পাঁচ দশক আগে ড. হাজরা ও ভবানন্দর অতীত জানতে ফেলুদাকে ‘সবজান্তা’ সিধুজ্যাঠার বাড়ি যেতে হয়েছিল। সিধুজ্যাঠা শুধু ভবানন্দ নয়, পৃথিবীর নানা তথ্য তাঁর মগজে এবং পড়ার ঘরে ঠেসে রেখেছিলেন, সেগুলো তাঁকে নিংড়ে বের করতে হত। লালমোহনবাবুর ভাষায় এনসাইক্লোপিডিয়া ‘ব্রিটানিয়া’ (আদতে ‘ব্রিটানিকা’) তখন থাকলেও তার নাগাল পাওয়ার উপায় সাধারণের কাছে ছিল সীমিত। এনসাইক্লোপিডিয়া, অর্থাৎ, বিশ্বকোষ হাতে পেলেও ‘সার্চ’ করার উপায় ছিল না, পাতা উল্টে উল্টে তথ্য বের করতে ঘাম ঝরে যেত। বলতে দ্বিধা নেই, আমার মতো বেশিরভাগ শহুরে শিক্ষিতের জ্ঞান সিধুজ্যাঠা নয়, লালমোহনবাবুর কাছাকাছি ছিল, আর জ্ঞানচক্ষু উন্মোচনের উপায় ছিল সাধারণ জ্ঞানের বই বা ‘বোর্নভিটা কুইজ কনটেস্ট’ জাতীয় রেডিও বা টিভির অনুষ্ঠান।
এরপর এল ইন্টারনেট। এবং নতুন সহস্রাব্দে অনেকের কাছেই ল্যাপটপ আর মোবাইল। বিপুলভাবে তথ্য সরবরাহের একটা কাঠামো তৈরি হল, সেই সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে বোতাম টিপে নানা বিষয়ে জ্ঞান আহরণের একটা উপায় তৈরি হল। কিন্তু সে-জ্ঞান তো অসংখ্য বই, পত্রিকা, পাণ্ডুলিপি আর পৃথিবীর কিছু সিধুজ্যাঠা জাতীয় ছিটগ্রস্ত মানুষের মগজ জুড়ে বিস্তৃত। সেগুলো সংকলন করবে কে? আর কেন-ই বা করবে?
আরও পড়়ুন : এআই কি ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে বিপন্ন করে তুলছে?
এখানেই উইকিপিডিয়া (wikipedia) বা চলতি ভাষায় উইকি-র আবির্ভাব। উইকিপিডিয়ার পূর্বসূরি ছিল নুপেডিয়া (Nupedia), যা একটি বিশেষজ্ঞ-সম্পাদিত বিশ্বকোষ হিসেবে চালু হয়েছিল ২০০০ সালে। কিন্তু নুপেডিয়ার সামগ্রী তৈরির ধীরগতি ও জটিল পদ্ধতির কারণে দুই মার্কিন নাগরিক জিমি ওয়েলস ও ল্যারি স্যাঙ্গার একটি বিকল্প উপায় খুঁজতে শুরু করেন। তারা উইকি (wiki) সফটওয়্যার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন, যেখানে যে-কোনও ব্যক্তি সহজেই তথ্য যোগ ও সম্পাদনা করতে পারে। এ-থেকেই উইকিপিডিয়ার জন্ম হয়। প্রথম থেকেই এর প্রতিষ্ঠাতারা ‘উইকিমিডিয়া’ নামক একটি অ-লাভজনক সংস্থার মাধ্যমে এটি পরিচালনা করে আসছেন। উইকিপিডিয়া ‘ওপেন-সোর্স’ লাইসেন্সভুক্ত অর্থাৎ, বাণিজ্যিকভাবে মুক্ত, কারণ এর উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করতেন, জ্ঞানের অবাধ এবং মুক্ত পরিবেশনে। শুরুর দিকে উইকিপিডিয়া ইংরেজি ভাষায় সীমাবদ্ধ ছিল, তবে এর দ্রুত জনপ্রিয়তার কারণে ২০০১ সালের মধ্যেই এটি বিভিন্ন ভাষায় বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে এটি ৩০০টিরও বেশি ভাষায় উপলব্ধ; তার মধ্যে বাংলা উইকিপিডিয়া ২০০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি চালু হয়।
প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকেই উইকিপিডিয়ার জনপ্রিয়তা বোঝা যায়। বর্তমানে এর সক্রিয় সম্পাদকের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ ২০ হাজার। তাঁরাই সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে প্রতিদিন প্রায় ১৯ লক্ষ নিবন্ধ সম্পাদনা করেন, ফলে আজ উইকিপিডিয়াতে প্রায় ৭ কোটি নিবন্ধ আছে। প্রতি মাসে, ১৫০ কোটি, অর্থাৎ, ভারতের জনসংখ্যার সমান মানুষ উইকিপিডিয়া ব্যবহার করেন। স্কুল, কলেজ, অফিস, এমনকী, ঘরের মধ্যেও আজ এর ব্যবহার ব্যাপক বললেই চলে। সংখ্যার হিসেবে গুগলের পর উইকিপিডিয়াই জনপ্রিয়তম ওয়েবসাইট।
যদিও এটা উল্লেখযোগ্য যে, বেশ কিছু স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্র রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে উইকিপিডিয়াকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
উইকিপিডিয়া-র মূল দর্শনটা কী? প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল জ্ঞানকে সর্বজনীন করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বহুস্তরিত সমাজে কোনওকালেই তা হয়ে ওঠেনি। ২০২০-তে প্রকাশিত ‘Essays on Free Knowledge: The Origins of Wikipedia and the New Politics of Knowledge’ বইয়ে ল্যারি স্যাঙ্গার লিখছেন, ‘The public deserves a seat at the table it did not have throughout most of history. Wikipedia’s tremendous usefulness shows the wisdom of that policy.’
অন্যদিকে তাঁর সহ-উদ্যোক্তা ওয়েলস ২০০৪-এ লিখছেন, ‘Imagine a world in which every single person on the planet is given free access to the sum of all human knowledge. That’s what we’re doing.’ আদর্শগত অবস্থানের দিক থেকে অবশ্যই এটি সমানাধিকারের বার্তা বহন করে। শুধু জ্ঞান আহরণের সমানাধিকার নয়, জ্ঞান প্রকাশেরও।
কিন্তু স্যাঙ্গার অন্ধভাবে সাম্যের পিছনে ছোটেননি। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, নিছক জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণ সবসময় সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে না। তাই তিনি এও লিখেছেন, ‘It is no exaggeration to say that epistemic egalitarianism, as illustrated especially by Wikipedia, places Truth in the service of Equality. I love Equality, if it comes down to choosing, I am on the side of Truth.’ অর্থাৎ, সত্য এবং সাম্যের মধ্যে বাছতে হলে তিনি সত্যকেই বাছবেন, সমষ্টির মতের স্বার্থে তিনি সত্যকে পরিহার করবেন না।
কিন্তু সত্য কী? জ্ঞান কি সত্যি নিরপেক্ষ এবং বিশুদ্ধ? এর বিচার কে করবে? সংশোধনবাদীরা যদি উইকিপিডিয়াকে হাতিয়ার করে?
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলেছেন, ‘Knowledge linked to power not only assumes the authority of ‘the truth’ but has the power to make itself true.’ অর্থাৎ, ‘ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত জ্ঞান’ কেবল ‘সত্যের কর্তৃত্ব’ দাবি করে না, বরং নিজেকে সত্য হিসেবে প্রমাণ করার ক্ষমতাও রাখে।
উইকিপিডিয়া-র মূল সমালোচনা ওই ক্ষমতা আর নিরপেক্ষতাকে ঘিরেই। দক্ষিণপন্থীদের মতে, উইকি বামপন্থী ভাবধারায় প্রভাবিত। এবং অর্থনীতি, রাজনীতি, পরিবেশ-নীতি, লিঙ্গ-নীতি— সব বিষয়েই এই প্রবণতা প্রকট। বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি ইলন মাস্ক তো সোজাসুজি উইকিপিডিয়াকে ‘ওকপেডিয়া’ (wokepedia) বলে ব্যঙ্গ করেছেন, এবং আবেদন করেছেন তাদের কোনও অর্থসাহায্য থেকে বিরত থাকতে। উল্টোদিকে বামেদের অভিযোগ— কাগজে-কলমে সকলের সুযোগ থাকলেও যতদিন না ডিজিটাল পরিকাঠামো সব স্তরে আর সব প্রান্তে পৌঁছচ্ছে, সমাজের একেবারে পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে সম্পাদনার বা পড়ার আর্থিক ক্ষমতা বা অবকাশ কোনওটাই নেই। ফলে উইকি বৈষম্য বাড়ায় বই, কমায় না।
স্যাঙ্গার যে পক্ষপাতিত্ব নিয়ে আগাম চিন্তা করেননি, তা নয়। তিনি লিখেছেন, ‘When you write with bias, you are treating your readers as your pawns, as mere means to your ends. You are not treating them as autonomous agents, capable of making up their own minds rationally. You are not respecting their dignity.’ অর্থাৎ, পক্ষপাতদুষ্ট লেখার মাধ্যমে পাঠকদের প্রভাবিত করার মধ্যে তিনি তাদের চিন্তাশক্তির মর্যাদাহানি দেখেছিলেন। এছাড়াও উইকিপিডিয়াতে যে তথ্যের ভুল নেই তা একদম নয়, সেজন্য বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গবেষণার কাজে এর ব্যবহারকে নীতিগতভাবে এড়িয়ে চলে। যেমন, ২০০৫ সালে উইকিপিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে একটি বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। জন সিগেনথেলার, একজন সাংবাদিক এবং প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা, তাঁর উইকিপিডিয়া-জীবনীতে একটি মিথ্যা এবং অপমানজনক তথ্য দেখতে পান। সেখানে বলা হয়েছিল যে, তিনি কেনেডি পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। এই ভুল তথ্যটি চার মাস ধরে উইকিপিডিয়ায় ছিল এবং এটি অনেক পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছিল। পরে জানা যায়, এটি এক ব্যক্তি মজা করে লিখেছিলেন।
এরকম ঘটনা পরেও বহু হয়েছে, এবং এখনও হচ্ছে। এসব বিচ্যুতির জন্যই হয়তো অ্যারিস্টটলের শিক্ষক প্লেটো জনগণের হাতে ক্ষমতার বিরোধী ছিলেন।
এই ঘোলা জল আরও ঘোলা হয়েছে সদ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত জেনেরেটিভ এ-আই (generative AI)-এর উদ্ভবে। সাধারণভাবে দেখলে, এটিও মানুষের জ্ঞানের সমষ্টির ওপর সফটওয়্যার প্রয়োগের ফল। অর্থাৎ কপিরাইট লঙ্ঘন, পক্ষপাতিত্ব, ভুল তথ্য, ইত্যাদি যত অভিযোগ উইকিপিডিয়ার ক্ষেত্রে উঠেছিল, ঠিক সেগুলোই একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরুদ্ধে উঠেছে। এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উইকিপিডিয়ার থেকে অনেক অস্বচ্ছ। অর্থাৎ ফুকো জ্ঞানের অস্ত্রীকরণের যে সম্ভাবনা তুলে ধরেছিলেন, তা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
তা সত্ত্বেও আমার ব্যক্তিগত অভিমত, এ বিতর্ক স্বাস্থ্যকর। ভাল-মন্দের দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়েই উইকিপিডিয়া বা জেনেরেটিভ এ-আই জাতীয় প্ল্যাটফর্মের পরিশীলন হবে এবং তাতে উপকারই হবে।
পরিশেষে কৃতজ্ঞতা সহকারে বলি, উইকিপিডিয়া নিয়ে লিখতে গিয়েও উইকিপিডিয়ার কিঞ্চিৎ সাহায্য নিতে হয়েছে বইকি!