ছবিঘর : পর্ব ৩

‘দ্য সফট স্কিন’

১। সন্ধেবেলা একটা গাড়ির ভেতরে এক দম্পতির চুমুর দৃশ্য—
“A woman and a man, it’s 7.30 p.m. and they’re on their way home for dinner. Not married to each other but to other people by whom they have children. A horrendously carnal kiss in a taxi, in a city— that was the starting point, an image and a sound, because during the kiss, we would hear the couple’s teeth knocking.”

২। “The sound of her stockings as a woman shifts her legs…”

৩। কিছুটা নিজের জীবন, কিছুটা বন্ধুদের, কিছুটা শোনা গল্প, আর একটা খবর— যেখানে প্যারিসের এক মহিলা সর্বসমক্ষে তার বরকে অবিশ্বস্ত হওয়ার জন্য গুলি করে মারে। ত্রুফো-র কথামতো, এই হল ‘দ্য সফট স্কিন’-এর উপাদান।

বিলি ওয়াইল্ডারের ‘দ্য অ্যাপার্টমেন্ট’ নিয়ে পড়ুন ‘ছবিঘর’ পর্ব ১…
কোয়েন ব্রাদার্সের ‘দ্য বিগ লোবোউস্কি’ নিয়ে পড়ুন ‘ছবিঘর’ পর্ব ২…

কামনা-বাসনা বললে, ‘desire’ শব্দটা পরিষ্কার হয় কি না, জানি না। তার গায়ে কিছুটা আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছেও লেগে থাকে। আর তার বাইরেও কিছুটা পড়ে থাকে। যৌনতা অবশ্যই একটা অন্যতম উপাদান। যেমন ‘Soft Skin’ বললে প্রাথমিক অর্থ দাঁড়ায়— পেলব ত্বক, বা তার আকাঙ্ক্ষা। এই শব্দটার অর্থ যখন বহির্মুখী, তখন অবশ্যই তাই। আবার এই মানেটাই যখন ভেতরের দিকে যায়, তখন এই সফট স্কিনের ভেতরে থাকা একটা দিশেহারা, স্থিতিস্থাপকতাহীন মনও উঁকি দেয়।

এই ডিজায়ার-এর স্বাভাবিক চারণভূমি ত্রিকোণ সম্পর্ক। এতটাই স্বাভাবিক যে, ক্লিশে। ত্রিকোণ প্রেম আধুনিকতার এক অলস মিথ্যে পাঁচালি হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষত সিনেমায়। আধুনিকতার মোটা সংজ্ঞায়, প্রাচীন সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতা বোঝাতে বিবাহ সবথেকে সহজ টার্গেট। ফলে ৬০ বছরের বেশি পুরনো একটি বিবাহ-বহির্ভূত প্রেমের ছবি দেখার মধ্যে একটা আশঙ্কা কাজ করে। একটা উক্ত বা অনুক্ত মরালিটির ফ্রেম বারবার দেখে দেখে আর নতুন কিছু আবিষ্কারের ইচ্ছা হয় না।

ছবির শুরুতে, টাইটেল সিকোয়েন্স-এর সময়, সম্ভবত একটি অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে এক পুরুষ ও মহিলার হাতের ক্লোজ-আপ দেখা যায়। পুরুষের হাতে ওয়েডিং রিং। মহিলাটির হাত, তার হাতের ওপর খেলে বেড়ায়। তারা যে বিবাহিত নয়, এটা অবশ্য বোঝা যাবে অনেকটা পরে।

ত্রুফো-র গল্পটা শুরু হয় এইভাবে, কিন্তু মরালিটি যে তার অভীষ্ট লক্ষ্য নয়, এটা বোঝার নানারকম ক্লু তিনি রেখে দিতে থাকেন শুরু থেকেই। ‘ক্লু’ শব্দটা সচেতনভাবেই ব্যবহার করলাম। এই ছবি ত্রুফো বানাচ্ছেন তার জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রজেক্ট ‘ফারেনহাইট ৪৫১’-এর জন্য অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে। এই অবসরে তিনি দু’টি কাজ করছেন। হলিউডে গিয়ে হিচককের লম্বা একটা ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু করছেন, যা পরে ছবি করিয়ে-দের জন্য একটি ধর্মগ্রন্থের আকার নেবে। আর বানাচ্ছেন এই ছবিটি। কম বাজেটে, ছোট ইউনিটে, ছবির একটা বড় অংশ নিজের বাড়িতে শুট করে। ততদিনে হিচকক তাঁর মাথায় গেঁথে গেছে।

ফলে ছবির শুরুতেই যখন পিয়ের লাঁশনে (সে একজন লেখক, পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল, সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি স্টার) হাতে খুব অল্প সময় নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়— সেই পুরো সিকোয়েন্সটা প্রায় হিচককীয় ভঙ্গিতে শুট ও এডিট করেন ত্রুফো। দেখতে-দেখতে একটা অন্য ছবির প্রস্তুতি শুরু হয় মনের মধ্যে। এটা কি তাহলে থ্রিলার? অচিরেই বোঝা যায়— না।

প্লেন লিসবনে ল্যান্ড করার আগে সে খেয়াল করে, এয়ার হোস্টেস-এর সিট থেকে বাইরে আইলের মধ্যে সামান্য এগিয়ে রাখা পা। মেয়েটিও একবার আড়চোখে দেখে নেয় তাকে। (এই একে-অপরকে অপাঙ্গে দেখার একটা লম্বা খেলা চলবে বেশ কিছুক্ষণ— এক অর্থে ধ্রুপদী হলিউডি ছবির স্ক্রিপ্টে যাকে inciting incident বলে, এটাকে তার ফরাসি রসিক ভার্সন ভাবা যায়।)

তার কিছুক্ষণ পরে পিয়ের দেখবে পর্দার তলা দিয়ে মেয়েটির জুতো পাল্টানো। ফ্রাঁসোয়াজ দোর্লেয়াকের মুখ তখনও দর্শকদের মনে গেঁথে যায়নি; দর্শক তাই লক্ষ্য করে যা পিয়ের লক্ষ্য করে। ছবিতে দর্শকের সময়ের বোধও পিয়েরের মাথাই নির্দেশ করতে-করতে যায়।

বহু বছর আগে এই ছবিটি প্রথম দেখার সময় একটা আচমকা ধাক্কা লেগেছিল। আমার ধারণা, অধিকাংশ দর্শকের ক্ষেত্রেই এই ঘটনাটি ঘটে। টাইটেল কার্ডে তো দেখা যায়নি, কিন্তু এই স্টুয়ার্ডেস চরিত্রে অভিনয় করা মেয়েটিকে অবিকল ক্যাথারিন দ্যানিউভের মতো দেখতে কী করে হয়? তখন জানতাম না, নিকোলের চরিত্রে অভিনয় করা এই মহিলা ক্যাথারিন দ্যানিউভের বড় বোন ফ্রাঁসোয়াজ দোর্লেয়াক। এই ছবি করার কিছুদিনের মধ্যেই হলিউডের স্টারডমের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি বীভৎস কার অ্যাক্সিডেন্টে তিনি মারা যাবেন।

ছবির একটি দৃশ্যে ফ্রাঁসোয়াজ দের্লোয়া

এইখানে এসে দাঁড়িয়ে ছবিটার গল্প একটু বলে দেওয়া যাক। গল্পটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেই কারণেই বলে দেওয়া যায়।

পিয়ের লাঁশনে লিসবন শহরে যায় ‘Balzac and Money’— এই বিষয়ে একটা বক্তৃতা করতে। তাকে লোকে চেনে, সে একজন সেলিব্রেটি। তার দেরি হওয়া সত্ত্বেও চেক-ইন ডেস্কের বিশেষ সহায়তায় সে প্লেনে শেষ মুহূর্তে উঠতে পারে। প্লেনে এক অল্পবয়স্ক এয়ার হোস্টেস তার নজর কাড়ে।

কাকতালীয়ভাবে গোটা ছবি জুড়ে প্রচুর এই ধরনের ঘটনা আছে। সেই এয়ার হোস্টেস ও তার সহকর্মীরা তারই হোটেলে ওঠে। এয়ার হোস্টেস তাকে চেনে, সে বিখ্যাত বলে। সে তাকে লক্ষ্য করেন, কারণ মেয়েটি আকর্ষণীয়। তারা লিফটে একসঙ্গে ওপরে ওঠে। মেয়েটি হাতে অনেক জিনিসপত্র থাকার সুযোগ নিয়ে কায়দা করে তার ঘরের চাবিটি লিফটের মধ্যেই ফেলে দেয়। লাঁশনে ব্যস্ত হয়ে তাকে সাহায্য করে।

জঁ দেশাইয়ি ও ফ্রাঁসোয়াজ দেলোয়ার্ক, পিয়ের ও নিকোলের চরিত্রে

ঘরে ফিরে, মুহূর্তের দুঃসাহসে লাঁশনে নিকোলের ঘরে ফোন করে একটা ড্রিংকের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। নিকোল প্রত্যাখ্যান করে, এবং তার কিছু পরে আবার ফোন করে ক্ষমা চায়। বলে সে পরের দিন দেখা করতে রাজি। পরের দিন থেকে তাদের সম্পর্ক শুরু হয়।

লাঁশনে মধ্যবয়স্ক, সফল, বিবাহিত, সম্ভ্রান্ত, সমাজে পরিচিত। মেয়েটি সুন্দরী, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়। ছোট শহরের মেয়ে। প্যারিসে তার নিজের লোক বলতে সামান্যই। তাদের প্রেমের সঙ্গে শুধু বয়স নয়, তাদের জীবনেরও গভীর সংঘাত আছে।

লাঁশনে পুরুষ। সে বালজাক, আঁন্দ্রে জিদ নিয়ে বক্তৃতা করতে পারে, প্রেম করার সময় সাশা গিত্রির উদ্ধৃতি দিতে পারে, কিন্তু সে নিজের ব্যাগ নিজে গোছাতে পারে না। তার স্ত্রী ফ্রাঁকা ছবির মতো সুন্দর সংসার গুছিয়ে রাখে। একটা কাগজ খুঁজতে গেলেও তাকে স্ত্রীর শরণাপন্ন হতে হয়। সেই জীবন নিশ্চিন্ত, অন্যের চোখে ঈর্ষার, কিন্তু অভ্যাসের। অধিকাংশ সফল পুরুষের মতোই নিজের জীবনকে চর্চা ও লালন করার কোনও যোগ্যতা বা ট্রেনিং তার নেই।

এই ছবিতে বক্তব্য বা মরালিটির চেয়েও অভিজ্ঞতার ওজন বেশি

নিকোল লাঁশনের মতো কোনও মানুষ দেখেনি, লাঁশনেও তার পরিধিতে এরকম কোনও মেয়ের সান্নিধ্যে আসেনি। তার দৈনন্দিন খোলসের বাইরে এই গোপন জীবনের উত্তেজনা তার একদম অপরিচিত। এইটা তাকে জীবনের যে স্বাদ দেয়, তাতে তার হিতাহিত-বোধ ক্রমশ লোপ পেতে থাকে। তাকে একশোটা মিথ্যে কথা বলতে হয়। জীবনের নানা অবাস্তব ফাঁকে তারা তাদের প্রেম প্রাণপণে গুঁজতে গিয়ে হাজারটা বালখিল্য ঘটনায় জড়িয়ে যায়।

ত্রুফোর জবানিতে, লাঁশনে তার কাজে দক্ষ, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে তার বুদ্ধি বয়ঃসন্ধির একটি কিশোরের মতো। He is an adolescent without its cuteness. সে একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ঝুলে থাকে। যে জীবন সে কোনওদিন আস্বাদন করেনি, সেই জীবনের দোলাচল তাকে তার পরিসীমার বাইরে পা রাখতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে সে ভীত-সন্ত্রস্ত— তার পরিণতির সম্বন্ধে অবহিত হলেও, তা দেখতে সে অপারগ।

সে তার ডিজায়ার-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে ঠিকই, কিন্তু চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস তৈরি করতে পারে না। তার প্রতি আমাদের সহানুভূতি হতে-হতেও হয় না, আবার ঘৃণাও করা যায় না ঠিকমতো। একটি সফল পুরুষের প্রতি যে করুণা হওয়া সম্ভব, সেটুকুই তার প্রাপ্য।

ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো

নিকোল তার স্বাভাবিক বেঁচে থাকার বুদ্ধি দিয়েই আস্তে আস্তে ধরতে পারে এই সম্পর্কটা অসম্ভব। এর বাইরেটা রোমাঞ্চকর, কিন্তু ব্যবহারিক অর্থে কাঁচা। উল্টোদিকে অচিরেই লাঁশনে তার স্ত্রীর কাছে ধরা পড়ে যায়। ছোট-ছোট সন্দেহ বাড়তে-বাড়তে একটা জায়গায় এসে তার আর পালানোর উপায় থাকে না।
ফ্রাঁকাও রক্ষণশীল। তার কাছে জীবন সাদা-কালোয় ভাগ করা, এবং তার ভরকেন্দ্র পরিবার। সেখানে যখন সে প্রতারিত হয়, তার জীবনের মূলধন যখন তামাদি হয়ে যায়, তারও আচরণ পরিবর্তিত হতে সময় লাগে না। মা ও স্ত্রী-র যে সামাজিক পরিচয়ের নোঙর ধরে তার অস্তিত্ব তৈরি হত, তার কাছি ছিঁড়ে যায়। একটি ক্যাফেতে গিয়ে সবার সামনে সে লাঁশনেকে গুলি করে মারে। তারপর বন্দুকটা ফেলে দিয়ে এক কোনায় চুপ করে বসে থাকে। শুধু তার শেষ হাসিটার মধ্যে কোথাও যেন চার বছর আগের ‘সাইকো’-র নরম্যান বেটস এসে উঁকি দিয়ে যায়।

এই গল্পটুকু পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে কল্পনা করা যায়। এতে অভিনবত্ব কিছু নেই। আধুনিকতার সবচেয়ে পরিচিত ক্রাইসিসের গল্প এটি। এবং পুনরাবৃত।

তাহলে ত্রুফো করলেনটা কী?

যেটা করলেন, সেটা ছবি দেখার অভিজ্ঞতার ভেতরেই খুঁজতে হবে। ছবিটা দেখতে-দেখতেই নানারকমের মানসিক অবস্থার মধ্যে দর্শক প্রবেশ করে এবং বেরিয়ে আসে। প্রথম-প্রথম একটু ধন্দ লাগে। কারণ আমাদের পরিচিত অভ্যাস কাহিনির মধ্যে তাৎপর্য খোঁজা। কাহিনি যেদিকে যায়, আস্তে আস্তে বোঝা যায় যে ওটা ভুল পথ।

ছবিতে ফ্রাঁকার চরিত্রে নেলি বেনেদেত্তি

শুরুতেই একটা এয়ারপোর্ট যাত্রার কথা বলেছিলাম। একটা হন্তদন্ত অবস্থা। মাত্র ৪০ মিনিট পরে ফ্লাইট ছাড়বে। ফলে বন্ধুর গাড়িতে করে পিয়ের লাঁশনে রওনা দেয় এয়ারপোর্টের দিকে। ওই যাত্রাটুকু গল্পে একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেভাবে দৃশ্যটা শুট ও এডিট করেন, তা প্রায় হিচককীয়। তখন মনে হয়, একটা থ্রিলারের প্রস্তুতি চলছে হয়তো। কিন্তু তারপরেই প্লেনে বসে যে স্বস্তি আসে, তাতে নজর এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। এবং অবকাশের মধ্যে লক্ষ করা যায় আইলের মধ্যে এগিয়ে রাখা এক বিমান-সেবিকার পা। এটা ওই নকল চেজ সিকোয়েন্সের ঠিক বিপরীতে।

এর কিছু পরে যখন কাকতালীয়ভাবে নিকোল ও তার সহকর্মী পাইলটটি লাঁশনের সঙ্গে হোটেলের লিফটে ওঠে, তখন একটা অদ্ভুত কাণ্ড হয়। লিফট একটা অস্বস্তিকর জায়গা। বিশেষত, সেখানে যদি অন্য লোকটিকে দেখার বাসনা জন্মায়। তাতে অদৃশ্য বাষ্প তৈরি হয়, আর সময় টেনে অনেকটা লম্বা হয়ে যায়। একটা অদ্ভুত ত্রিকোণ তৈরি হয়। লাঁশনে নিকোলকে দেখে, নিকোল-ও লাঁশনের দিকে লুকিয়ে তাকায়, আর তাদের দু’জনকে দেখে নিকোলের সহকর্মী (পরে আমরা জানতে পারি তার সঙ্গেই নিকোলের একটা আধখাঁচড়া প্রেম ছিল)। এই ‘ক্রস গেজ’ সময়কে ইলাস্টিকের মতো টেনে লম্বা করে দেয়।
আবার নিকোলকে ছেড়ে আটতলা থেকে যখন লাঁশনে তিনতলায় নেমে আসে, ওই একই পথ লহমায় পেরিয়ে যায়। অবিশ্বাস্য গতিতে আমরা লিফটের দরজার ফাঁক দিয়ে প্রত্যেক তলার আলোটুকু দেখতে পাই মাত্র।

তারপর লাঁশনে যখন লিফট থেকে নেমে তার ঘরের দিকে হাঁটে, তার চোখ চলে যায় পরপর ঘরের বাইরে রাখা জুতোর সারির দিকে। কোনও ঘরের বাইরে নর-নারীর জুতো যুগল, কোনও ঘরের বাইরে একটি। লাঁশনে-র মনের মধ্যে চলা গ্রাফ আস্তে আস্তে ছবি ও মিউজিকের হাত ধরে।

‘কাহিয়ের দ্যু সিনেমা’-য় প্রকাশিত ত্রুফো-র নিবন্ধ

তার আবার কিছু পর, যখন পিয়ের ঘর থেকে তাকে ফোন করে, তখন ঘরটা আবছায়া। প্রত্যাখ্যানের কিছু পরে নিকোল যখন আবার কল করে দেখা করতে চায়, প্রায় অকারণেই মধ্যবয়স্ক পিয়ের লাঁশনে ঘরের মধ্যে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে ঘরের সমস্ত লাইট জ্বালিয়ে দিতে থাকে।

‘কাহিয়ের দ্যু সিনেমা’-তে ১৯৫৪-তে ‘A Certain Tendency of the French Cinema’-তে ত্রুফো তৎকালীন ফরাসি ছবির সম্বন্ধে যে অভিযোগগুলো করছেন, তার একটা বড় দিক হল—

১. তার নীতিবাগীশতা।
২. সে দর্শককে বলে দিচ্ছে কী ভাবতে হবে।
৩. সে ইমেজের ওপরে আস্থা রাখতে ভুলে গেছে— সে দেখাচ্ছে না, বলছে।
৪. জন-মনোরঞ্জন করতে গিয়ে সে ব্যক্তিগত মনোবিশ্বের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।
৫. ব্যক্তির অন্তর্জগৎ, বিশেষত যে ছবি বানাচ্ছে, তার জীবন-অভিজ্ঞতার এবং আবেগের কোনও স্থান সেই বলার থেকে নির্মমভাবে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে।

এইবার আস্তে-আস্তে স্পষ্ট হয় একটা মামুলি ত্রিকোণ সম্পর্কের গল্পের মধ্যে কী উদ্দেশ্য নিয়ে ত্রুফো প্রবেশ করতে চাইছেন। আসলে, মূল উদ্দেশ্য যদি হয় অন্তরের ব্যক্তিজীবনের দেখার আর বোঝার বর্ণমালা, তাহলে সব গল্পই ভাল। কারণ কোনও গল্পই শেষমেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে কোনও কাহিনিসূত্রের খিড়কি দরজা বা রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ব্যক্তি-পরিচালক নির্দ্বিধায় প্রবেশ করতে পারেন। পারেন শুধু না— এটাই তার মূল কাজ। তার জীবনের টক, তেতো, মিষ্টি ও ঝাল ও কষা এই বলার মধ্যে আস্তে-আস্তে জড়িয়ে দেওয়া।

এই সিনেমায়, অন্তত ত্রুফোর দৃষ্টিতে, বক্তব্য পরে, মরালিটি আরও পরে। অভিজ্ঞতাই আসল। সেই অভিজ্ঞতার একটা দৃশ্য-শ্রাব্য ফ্যাব্রিক তৈরি করা— যেন তার দৈনন্দিনের জুতোর মধ্যে পা গলিয়ে দর্শক বহু জীবনের মধ্যে একটা অনন্য জীবনকে ক্ষণিকের জন্য হলেও ধারণ করতে পারে।

ত্রুফো-র ছবি দেখতে গিয়ে মনে হয় আয়াসহীন। এক ধরনের মসৃণ হালকা ভাব থাকে দৃশ্যায়নের ভেতরে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যে হালকা চালে ছবি এগিয়ে যায়। সেটা একটু বিভ্রান্তিকর, কারণ চোখে আঙুল না দিয়ে বহু জটিল mise-en-scène ও découpage সেখানে সারাক্ষণ থাকে। অনাবশ্যক ভাল শট নেওয়ার, শ্বাসরুদ্ধ করা কোনও ফ্রেমিং ও দৃশ্যকল্প তৈরি করা সেখানে বারণ। কারণ আয়াসহীনতাই এখানে প্রজেক্ট। তৈরির চিহ্নগুলো মুছে দেওয়াই উদ্দেশ্য।

এই চিহ্নগুলো ছবির টেকনিক্যাল দিকে যেমন থাকে, তার থেকেও বেশি থাকে চিত্রনাট্যের অতীব কাঠামো-নির্ভরতায়। ‘দ্য সফট স্কিন’-এ কাঠামো-নির্ভরতার থেকে অনেক বেশি আস্থা ত্রুফো রাখেন স্বতন্ত্র এপিসোডগুলির যূথতায়। তারা সিঁড়ি বেয়ে এক থেকে দুই, দুই থেকে তিনতলায় যায় না। তারা গোল হয়ে একে-অপরকে একটা এলাকার মধ্যে কোরিওগ্রাফির নিয়মে প্রদক্ষিণ করে। তারা মিলেমিশে একটা কিছু করতে পারে, কিন্তু একটা সরে গেলে পুরো কাঠামোটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় না। জীবনের অভিজ্ঞতা তৈরি করতে গেলে জীবনের খণ্ডচিত্রগুলোর ভেতরে যে অবচেতনের সাঁকো থাকে, তার একটা দিকনির্দেশ হয়তো ত্রুফো দর্শকদের ইঙ্গিত করতে চান।

ছবির মাঝামাঝি জায়গায়, প্যারিসে প্রেম করতে ব্যর্থ হয়ে পিয়ের নিকোল-কে রেইমসে নিয়ে যায়। সেখানে আঁন্দ্রে জিদের ওপর একটি তথ্যচিত্রের ইন্ট্রোডাকশন দেওয়ার কাজ তার। তার ধারণা, যেমন জীবনের অন্যান্য বিষয় ম্যানেজ করা নিয়ে তার ধারণা, যে বক্তৃতাটুকু দিয়েই সে কেটে পড়তে পারবে, এবং তারপর নিকোলকে নিয়ে নিশ্চিন্তে দুটো দিন অজ্ঞাতবাসে কাটাতে পারবে।

একটা ছবিকে এইভাবে প্রায় অনায়াস সহজতায় প্লটের ওপরে তুলে ছেড়ে দেওয়া যায়, যেখানে একটা খণ্ডচিত্র কোনও এক অলীক নিয়মে গোটা ছবির বিষয়বস্তুর ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে। সম্ভবত এইরকম কিছুরই সন্ধান করছেন ত্রুফো, যাকে তিনি সিনেমার মূল অভিজ্ঞতা বলছেন। এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ সময়বোধের ওপর নির্ভর।

স্বাভাবিকভাবেই, ছোট শহরের অনাবশ্যক কৌতূহল এবং আনুষ্ঠানিকতার আতিশয্যে সে বিশ্রীভাবে আটকে যায়। সে স্বভাবভদ্র, নিজের ইমেজ সম্বন্ধে সচেতন— শুষ্ক হেসে সামলে যায়। শুধু তার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে, হোটেলে নিকোল একা রয়েছে, আর তার স্টকিংস ছিঁড়ে গেছে। তাকে নিকোল দায়িত্ব দিয়েছে দু’জোড়া স্টকিং কিনে নিয়ে আসার।
কোনওক্রমে মিথ্যে কথা বলে সে স্টকিংটুকু কিনে উঠতে পারে, কিন্তু নিকোলের জন্য বক্তৃতার টিকিট জোগাড় করতে ভুলে যায়। এর মধ্যে বক্তৃতা শুরু হয়ে যায়। নিকোল শেষ মুহূর্তে গিয়ে কোনও টিকিট পায় না। সে উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে।

বক্তৃতা দিয়ে যখন পিয়ের বেরতে যাবে, তার স্থানীয় বন্ধুটি তার পিছু ছাড়ে না। তার উদ্দেশ্য— একবার যখন পিয়েরকে পাকড়াও করা গেছে, তখন তার সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে একটু আলাপ না করে সে ছাড়বে না। লবিতে পিয়ের নিকোলকে দেখে, কিন্তু সঙ্গে জোঁকের মতো লেগে থাকা বন্ধুটির কারণে সে নিকোলকে চিনতে বা কিছু বলতে পারে না।

এই অবধি দৃশ্যগুলো একটি অস্বস্তিকর কমেডির জোনে থাকে। কিন্তু অডিটোরিয়ামের লবি থেকে বেরিয়েই সে দেখতে পায়, একটি মাতাল লোক নিকোলকে রাস্তায় বিরক্ত করছে। সে অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে।

‘দ্য সফট স্কিন’-এর শুটিংয়ে

তারও অল্প কিছুক্ষণ পর, বাধ্য হয়ে যখন সে বন্ধুর সঙ্গে একটা ক্যাফেতে বসে বিয়ার অর্ডার করেছে, কাচের ওপারে সে দেখতে পারে— রাস্তার লোকটি এখনও নিকোলের পিছু ছাড়েনি। বিষয়টা আর কমেডিতে নেই। পিয়ের অসহায়। তার জীবন কাচের ওপারে, সেখানে তার এক্ষুনি যাওয়া উচিত, কিন্তু তাকে স্থির হয়ে বন্ধুর বকবকানির সামনে বসে থাকতে হয়।

একটা ছবিকে এইভাবে প্রায় অনায়াস সহজতায় প্লটের ওপরে তুলে ছেড়ে দেওয়া যায়, যেখানে একটা খণ্ডচিত্র কোনও এক অলীক নিয়মে গোটা ছবির বিষয়বস্তুর ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে। সম্ভবত এইরকম কিছুরই সন্ধান করছেন ত্রুফো, যাকে তিনি সিনেমার মূল অভিজ্ঞতা বলছেন। এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ সময়বোধের ওপর নির্ভর। যে-জন্য এই ছবিটি নানা জায়গায় নানারকম— কখনও অনাবশ্যকভাবে মন্থর, কখনও অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত। ধ্রুপদি নিয়মে গল্প যেখানে গতি নিয়ন্ত্রণ করে, এখানে সেই একই গতি বা তার বিভ্রম তৈরি হয় প্রত্যক্ষের নিরিখে।

তার অল্প কিছুক্ষণ পর, আর কোনও উপায় না পেয়ে, পাতি মিথ্যে কথা বলে, বন্ধুকে হোটেলের লবিতে সুটকেস হাতে অপেক্ষা করিয়ে, বান্ধবীকে নিয়ে চোরের মতো পালিয়ে যায় প্যারিসের বিখ্যাত পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল পিয়ের লাঁশনে।

আবার ছবির একেবারে শেষে, পিয়ের যখন ক্যাফে থেকে প্রথমে ফ্রাঁকার বন্ধুকে এবং পরে ফ্রাঁকাকে ফোন করার চেষ্টায় একটা ব্যাস্ত বুথের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তার ক্রস কাটিং-এ আমরা ফ্রাঁকাকে দেখি বন্দুক নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে যেতে… আর তাঁদের বাড়ির অ্যাটেনডেন্ট ফ্রাঙ্কার খোঁজে প্রথমে বিল্ডিং-এর লবিতে এবং তার পরবর্তীতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে তখন এই অতি-পরিচিত সময়ের এক্সটেনশন থ্রিলারের নিয়ম মেনে করা করা হলেও, তার উদ্দেশ্য আলাদা। পিয়েরের জীবনের যে মামুলিপনা, banality— মৃত্যুও তার থেকে তাকে উদ্ধার করতে পারে না। শেষ মুহূর্তেও তার মুক্তির ধারে-কাছেও সে যেতে পারে না। তাকে কেউ বাইরে দাঁড় করিয়েই রাখে। এই নির্মমতা লক্ষণীয়। এবং ছবির প্রেক্ষাপট এবং ত্রুফোর ব্যক্তিগত জীবনের কথা মাথায় রাখলে, এই নির্মমতা তাঁর নিজের দিকেই ধাবিত।

‘দ্য সফট স্কিন’ দেখতে গিয়ে দর্শকদের যে অস্বস্তি বাড়তে থাকে, যাকে impending doom বলে, সচেতন না থেকেও তার যে একটা বোধ তৈরি হয়, তার কারণ ধীরে ধীরে পিয়েরের অভিজ্ঞতার জগতে ত্রুফো দর্শককে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। এই অভিজ্ঞতা structured নয়, accumulated। অনেকটা দই জমার মতো।

এতে মন্তব্য কি নেই? আছে, কারণ একটা দেখা আছে। সেই দেখা যতই নিস্পৃহ হোক, তার একটা কোণ অবশ্যই আছে। সেই কোণ থেকেই পুরুষটি দুর্বল, নরম কিন্তু মেকি, এবং সেই পুরুষেরই সাজানো দুনিয়ায় মেয়েরা সাধারণ কিন্তু অনেক বেশি প্রোথিত। তারা জানে তারা কারা। তাদের ভুলটাও এক অর্থে ঠিক, কারণ নিজেদের সঙ্গে আলাপে কোনও আবরণ তারা রাখে না।

উল্টোদিকে পিয়ের লাঁশনে— যার নিজের সঙ্গে গোটা ছবি জুড়ে প্রায় একবারও দেখা হয় না— তার চালচিত্র জুড়ে থাকে আধুনিক জীবনের নানান মাপক। প্লেনের আর গাড়ির ড্যাশবোর্ড, এয়ারপোর্টে কার্গোর মন্থর যাত্রা, পেট্রোল পাম্পে ফুয়েলের কাউন্টার, টেলিফোনের ডায়াল, ক্যামেরার অটোমেটিক শাটারের টাইমার, ইলেকট্রিক শেভারের আওয়াজ, হাইওয়েতে বড় বড় কন্টেনারের উদ্ধত যাতায়াত।
থাকে।

আছে বলেই থাকে। মন্তব্যহীন। প্রায়।

La Peau Douce (The Soft Skin), 1964
পরিচালক: ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো
প্রযোজক: আন্তোনিও দা কুনহা তেলেস
চিত্রনাট্য: ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, জঁ-লুই রিশার
চিত্রগ্রহণ: রাউল কুতার
সম্পাদনা: ক্লোদিন বুশে
সংগীত: জর্জ দেলেরু
অভিনয়: জঁ দেশাইয়ি (পিয়ের লাঁশনে), ফ্রাঁসোয়াজ দোর্লেয়াক (নিকোল শোমেত), নেলি বেনেদেত্তি (ফ্রাঁকা লাঁশনে)