সাক্ষাৎকার: বিপুলজিত বসু

Representative Image

ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাওয়ার্ডে ২০২৫ সালে দুটো বিভাগে নমিনেশন পেয়েছে কলকাতার বুকে বাংলাভাষায় তৈরি হওয়া ফিল্ম, ‘রেডলাইট টু লাইমলাইট’— বেস্ট রাইটিং এবং বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফি। ইউকে, নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরি, নেপাল-সহ নানা দেশের আন্তর্জাতিক ফিল্মোৎসবে সাড়া জাগিয়েছে এই ডকুমেন্টারি। ডাকবাংলা.কম-এর তরফে, সিনেমাটির লেখক-পরিচালক বিপুলজিত বসুর সঙ্গে কথা বললেন উদয়ন ঘোষচৌধুরি।

কালীঘাটের পতিতাপল্লির কয়েকজন বাসিন্দা নিজেদের উদ্যোগে সিনেমা বানায়— এরকম একটা বিষয় কীভাবে খুঁজে পেলে?

আমি মূলত সোশ্যাল ওয়ার্কের ছেলে। আমার পড়াশোনা, কাজকর্ম— সব ওই বিষয়েই। আমাদের আশপাশে যেসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। আগে এটাকে বলতাম, ‘মিডিয়া অ্যাডভোকেসি’। মানে, এদের কথাগুলো সকলের সামনে তুলে ধরার জন্য মূলধারার মিডিয়াকে কাজে লাগানো। কারণ, মূলধারার মিডিয়া সাধারণত এদের কথা বলে না। মোটামুটি ২০০৬-০০৭ সাল থেকে এই প্রান্তিক মানুষদের কাহিনি, বহুস্বরের গল্প মিডিয়াতে নিয়ে আসার কাজ বা চেষ্টা আমি করছি। আগে কিছু প্রোগ্রাম প্রোডিউস করেছি, কয়েকটা সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু, আমার একটা বড় পরিসর দরকার ছিল, যেখানে একসঙ্গে অনেক মানুষের কাছে এদের কথা পৌঁছে দেওয়া যাবে আর সেইসব মানুষের মনে খানিকটা হলেও একটা প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ, জনমত গড়ে তোলার জন্য সবথেকে কার্যকর মিডিয়াকে ব্যবহার করা। আর, সেটার জন্য এখনও পর্যন্ত সিনেমার থেকে বড় কিছু হয়ে ওঠেনি।

মাঝে ২০১৪-১৫ নাগাদ বাংলা সিনেমা বিদেশে ডিস্ট্রিবিউট করতাম। সেটা করতে গিয়ে ইওরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার কোরিয়া বা জাপানের আন্তর্জাতিক সিনেমা-জগতের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হল। আমার সামনে যেন সম্পূর্ণ নতুন একটা দরজা খুলে গেল। কলকাতা বা মুম্বইতে আমরা যেভাবে সিনেমা দেখতে বা সেটা নিয়ে চর্চা করতে অভ্যস্ত, তার পিছনে যে সিস্টেমটা— ডিস্ট্রিবিউশন বা অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছনো— সেটার সঙ্গে ওদের সিস্টেমের তুলনা করলে বুঝতে পারবে, একটা বিরাট গুণগত তফাৎ রয়েছে। ভারতীয় সিনেমায় সাধারণত বহুস্বরের গল্প দেখানো হয় না। কিন্তু, ওরা সারা দুনিয়া থেকে এই ধরনের গল্প খুঁজে আনছে আর সেগুলোর ভিত্তিতে সিনেমা তৈরি করছে।

কালীঘাটের এইসব মানুষের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় ২০১৮ সাল থেকে। প্রথমে এদের নিয়ে একটা শর্ট ফিল্ম বানালাম। বুঝতে চেষ্টা করলাম, যেটা বলতে চাইছি, সেটা বলতে পারছি কিনা। ওটা কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে, এনএফডিসি ফিল্ম বাজারে নির্বাচিত হল। তখন বুঝতে পারলাম, এবার এদের নিয়ে বড় পরিসরে ফিচার তৈরি করার ব্যাপারে ভাবতে হবে। ‘রেডলাইট টু লাইমলাইট’-এর কাজ শুরু করেছিলাম ২০২০ সালে। তখন কোভিড চলছে। শুটিং শুরু হয়েছিল ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে, শেষ হয়েছিল ২০২৪-এর আগস্টে।

আরও পড়ুন: সাক্ষাৎকার। রিচা ঘোষ

তারপর এডিট হয়েছে?

না, এডিট শুরু হয় ২০২২ সাল থেকে। শেষ হয়েছিল ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে।

ছবি তৈরির জার্নিটা কেমন ছিল?

শুরুতে আমার কাছে টাকাপয়সা তেমন কিছু ছিল না। কাজ করতে-করতে নানা জায়গায় অ্যাপ্লিকেশন পাঠাতে আরম্ভ করলাম। আস্তে-আস্তে এই ছবিটাকে সানড্যান্স, বিবিসি, আইডিএফএ, হটডকস— এরা ফান্ড করল। লাটভিয়া সরকারের কাছ থেকে ফান্ড পেলাম। এসব জায়গায় ফান্ডিংয়ের জন্য সারা পৃথিবী থেকে কয়েক হাজার প্রোপোজাল জমা পড়ে। সেখান থেকে হয়তো ১০-১৫টা ছবি বেছে নেওয়া হয়। পুরো ব্যাপারটাই চূড়ান্ত প্রতিযোগিতামূলক।

সিনেমাটা শেষ হওয়ার পর প্রিমিয়ার হল শেফিল্ড ডকফেস্টে। গত ৬ মাসে বিশ্বের প্রায় ১২টা প্রথমসারির ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নির্বাচিত হয়েছে এটা। আমি আশাও করিনি যে, ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনে দু’খানা নমিনেশন পেয়ে যাবে ছবিটা। ওটা অস্কারের সমতুল্য। তবে, আমার কাছে সবথেকে আনন্দ যেটা, লোকজন এই ছবিটা নিয়ে কথা বলছে। এইসব প্রান্তিক মানুষের কথা তাদের মনে সাড়া ফেলছে।

বিপুলজিত বসু

তাহলে সোশ্যাল ওয়ার্কের সূত্রে যাতায়াত করতে-করতে কালীঘাটের এই জনগোষ্ঠীর এরকম কাজকর্ম খুঁজে পেয়েছিলে?

হ্যাঁ, একদমই। আমি বহুদিন ধরে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছি। ফলে, সেই অ্যাক্সেসটা আমার কাছে ছিল বা আছে। আসলে, এই ধরনের সিনেমা তৈরি করা একটা লম্বা প্রসেস। আজ ভাবলাম আর কাল হয়ে গেল— এরকম মোটেই নয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটা না থাকলে, শেষ পর্যন্ত সবকিছু সুষ্ঠুভাবে করা হয়ে উঠত না। যে-কোনও প্রান্তিক অরক্ষিত মানুষদের সঙ্গে কাজ করা, তাদের ৪-৫ বছর নিজের কাছে ধরে রাখা, নিজের কাজের সঙ্গে যুক্ত রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ওই সোশ্যাল ওয়ার্কের স্কুলিং না থাকলে আমার পক্ষে এটা করা সম্ভব হত না।

তুমি যখন ফিল্মমেকিং টিম নিয়ে ওখানে পৌঁছলে, তখন ওদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? কোনও বাধা এসেছিল?

আমাকে একজন একটা খুব জরুরি কথা বলেছিল, আমি কীভাবে কোনও জনগোষ্ঠীকে দেখছি বা অনুভব করছি, সেটার থেকেও বড় ব্যাপার হল সেই জনগোষ্ঠী আমাকে কীভাবে দেখছে বা অনুভব করছে। শুধু আমি বা আমার টিম ওদের সঙ্গে কাজ করছি, তা নয়। উলটোদিক থেকে ওরাও কিন্তু আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। আমি সবসময়ে মনে করি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ‘কালেক্টিভ ইন্টেলিজেন্স’ যে-কোনও আপার এলিট ক্লাসের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে থাকে। তাই, যখন একেবারে বাইরে থেকে একটা টিম গিয়ে তাদের সঙ্গে পরিচয় করছে, একটা বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করছে, তারপর সকলে মিলে একটা লক্ষ্যে চলতে শুরু করছে— তখন কোনও একজন থাকল কিনা, টিম থেকে চলে গেল কিনা, সেসব গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিষয়টা তখন ব্যক্তিগত নয়। কারণ, কাজটা হয়ে উঠেছে একটা সমবেত লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য সকলের অংশগ্রহণ।

যে-কোনও ইন্টারন্যাশনাল সার্কিটে যদি এইধরনের প্রোজেক্ট-ফান্ডিংয়ের জন্য অ্যাপ্লাই করো, তাহলে সেখানের কর্তাব্যক্তিদের প্রথমেই একটা জিনিস বোঝাতে হবে। সেটা হল, দুনিয়ায় আরও অনেক দক্ষ ফিল্মমেকার আছে, যারা এই একই বিষয় নিয়ে আরও ভাল ছবি বানাতে পারবে। তাহলে তোমাকে কেন ফান্ড দেওয়া হবে? এটা সবসময়ে ব্যাখ্যা করতে হয়। আমি বলেছিলাম, এই যে পিছনের দীর্ঘ প্রসেসটা, সেটা সকলের কাছে নেই। সেটা থাকা দরকার। নইলে, বিশ্বের তাবড়-তাবড় অর্গানাইজেশন এই কাজে টাকা দেবে না। কোনও ভুঁইফোঁড় কেউ এসে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবে কি না বা কাজটা করতে পারবে কি না— সেটা ওদের কাছে মুখ্য মাথাব্যথা নয়। মুখ্য হল, কাজটা করার পিছনে তার যে দূরদর্শিতা আর অনুসন্ধান, সেটা কতটা মজবুত। এটা বুঝতে পারলে, তখন ওরা কীভাবে সহযোগিতা করবে, সেইসব আলোচনা শুরু হয়। সুতরাং, ক্যামেরার সামনে যেটা ঘটছে, সেটার থেকেও প্রয়োজনীয় বিষয় হল ক্যামেরার পিছনে কী-কী ঘটছে।

আমাদের সঙ্গে ওদের যে গুণগত তফাতের কথাটা বলছিলাম, এটাই সেই তফাৎ। ইওরোপ বা আমেরিকায় যেভাবে ‘বিহাইন্ড দ্য ক্যামেরা’ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, আমি দেখেছি, ভারতে সেটা হয় না। ফিল্মের মেকিং প্রসেসটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় না। ধরো, তুমি রোজ নিয়ম মেনে ব্যায়াম করে শরীরটা সুন্দর গড়ে তুলছ। বাইরে থেকে মানুষ কিন্তু তোমার দেহসৌষ্ঠব দেখছে, কেউ পিছনের ওই অধ্যবসায়টা দেখছে না। আমাদের দেশে যাবতীয় তোড়জোড় থাকে সামনে দেখানোর জিনিসটা নিয়ে। আমরা গত ৫ বছর ধরে মাত্র একটা ছবি বানিয়েছি। কিন্তু তাতে আমাদের সকলের যে-অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটা পরের ছবিতে আরও কাজে লাগবে। এই চিন্তাটাকে ভারতে পাত্তাই দেওয়া হয় না।

ডকুমেন্টারিতে রাইটিং ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলো। আমাদের অনেকের কাছেই এটা শুনতে বেশ আশ্চর্য লাগে।

আমরা বাঙালিরা বা ভারতীয়রা এখনও ডকুমেন্টারি বলতে যা বুঝি, আর বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ডকুমেন্টারি যেখানে পৌঁছে গিয়েছে, দুটোর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। একটা উদাহরণ দিই। তুমি যদি বার্লিনালেতে কোনও ডকুমেন্টারি প্রোজেক্টের ফর্ম ফিল-আপ করো, দেখবে যেখানে ডিরেক্টর-প্রোডিউসার সকলের নাম দিতে হয়, সেখানে রাইটারের নামও দিতে হয়। এই বার্লিনালে হল পৃথিবীর সেরা সেরা সিনেমা নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে অন্যতম। তাহলে বুঝতে হবে, ডকুমেন্টারি সম্বন্ধে আমাদের আর ওদের বোধের মধ্যে বিশাল ফারাক হয়ে গিয়েছে।

এই মুহূর্তে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফিকশন আর নন-ফিকশনের সীমারেখা প্রায় নেই বললেই চলে। প্রথমসারির সার্কিটে যেসব নন-ফিকশন এখন দাপিয়ে ঘুরছে, সেগুলো যে-কোনও ফিকশনের থেকে দশ কাঠি ওপরে। সেসব ছবির ট্রিটমেন্ট, ভিজুয়াল ল্যাঙ্গোয়েজ সাংঘাতিক উঁচু মানের। আর, সেগুলো সবই কাহিনি-নির্ভর। আমরা এখানে মোটামুটি দুটো প্রাথমিক শ্রেণিভাগ করি— ফিকশন আর ডকুমেন্টারি। আমার ব্যক্তিগত মতে, প্রাথমিক শ্রেণিবিভাগটা এরকম হওয়া উচিৎ — কাহিনি-নির্ভর আর কাহিনি-নির্ভর নয়। কাহিনি-নির্ভর হলে, তখন ফিকশন আর ডকুমেন্টারি। এবং, কাহিনি-নির্ভর না হলে যেসব সাবেক ধাঁচের ডকুমেন্টারি আছে, সেগুলো হতে পারে।

ইওরোপ-আমেরিকায় ফান্ডিং খুঁজতে গেলে, প্রথমেই জানতে চায়, যে-ডকুমেন্টারিটা বানাবে সেটার গল্পটা কী, সেটার আর্টিস্টিক ট্রিটমেন্ট কী হবে। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, যে-মানুষটাকে বা ঘটনাটাকে আমি দেখিনি, সেটার গল্প বা ট্রিটমেন্ট আগে থেকে কীভাবে বুঝব। ফিকশনের ক্ষেত্রে ঘরে বসে কল্পনা করে একটা গল্প লিখতে পারো। কিন্তু, নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে গল্পটা কীভাবে এগোবে বা কোথায় শেষ হবে, সেটা আগেভাগে বোঝা সম্ভব নয়। তাহলে ওরা কেন এটা জানতে চায়? একেবারে মূল কারণ হল, ওদের কাছে ফিকশন আর নন-ফিকশনের গণ্ডিটা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছে।

একটা জিনিস মনে রাখা দরকার। দর্শক যখন কোনও ফিকশন দেখতে আসে, সে জেনে-বুঝেই আসে যে, যেটা পর্দায় চলছে সেটা মিথ্যে বা কাল্পনিক। ফলে, হাজার-হাজার গণহত্যা হয়ে গেলেও, তার কোনও হেলদোল হয় না। কিন্তু, নন-ফিকশন ফিল্মমেকার দর্শকের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। কারণ, দর্শক সেখানে সত্যি ঘটনা দেখতে আসে। তাই, সেক্ষেত্রে একটা থাপ্পড় বা একফোঁটা চোখের জল তাকে সাংঘাতিক প্রভাবিত করতে পারে।

এখনকার ডকুমেন্টারিতে যেরকম ট্রিটমেন্ট আর ড্রামা ব্যবহার করা হয় বা করতে হয়, সেটা ফিকশনের থেকে কোনও অংশে কম নয়। তফাৎ হল, প্রথমটায় থাকে বাস্তব ঘটনা আর দ্বিতীয়টায় থাকে কাল্পনিক কাহিনি। ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার গল্পের কিছুটা অনুমান করে, দীর্ঘদিন ধরে সেই মানুষটাকে বা ঘটনাটাকে নিয়ে গবেষণা করে। সেটার ভিত্তিতে তার কাজ এগোয়। তুমি যদি কারও সঙ্গে এক বছর ধরে ঘনিষ্ঠভাবে মেশো বা কথা বলো, তাহলে অনুমান করতে পারবে পরবর্তী তিন বছরে সেই মানুষটা কী-কী করতে পারে। সেই অনুমান থেকে একটা কাহিনি তোমার মাথায় চলতে শুরু করে।

তারপর সেই আনুমানিক কাহিনি অবলম্বনে শুটিং আরম্ভ করলে। তখন দেখলে, তোমার অনুমান কোথাও ওপর-নীচ হল বা একই ট্র্যাকে চলতে থাকল। শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখলে, অনুমানটা ৯০% মিলেছে, ১০% মেলেনি। বা, উলটোটা হল, ৯০% মেলেনি, ১০% মিলেছে। ডকুমেন্টারিতে এই দুটো সম্ভাবনাই থাকে। এই ধরনের কাজে সেটাই মজা। ফিকশনের ক্ষেত্রে শুট শুরু করার সময়েই জানো, কোথায় গিয়ে থামবে বা শেষ করবে। কিন্তু, নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে শুরুটা জানো, শেষটা কী হবে জানো না। হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করেছ, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না ওখানেই শেষ হবে কিনা। এইভাবে মিলিয়ে-মিশিয়ে চলতে থাকাই একজন ডকুমেন্টারি রাইটারের কাজ।

ফান্ডিংয়ের অ্যাপ্লিকেশন করার সময়ে কি কোনও আনুমানিক স্ক্রিপ্ট জমা দিয়েছিলে?

না, স্ক্রিপ্ট মানে ঠিক প্রথাগত স্ক্রিন-প্লে ফরম্যাট নয়। ওরকমভাবে আমি কিছু লিখিনি। নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে সাধারণত স্ক্রিপ্ট জমা দিতে হয় না। ওরা রাইটারের নামটা চায়। আর চায় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান। মানে, কাহিনি যেভাবে এগোবে বলে ভেবেছ বা মনে করেছ, সেটা লিখতে হয়। প্রায় ৪-৫ হাজার শব্দসংখ্যা দেওয়া থাকে। সেখানে এই কাহিনি, ট্রিটমেন্ট ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ৩০-৪০ পাতা লিখতে হয়। সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ অনুমান নয়। একটা গবেষণা-ভিত্তিক, যুক্তিসম্মত আর দূরদর্শিতা মেশানো জিনিস, যেটা তুমি ১০০% স্থির বুঝতে পেরেছ, সেখানে পৌঁছতে পারবেই। এটাই রাইটারের মুনশিয়ানা। ফিকশন রাইটারের দরকার কল্পনাশক্তি আর নন-ফিকশন রাইটারের দরকার অনুমানশক্তি।

‘রেডলাইট টু লাইমলাইট’-এর ক্ষেত্রে আমি যেরকম ভেবেছিলাম, শুটিংয়ে সেটার প্রায় ৭৫% ঘটেছে। তবে, অন্যান্য অনেক ছবির ক্ষেত্রে এরকম হয় না। যদিও, এই গোটা জগতটা যারা চালায় বা সাপোর্ট করে, তারা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল যে, অনুমানের সঙ্গে প্রকৃত বাস্তব না-ও মিলতে পারে। অনেক কিছু ওপর-নীচ হয়। সেটা তাদের কাছে গ্রাহ্য বিষয়। এই ধরনের কাজে যেমন-যেমন ফুটেজ পাওয়া যায়, পাশাপাশি তেমন-তেমন এডিট চলতে থাকে। কারণ, বুঝতে হয় ফিল্ডে বা লোকেশনে যেটা পেলাম, সেটা ঠিক ট্র্যাকে চলছে কিনা। এই অবিরাম প্রক্রিয়াটা ওই সাপোর্ট দেওয়ার মানুষেরাও লাগাতার দেখতে থাকে এবং মতামত জানাতে থাকে।

এই ধরনের ফিল্মমেকিং একেবারেই টিম-ওয়ার্কের ফলাফল। ধরো, ৪-৫ বছর ধরে কাজ করতে-করতে কাহিনির গতি বদলে যেতে পারে। কোনও প্রধান চরিত্র মারা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ছবির কাজ তো থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তখন ভাবতে হবে কাহিনিটা কোন দিকে যেতে পারে। তাই, নির্দিষ্ট সময় অন্তর পুরো টিম কাজটা দেখে আলোচনা করে যে, এরপর কী করা হবে।

ধরো, অনুমান করে ভেবেছ একটা ঘটনা ঘটবে। বাস্তবে সেটা ঘটল না। তখন কি সেটা কোনওভাবে বানিয়ে শুট করবে?

না, বানানোর প্রয়োজন হয় না। ‘রেডলাইট টু লাইমলাইট’ শুট হয়েছে ৪ বছর ধরে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৬০ ঘণ্টার ফুটেজ ছিল। প্রথম ২ বছর যেটা শুট করেছি, সেটা জাস্ট ফেলে দিয়েছি, ওটা কোনও কাজেই লাগেনি। পরের ২ বছরের ফুটেজটা কাজে লেগেছে। এখানে পরিস্থিতিটা তোমার নিয়ন্ত্রণে নেই। যেমন যেমন ঘটছে, সেগুলো যতদূর তোমার অনুমানের সঙ্গে মিলছে, সেইসব নিয়ে বসছ এডিটিং টেবিলে। এই ধরনের কাজে এডিটরকে বলা হয় কো-রাইটার। এবং, অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন এডিটর নয়, গোটা এডিটোরিয়াল টিম থাকে। তারা লাগাতার ইনপুট দিতে থাকে। প্ল্যান এ থেকে প্ল্যান বি হলে বা প্ল্যান বি থেকে প্ল্যান সি হলে কাহিনি কীভাবে এগোবে, সেই প্রস্তুতিটা করে রাখতে হয়।

এই ধরনের কাজে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল ছোট-ছোট ‘মোমেন্ট ক্যাপচার করা’। কোথাও কখনও টেকনিক্যাল ভুলচুক হলে ‘রি-টেক’ করার কোনও জায়গা নেই। ‘এন-জি’ বলে এখানে কিছু হয় না। সাউন্ড বা লাইটের কোনও সমস্যা হলে সেটা আবার ঠিক করতে পারবে না। কারণ, ওই মুহূর্তটা বেরিয়ে গিয়েছে। নন-ফিকশনের চরিত্ররা একটা মুহূর্ত ‘রি-ক্রিয়েট’ করতে পারবে না। কারণ, তারা অভিনয় করছে না। আমাদের শুটিংয়ের প্রথম ২ বছরের ফুটেজে প্রচুর ‘এন-জি’ ছিল, তাই অনেক ‘মোমেন্ট’ রাখতে পারিনি। সেগুলো রাখতে পারলে এই কাহিনি হয়তো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠত।

এই ‘মোমেন্ট ক্যাপচার করা’-র ব্যাপারটা সবসময়ে কতটা সত্যনিষ্ঠ হয়?

সম্পূর্ণভাবেই সত্যনিষ্ঠ হয়। ধরো, শৌনক সেনের ছবি, ‘অল দ্যাট ব্রিদস’। আমি শৌনকের কাছ থেকেই শুনেছি, ওর কাছে মোট ফুটেজ ছিল ৬০০ ঘণ্টার। কিন্তু, ছবিটা তো মাত্র দেড় ঘণ্টার! তাহলে, ওই ৬০০ ঘণ্টায় কী আছে? ওখানে ওইসব টুকরো মুহূর্ত আছে, যেগুলো গেঁথে সাজিয়ে দর্শকের সামনে কাহিনিটা তুলে ধরা হয়েছে।

শৌনকের ছবিটা সম্পূর্ণভাবেই ডকুমেন্টারি। কিন্তু, ওখানে ফিকশন স্টোরিটেলিংয়ের কিছু টুলস আর টেকনিক ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও, এই টুলস আর টেকনিক দুম করে একদিনে আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়। ব্যাপারটা হল, তথাকথিত নন-ফিকশনে আর ফিকশনে শট-টেকিংয়ের ধরন আলাদা। ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে আমরা ‘সিন’ বলি না, বলি ‘রিয়েল-লাইফ ইভেন্ট’। আমার সামনে যে-বাস্তব ঘটনাটা ঘটছে, সেটাকে যদি সিনেমাটিক ভাষায় দক্ষতার সঙ্গে ফিল্মে ট্রান্সলেট করতে পারি, তাহলে সেটা দেখতে ফিকশনের মতোই লাগবে। পাশ্চাত্যে ডকুমেন্টারির বোধটা এই মুহূর্তে সেখানে পৌঁছে গিয়েছে। বাস্তবটা দেখতে-দেখতে যখন লিখছি বা শুটের পর এডিট টেবিলে বসছি, তখন যদি নাটকীয় জায়গাগুলো ঠিকমতো সাজাতে পারি, তাহলে সেটাই আসল মুনশিয়ানা।

আরেকটা উদাহরণ দিই। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডিসকভারি বা অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে যেসব ছবি দেখছ, সেখানে যেটা করা হয়— ক্যামেরাকে ‘ফ্লাই অন দ্য ওয়াল’ মোডে রেখে দেওয়া হয়। ক্যামেরাটা দিনের পর দিন একই জায়গায় পড়ে থাকছে। মানে, একটা মাছি বা টিকটিকি দেওয়ালে বসে ২৪ ঘণ্টা তোমাকে দেখছে, সিসিটিভি-র মতো। আমার মনে হয়, সিসিটিভি-র ফুটেজ দিয়েও দুর্দান্ত সিনেমা বানানো যেতে পারে।

কল্পনা করো, তোমার সামনে একটা উন্মুক্ত খোলা মাঠ। সেটার একদিকে ঘন জঙ্গল, আরেকদিকে গভীর গিরিখাত। জঙ্গলে সব ভয়ংকর জন্তু-জানোয়ার আছে। মাঠটায় কিছু বাচ্চাকাচ্চা খেলাধুলো করে। এবার, তুমি জানো না, বাচ্চাগুলো যখন খেলবে, তখন জঙ্গল থেকে বাঘ এসে ওদের খাবে কিনা বা কেউ খাদের মধ্যে পড়ে যাবে কি না। বাচ্চাদের খেলা কিন্তু বন্ধ করা যাবে না, তাহলে সেটা ‘নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি’ হয়ে যাবে। তুমি যেটা করতে পারো, মাঠটাকে বেড়া দিয়ে ঘিরে দিতে পারো। অর্থাৎ, তুমি বিপদটাকে বাধা দিয়ে বাচ্চাদের খেলাটাকে বা কাজটাকে সম্পূর্ণ করতে দিলে।

ঠিক সেরকমই নন-ফিকশন ফিল্মমেকিংয়ে চরিত্রদের কাজ করতে দাও তাদের নিজেদের মতো, কিন্তু একটা অদৃশ্য বেড়া দিয়ে দাও। ওই বেড়াটা হল তোমার সিনেমাটিক কন্ট্রোল। যাতে তোমার যে অনুমান, চরিত্ররা যেন যতটা সম্ভব সেটার ভেতরেই থাকে। কারণ, শেষমেশ জিনিসটা সিনেমা। অনন্তকাল ধরে অনন্ত টাকা খরচ করে শুটিং করা সম্ভব নয়। ফিকশনের ক্ষেত্রে ওই বেড়াটা তো থাকেই, সেই সঙ্গে ঠিক কোন জায়গায় খেলবে, কতক্ষণ খেলবে — সেইসব আগেভাগে বলে দেওয়া হয়। নন-ফিকশন করতে হলে, শুধু বেড়াটা দিয়ে দাও। কিন্তু, খেলার স্বাধীনতা আটকে দিও না।

বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে থাকলেও, কালীঘাটের এইসব চত্বরে স্থানীয় দাদাগিরি, গুন্ডামি-মস্তানি সম্বন্ধে সকলেই মোটামুটি জানি। তাদের কীভাবে সামলেছ?

যেটা আগে বললাম, তোমার কাজটাকে যদি যৌথ বা সমবেত লক্ষ্য করে তুলতে পারো, তাহলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, সিনেমাটা কারও একার নয়। একটু-একটু করে তোমার পাশে দলটা যখন বাড়তে থাকবে, প্রায় গোটা জনগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে তোমাকে সাপোর্ট দেবে— সেই দলগত প্রচেষ্টাকে কে-না সমীহ করবে! তখন ওইসব খুচরো গুন্ডা-মস্তান জাস্ট উড়ে যাবে।

‘রেডলাইট টু লাইমলাইট’-এ কয়েকজন ‘কাস্টোমার’-কে দেখানো হয়েছে। এরাও কি বাস্তব চরিত্র?

হ্যাঁ, সবাই বাস্তব। যদিও সবাইকে সামনে থেকে ক্যামেরায় ধরা হয়নি, মাত্র একজনের মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। এই ধরনের কাহিনিতে লক্ষণীয় চরিত্র হিসেবে যাকে যাকে ক্যামেরাতে ধরা হয়, সকলকে ‘অ্যাপিয়ারেন্স রিলিজ অর্ডার’ সই করতে হয়। মানে, তাকে পর্দায় দেখালে তার কোনও আপত্তি নেই। যে-ভদ্রলোককে দেখানো হয়েছে, তার সম্পূর্ণ সম্মতি ছিল। সেটার পিছনেও পুরোপুরি কৃতিত্ব ওখানকার মহিলাদেরই। তারাই তাদের সম্পর্কের খাতিরে তাকে রাজি করিয়েছে।

সেই ভদ্রলোকের দিক থেকে ভাবলে, খুবই সাহসের পরিচয় বলতে হবে।

সত্যি বলতে, এটা একটা সামাজিক ‘ট্যাবু’ ছাড়া কিছু নয়। সমাজের অসম্মতিতে যৌনকর্ম করলে, সেটা নিয়ে আমাদের প্রচুর আপত্তি থাকে। সমাজের সম্মতিতে যৌনকর্ম করলে, সেটা যেমনই হোক না কেন, আমাদের কোনও আপত্তি থাকে না। যৌনতা কিন্তু মানুষের ব্যক্তি-অধিকার। ভারতীয় আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের ওপরে পারস্পরিক সম্মতিতে যৌনকর্ম করা কোনও অপরাধ নয়। সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে যে, যৌনকর্মীরা অন্য যে-কোনও জীবিকার মানুষের মতো সমান মর্যাদার অধিকারী। এই কাজটা মোটেও কোনও অপরাধ নয়। সুতরাং, যে পেশাটা জাস্ট একটা পরিষেবা, আইনের চোখে যেটা অপরাধ বলে গণ্য নয়— সেই পরিষেবাটা যদি আমার সামর্থ্য মতো পয়সা দিয়ে কিনি, রাষ্ট্রের কাছে সেটা কোনও সমস্যা নয়। সমস্যাটা হল সমাজের ওই চোখ-রাঙানি।

বিশ্বের বাজারে ডকুমেন্টারির পরিস্থিতি এখন কীরকম?

আমি কিছুদিন আগেই অ্যামস্টারডাম থেকে ফিরলাম। আমাদের ছবিটা নিয়ে ওখানে ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিলাম। সেখানে জানতে পারলাম, নেদারল্যান্ডসে এখন সারাবছরে যতগুলো ছবি রিলিজ হয়, তার মধ্যে মাত্র ৫% ফিকশন, বাকি ৯৫% নন-ফিকশন। মানে, নন-ফিকশনের অডিয়েন্স ওখানে অনেক বেশি। এবং, তারা বিভিন্ন জঁরের, বিভিন্ন ট্রিটমেন্টের নন-ফিকশন দেখতে অভ্যস্ত। সেইজন্যই ওখানে এই বিরাট বাজার তৈরি হয়েছে।

একটু অন্য প্রসঙ্গ হলেও বলি, কারণ এটাই প্রকৃত ঘটনা। নন-ফিকশনের অডিয়েন্স কিন্তু সবসময়েই ফিকশনের থেকে বেশি। নন-ফিকশনের যোগ্যতা আর গ্রহণযোগ্যতা চিরকালই আলাদা। তুমি বইয়ের জগতেই খোঁজ করে দেখো, গল্প-উপন্যাস-কবিতার ক্রেতা বা পাঠক হয়তো ২৫% পাবে। বাকি ৭৫% বই নন-ফিকশন, যা মানুষ কিনছে বা পড়ছে। সিনেমার ক্ষেত্রেও একেবারে তাই-ই।

অনেক অনেক ধন্যবাদ, বিপুলজিত। অনেক কিছু খুব প্রাঞ্জলভাবে বোঝালে এতক্ষণ ধরে। কলকাতায় বসে এতকিছু জানতে পারি না আমরা।

আমারও খুব ভালো লাগল কথা বলে। আমি চাই যে, ডকুমেন্টারি বা নন-ফিকশন নিয়ে আরও কথা হোক, আলোচনা হোক। আলোচনা হলে তবেই জানার পরিধি বাড়বে। তবে, এই ধরনের কাজের জন্য কলকাতাতেই একটা দারুণ প্ল্যাটফর্ম আছে — ডকেজ (DocedgeKolkata)। এখানে চমৎকার সাপোর্ট পাওয়া যায়, ট্রেনিং দেওয়া হয়। এইদিক থেকে দেখলে ভারতের অন্যান্য জায়গার থেকে কলকাতা অনেক এগিয়ে আছে।

আমার প্রশ্ন বা কৌতূহল আপাতত শেষ। তুমি কি আরও কিছু বলতে চাও, যা হয়তো আমার মাথায় নেই বলে আমি জিজ্ঞাসা করিনি?

কয়েকজনের নাম উল্লেখ করতে চাই, যারা না থাকলে এই কাজটা আমি করতে পারতাম না। নীলোৎপল মজুমদার, সোমনাথ ঘোষ, সায়ন্তী ভট্টাচার্য, শুভদীপ দে, অনির্বাণ মাইতি, মৃণ্ময় মণ্ডল, প্রদীপ্ত সাহা, সৃষ্টি গুপ্ত, প্রসেনজিত মণ্ডল, সঙ্কেত মণ্ডল, জন ওয়েবস্টার, আল্ডিস সেকুলিস, পেসি লেভান্টো, এডওয়ার্ডস ব্রোডার্স। আর, পাশ্চাত্যের তরফে এই কাজটাকে যিনি প্রায় আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি মার্টিন টে পাস।