সায়নদেব চৌধুরীর প্রথম বই ‘Uttam Kumar: A Life In Cinema’। প্রায় দেড় দশকের চিন্তা, এবং ছয় বছরের কিছু বেশি গবেষণায় ঋদ্ধ এই লেখা। এই বইয়ে বাংলা সিনেমার প্রথম এবং শেষ মহাতারকার এমন এক চলচ্চিত্র-জীবন প্রকাশিত হয়েছে, যা এর আগে সম্ভবত কখনও এ ভাবে দেখা হয়নি, বিশ্লেষণ করা হয়নি ইতিহাসের পটভূমিকায়। কেন উত্তমকুমার মহানায়ক, এই উত্তর যেমন রয়েছে এই বইয়ে, তেমনই উঠে এসেছে কিছু প্রশ্ন— স্বর্ণযুগের অবসানে আজ বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ কী? কোনও ইতিহাস তৈরি করে দেবে নতুন কোনও স্বর্ণযুগ— বা আদৌ দেবে কি? কথোপকথনে সায়নদেব।
আজকের যুগের বাংলা চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে, উত্তমকুমারকে নিয়ে এই বই লেখার অনুপ্রেরণা কী?
প্রধান কারণ এবং অনুপ্রেরণা একটাই— উত্তমকুমারের সমগ্র চলচ্চিত্র-জীবনকে কেন্দ্র করে লেখা কোনও বই নেই; দেশভাগ কিংবা এপার বাংলা-ওপার বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর সিনেমার প্রভাব কতটা, তা নিয়েও কোনও বিশ্লেষণ হয়নি।
‘Uttam Kumar: A Life In Cinema’ বাংলার চলচ্চিত্র জগতের গোড়ার দিকে ফিরে তাকায় এবং দেশভাগের পরবর্তী বছরগুলোয় যে সব সিনেমা হয়েছে, তাদের নিরীক্ষণ করে। আমরা দেখতে পাই কী ভাবে এমন কিছু ক্ষেত্র বা সিনেমা-পরিবেশ তৈরি হয়ে উঠেছিল যার ফল এই নির্দ্দিষ্ট তারকার উত্থান।
উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর চার দশক কেটে গেছে। আজও, এখনও, তাঁর তারকা-মোহ এক বিন্দু কমে আসেনি। আমার মনে হয় চল্লিশ বছর পরেও তাঁর সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের কৌতূহল একটুও স্তিমিত হয়নি। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে উত্তমকুমারের গুরুত্ব ঠিক কী, তাঁর অবদানই বা কতটা সেটা বুঝে নেওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আর তাই, তাঁর সম্বন্ধে এই বই লেখা এবং প্রকাশের এটাই সবচেয়ে উপযোগী সময়।
উত্তমকুমার সম্মন্ধে এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা— এমন একটা বই আপনার প্রথম প্রকাশনা হবে, এটা আপনি কেন ভাবলেন?
আলাদা করে কোনও কারণ নেই; সত্যি বলতে আমার লেখক হয়ে ওঠার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। তবে বিষয় হিসাবে উত্তমকুমার আমার বহুদিনের চর্চা; আমার প্রজন্মের বহু, বহুজনের মত আমিও টেলিভিশনের ছোটপর্দায় উত্তমকুমারের ছবি দেখে বড় হয়েছি, প্রভাবিত হয়েছি। ছোটপর্দায় দেখানো বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে আমাদের ছোটবেলার, আশির দশকে হলে চলা ‘বাবা কেন চাকর’-মার্কা বস্তাপচা সিনেমার যে বিরাট ফারাক, তা বুঝতে শিখেছি।
উত্তমকুমারের একটি সর্বাঙ্গীন ব্যক্তিত্বের প্রতি আমার সম্ভ্রম, কৌতূহল এবং বিস্ময়, বিহ্বল হয়ে থাকা থেকেই বইয়ের ধারণাটা তৈরি হয়।
এটা আমার প্রথম বই, এবং প্রথম বই-এর তুলনায় যথেষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষী, যেহেতু বিষয়টা উত্তমকুমারের মত একজন তুমুল জনপ্রিয়, সর্বজনীন ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমি কী লিখব, সে ব্যাপারে আমায় খুবই সতর্ক থাকতে হয়েছে। ব্যর্থ হতেই পারতাম, কিন্তু চেষ্টাটা করতেই হত!
বইটা নেহাতই একটা সোজাসাপ্টা জীবনী নয়; উত্তমকুমারের কাজের গ্রাম্ভারি, শুষ্ক সমালোচনা তো নয়ই। নিজের বইটিকে কী ভাবে বর্ণনা করবেন?
বইটা খুব ভাবিয়েছে আমায়; ২০১৮-১৯-এ বোধহয় একটা দিনও যায়নি যেদিন আমি ভাবতে বসিনি যে বইয়ের মেজাজটা কী হতে চলেছে! একটা আপাদমস্তক অ্যাকাডেমিক বই লিখব, সেটা কখনই চাইনি, আবার উত্তমকুমার ‘গুরু’, ‘মহানায়ক’; তাঁকে নিয়ে, তাঁর চলচ্চিত্র ভাষাকে নিয়ে বিস্তর নীরস কচকচি লেখা হবে, এটাও ভাবা যায় না!
আমি নিজে একজন শিক্ষক, সুতরাং একেবারে হালকা, পাঠক-অনুকূল কিন্তু অন্তঃসারশূন্য জীবনী-মার্কা কিছু একটা যে লিখে বসব না, তা-ও নিশ্চিত ছিল।
একটা মাঝামাঝি পথ নেব বলেই স্থির করেছিলাম, এবং সেটা আমার বইকে সফল করে তুলেছে কি না, তা জানি না। প্রচুর গবেষণা তো করেইছি, এবং নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সেই গবেষণাকে তুলে ধরতে চেয়েছি। আমার মতে এর ফলে চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং সাধারণ পাঠক, উভয়েই এই বইতে কিছু না কিছু খুঁজে পাবেন, যা এর আগে বলা হয়নি। ‘Uttam Kumar: A Life in Cinema’–কে আমি গবেষণা-ঋদ্ধ, তথ্য সমৃদ্ধ নন-ফিক্শন বলতে পারি, যা আমাদের দেশের শিক্ষিত পাঠকের ভালো লাগতে পারে।
উত্তমকুমারের বিবরণে আপনি এক জায়গায় লিখছেন তিনি যেন এক ‘মিথিকাল ম্যাটিনি আইডল’; দেবসম, অলীক এক প্রতিমা। আজ যখন বাংলা চলচ্চিত্রে আর কোনও ‘ম্যাটিনি আইডল’ নেই, ২০২১-এ দাঁড়িয়ে উত্তমকুমারের তাৎপর্য কী?
হালকাভাবে বলতে হলে বলব যে উত্তমকুমারের তাৎপর্য অনন্ত, চিরন্তন; তিনি একটা গোটা প্রজন্মের সাধ-ভালোবাসা-যাপনের প্রতীক। সেভাবে দেখতে গেলে, তাঁর তাৎপর্য তাই কোনোদিন কমে আসেনি, কেননা বাংলা ছায়াছবির ইতিহাসের অর্ধভাগ তাঁর চলচ্চিত্রেই অবস্থিত, যদি বাকি অর্ধেক (সত্যজিৎ) রায় অ্যান্ড কোং-এ বিরাজ করে।
কিন্তু বস্তুত, উত্তমকুমার যে এখনও ‘ম্যাটিনি আইডল’, এবং বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে প্রথম এবং শেষ সুপারস্টার, এই তথ্যটা দুটো জিনিস তুলে ধরে। এক, দেশভাগ-পরবর্তী পশ্চিম বাংলায় আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিল— যার ফলে উত্তমকুমারের মতো এক জন সিনেমা-ব্যক্তিত্ব জন্ম নেয়। এবং আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলা সিনেমার একটা বিবর্তন শুরু হয় এবং উত্তমকুমার কেবল একজন সিনেমা অভিনেতা থেকে একজন মহাতারকা হয়ে ওঠেন।
যেহেতু এই বিবর্তন চলচ্চিত্র ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এবং যেহেতু সেই সময়টা অতীত, তাই দ্বিতীয় উত্তমকুমারের সৃষ্টি আর কখনও সম্ভব নয়। ঠিক এই কারণেই তিনি একক, অদ্বিতীয়, ‘মিথিকাল’, এবং বাংলা ছবির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। মজার ব্যাপার, এই সুপারস্টারকে সৃষ্টি করতে একটা মিথ প্রয়োজন ছিল, যাকে ঘিরে গড়ে ওঠে তারকা-উপাসনা, আর সেই উপাসনাকে বহন করে নিয়ে যেতে প্রয়োজন ছিল এই মিথের। উত্তমকুমার ব্যতীত অন্য কারো উপর এই অতিকথা স্থাপন করা যেত না।
দুই— উত্তমকুমার একই সঙ্গে দুরন্ত অভিনেতা, পারফর্মার, তারকা— এমন একটা আশ্চর্য মিশেল সম্ভবত আর কোনও অভিনেতার মধ্যে বাংলা সিনেমা পায়নি।
বাংলা সিনেমার ইতিহাস বলুন কিংবা তৎকালীন বাংলার সামাজিক পরিস্থিতি বলুন— সেই সময় যে ধরনের সিনেমা হচ্ছিল, সিনেমা যে ভাবে, যে পথে এগোচ্ছিল এবং উত্তমকুমার সেই বদলে যাওয়া পরিস্থিতি ও সিনেমা ভাবনার সঙ্গে নিজেকে যে ভাবে বদলাচ্ছিলেন,তা অভাবনীয়। এই যে উত্তমকুমারের মধ্যে একটা সম্পীর্ণতা, একটা টোটাল প্যাকেজ, এ আর কারো মধ্যে কোনোদিন দেখা যায়নি, যাবেও না। বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তাই উত্তমকুমারের তাৎপর্য সীমাহীন, এখনও, আজও।
আপনি লিখছেন যে তাঁর খ্যাতি ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে উত্তমকুমার তারকা-ব্যক্তিত্বকে ভাঙতে শুরু করেন…
দুই-এক লাইনে কীভাবে ব্যাখ্যা করব জানি না, আমার অর্ধেক বইটাই এই বিষয়ে লেখা। তারকারা নিজেদের স্বচ্ছন্দের পরিসরে একবার বাসা বেঁধে ফেললে সচরাচর সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন না, আসতে চান না; এমন কোনো অবস্থায় নিজেদের ফেলেন না যেখানে সেই স্টারডমকে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। উত্তমকুমার অত্যন্ত সুপটুভাবে এই ভাঙা-গড়ার খেলাটা খেলতে পারতেন; আমার মনে হয় কমল হাসান ছাড়া দ্বিতীয় কোন ভারতীয় অভিনেতা এত স্বচ্ছন্দে, এবং সফলভাবে, নিজের খাসজমির বাইরে অনায়াসে কাজ করতে পেরেছেন।
এই সাবভার্সনটা উত্তম শুরু করেন ১৯৫৫ থেকে, যখন তিনি তারকা। ১৯৫৬-এ তিনি মহানায়ক। এবং প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁর মহানায়কত্বকে আরো জোরালো করে তুলবে এমন ছবি প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেন, রোমান্স-মেলোড্রামাগুলো থেকে সরে আসতে শুরু করেন। এই পদ্ধতির শুরু ১৯৫৮-৫৯-এর ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ এবং ‘বিচারক’ থেকে। পর-পর চরিত্র-বাছাই চলে যেখানে তিনি যেন নিজের হিরো-ভাবমূর্তিকে ক্রমশ আবছা করতে চেষ্টা করেন, যেমন ‘শেষ অঙ্ক’, যেখানে তিনি আততায়ী, বা ‘কাল তুমি আলেয়া’। এই শেষোক্ত ছবিতে উত্তমকুমার একজন ধূর্ত, কূটিল নেগোশিয়েটর, যে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যা খুশি তাই করতে পিছপা হয়না। কোনও ‘ভদ্রলোক’ তারকা যা কখনোই করবেন না! কিন্তু উত্তমকুমার তা করেছিলেন, এবং তাঁর খ্যাতির শিখরে দাঁড়িয়ে!
কিন্তু যে ছবিতে উত্তমের এই সাবভার্সন সবচেয়ে সফল, তা হল ‘নায়ক’। ‘নায়ক’-এর উত্তমকুমার যেন উত্তমকুমারের চিন্তাটাকেই বিপদে ফেলে দিচ্ছেন, কেননা অরিন্দম মুখার্জি এবং উত্তমকুমার যে একই চরিত্র, সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এটা যেন নিজের উপরেই কাটাছেঁড়া; উত্তমকুমার যত উত্তমরূপে অরিন্দম হয়ে উঠছেন, ততই যেন উত্তমকুমারের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার উপক্রম কাছে আসে। সত্যজিৎ ক্রমাগত উত্তমকে একের পর এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, এবং উত্তম প্রতিবার অনবদ্যভাবে সেগুলো জিতে গেছেন। কিন্তু শেষ অবধি, ‘নায়ক‘-এ অরিন্দম উত্তমকুমার-ই হয়ে ওঠেন, এবং উত্তমের মিথ ‘নায়ক‘ সত্ত্বেও রয়ে যায় অক্ষত, অধরা।
সত্যজিতের অন্য কোনও ছবিতে কি আপনি উত্তমকুমারকে কখনও কল্পনা করেছেন?
‘অপরাজিত ‘ছবির বেনারস পর্যায়ে শুটিং-এর সময়ে সত্যজিৎ পায়ে চোট পান, এবং পা সারতে-সারতে লিখে ফেলেন ‘ঘরে-বাইরে’-র স্ক্রিপ্ট। মধ্য-পঞ্চাশের দশকে, ‘অপুর সংসার‘-এর ঠিক পর-পর, যে ‘ঘরে-বাইরে’ উনি ভেবেছিলেন, তাতে উত্তমকুমার ছিলেন সন্দীপ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন নিখিলেশ এবং সুচিত্রা সেন ছিলেন বিমলা। ভাবুন তো, সেই ছবিটা হলে কী হত!
আমি মনে করি চরিত্রটা প্রত্যাখ্যান করে উত্তম বোকামি করেছিলেন— তাঁর তখন উচ্চতায় পৌঁছনো বাকি, নেগেটিভ রোল ইত্যাদি ছিল কারণ। আমার তো মনে হয় যে ‘ঘরে-বাইরে’ আমরা পেয়েছি, তার চেয়ে বহুগুণে আকর্ষণীয় হত উত্তমকুমার-সৌমিত্র-সুচিত্রা অভিনীত ‘ঘরে-বাইরে’।
বাকি ছবি? জানি না। ‘চারুলতা’-য় শৈলেন মুখার্জির চরিত্রের মতো চরিত্র পেতে পারতেন উত্তম, কিন্তু সত্যজিৎ বোধহয় সেটা কখনই হতে দিতেন না। কেননা উত্তম সৌমিত্র-অভিনীত অমলকে একেবারেই টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে যেতেন!
আপনার বইয়ে ‘A Gallery of Portraits’ নামের যে বিভাগটা পাওয়া যায়, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তমকুমারের কাজের এ-রকম একটা প্রণালীবদ্ধ বিশ্লেষণ এর আগে দেখা যায়নি। আপনার গবেষণার বিষয়ে বলুন…
ধন্যবাদ! আমি নিছক একটা প্রথাগত জীবনী লিখতে চাইনি, এবং আমি কোন সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক লেখাও লিখতে চাইনি। আমি যে নতুন উত্তরগুলোর খোঁজে ছিলাম— উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রের আধুনিকতা, তাঁর ভাবমূর্তি-ধ্বংসের অভিনয়, এবং তাঁর দেবতাসম ব্যক্তিত্ব, যা আখেরে কোনও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পক্ষেই স্বাস্থ্যকর নয়— এর সমগ্রটাই আমি পাই উত্তমকুমারের ছবিতে, কোনও সাক্ষাৎকারে নয়।
উত্তমকুমার তিন দশক ধরে কাজ করেছেন। এখনও টিভিতে উত্তমকুমারের সাত-আটটা সিনেমা ছাড়া— মানে ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘দেওয়া-নেওয়া ’র বাইরে— কিছু দেখানো হয় না। আমি তাঁর কর্মজীবনের প্রথম দুই দশকের ছবিতে ডুবে যাই। প্রতিটা ছবি, তাদের রিভিউ, বুকলেট, জনসাধারণের মত, সবটা নিয়ে পড়াশোনা করি, এবং তাঁর সিনেমা-সংক্রান্ত প্রায় যা ছাপা আছে, তার সবটাই পড়ে ফেলতে হয় আমাকে, কেননা আমি কিছু ছেড়ে রাখতে চাইনি।
দুর্ভাগ্যবশত, এর মধ্যে কিছু ছবি চিরকালের মতো নষ্ট হয়ে গেছে, যেমন ‘ডাক্তারবাবু’, ‘নেকলেস’, ‘চিরকুমার সভা’, ‘কার পাপে’, ‘শঙ্কর নারায়ণ ব্যাংক’, এবং এগুলো মাত্র ১৯৫০-এর দশকে বানানো ছবি! একমাত্র আমাদের দেশেই এটা সম্ভব— প্রায় দেবতুল্য উত্তম-উপাসনা, ওদিকে পুনরুদ্ধারের কোনও বালাই নেই!
সিনেমা দেখা তো ছিলই, এবং আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল তারকা উত্তমকুমারের সিনেমা-জীবন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কেমন মানুষ ছিলেন, কোন পদে চিংড়ি মাছ খেতে ভালোবাসতেন বা কী পোশাকআশাক পছন্দ করতেন, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কৌতূহল ছিল না। মানুষ উত্তমকুমার আমাকে আকৃষ্ট করেননি; আমার বিষয় ছিল তারকা উত্তমকুমার। তিনি অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন, এবং এই বিষয়টা বিস্ময় জাগায় — একজন অত্যন্ত সাধারণ মানুষ থেকে তাঁর মহীরুহসম তারকা হয়ে ওঠার পথ।
উত্তমকুমারের বায়োপিক তৈরি হলে তাঁর চরিত্রে কার অভিনয় করা উচিত?
কারোর না! প্রথমত, কোনও বায়োপিক তৈরি হওয়া উচিতই নয়, কিছু জিনিস অধরা রয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। দ্বিতীয়ত, সেটা হলে একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার হবে; কোনও না কোনও একজন অত্যন্ত খারাপ অভিনেতা তাঁর ভূমিকায় জঘন্য অভিনয় করবেন, যদি খারাপকে আরো অসম্ভব খারাপ করে তোলা যায়, তা-ই করবেন।
২০২১ উত্তমকুমারের ৯৫তম জন্মবর্ষ। আর পাঁচ বছরে, ওঁর জন্মশতবর্ষে, আপনি কি উত্তমকুমার-বিষয়ক আরো একটা বই প্রকাশ করতে চাইবেন?
না, না, পাঁচ বছর বড্ড অল্প সময়! বাংলা অনুবাদের কথা একটা চলছে, এবং যদি সেটা হয়, আমার সে-বইয়ের শিরোনামও ভাবা রয়েছে।
অন্য আইডিয়াটা হল, উত্তমকুমারের সিনেমা এবং জীবন নিয়ে একটা ইলাস্ট্রেটেড কাজ হতে পারে, যেমন চ্যাপলিন, বা ক্যারি গ্রান্ট-কে নিয়ে রয়েছে। কাজি অনির্বাণ এবং পরিমল রায় এ-ধরনের কিছু বই ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছেন, কিন্তু বস্তুত তার প্রায় সবটাই ছবির পোস্টার থেকে তৈরি। আমি চাই এমন একটা কাজ যাতে একটা চাক্ষিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উত্তমকুমারের সিনেমা-জীবনকে ধরা যেতে পারে।
Uttam Kumar: A Life In Cinema, সায়নদেব চৌধুরী
ব্লুমসবেরি, ১,২৯৯/-