সমাজ, নীতি, রাজনীতি

Andre Betei

ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ একবার বলেছিলেন যে, একাধারে বাঙালি ও ভারতীয় হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করার ক্ষমতা খুব কম মানুষই রাখেন, আন্দ্রে বেতেই তার মধ্যে একজন। গবেষক, সমাজবিদ বা উচ্চশিক্ষায় পা রাখা পণ্ডিততবর্গ অনেকসময়ে ইনসুলার রোগে ভোগেন। এ এক এমন প্রতিবন্ধকতা যেখানে সমাজবিজ্ঞানীরা নিজেদের এলাকা, সংস্কৃতি বা কৌম জীবন ব্যতীত অন্য কোনো সমাজ, তাদের আদবকায়দা বা জীবনচর্যা দেখতে প্রস্তুত নন। যিনি বাংলা নিয়ে কাজ করেন তাঁর পুঁথিগত বিদ্যা বাঙলাতেই সীমাবন্ধ, আবার যিনি মারাঠি সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করে চলেছেন, তিনি তাঁর আঞ্চলিকতার বাইরে যেতে নারাজ। একেই বলে ইনসুলারিটি, যা একজন সমাজবিদের চোখে যেন ঠুলি পরিয়ে দেয়। আন্দ্রে বেতেই এমন একজন সমাজতাত্ত্বিক যিনি এই ঠুলি পরার পক্ষপাতী নন; তাঁর দীর্ঘ গবেষণাপঞ্জি দেখলেও বোঝা যায়, কীভাবে কম্পারেটিভ সোশিওলজি বা তুলনামূলক সমাজবিজ্ঞান তাকে প্রথমদিন থেকে প্রভাবিত করেছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করলেন আন্দ্রে বেতেই, ফিরে দেখা যাক তাঁর জরুরি কিছু তত্ত্ব, বই বা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বেতেই এর গবেষণার তাৎপর্য।

আরও পড়ুন: মাথা না নোয়ানো ছিল নিভৃত এই কবির স্বভাবজাত! লিখছেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত…

চন্দননগরে এক মিক্সড রেস পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আন্দ্রে, ১৯৩৪ সালে। বাবা ছিলেন ফরাসি, মা বাঙালি। চন্দননগর, পাটনা, কলকাতা ও দিল্লিতে পড়াশোনা করার সময়ে তিনি আগ্রহী হন নৃতত্ত্ববিদ্যা ও সমাজবিদ্যায়। তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ক্লাস, কাস্ট অ্যান্ড পাওয়ার’ তামিলনাড়ুর তাঞ্জোর গ্রামকে কেন্দ্র করে লেখা। গবেষণার এই ক্ষেত্র (স্পেস) নির্বাচন করার প্রেক্ষিতেও আমরা বেতেই এর কাজে এক অভিনবত্ব দেখতে পাই। পাটনা, বাংলা বা দিল্লিতে পড়াশোনা করেছেন বলে সেখানেই তিনি স্বচ্ছন্দ্য, তার বাইরে বেরোলে কাজ করা কঠিন হতে পারে, এমন কোনও সীমাবদ্ধতা প্রথম থেকেই আন্দ্রের কাজে লক্ষ করা যায় না। এই মবিলিটি বা গবেষণার ব্যাপকতা, একদিকে যেমন তাঁর সন্দর্ভকে সমৃদ্ধ করে, তেমনই এমন কাজ সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমের। দিল্লি, পাটনাতে বড় হওয়া এক নতুন গবেষক যাচ্ছেন দক্ষিণী এক গ্রামে, শিখতে হবে নতুন ভাষা, আদবকায়দা; এখনকার কোনও স্কলার সচরাচর বাংলায় বড় হয়ে তামিল গ্রাম বেছে নেবে না গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে। আন্দ্রে যে শুধুমাত্র নিজের কাজেই আঞ্চলিক/ মুষ্টিমেয় জনজাতি থেকে বেরিয়ে একরকম সমগ্রতায় বিশ্বাস করতেন তা নয়, যাদের পড়িয়েছেন বা গবেষণার তত্ত্বাবধান করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় এই তুলনামূলক, মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব। অধীক্ষক হিসেবে গাইড করেছেন এক বাঙালি গবেষককে, যে বড় হয়েছে বম্বেতে। জামশেদপুরে বেড়ে ওঠা এক তামিল ছাত্র, এক কন্নড় গবেষক যে লাদাখ নিয়ে আগ্রহী, বা একজন পাঞ্জাবি যে সমীক্ষা করছেন কর্নাটকে গিয়ে, এমন ছাত্রছাত্রীদের প্রাধান্য দিতেন আন্দ্রে। এই বহুত্ববাদ ছাড়া নৃতত্ত্ব বা সমাজবিদ্যার পাঠ সম্ভব নয়, এমনটাই মনে করেছিলেন তিনি। নিজের পারিবারিক পরিসর বা বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনার সুবাদে যে-বৈচিত্রের ধারণা তার মধ্যে অনেক ছোট থেকেই গড়ে উঠেছিল, পরবর্তীকালে তা তুলনামূলক সমাজবিদ্যার নতুন ধারা প্রবর্তনে সাহায্য করে ভারতে। একজন মানুষ, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ভাবাদর্শ ও অ্যাকাডেমিক গবেষণা যে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও সত্ত্বা নয়, সেটা আন্দ্রের কর্মকাণ্ড দেখলে বোঝা যায়। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, শৈশবে বাড়ির মধ্যেই ফরাসি, ভারতীয় তথা বাঙালি আদবকায়দার সমাহারে এক ধরনের ডাইভারসিটিতে তিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।

Social stratification বা সামাজিক স্তরবিন্যাস নিয়ে কাজ করেছেন বেতেই। সমাজবিজ্ঞানের ধারায় তাঁর একটি জরুরি অবদান হল কাস্ট ডিটারমিনিসম থেকে বেরিয়ে এসে সমাজের আরও নানা ক্ষমতার কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র অনুধাবন করা। সোসিওলজি ডিসিপ্লিনে কাস্ট নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে, কিন্ত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, ভূমিসংস্কার বা মধ্যবিত্তের পেশায় কাস্ট ছাড়াও আরও যেভাবে অসমতা তৈরি হয় তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন বেতেই। তিনি বলছেন অর্থ, সম্পদ, শ্রেণি বা সামাজিক মর্যাদা দ্বারা যেভাবে অসাম্য তৈরি হয় গ্রামীণ বা কৌম জীবনে, সেখানে কাস্ট নামক ক্যাটাগরি  ছাড়াও আরও নানা দিক বিচার্য। আমরা জানি যে ব্রিটিশ ভারতে সংঘটিত সেন্সাস বা সার্ভে কীভাবে একধরনের জাতিগত চেতনা বা কাস্ট consciousnes তৈরি করেছিল, যা আগে সেভাবে ছিল না। কাস্ট বিষয়টিকে যেভাবে ঔপনিবেশিক ভারতে স্ট্যান্ডারডাইস করা হয়েছে (উচ্চ নীচের ধারণা একপ্রকার ফিক্সড বা স্থির ভেবে নেওয়া হয়, যা নাকি সমস্ত ভারতেই সমান) সেখানে গ্রামীণ জীবনকে বুঝতে গেলে, কাস্ট পরিমাপক হিসেবে যথেষ্ট নয়। বেতেই বারবার feild view আর book view এর পার্থক্য বুঝিয়েছেন। কোনও ঐতিহাসিক বা সমাজবিদ ভারতে কখনও না এসে, শুধুমাত্র লাইব্রেরির সহায়তায়, এখানকার গ্রামকে unchanging (অপরিবর্তনশীল) এন্টিটি হিসেবে দেগে দিয়েছেন বা কাস্ট দিয়েই সবকিছু বোঝার চেষ্টা করেছেন নিজে feild এ না গিয়ে, এমন পন্থাকে নস্যাৎ করেছেন আন্দ্রে। নিজের বিবিধ সাক্ষাৎকারে কলকাতার এন কে বোস বা সুরজিৎ সিনহার feild ওয়ার্ক এর কথা বলেছেন, যা তাকে পরবর্তীকালেও অনেক কিছু শিখিয়েছে।

একবার বেতেইকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, একজন sociologist এর কি পলিসি মেকিংয়ে অংশগ্রহণ করা উচিত? এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আজকের দিনে; কারণ এটি পরোক্ষভাবে জানতে চায় যে, একজন অ্যাকাডেমিশিয়ান খাতায় কলমে যে কাজটি করছে তার ব্যবহারিক দিক ঠিক কী? অ্যাকাডেমিয়ার তত্ত্ব, আবিষ্কার, গবেষণা, বিশেষ করে সোশ্যাল সায়েন্স এর পরিধিতে, আসল জীবনে তার প্রভাব বা পরিণতি দেখা যায় কি? না কি সবটাই শুধু তত্ত্বকথা আর ঠান্ডা ঘরের আলোচনা? ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে সমাজবিজ্ঞান যখন ক্রমশ কোণঠাসা, তাঁর পুঁজি নেই, গবেষণার পরিসর কম, ৫ বছর ধরে রিসার্চ করলেও নূন্যতম চাকরি মেলেনা, তখন প্রশ্ন জাগে কেন অবহেলিত এই ডিসিপ্লিন? তাহলে কি বাস্তব জীবনে এর কার্যকারিতা একেবারে তলানিতে। আন্দ্রে বেতেইয়ের উত্তর অনুধাবন করেই এই প্রশ্নের সমাধান মিলবে। উনি বলছেন সোশিওলজি কিন্তু পলিসি সায়েন্স নয়। মানে কেউ যদি ভেবে থাকে সোশিযওলজি, ইতিহাস বা নৃতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করার উদ্দেশ্য পলিসি বা নীতি তৈরি করা, তাহলে এই ভাবনায় গলদ আছে। পলিসির কথা উঠলেই প্রশ্ন আসে কার পলিসি? কে এই নীতির প্রণেতা? বা কার উদ্যোগে এই নীতি? উত্তর হল অবশ্যই সরকারী নীতি বা রাষ্ট্রের পলিসি তৈরি করা। বেতেই বলছেন, একজন সমাজবিজ্ঞানীর কাজ কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। বরং পাবলিক মাইন্ড বা জনচেতনা তৈরির ভূমিকাই এখানে মুখ্য। সমাজে যে-ধরনের অসাম্য আছে, যে-নির্দিষ্ট সামাজিক কাঠামোর মধ্যে থেকে, যে-যে চয়েস বা বিকল্প রাস্তা একটি জনজাতির কাছে খোলা আছে, তার হদিশ দেওয়া সোশিওলজিস্টের কাজ। রাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে নীতি নির্ধারন করা ছাড়াও সমাজবিজ্ঞানীদের বড় দায়িত্ব রয়েছে। আর তা হল সাধারণ মানুষের প্রতি, জনঅভিমত তৈরিতে। 

হিন্দুত্ব ব্রিগেডের আদর্শকে কীভাবে দেখেন বেতেই? যারা বলতে চায় যে, হিন্দুত্ব মডেল ভারতীয় সমাজকে বিশ্লেষণ করবার একমাত্র আদর্শ পন্থা। উত্তরে আন্দ্রে বলছেন যে এই ধরনের আইডিয়া আমায় সংবিগ্ন (disturbed) করে তোলে, এই ধারণা আদতে ভারতীয় নয়।

২০১০ (মতান্তরে ২০১৩) নাগাদ একটি ইন্টারভিউতে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, হিন্দুত্ব ব্রিগেডের আদর্শকে কীভাবে দেখেন বেতেই? যারা বলতে চায় যে, হিন্দুত্ব মডেল ভারতীয় সমাজকে বিশ্লেষণ করবার একমাত্র আদর্শ পন্থা। উত্তরে আন্দ্রে বলছেন যে এই ধরনের আইডিয়া আমায় সংবিগ্ন (disturbed) করে তোলে, এই ধারণা আদতে ভারতীয় নয়। হিন্দুত্বকে কাজে লাগিয়ে যদি বলা হয় আমার দেশ অন্য সকলের থেকে সর্বোত্তম, তাই কারুর থেকে আমাদের কিছু শেখার নেই, তাহলে এর থেকে অন্তঃসারশূন্য বিষয় আর কিছু হতে পারে না। এই সাক্ষাৎকারেই তিনি বোঝাচ্ছেন যে— ভারতীয় সংস্কৃতি একটা অ্যাসিমিলেশন (আত্তীকরণ) এবং রেসিলিয়েন্সির (সহনশীলতার) ওপর গড়ে উঠেছে। পিছনের দিকে ফিরে তাকালেও এই বহুত্ববাদ সকলের চোখে পড়বে। প্রাচীন ভারতে শক, কুশান, ইন্দো-গ্রিক, গান্ধার শিল্প থেকে আরম্ভ করে মধ্যযুগের দীন-ই-ইলাহী বা ঔপনিবেশিক যুগে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে গড়ে ওঠা সংস্কারবাদী আন্দোলন। সর্বত্র কি শুধু ভারতীয়/ বাঙালি/ হিন্দু এভাবে ভাগ করা যায়! আন্দ্রে বেতেই যে সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের কথা বলছেন, তা অবলম্বন করে মনে হয় সত্যিই তো, রবীন্দ্রনাথের গড়ে তোলা বিশ্বভারতী, এক সময়ে যা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান ছিল, সেখানে ওকাকুরাকে বাদ দেওয়া সম্ভব? বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট যে প্যান এশিয়ানিজমের ধারাকে প্রাধান্য দিয়েছিল, সেটা কি ঠিক নয়? যেখানে যেভাবেই চিন্তার অভিনবত্ব এসেছে, তা এক বহুত্ববাদকে কেন্দ্র করেই সম্ভব হয়েছে। তাই হিন্দুত্ববাদী পরিসর, কোনওদিকে না তাকিয়ে নিজের আচারকেই সর্বোত্তম মানা, আসলে এক ক্ষমতা দখলের রাজনীতির আভাস দেয়। সাধারণ মানুষ, জনরুচি বা পাবলিক মাইন্ড-এর জন্য যা কখনওই ভাল নয়। আন্দ্রের মতামত ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপন্ন হয়, তিনি বলছেন যে, হিন্দুত্ব মডেল আর ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্টদের মতামত অনেকাংশেই অভিন্ন হয়ে পড়ে। দুই ক্ষেত্রেই নতুন সমাজ, চিন্তাভাবনা বা মতাদর্শকে পুরনো সমাজ মেনে নিতে পারে না। তৈরি হয় একটা ভয়, ক্ষোভ বা অসহায়তার জায়গা; এই নূতন-পুরাতনের দ্বন্দ্বে, পুরনোকে যেভাবেই হোক (তা সে যত নিকৃষ্ট, নিম্নগামী বা নির্যাতনের ইতিহাস হোক না কেন) বাঁচিয়ে রাখার এক প্রবল তাগিদ, পুরনো শ্রেণি বা কমিউনিটির হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াস থেকেই জন্ম নেয় এমন মৌলবাদের, হিন্দু-মুসলিম দুই। একপ্রকার অন্ধ হয়ে থাকা, ইতিহাস বিকৃত করা এবং সংকীর্ণ অর্থে সমাজবিদ্যাকে বোঝার চেষ্টা চলে। আন্দ্রে বেতেই এর প্রয়াণের পর তাঁর কাজ বা সাক্ষাৎকার ফিরে দেখলে, এই হিন্দু মডেলের বিরোধীতার কথা চোখে পড়ে। কীভাবে উনি বারবার এমন তত্ত্ব সমূহ নাকোচ করেছেন; এমপিরিক্যাল, feild ওয়ার্ক এর প্রতি জোর দিয়েছেন এবং ভারতের এক সহজাত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে গুরুত্ব দিয়েছেন।