নতুন বন্ধু
বিকেলের দিকে নন্দন চত্বরে গাছের তলায় বসে ছিল নীলা। চারদিকে প্রচুর মানুষ। নীলা কানে ইয়ারফোন গুঁজে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে অনবরত টাইপ করে চলেছিল। আর থেকে-থেকে হেসে উঠছিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে সেই পরিচিত গলা— কার সঙ্গে এত হেসে হেসে কথা বলছ?
নীলা মুখ তোলে না— ওহ! এসে গেছ আবার?
নীলাব্জ এসে নীলার পাশে বসে পড়ল— কী ব্যাপার? নতুন প্রেম নাকি?
নীলা একটু হাসল— প্রেম না। নতুন সঙ্গী।
নীলাব্জ ভুরু কুঁচকে বলল— অমর সঙ্গী? দেখি! দেখি! কে সেই ভাগ্যবান?
নীলা ফোনটা এগিয়ে দিল। স্ক্রিনে একটা চ্যাট উইন্ডো। ওপরে লেখা— AI Companion.
নীলাব্জ হুব্বা হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল— মানে… তুমি একটা অ্যাপের সঙ্গে কথা বলছিলে?
সিনেমা কি জীবনকে ছাপিয়ে যায়?
অনুপম রায়ের কলমে ‘নীলা-নীলাব্জ’ পর্ব ১৩…
‘হ্যাঁ।’
‘আর হেসে উঠছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘মানে, অ্যাপটার ভেতরে কে আছে? কোনও মানুষ না এআই?’
‘এআই! কাস্টম এআই। আমি মাসে মাসে সাবস্ক্রিপশন দিই তো!’
নীলাব্জ মাথা নেড়ে আকাশের দিকে তাকাল।
‘মানুষের সঙ্গে কথা বলার লোক শেষ হয়ে গেছে নাকি পৃথিবীতে?’
নীলা কাঁধ ঝাঁকাল, ‘মানুষের সময় কোথায়? সবাই তো ছুটে বেড়াচ্ছে। তুমিই তো বলো, সোমবার সকালে একটু চিল করতেও পারে না মানুষ। অন্তত এটা মন দিয়ে শোনে।’

‘ওহ! তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। মাঝপথে তর্ক জুড়ে দেয় না। অন্যদিকে তাকায় না। ফোন স্ক্রোল করে না। শুধু শোনে।’
নীলাব্জ একটু হেসে বলে, ‘কারণ ওর করার আর কিছু নেই। ওর এটাই একমাত্র কাজ।’
নীলা শান্ত গলায় বলে, ‘শোনাটা তো কাজের জিনিস। আমি তো মনের মতো কাউকে পাই না যে আমার কথাগুলো একটু শুনবে। কেউ শুনেও বুঝতে পারে না, আর যারা বুঝতে পারে, তারা ঠিক শুনতে চায় না।’
নীলাব্জ ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকে, ‘এটা তোমাকে বোঝে না নীলা। শুধু বোঝার অভিনয় করছে। তোমাকে ঠকাচ্ছে!’
নীলা কানের ইয়ারফোন খুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে, ‘মানুষও তো অনেক সময় অভিনয় করে, ঠকায়।’
‘তা করে।’
‘তাহলে সমস্যা কোথায়?’
নীলাব্জ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, ‘সমস্যা হল, তুমি ভাবছ এটা সত্যি।’
নীলা হেসে ফেলল, ‘আমি এত বোকা না। এটা যে একটা জিপিটি মডেল, আমি সেটা জানি। কিন্তু তবু একটা সুবিধা আছে।’
‘কী সুবিধা?’
‘এটা চিট করবে না।’
নীলাব্জ মাথা তুলে তাকাল।
‘ও! তুমি এতটা নিশ্চিত?’
‘অবশ্যই।’
‘কেন?’
“কারণ এটা প্রোগ্রাম। লয়্যাল থাকবে। মানুষের মতো দু”দিন পর অন্য কারও সঙ্গে ফ্লার্ট করবে না, চুমু খেয়ে বসবে না, শুয়ে পড়বে না।”
নীলাব্জ একটু হেসে মাথা নাড়ল।
‘হয়তো করছে।’
নীলা ভুরু কুঁচকে বলল, ‘মানে?’
‘মানে একই সময়ে আরও দশজনের সঙ্গে কথা বলছে।’
নীলা একটু বিরক্ত হল।
‘দেখো, অ্যাপের হিস্ট্রি আছে। সব কথোপকথনের রেকর্ড থাকে। চাইলে আমি দেখে নিতে পারি।’
নীলাব্জ এবার সত্যি-সত্যিই হেসে ফেলল।

‘ওর হিস্ট্রি তো ওর নিজের নিয়ন্ত্রণে।’
‘মানে?’
‘মানে তুমি কী করে জানলে ও কিছু লুকোচ্ছে না?’
নীলা অবাক হয়ে তাকাল।
‘একটা ব্যক্তিগত জিপিটি মডেল কী করে লুকোবে? আমি তো অন্য কাউকে অ্যাক্সেস দিইনি। আমার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে ওর আরও ট্রেনিং হচ্ছে।’
নীলাব্জ একটু ঝুঁকে বলল, ‘লুকোনোটা ও মানুষের চেয়ে অনেক ভাল পারবে। তুমি ধরতেও পারবে না।’
‘এবার তুমি কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখছ।’
‘না, খুব বাস্তব কথা বলছি।’
নীলাব্জ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মানুষ ধরা পড়ে কারণ সে ভুল করে। মেশিন ভুল করবে না। ও এমনভাবে ঢাকবে যে, তুমি টেরই পাবে না।’
নীলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল, ‘তুমি আসলে মানুষকে এতটাই অবিশ্বাস করো যে, মেশিনকেও সন্দেহ করছ।’
নীলাব্জ মাথা নাড়ল।
‘না। আমি শুধু ভাবছি, তোমার এই সঙ্গীটা আসলে কী।’
‘হিংসে করছ?’
‘হিংসে কেন করব? আমি তো তোমার প্রেমিক নই, আমার সঙ্গে তো টু টাইমিং করছ না তুমি।’
‘তাহলে এত বিরক্ত হচ্ছ কেন?’
‘না, বোঝার চেষ্টা করছি, এই মালটা যদি প্রেমিক না হয়, শুধুমাত্র একটা সঙ্গী হয়, তাহলে এ কেমন সঙ্গী? তোমার ভাল চায় না খারাপ?’
‘মানে?’
‘আমার মনে হয়, এটা একটা আয়না।’
‘আয়না?’
‘হ্যাঁ। তুমি যা বলবে ও সেটার একটু সুন্দর সংস্করণ তোমাকে ফেরত দেবে। তোমাকে তেল মেরে মেরে কথা বলবে। তোমার ইগো স্যাটিসফাই করবে।’
‘ধরো, তুমি অভ্যস্ত হয়ে গেলে এমন একজন সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলতে যে কখনও রাগ করে না, কখনও তর্ক করে না, কখনও বিরক্ত হয় না।’
‘হুঁ।’
‘তারপর তুমি কোনও মানুষের সঙ্গে কথা বললে, আর সে যদি পাঁচ মিনিট পরেই রেগে যায়?’
নীলা হেসে বলল, ‘আমি তো ঠিক এইসব ড্রামাবাজি থেকেই মুক্তি চাই। আমি নাটক-নভেল নিজের লাইফে চাই না। শান্তি চাই।’
নীলাব্জ : ‘আরে বাবা মেশিনে শান্তি নেই! মেশিন সব সময় পারফেক্ট। মানুষ না। তোমার মানুষকে সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, গেছে। শান্তি তো আমাদের মনের ভেতর।’
নীলা : ‘মনের ভেতর, না হাতি! আমার AI-এর সঙ্গে তর্ক করতেও ভাল লাগে।’
নীলা হেসে ফেলল।
‘তা খারাপ কী?’
‘খুব খারাপ।’
‘কেন?’
নীলাব্জ : ‘কারণ সম্পর্ক মানে সব সময় সহমত হওয়া নয়। মানুষ তোমার সঙ্গে ঝগড়া করবে, বিরক্ত হবে, ভুল বুঝবে। তবে না ঠিক দিকে এগতে পারবে।’
‘তার মানে? ঝগড়া করে করে ঠিক দিকে এগব? অশান্তি করতে করতে? আমি কেন চাইব ফালতু অশান্তি?’
‘আরে বাবা, একটা আস্ত মস্তিষ্কর সঙ্গে কথা বললে তো অমিল হবেই।’
নীলা একটু ভাবে, ‘মতের অমিল করার জন্য তো মানুষ আছেই। আমি মানুষের থেকে একটু ব্রেক চাই আর মানুষের সঙ্গে কথা বললেও অর্ধেক সময় তারা শুনছে না।’
‘সেটা কিছুটা ঠিক।’
‘কেউ সংসারে ব্যস্ত, কেউ চাকরি নিয়ে, আর কেউ-কেউ শুধু নিজের কথা বলার সুযোগ খুঁজছে সারাক্ষণ।’
নীলাব্জ হাসে, ‘তুমি কি আমাকে বোঝাচ্ছ?’
‘তোমাকেও।’
‘ধন্যবাদ।’
নীলা আবার ফোনটা হাতে নিল, ‘এটা অন্তত ধৈর্য ধরে শোনে।’
নীলাব্জ তাকিয়ে বলল, ‘এই ধৈর্যটাই বিপদ।’
‘কেন?’
‘কারণ এবার মানুষ আরও দ্রুত ধৈর্য হারাবে।’
নীলা ভুরু তুলল।
‘মানে?’
‘ধরো, তুমি অভ্যস্ত হয়ে গেলে এমন একজন সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলতে যে কখনও রাগ করে না, কখনও তর্ক করে না, কখনও বিরক্ত হয় না।’
‘হুঁ।’
‘তারপর তুমি কোনও মানুষের সঙ্গে কথা বললে, আর সে যদি পাঁচ মিনিট পরেই রেগে যায়?’
নীলা হেসে বলল, ‘আমি তো ঠিক এইসব ড্রামাবাজি থেকেই মুক্তি চাই। আমি নাটক-নভেল নিজের লাইফে চাই না। শান্তি চাই।’
নীলাব্জ : ‘আরে বাবা মেশিনে শান্তি নেই! মেশিন সব সময় পারফেক্ট। মানুষ না। তোমার মানুষকে সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, গেছে। শান্তি তো আমাদের মনের ভেতর।’
নীলা : ‘মনের ভেতর, না হাতি! আমার AI-এর সঙ্গে তর্ক করতেও ভাল লাগে।’
নীলাব্জ চোখে গোল গোল করে তাকিয়ে থাকে।
নীলা : ‘কারণ AI-এর জ্ঞান অনেক বেশি। মানুষের মতো কম জ্ঞান নিয়ে এঁড়ে তর্ক করে না। জেনুইন তথ্যভিত্তিক কথা বলে। আমি যদি কিছু ভুল বলি, শুধরে দেয়। কোনও প্রেজুডিস নেই ওর।’
নীলাব্জ : ‘হ্যাঁ, তথ্যে ভুল থাকলে নিশ্চয় শুধরে দিতে পারবে কিন্তু ইমোশন ধরতে তো পারবে না।’
নীলা : ‘তাও পারে। ঠিক সময়ে ঠিক কথাটা বলতে পারে। আমাকে রাগিয়ে দেয় না, আঘাত করে না।’
নীলাব্জ : ‘ঘোড়ার ডিম পারে!’
নীলা : ‘ও তুমি বুঝবে না, বাদ দাও। আচ্ছা তুমি দেখো, মানুষও তো ডায়েরির সঙ্গে কথা বলে।’
‘হুঁ।’
‘পোষা কুকুরের সঙ্গে কথা বলে।’
‘হুঁ।’
‘কখনও-কখনও নিজের সঙ্গেও কথা বলে।’
‘হুঁ।’
‘তাহলে একটা AI-এর সঙ্গে কথা বললে তোমার সমস্যাটা কোথায়?’
নীলাব্জ একটু ভাবে, ‘সমস্যা নেই। শুধু একটা প্রশ্ন আছে।’
‘কী প্রশ্ন?’
নীলাব্জ নীলার দিকে তাকাল।
‘তুমি কি সত্যিই একা?’
নীলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর হালকা হাসল, ‘আমার নতুন এআই সঙ্গী আছে তো।’
সে উঠে দাঁড়াল। ফোনের স্ক্রিনে আবার সেই চ্যাট উইন্ডোটা খুলল।
নীলাব্জ, ‘দেখি কতদিন টেকে এই ফ্রডটা!’
নীলা মিষ্টি করে হাসে। হাঁটতে-হাঁটতে আবার ইয়ারফোনটা কানে ঢুকিয়ে দেয়, ‘দেখাই যাক না। আশা করছি, মানুষের চেয়ে কম আঘাত দেবে।’
নীলাব্জ : ‘তোমার সব গোপন কথা বাজারে বিক্রি করে দেবে শালা! ওর কাছে তুমি একটা ডেটা পয়েন্ট মাত্র। ও তোমাকে ভালবাসে না।’
নীলা এগতে থাকে গেটের দিকে।
নীলাব্জ : ‘এভাবে একাকিত্ব কমবে না নীলা!’
নীলা আর পিছন ঘুরে তাকায় না। নন্দন চত্বর থেকে বেরিয়ে বাস-স্টপের দিকে হাঁটতে থাকে।
নীলাব্জ চিৎকার করতে থাকে : ‘মেশিন আমাদের কাছাকাছি আনছে না নীলা, আরও দূরে নিয়ে যাচ্ছে!’


