দু’টি চরিত্র। একজন সাহিত্যজগতের সর্বকালীন বিস্ময় ’ইউলিসিস’ স্রষ্টা জেমস জয়েস। জন্ম আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে, ১৮৮২ সালে। ব্যাপটাইজড হওয়ার পর, তাঁর নাম হয় জেমস অগাস্টিন জয়েস।
দ্বিতীয় জন নোরা বার্নাকল। ১৮৮৪ সালে জন্ম আয়ারল্যান্ডের গালওয়ে-তে। ছিলেন ডাবলিনে একটি হোটেলের পরিচারিকা।
১৯০৪ সালের ১৬ জুন সন্ধ্যায় তাঁদের প্রথম মিলন। জয়েস ২২, নোরা ২০। দীর্ঘ ২৭ বছরের প্রেমিকা এবং পরবর্তীতে স্ত্রী নোরা-কে আট বছর ধরে (১৯০৪-১৯১২) ৫৩টি চিঠি লিখেছিলেন জয়েস। তথ্যমূল্য, সাহিত্যমূল্য এবং বাণিজ্যমূল্যের নিরিখেও ঐতিহাসিক এই চিঠিগুলি। বিংশ শতাব্দীতে নিলামে ওঠা সর্বাধিক দামি পত্রাবলি হিসেবে স্বীকৃত। ২০০৪ সালে লন্ডনে চিঠিগুলি নিলামে ওঠে। মূল্য উঠেছিল ২,৪০,৮০০ পাউন্ড। ভারতীয় অর্থমূল্যে ২৬ কোটিরও বেশি।
আরও পড়ুন : কবির মুখ বুজে থাকা মানায় না, দেখিয়েছিলেন ওক্তাভিও পাজ! লিখছেন অভীক মজুমদার…
এই প্রথম বাংলায় ৫৩টি চিঠি অনূদিত হয়েছে। সোনালী চক্রবর্তীর ভূমিকা ও অনুসৃজনে। নোরা বার্নাকল-কে জেমস জয়েস প্রথম চিঠিটি লিখেছিলেন ১৯০৪ সালের ১৫ জুন। অর্থাৎ, প্রথম মিলনের আগের দিন। বাংলা অনুবাদে সেখানে নোরা-কে ‘আপনি’ সম্বোধন করে জয়েস লিখেছেন, ‘আমি সম্ভবত দৃষ্টিশক্তিহীন। দীর্ঘ, দীর্ঘ সময় লালচে খয়েরি চুলের একটা মাথার দিকে তাকিয়ে থাকার পর আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হল তা আপনার নয়। বিবর্ণ বিষণ্ণতাকে সঙ্গী করে বাড়ি ফিরলাম। একটা দিন শুধু আপনাকে দেখার জন্য চাইতে ইচ্ছে হয় কিন্তু সেটা হয়তো আপনার ভাল লাগবে না। শুধু আশা করতে পারি যদি ইতিমধ্যে আমাকে ভুলে না গিয়ে থাকেন, একদিন আপনিই আমার কাছ থেকে তা চেয়ে নেবেন, এটুকু মায়া তো আসবে কোনও না-কোনও দিন।’ মিলন-পরবর্তী দ্বিতীয় চিঠিতে ১২ জুলাই, ১৯০৪ তারিখ বসানো আছে। চিঠিতে লেখা বিষয় থেকে মনে হয়, মঙ্গলবার লিখিত হয়েছিল ওই পত্র। তবে অনুবাদক জানিয়েছেন, এই তারিখ জয়েস নিছক অনুমানের ভিত্তিতে বসিয়েছিলেন বলে ধারণা করা যেতে পারে, কারণ ১৯০৪ সালের জুলাই মাসে যে চারটি মঙ্গলবার ছিল, তাদের তারিখগুলি হল ৫, ১২, ১৯ ও ২৬। এই তথ্য-হতে বাইরে বেরিয়ে আমরা দেখি ‘আপনি’ সম্বোধন উধাও হয়ে ‘তুমি’। আদর-মাখানো এই চিঠি শুরু হচ্ছে এভাবে— ‘আমার ছোট্ট বাদামি জুতোওয়ালা পরি…’।
পরবর্তী পত্র-সমূহে বহু স্তর। প্রেমে পূর্ণ, যৌন কামনায় উদ্দাম। অকপটে আত্মপ্রকাশ। সপ্তম চিঠিতে লেখেন, ‘জানো যখন তোমার সঙ্গে থাকি, আমি আমার মজ্জাগত অবজ্ঞা আর যাবতীয় সন্দেহপ্রবণতাকে একদম দূরে, বহুদূরে সরিয়ে ফেলি। আমার কাঁধের উপর তোমার মাথাটাকে এই মুহূর্তে পেতে অসম্ভব ইচ্ছে করছে নোরা।’ (১৫ অগাস্ট, ১৯০৪)
বছর শেষ হয়ে আসে। ডিসেম্বর (?) মাসে তারিখবিহীন একটি চিঠি পাওয়া গেছে। মনে করা হয়, ক্যাফে-তে বসে একটি চিরকুটে এই চিঠিটা লিখে টেবিলের তলা দিয়ে নোরা-কে দিয়েছিলেন।
‘প্রিয় নোরা,
ভগবানের দোহাই, অন্তত আজ রাতে যে-কোনও অজুহাতেই হোক আমাদের অসুখী থাকতে দিয়ো না, যদি কোথাও কোনও সমস্যা হয়ে থাকে আমাকে দয়া করে জানাও সেটা। আমি ইতিমধ্যেই কাঁপতে শুরু করেছি আর খুব তাড়াতাড়ি যদি আগের মতো আমার দিকে না তাকাও অন্তত একবার, সারারাত হয়তো এই ক্যাফের সামনের রাস্তায় এপাশ থেকে ওপাশে হেঁটেই কাটিয়ে দিতে হবে। তুমি যা-ই-ই করো-না-কেন, আজ রাতে আমি কিছুতেই বিরক্ত হব না। যখন আমাদের সংসার হবে, তোমাকে হাজার হাজার চুমু খাবই খাব।‘’
সময় এগিয়ে চলে। এসে গেছে ১৯০৯। ১৯০৫ সালে জন্মে গেছে তাঁদের প্রথম সন্তান জর্জ। হঠাৎ উঠল ঝড়। জংলা ঝোপের বৃষ্টিস্নাত নীল ফুলের বনে। ভিনসেন্ট কসগ্রেভ নামে একজন তথ্য দিয়ে জানান ও দাবি করেন, নোরা সমান্তরাল একটি প্রেম ও শারীরিক সম্পর্কে দীর্ঘদিন যুক্ত। তার অভিঘাতে লেখা চিঠিতে হতাশা ও বেদনার বুক-ফাটা বহিঃপ্রকাশ— ‘আমার চোখে জল চলে আসছে, অপমান-গ্লানি-অনুশোচনা-যন্ত্রণার জল।… তীব্র হতাশা আর ক্ষোভ আমার হৃদয়কে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে।… নোরা, নোরা গো, কিছু তো দয়া করো এই সর্বস্বান্ত-বিধ্বস্ত-হেরে যাওয়া আমার ভালবাসাটাকে। আর কোনও প্রেমের সম্বোধন আমি তোমাকে কোনওদিন উপহারে লিখতে পারব না কারণ আজ রাতে আমি শিখলাম মানুষ যে-প্রাণকে তার প্রাণাধিক করে তোলে সে তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকে না।
উফ নোরা, আমাদের সবকিছু এইভাবে শেষ হয়ে গেল আজ?’
(১৭ সংখ্যক পত্র, ৬ অগাস্ট, ১৯০৯)
সন্দেহের আগুন অন্তর জ্বালিয়ে খাক করে দেয়। যে ভাষা একদিন ছিল প্রেমময়, তা পালটে গিয়ে হয়ে ওঠে এমনই ভয়ানক… ‘জর্জি কি আমার সন্তান? এগারোই অক্টোবর জুরিখে প্রথম রাত কাটাই তোমার সঙ্গে আর ও জন্মেছিল সাতাশে জুলাই। অঙ্কের হিসাব বলছে ন-মাস ষোলো দিন। আমার স্পষ্ট মনে আছে কতটা কম রক্ত তোমার বেরিয়েছিল সেই রাতে, তাহলে কি আমার আগেই অন্য কেউ তোমার সতীচ্ছদ ছিঁড়ে দিয়েছিল?… কী মূর্খ আমি। জীবনের সমস্তটা সময় ভেবে গেছি তুমি শুধু আমাকেই দিয়ে চলেছ তোমার যাবতীয় কিছু আর তুমি তোমার শরীরকে ভাগ করতে থেকেছ আমি আর আর-একজনের মধ্যে। ডাবলিনের হাওয়ায় হাওয়ায় দ্রুত সংক্রামিত হচ্ছে এক গুজব— আমি অপরের উচ্ছিষ্টভোগী। হয়তো তারা হাসে যখন দেখে এক জারজকে নিজের ছেলে ভেবে আমি ঘুরতে নিয়ে বেরিয়েছি জাহির করে।’
(১৮ সংখ্যক পত্র, ৭ অগাস্ট, ১৯০৯)
কসগ্রেভ-এর তথ্য ও দাবি দুই-ই ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। অচিরেই নিঃসন্দেহ হন সন্দেহ ও ক্রোধে জ্বলতে থাকা জয়েস। ১৯ সংখ্যক চিঠিতে (১৯ অগাস্ট, ১৯৯০) ঝরে পড়ছে অনুশোচনার অশ্রু। ফিরে আসছে পুরনো সেই আদর… ‘আমার খুব আদরের মহীয়সি তুমি নোরা, আমার ঘৃণ্য আচরণের জন্য আমি তোমার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।’ বাহানা দিচ্ছেন… ‘আসলে কি জানো তো, আমার কাছ থেকে তোমাকে সরিয়ে নিতে ওরা আমাকে উন্মাদ করে তুলেছিল।’ পুরুষ-সমাজের যেন মুখপাত্র তিনি, এভাবে রাখছেন তাঁর কৈফিয়ত… ‘আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর কোনো পুরুষ আজ অবধি কোনও নারীর ভালবাসার যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি।’
সাহিত্যে অসীম প্রতিভাধর জয়েস তাঁর চিঠিগুলিতে নিজেকে ক্রমশ বিস্তার করেছেন। নিজের বিষয়ে লিখেছেন যে, তিনি এক ঈর্ষাপ্রবণ, একাকী, অতৃপ্ত, অসুখী, অহংকারী লোক। নোরা-কে লিখেছেন, তুমি একটা ছোট্ট দুঃখী মানুষ। আর তিনি? একটা শয়তানের মতো বিষাদগ্রস্ত পুরুষ। ভালবাসার পাশাপাশি লালসার অস্তিত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে সংকোচে বিহ্বল হয়ে থাকেননি জেমস জয়েস। চিঠিক্রম ৩৬, লিখিত হয়েছে ২ ডিসেম্বর, ১৯০৯… ‘তোমার প্রতি আমার যে অনুভূতি তা যেমন আমাকে অনুমতি দেয় তোমার চোখে প্রতিফলিত হওয়া অনন্ত সৌন্দর্য আর নম্রতার শক্তিকে উপাসনা করতে ঠিক তেমনই আদেশ করে এক ঝটকায় তোমাকে আমার নিচে এনে তোমার নরম তলপেটে মুখ ঘষতে অথবা একটা কুকুর যেভাবে তার মাদীর পিছনে চড়ে মৈথুনে রত হয়, সেই সুখ পেতে— অনুমতি দেয় তোমার পায়ু থেকে বেরোনো দুর্গন্ধ আর ঘামে ভিজে উজ্জ্বল হতে, উলটে ফেলা জামার নগ্ন নির্লজ্জতা মাখতে, আদেশ করে সাদা সাদা ভীষণ মেয়েলি লুকানো খাঁজগুলোকে আবিষ্কার করতে, আরক্তিম গ্রীবা আর জট পেকে যাওয়া চুলের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে— অনুমতি দেয় তোমার সামান্য একটা শ্বাসের শব্দেও চিৎকার করে কাঁদতে, একইসঙ্গে মায়া আর দ্বিধায় দীর্ণ হতে, কোনও সুরের মূর্চ্ছনা বা কোনও বাদ্যযন্ত্রের একটিমাত্র ছড়ের টানেও তোমার শরীরকে ভেবে কেঁপে উঠতে, আদেশ করে তোমার পায়ে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে টের পেতে তোমার আঙুলগুলো আমার শিশ্নকে নিয়ে খেলছে, আমাকে পিছন থেকে আঁকড়ে ধরে বাজাচ্ছে— অনুমতি দেয় তোমার পুরুষ্ট থাইয়ে মাথা গুঁজে থেকে তোমার উত্তপ্ত ঠোঁটকে আমার পুরুষাঙ্গ লেহনের সুযোগ করে দিতে, আদেশ করে তোমার নিতম্বের নরম গাছিদুটোকে খামচে টকটকে লাল যোনিতে সাপ হয়ে জিভ ঢোকাতে।’
ভালবাসার পাশাপাশি লালসার অস্তিত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে সংকোচে বিহ্বল হয়ে থাকেননি জেমস জয়েস। চিঠিক্রম ৩৬, লিখিত হয়েছে ২ ডিসেম্বর, ১৯০৯… ‘তোমার প্রতি আমার যে অনুভূতি তা যেমন আমাকে অনুমতি দেয় তোমার চোখে প্রতিফলিত হওয়া অনন্ত সৌন্দর্য আর নম্রতার শক্তিকে উপাসনা করতে ঠিক তেমনই আদেশ করে এক ঝটকায় তোমাকে আমার নিচে এনে তোমার নরম তলপেটে মুখ ঘষতে…
তাঁর একমাত্র কবিতার বই ‘চেম্বার মিউজিক’-এর যাবতীয় কপি সচেতনভাবে দায়িত্ব নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন জয়েস। কারণ, কবিতার উদ্দেশ্য তাঁর প্রেমিকা, ‘ওরানমোরের জংলা ঝোপের বৃষ্টিস্নাত নীল ফুল’ নোরা-র মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। ঘটনাটির উল্লেখ করে অনুবাদক সোনালী চক্রবর্তী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এটা কি আবেগ নয়?’
এই অনুবাদের প্রাণভোমরা হল সেই আবেগ। যা পেরিয়ে যায় দেশ-কাল-ভাষার সীমানা। চিঠিগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়, যেন বাংলা ভাষাতেই লিখিত হয়েছিল। অনুবাদকের কৃতিত্ব ও সাফল্যে পত্রলেখক যেন-বা একজন বাঙালি! এক্ষেত্রে জাঁক দেরিদা-কে সূচক মেনেছেন সোনালী। দেরিদা-র তত্ত্ব, ‘অনুবাদ কোনও ভাষান্তর নয়, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি সাহিত্য’। মূল আইরিশ থেকে ইংরেজি, সেই ইংরেজি থেকে বাংলা— এই ত্রিস্তরীয় অনুবাদের কারণে কিছু ভাবগত সমস্যা আসা অসম্ভব নয়, এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন অনুবাদক। তাঁর কথায়… ‘সেই কারণে এই অধম অনুবাদক একটি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে, জেমস জয়েসকে খুঁজতে চাওয়া হয়েছে সেই বাংলা ভাষায় যে-ভাষার এমন ক্ষমতা যেখানে ‘আসি বলে স্বচ্ছন্দে চলে যাওয়া যায়’, আবিষ্কার করতে চাওয়া হয়েছে জয়েস নামের যাবতীয় দানবীয় প্রতিভার অধিকারী সেই কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রেমিককে, যিনি বাঙালি’। কারণ… ‘আবেগপ্রবণতায় বাঙালির খ্যাতি জগৎব্যাপী’।
এই মূল্যবান অনুবাদ-গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে জেমস জয়েস বাঙালি হলেন!
‘ক্ষমা করবেন জয়েস’
নোরা বার্নাকল জয়েসকে লেখা জেমস জয়েসের চিঠিপত্র। ভূমিকা ও অনুসৃজন— সোনালী চক্রবর্তী।
প্রকাশক— তবুও প্রয়াস।
দাম— ৩০০।