আধুনিক সভ্যতা মানুষকে চিনে নিতে চায় নম্বর দিয়ে। আদর-যত্নে দেওয়া নামে রাষ্ট্র হয়তো কোনও সার্থকতা খুঁজে পায় না। নাগরিকের পরিচয় নম্বর দিয়ে চিনে নিতে তাই টেকনোলজি-নির্ভর বিচিত্র আয়োজন। অতীতে নম্বর মিলিয়ে পরিচয়ের রেওয়াজ জেলখানার ভেতরেই একমাত্র পাওয়া যেত। বন্দির নাম-ধাম-ঠিকানা-ঠিকুজি— সবকিছু ওই নম্বরে লুকিয়ে থাকত।
সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা ‘দেশে বিদেশে’ উপন্যাসে ‘জাহান্নাম’ নামক জেলে পুস্ত ভাষায় ‘মাকু চিহল পঞ্জম হস্তম’ পরিচয় নিয়ে এক বন্দি কয়েদ ছিলেন। বাংলায় যে শব্দের মানে দাঁড়ায়, আমি পঁয়তাল্লিশ নম্বর। দেখা গেল, জেলের দীর্ঘ জীবন পার করে যখন মানুষটি খোলা আকাশের নিচে মুক্ত স্বাধীন, তখনও নিজের পরিচয় পঁয়তাল্লিশ নম্বর কোনওভাবেই সে ভুলতে পারল না। যেন পঁয়তাল্লিশ নম্বরটাই তার জীবনে একমাত্র সত্য। সত্য-মিথ্যার এলোমেলো ধাঁধাঁর খেলা এই উপন্যাসে হাসির খোরাক হলেও, বুঝতে অসুবিধে হয় না, নেপথ্যে দমনমূলক মানসিকতা কীভাবে লুকিয়ে।
আইনের শাসনের চাপে অতীত ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছে যে মানুষ, তার আখ্যান এরকমই। ভৌগোলিক সীমারেখা টেনে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ভূখণ্ডকে জেলখানার কায়দায় গড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে, আধুনিক রাষ্ট্র-কাঠামোর যে তালিম শুরু হয়েছিল— তারই ছোট সংস্করণ যেন জেলখানা বা নয়া ব্যবস্থাপনার সংশোধনাগার। সেই জেলখানায় কেমন কাটে নারী বন্দিদের জীবন? লিঙ্গবৈষম্য যে কারাগার তার জন্য সমাজের মধ্যে তৈরি করেছে, তা কি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে কারাগারের অন্দরে?
আরও পড়ুন: ‘ভোগের রান্না’ বইতে ধরা পড়েছে ভারতীয় খাদ্য-মানচিত্রর এক অন্য চেহারা!
লিখছেন প্রিয়ক মিত্র…


হাজারিবাগ সেন্ট্রাল জেলের একদিকে আছে সত্তরের মেরি টাইলারের (নকশালপন্থী হওয়ার অভিযোগে যিনি বন্দি ছিলেন) রাজনৈতিক বন্দিজীবনকে স্পর্শ করে থাকা স্মৃতি, আর অন্যদিকে ২০০৯ সালে সেই একই জেলে লেখক ও নারী অধিকার-কর্মী বি অনুরাধা-র রাজনৈতিক বন্দি হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা। দুটো ভিন্ন সময় হলেও রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে জেলের সাধারণ বন্দি ও জেলের কর্তৃপক্ষের প্রতিদিনের আচার-ব্যবহারের তুলনামূলক আলাপ সেই গল্পে এসেছে।
যে সেলে সত্তরে মেরি রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে একা কাটাতেন, সেইরকম সেলে ২০০৯ সাল নাগাদ চারজন শিশু-সহ তেরোজন বন্দিদের জায়গা ভাগ করে নিতে হয়। ব্রিটিশ নাগরিক মেরি হিন্দি ভাষা শিখে সহবন্দিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিতে যত্নবান ছিলেন, সেই একই ধারাবাহিকতা বি অনুরাধার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। জেলজীবনের অভিজ্ঞতায় ১৭টি বিভিন্ন নাম-ধাম-পরিচয়-সম্পর্ককে সঙ্গে করে ছোট ছোট গল্পের পরিসর, আমাদের স্বস্তির ঘুম ভাঙিয়ে দিতে চেয়েছে।
অবিভক্ত অন্ধপ্রদেশের দলিত পরিবারের মেয়ে বি অনুরাধা হাজারিবাগ জেলে এসে, নারী বন্দিরা ব্যক্তিগত জীবনে, সামাজিক-পারিবারিক-রাজনৈতিক অধিকার থেকে কীভাবে বঞ্চিত হয়ে থাকেন— সেই উপলদ্ধি বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পরম যত্নে গল্প বলার আঙ্গিকে মালার মতো গেঁথে নিয়েছেন। গল্প বলার এই বুনট এদেশের লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।
সূর্য ডুবলে পুলিশের খাতায় গোনাগুণতির হিসেব মিটিয়ে বন্দিরা তালাচাবি দেওয়া সেলের ভেতরে চালান হয়ে যান। কাজ চালানোর জন্য ৭০-৭৫ জন বন্দিকে একমগ জলে মানিয়ে নিতে হয় সন্ধে থেকে পরদিন সকাল না হওয়া পর্যন্ত। ফলত, রাত বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা ঝাঁঝালো বিশ্রি নাইট্রোজেন-মিশ্রিত গন্ধের পারদ চরতে থাকে। এরই মধ্যে ঘুম-স্বপ্ন-আশা-ভরসার নিয়মিত যাতায়াত।এত কিছুর পরেও অপরাধের তকমা নিয়ে জেলে আসা বহু মেয়েদের কাছে জেল নাকি স্বাধীন হয়ে ওঠার পাঠশালা।
সেই আখ্যানে কখনও দেখা যায়, উঁচু জাতের এলাকায় নিচু জাতের মানুষ বসত করার স্পর্ধা দেখালে, কীভাবে আইন-আদালতের দরজায় অপরাধী হতে হয় এবং ১৪ বছরের জেলজীবন কাটাতে বাধ্য হতে হয়। অথবা, আদিবাসী মাকে অপরাধী প্রমাণ করে রাষ্ট্র যখন তাকে জেলে বন্দি করে, তখন কোনও অপরাধ না করেও সন্তান তার মায়ের সঙ্গে জগৎবিচ্ছিন্ন উঁচু পাঁচিলের আড়ালে শাস্তির দায় ভার বহন করে বেড়ে উঠতে বাধ্য হয়। সেই শৈশবের গায়ে চাঁদের আলো এসে পৌঁছয় না। এই বাচ্চাদের চাঁদকে চিনে নিতে টেলিভিশানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। জেলের বাইরের দুনিয়ায় শিশুদের বেড়ে ওঠার মুহূর্তে টেলিভিশনের উপস্থিতি নিয়ে বাবা-মা স্কুলশিক্ষক-শিক্ষিকারা দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেললেও, জেলে কিন্তু শিশুদের বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠার একমাত্র রাস্তা ওই টেলিভিশনই।
সূর্য ডুবলে পুলিশের খাতায় গোনাগুণতির হিসেব মিটিয়ে বন্দিরা তালাচাবি দেওয়া সেলের ভেতরে চালান হয়ে যান। কাজ চালানোর জন্য ৭০-৭৫ জন বন্দিকে একমগ জলে মানিয়ে নিতে হয় সন্ধে থেকে পরদিন সকাল না হওয়া পর্যন্ত। ফলত, রাত বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা ঝাঁঝালো বিশ্রি নাইট্রোজেন-মিশ্রিত গন্ধের পারদ চরতে থাকে। এরই মধ্যে ঘুম-স্বপ্ন-আশা-ভরসার নিয়মিত যাতায়াত।এত কিছুর পরেও অপরাধের তকমা নিয়ে জেলে আসা বহু মেয়েদের কাছে জেল নাকি স্বাধীন হয়ে ওঠার পাঠশালা।
বিহারের সুনীতা সিং দিল্লির কলেজ থেকে পাশ করে বনেদিবাড়ির বউ হয়ে মাথা কাপড়ে ভাল করে ঢেকে, ছোট ছোট পা ফেলে, ধীর-স্থির, বাধ্য হয়ে বাড়ির পুরুষদের খিদমত খাটতে অভ্যস্ত হতে থাকেন। এই বাড়ির মেয়েদের গান গাওয়া ও জোরে হাসার ওপর থাকে ঘোরতর নিষেধ। গৃহকর্তা তথা শ্বশুরের অনুমতি ছাড়া স্বামীর সঙ্গেও বাড়ির বাইরে পা রাখায় ছিল নিয়ন্ত্রণ। নিজের শোওয়ার ঘরে সুনীতা কী ধরনের পোষাক পরবেন, তাও ছিল কড়া নিয়ম ও অনুশাসনে বাঁধা।
ওই বাড়িতে সুনীতার জা নিয়ম-অনুশাসনের বিরুদ্ধে গিয়ে আত্মহত্যা করলে সুনীতার বিরুদ্ধে জায়ের বাড়ির লোকেরা খুনের অভিযোগ আনেন। সুনীতার ১০ বছরের জেল হয়। উলকাটা হাতে সবসময় সোয়েটার বুনতে থাকা ও জেলের বাচ্চাদের হিন্দি দিদিমণি সুনীতা সিং জেলে এসে স্বাধীনতা খুঁজে পায়। কারণ সবসময় সতর্কভাবে মাথায় কাপড় দিতে হয় না। সুনীতা ইচ্ছেমতো রাতপোশাক পড়তে পারেন। বেলাগাম আওয়াজ করে হাসতে পারেন। জেল সুনীতাকে ভাবনাচিন্তা করতে ও মনোবল বাড়িয়ে নিতে সাহায্য করেছে। জেলে শাস্তি পাওয়া বন্দিজীবন কাটালেও আদতে শ্বশুরবাড়ি সুনীতার কাছে প্রকৃত জেলখানা।
একজন মহিলার পদবির মধ্যে কেবল জাত-ধর্মের চিহ্ন লেগে থাকে, তা কিন্তু নয়। বৈবাহিক পরিচিতির পূর্ণ বিবরণ থাকে। যেমন, সোনম কুমারী মানে অবিবাহিতা নারী। সোনম দেবী মানে বিবাহিতা আর সোনম মোসামাথ মানে বিধবা। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিধবা নারীর প্রাপ্য সম্পত্তি হাতিয়ে পরিবারের মধ্যে রেখে দেয়। অন্যদিকে, বিবাহিত দেওর ও সদ্য স্বামীহারা মেয়েটিকে পাশাপাশি বসিয়ে তাদের মাথায় সমাজিক আচার-নিয়মের চাদর চাপিয়ে ঘোষণা করে দেয়, দেওর তার মৃত দাদার স্ত্রীর দায়িত্ব পালনে বাধ্য থাকবে। অন্যদিকে, বিবাহিত পুরুষকে কবজা করার অপরাধে ভারতীয় আইন-ব্যবস্থা ও সামাজিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধানে বিধবা নারীটি শাস্তিযোগ্য দোষী হয়ে ওঠেন।
অপারাধের বোঝায় জর্জরিত যে সমাজকে কাঠগড়ায় তোলা উচিত, সেখানে অদ্ভুত জীবন-গল্প নিয়ে এই সমাজের আনাচকানাচে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা মেয়েরা, তাদের নিজস্ব চাওয়া-না-চাওয়ার উর্ধ্বে কেবল অপরাধীই হয়ে ওঠেন।
তাদের অপরাধ ঠিক কোথায়? কী জন্য? সেটা বুঝে ওঠার আগেই আদালতে শাস্তি ঘোষণা হয়ে যায়। কখনও আদিবাসী মেয়েটির রান্না করা গরম ভাতের মাটির হাঁড়িতে ছাগল মুখ ঢুকিয়ে খেতে গিয়ে দমবন্ধ হয়ে মারা পড়লে ছাগলের মালিক জঙ্গলে গড়ে ওঠা পুলিশ স্টেশনে নালিশ জানায়। নাগরিক জীবনের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ মিথ্যে কেসে আদিবাসী মা ও তার সন্তানকে জেলে চালান করার বন্দোবস্ত করে দেয়।
রান্নার জায়গায় ছাগল ঢুকে যখন হাঁড়ির ভাতে ভাগ বসাতে চায়, সেখান থেকেই বোঝা যায়, লতাপাতা দিয়ে কোনওভাবে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করা আদিবাসী এই মা, সমাজ ও জীবনে কোন আর্থসামাজিক স্তরে বসবাস করে থাকেন। জেলখানাতে স্পষ্ট হয়, আদিবাসী মেয়েদের এ-দেশে তথাকথিত সভ্যসমাজের উপযোগী কাজ পেতে গোপন করতে হয় আদিবাসী পরিচয়। নিদারুণ আর্থিক অসংগতি থেকে বাঁচতে আদিবাসী মেয়েদের দশ-বারো বছর বয়সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে শহরমুখো হতে হয়। কাজ পেয়ে থিতু হলে সেই মেয়েরাই আবার গ্রামের পরবর্তী দশ কিংবা বারো বছর বয়সিদের শহরে কাজের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। আইনের হিসেবে এই পরম্পরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও, ঝাড়খন্ডে আদিবাসী মেয়েদের না খেতে পাওয়া জীবনই দিব্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরম্পরা হয়ে থাকে।
জেলখানার যাবতীয় রাগ-ক্ষোভ, যন্ত্রণা, আশ্বাস, অস্বস্তি, ভরসা ও স্বপ্নের অভিজ্ঞতা কারাগারের উঁচু পাঁচিল টপকে ঠিক সামনে চলে আসে। ‘কারাগার থেকে বলছি’ নামে ছয় ফর্মার একটি গ্রন্থ, বাংলা অনুবাদে ‘কমিটি ফর দ্য রিলিজ অফ পলিটিক্যাল প্রিজনার্স’ পশ্চিমবঙ্গ শাখার উদ্যোগে প্রকাশ পেয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বয়সের নারীদের উদ্যোগ এক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো। গল্পের শেষে পাঠকও উদ্যোগী ভূমিকায় আয়নার সামনে দাঁড়ায় বুঝে নিতে, পিতৃতান্ত্রিক বোঝার কালসিটে দাগ আমাদের চোখে-মুখে, শ্রমে-ক্লান্তিতে, ঠিক কতটা লেগে আছে। ফলত, এই গল্পের ঘাত-প্রতিঘাত কতটা পাঁচিলের ভেতরের আর কতটা বাইরের সে হিসেব এই বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে বুঝে নেওয়ার দায় পাঠকের।




