকরো। এদিকে-সেদিকে গুচ্ছ-গুচ্ছ সেনা পুলিশ। ডানলপে গুরদোয়ারার দিক থেকে ধোঁয়া উঠছিল পাক খেয়ে। দমকলের ঘণ্টা শুনলাম। থমথমে ওই আলো-অন্ধকারে আমি ও ভাস্করদা মাধবীকে খুঁজতে লাগলাম।’

‘দাদুকে শতরঞ্চিতেও তালি লাগাতে দেখেছি। শতরঞ্চি ফুটো হয়ে গেলে টুকরো কাপড়ের তালি লাগাতেন নিজেই। এতটাই ‘তালি-বান’ ছিলেন আমার দাদু। শুধু দাদু নয়, গোটা পরিবারেরই এই অভ্যেস ছিল। কোনও জিনিসকে বহুদিন এবং বহু ভাবে ব্যবহার করার নানাবিধ ফন্দিফিকির উদ্ভাবন করা হত।’

‘আমাদের এখানে যদি ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেও, তাহলেও একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। তারা মেতে যায় তাদের আনকোরা জীবনকে পাটে-পাটে খুলে উপভোগ করতে, তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ অনুভব করতে। আর মায়ের হাতে পড়ে থাকে এক অদ্ভুত শূন্যতা। এর নাম দুঃখ বললে পুরোটা বলা হয় না।’

ঢাকার মানুষ বলেন, সিলেট তো বড়লোকের শহর। সত্যিই তাই! আসলে সিলেটের প্রায় প্রতিটি বাড়ির কেউ না-কেউ বিলেত-আমেরিকায় থাকে। বিশেষ করে, লন্ডনের পুবদিকের পাড়াগুলোতে ঘুরলে আপনার মনে হবে, একটুকরো সিলেট।

‘আমার দাদুর কোনও ছবি তোলা নেই। ক্যামেরা না থাকার কারণেই মূলত কোনও ছবি ওঠেনি। তবে রাঙাদা কিছু ছবি তুলেছিল, তার কিছু কপি আমার কাছেও ছিল, সব বিবর্ণ ও নষ্ট। এখনকার এ আই হয়তো অনেকটাই উদ্ধার করে দিতে পারত, কিন্তু সেইসব ছবি কোথায় আছে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।’

প্রার্থনা কবুল হল, বাড়িতে কানেকশন নেওয়া হবে। আমি আড়ালে একবার আনন্দ করে নিলাম দু’পাক। জানি না, রোজ-রোজ সিনেমা আমাকে দেখতে দেওয়া হবে কি না, বা ক্লাস সেভেনে সব সিনেমা তো দেখার কথাও নয়।
This Website comprises copyrighted materials. You may not copy, distribute, reuse, publish or use the content, images, audio and video or any part of them in any way whatsoever.
©2026 Copyright: Vision3 Global Pvt. Ltd.