ছাত্র রাজনীতি
কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউস। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। ধোঁয়া ওঠা কফি-কাপ নিয়ে জানলার ধারে বসে নীলা। বাইরে তুমুল শোরগোল। সামনে টেবিলের উপর রাখা একটা লিফলেট— ‘আগামীকাল ছাত্র সংসদ নির্বাচন।’
এমন scene-এ নীলাব্জ এসে ঢোকে।
নীলাব্জ: কী, কাল ভোট দেবে না কি?
নীলা: আবার এসে জুটেছ?
নীলাব্জ একগাল হাসে।
নীলা: আমি কি কলেজে পড়ি? আর এসব ফালতু জিনিসে আমি নেই।
নীলাব্জ: মানে?
নীলা: মানে আমি চাই না কলেজে রাজনীতি থাকুক।
নীলাব্জ খুব জোরে হেসে ওঠে। পাশের লোকগুলো ঘুরে তাকায়।
নীলাব্জ: বাহ্! তাহলে এই বয়সে এসেও ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করো না?
নীলা: ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করি। কলেজে পার্টির পতাকা আর ক্যাডার রাজনীতিতে না।
নীলাব্জ: দুটো এক জিনিস নয় কেন?
নীলা: কারণ কলেজটা স্কুল না, আবার বিধানসভাও না। ওটা পড়াশোনার জায়গা। পাওয়ার প্র্যাকটিসের নয়।
নীলাব্জ চেয়ারটা একটু টেনে নেয় টেবিলের দিকে।
নীলাব্জ: শোনো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভুলটা হয় এখানেই। আমরা ভাবি রাজনীতি পরে শিখব। কিন্তু পরে যে আর শেখা হয় না। আর এই রাজনৈতিক অশিক্ষা আমাদের প্রতিদিন বিপদের মুখে ঠেলে ফেলছে। মাথায় চড়ে বসছে একদম অযোগ্যরা।
নীলা: না নীলাব্জ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভুলটা হল— ভাবা যে সব জায়গায় রাজনীতি ঢোকালেই মানুষ সচেতন হয়ে যাবে। হয় না এভাবে। ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যা হয়।
নীলাব্জ: জীবন মানেই তো সমস্যা।
নীলা: কলেজে সেটা বাড়ানোর দরকার কী? দেখো আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, আইভি লিগ কলেজগুলো। সেখানে কি পার্টিভিত্তিক ছাত্র ইউনিয়ন আছে? প্রতিদিন মিছিল? ক্লাস বন্ধ? নেই। তবু ওরা লিডার তৈরি করছে।
নীলাব্জ: ওখানে অন্য ধরনের রাজনীতি হয়।
নীলা: একদম। ইন্টেলেকচুয়াল রাজনীতি। ডিবেট, পলিসি ডিসকাশন, স্টুডেন্ট-গভর্নমেন্ট সম্পর্ক, কত কিছু! কিন্তু কোনও জাতীয় দলের ক্যাম্পঅফিস কেউ খুলে বসেনি ওখানে।
নীলাব্জ: কারণ ওরা এলিট।
নীলা: না। কারণ ওরা কলেজকে কলেজের মতো রাখে। সিঙ্গাপুর দেখো। ওখানে ইউনিভার্সিটিতে রাজনৈতিক র্যালি নেই, পতাকা নেই। ফলাফল কী? রিসার্চ, ডিসিপ্লিন, চাকরি।
নীলাব্জ: তাহলে কি বলছো, ওখানকার মডেলটাই ঠিক?
নীলা: আমি বলছি, ওরা বুঝে গেছে যে, শিক্ষার জায়গায় পাওয়ার-গেম ঢুকলে শিক্ষা মরে।
নীলাব্জ একটা মাছি তাড়ায়।
নীলাব্জ: আর আমি বলছি, রাজনীতি বাদ দিলে ভাল কর্মচারী হয়তো তৈরি হবে। ভাল নাগরিক না।
নীলা: নাগরিকত্ব মানেই কি পার্টি অফিসে পোস্টার মারা?
নীলাব্জ: না। নাগরিকত্ব মানে প্রশ্ন করতে শেখা।
নীলা: সেটা তো ক্লাসরুমেও শেখা যায়। প্রশ্ন করা শিখতে গেলে ইউনিয়ন রুমে দাদাগিরি করে বেড়াতে হয় না।
নীলাব্জ: না যায় না। ক্লাসরুম সবকিছু শেখায় না। রাজনীতি শেখায় কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়।
নীলা: হাসিও না বাবা। এই ঘুরে দাঁড়ানো শেখাতে গিয়ে কলেজে কী হচ্ছে দেখেছ? ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েরা সিনিয়রের চাপে ভোট দিচ্ছে। ফ্লেক্স ছাপছে বাবার টাকায়। মারামারি করছে নেতার জন্য। মেয়েরা হেনস্থা হচ্ছে।
নীলাব্জ: সেটা সিস্টেমের দোষ।
নীলা: সব সময়ে এই উত্তর। কিন্তু সিস্টেম তো মানুষ দিয়েই তৈরি। আমাদের এখানে ছাত্র-রাজনীতি মানেই বাইরে থেকে পার্টি ঢুকে পড়া। কলেজের সমস্যা কলেজেই থাকুক, কলেজকেই মেটাতে দেওয়া হোক।
নীলাব্জ: কীভাবে থাকবে? ফিজ বাড়লে কে প্রশ্ন করবে? হোস্টেলে বৈষম্য হলে কে লড়বে?
নীলা: তাহলে ইউনিয়ন থাকুক। কিন্তু পার্টি কেন?
নীলাব্জ: কারণ ক্ষমতা ছাড়া কেউ শোনে না।
নীলা: এই ভাবনাটাই ভয়ংকর। এটা তো ভুল শিক্ষা। কলেজে ঢুকেই শিখে ফেলো – পাওয়ার না থাকলে তুমি কিছু না। তারপর বাকি জীবনটা ওই ক্ষমতার লোভে হ্যাংলামি করে বেড়াও।
নীলাব্জ একটু চুপ করে থাকে।
নীলাব্জ: নীলা, বলোতো বিভিন্ন দেশের বড় বড় আন্দোলনগুলো কোথা থেকে শুরু হয়?
নীলা: ছাত্রদের থেকে।
নীলাব্জ: তাহলে?
নীলা: এটা অনেক সময়ে অর্ধসত্য। ছাত্রদের সামনে সাজিয়ে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে বড় নেতারাই। আর ফান্ডিং ছাড়া কোনও আন্দোলনই বেশিদিন টানা যায় না। তাই ছাত্ররাও অনেক সময়ে বাধ্য হয় …
নীলাব্জ: তুমি জেনেরালাইজ করে দিচ্ছ পুরো ব্যাপারটা।
নীলা: দেখো, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তখন রুখে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সব সময়ে তা নয়। এখানে রাজনীতি পেশার মতো হয়ে গেছে। কলেজ হচ্ছে রিক্রুটমেন্ট সেন্টার। কে বুদ্ধিমান সেটা নয়, কে বেশি চেঁচায় সেই ব্যাটা লিডার। যেহেতু সিস্টেমটা পুরো দিখাওয়াতে চলে, পার্ফরম্যান্সের কোনও মূল্য নেই, তাই একদম গোড়া থেকেই ঢ্যাঁড়শে ভরে যায় পার্টি। তুমি বলো, দেশ বা সমাজের উপকারের জন্যই যদি রাজনীতি করা হয়, তাহলে সবচেয়ে ওঁচা মালগুলো কেন ঢোকে গিয়ে শিবিরে? যে-ছাত্র মাইক্রোসফ্ট বা গুগল বা জেপি মর্গানে চাকরি পেয়ে যাবে, সে কোনওদিন করবে এই ক্যাডারগিরি? কলেজে পড়তে গেছিস না গুন্ডামি করতে? আইনস্টাইন কোনও দলের হয়ে স্লোগান দিচ্ছে, এটা ভাবতে পারছ?
নীলাব্জ একটু হেসে নেয়। হাসিটা একটু ক্লান্ত, একটু কটাক্ষের।
নীলাব্জ: তুমি ধরেই নিচ্ছ, বুদ্ধিমান মানেই কর্পোরেট চাকরির লাইনে দাঁড়ানো। মাইক্রোসফট–গুগল–জেপি মরগ্যান—এই তিনটে নামই কি মেধার সার্টিফিকেট? যে মানুষটা অন্যায় দেখে চুপ থাকতে পারে না, যে বুঝতে পারে সিস্টেম কোথায় ঠকাচ্ছে, সে কি কম বুদ্ধিমান?
(একটু থামে)
আর আইনস্টাইনের কথা তুলছ? আইনস্টাইন কিন্তু যুদ্ধের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, নিউক্লিয়ার অস্ত্র নিয়ে অনুশোচনা করেছিলেন। সেটা কি রাজনীতি নয়? স্লোগান দিলেই রাজনীতি ছোট হয়ে যায় আর চুপ করে ল্যাবরেটরিতে থাকলেই মানুষ বড়— এটা কার বানানো ধারণা?
নীলা: সেটা করতে তাঁকে ছাত্র রাজনীতি করতে হয়নি। এমনিই পেরেছে।
নীলা আরও কিছু বলতে যাবে, নীলাব্জ হাত তুলে থামায়।
নীলাব্জ: আর ‘ওঁচা মাল’ ঢোকে শিবিরে— এই কথাটা খুব অনায়াসে বলা যায়, কারণ তুমি ধরে নিচ্ছ ওরা সবাই সুযোগসন্ধানী।
নীলা: আলবাত সুযোগসন্ধানী। যে একটু কাজ পারে, তাকে নেতা ধরতে হয় না।
নীলাব্জ: তুমি বুঝতে চাইছ না যে, সবাই এক জায়গা থেকে উঠে আসে না। এমনও পিছিয়ে পড়া মানুষ রয়েছে, যাদের প্রতিদিন বেঁচে থাকতে রাজনীতির প্রয়োজন। কাজ পারা নয়, কাজের জায়গাটা অবধি পৌঁছতেও তারা পারছে না। তাদের হাত ধরতে হয়।
নীলা: ইচ্ছে করে তফাৎটা রাখা হয়েছে যাতে ব্যবধানটা থাকে। সারাজীবন যেন এরা হাত পেতে চাইতে থাকে।
নীলাব্জ: তুমি আসলে গ্রাউন্ড রিয়্যালিটি থেকে এত দূরে… যাক গে। আর হ্যাঁ, ‘কলেজে পড়তে গেছিস না গুন্ডামি করতে’— এই লাইনটাও খুব জনপ্রিয়। কিন্তু বাস্তবে কলেজে মানুষ যায় জীবন বুঝতে। কারও ক্ষেত্রে সেটা বই দিয়ে হয়, কারও ক্ষেত্রে সংঘর্ষ দিয়ে। দুটোই সত্যি। ছাত্র রাজনীতি তুলে দিলে গুন্ডা উধাও হয়ে যাবে, এই ভদ্রলোকি কল্পনাটা খুব বিপজ্জনক।
নীলা: তুমি কি অন্ধ? আমাদের নেতারা ভোট ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবে? বুঝতে চাইছ না, এই ছাত্রগুলো ওদের কাছে জাস্ট কয়েকজন ভোটার। এদের থেকে ভোট পেয়ে গেলেই সবাই হ্যাপি। এবং একদম অল্প বয়স, কচি বয়স থেকেই শুরু করা যাবে মগজ ধোলাই।
নীলাব্জ সামনের লিফলেটটা তুলে নেয়।
নীলাব্জ: তুমি ভোট দিতে না?
নীলা: না। আমি প্রাইভেট কলেজে পড়েছি, ওখানে এত ঝামেলা…
নীলাব্জ: সরকারি কলেজে পড়লে কি দিতে?
নীলা: না।
নীলাব্জ: এটাতো পালিয়ে যাওয়া। এটাই তো সমস্যা।
নীলা: না। পালানো নয়। আমি অল্প বয়স থেকেই জানি, আমাকে বেঁচে থাকতে হবে লড়াই করে। নিজের স্কিল বেচে। আজকে আমাদের যে সরকার-ই আসুক, ডেমোক্রেসি থাক, রাজা আসুক, ডিক্টেটর আসুক, যা খুশি হয়ে যাক, আমাকে আমার কাজ করে যেতে হবে। তবে আমি নিজের মতো, সৎ ভাবে বেঁচে থাকতে পারব। কোনও পার্টির করুণার পাত্রী হয়ে না। ভাতাজীবি হয়ে না।
নীলাব্জ: সেই কাজই যদি তোমার না থাকে? যদি তোমার স্কিলের মূল্য দেওয়ার সিস্টেমটাই না থাকে? তোমাকে প্রতিবাদ করতে হবে না?
নীলা: খুব দরকার হলে নিশ্চয় প্রতিবাদ করে নেব। সেটা আমাকে কলেজের এই নোংরা রাজনীতি করে শিখতে হবে না।
নীলাব্জ জানলার বাইরে তাকায়।
নীলাব্জ: জানো, ক্ষমতা কাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়?
নীলা: কাকে?
নীলাব্জ: রাজনৈতিকভাবে সচেতন একজন ‘ইয়ুথ’কে।
নীলা: রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকাটা আমি অবশ্যই সমর্থন করি।
নীলাব্জ: তাহলে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবলেমটা কী?
নীলা: প্রবলেম হল কলেজের ভেতর বলে।রাজনৈতিক এক্সপোজার দিতে গিয়ে পিছু পিছু পার্টি ঢুকে যাচ্ছে। সচেতনতা জাগানোর দরকার হলে সবার জন্য সিলেবাসে নাহয় পল সাইন্সের একটা পেপার …
নীলাব্জ: ধুস! ওভাবে হয় না কি?
নীলা: আর কী উপায়? রাজনীতি করে-করে সব কলেজগুলোর তো শেষ অবস্থা আমাদের এখানে! দেখতে পাও না?
নীলাব্জ: সেটা আমাদের সিস্টেমের সমস্যা!
নীলা: ঘুরে ফিরে সেই এক কথা… বিরক্তিকর!
কফিহাউসের ভেতরে শোরগোল বাড়ে। অন্য টেবিলে অন্য কিছু একটা তর্ক বেঁধেছে। দুই তরুণ উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকে। এসবের মধ্যেই ওরা দু’জনে চুপ করে বসে থাকে।
ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী




