এই বছর কিয়োটো পুরস্কার পেলেন ভারতীয় শিল্পী নলিনী মালানি। পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রায় সাত লক্ষ মার্কিন ডলার— ভারতীয় মুদ্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু শুধু অর্থমূল্য নয়, সম্মানের দিক থেকেও এই পুরস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে, এ হল জাপান-এর দেওয়া নোবেল পুরস্কার। কথাটা খুব বাড়িয়ে বলা, এমন নয়। ১৯৮৪ সালে এই পুরস্কার শুরুর সময়ে নোবেল কমিটির সঙ্গে আলোচনাক্রমে, নোবেল পুরস্কারের ধাঁচেই, পুরস্কারের নির্বাচন পদ্ধতি নির্দিষ্ট হয়। তবে নোবেল যে যে বিষয়ে দেওয়া হয়, কিয়োটো পুরস্কারের বিবেচ্য বিষয় খানিক আলাদা। এখানে পুরস্কার দেওয়া হয় তিনটি বিভাগে— বেসিক সায়েন্সেস, অ্যাডভান্সড টেকনোলজিস এবং আর্টস অ্যান্ড ফিলজফি। এই ‘আর্টস অ্যান্ড ফিলজফি’ বিভাগে ইতিপূর্বে পুরস্কৃত হয়েছেন— কার্ল পপার, জুরগেন হেবারমাস, ব্রুনো লাতুর বা মার্থা নুসবম-এর মতো দার্শনিক, আকিরা কুরোশাওয়া-র মতো চিত্রপরিচালক, ইসে মিয়াকে-র মতো ফ্যাশন ডিজাইনার, জন কেজ-এর মতো সুরকার, রয় লিখটেনস্টেইন-এর মতো শিল্পীরা। এর আগে ভারতীয়দের মধ্যে এই পুরস্কার পেয়েছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (২০১২ সালে) এবং উস্তাদ জাকির হুসেন (২০২২ সালে)। এ বছর পেলেন নলিনী মালানি। অথচ, জাতীয় মিডিয়ায় অল্পবিস্তর খবর হলেও (এবং আর পাঁচটা উৎপটাং বিষয় নিয়ে উৎসাহের অভাব না ঘটলেও), এমন বড় সুখবর নিয়ে আমাদের জনপ্রিয় মিডিয়ায় বিশেষ কোনও হইচই নেই।
এর কারণ হতে পারে দুটো। প্রথমত, কিয়োটো পুরস্কারের গুরুত্ব বিষয়ে অবহিত না থাকা। আর দ্বিতীয়ত, শিল্পচর্চা বিষয়ে দেশের মিডিয়ার চূড়ান্ত অনীহা। এদেশে শিল্পীরা খবর হয়ে ওঠেন শিল্প-উৎকর্ষের কারণে নয়, শিল্পচর্চার সঙ্গে যোগাযোগহীন অন্য কোনও কারণে। মকবুল ফিদা হুসেন ছবি আঁকার কারণে যতবার মিডিয়ার আকর্ষণের বিষয় হয়েছেন, তার চাইতে ঢের বেশিবার খবর হয়েছেন ‘গজগামিনী’ ও মাধুরী দীক্ষিতের কারণে, বা সরস্বতী-রূপ-জনিত বিতর্কের কারণে। এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রকর গণেশ হালুই নিয়ে বাংলা-বাজারের মিডিয়া কখনও আলোচনা করেছে বলে মনে পড়ে না— অথচ শুভাপ্রসন্ন বার বারই শিরোনামে উঠে আসেন, এবং সেটাও, একবারও, তাঁর শিল্পকর্মের কারণে নয়।
আরও একটি কারণে শিল্পী খবর হয়ে ওঠেন (ভেতরের পাতায় ছোট খবর হলেও), সেটি হল নিলামঘরে ছবি অবিশ্বাস্য বেশি দামে বিক্রি হলে। সেখানে অবশ্য পুরুষ শিল্পীদের রমরমা— যদিও এদেশে বর্তমানে জীবিত শিল্পীদের মধ্যে সবচাইতে দুর্মূল্য যাঁদের শিল্পকর্ম— তাঁদের অন্যতম হলেন অর্পিতা সিং (রীতিমতো বাঙালি, অর্পিতা দত্ত), তবু জনপ্রিয় মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে কোনও আলোচনা কখনওই দেখিনি। শিল্পবাজার এবং জনপ্রিয় মিডিয়ায় শিল্পীদের বরাতে যেটুকু জায়গা জোটে, নারীশিল্পীরা, দুই জায়গায়ই, অনেকাংশে অবহেলিত।
শিল্পবাজারের প্রসঙ্গ যখন উঠলই, তখন বলে রাখি, নলিনী মালানি খুব সচেতনভাবেই নিজেকে দুর্মূল্য গ্যালারি, নিলামঘর, বিক্রয়যোগ্য শিল্পের বাজার থেকে দূরে রাখেন। অনেক সময়ে প্রদর্শনীকক্ষের দেওয়ালে ছবি আঁকেন ও প্রদর্শনীর শেষে সে ছবি মুছে দেন। কয়েক দশক আগেই মুম্বই-এর কেমল্ড গ্যালারি-তে একটি বিখ্যাত প্রদর্শনীতে তিনি ছবি আঁকেন কাগজ-ক্যানভাসের পরিবর্তে, সরাসরি গ্যালারির দেওয়ালে এবং প্রদর্শনীর শেষে যাবতীয় ছবি মুছে দিয়ে দেওয়ালটি আবার সাদা রঙে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। প্রদর্শনীর দেওয়ালে ছবি আঁকা ও প্রদর্শনীর শেষে সেই ছবি মুছে ফেলা, এই ঘরানা— ইরেজার পারফরম্যান্স— নলিনী মালানি গত তিন দশক ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন। বছরকয়েক আগে প্যারিস-এর বিখ্যাত গ্যালারিতে যখন তাঁর সুবিশাল প্রদর্শনী হল— ওই গ্যালারিতে জীবিত ভারতীয় শিল্পী হিসেবে তিনিই প্রথম প্রদর্শনী করার আমন্ত্রণ পেলেন— সেখানেও তিনি প্রদর্শনীর প্রবেশ পথের দেওয়ালে এমন করে দু’খানা মস্ত বড় ছবি রেখেছিলেন, যা মুছে দেওয়া হল। তাঁর নিজেরই কথায়, শিল্পকর্মের ক্ষণস্থায়িত্ব বিষয়ে তাঁর যে অনুভব, এমন কাজ সে কারণেই।
এছাড়াও, তাঁর শিল্পীজীবনের শুরু থেকেই তিনি শিল্পচর্চার মাধ্যম নির্বাচন করেন এমন, যা সাধারণত বিক্রয়যোগ্য নয়— অতএব, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সত্ত্বেও, তাঁর শিল্পকর্ম চট করে কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয় না। আর্থসামাজিক অবস্থান বিচার করলে তাঁর জন্ম উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। সেক্ষেত্রে শিল্পী হিসেবে শুরুর পর্যায়ে যে আর্থিক সংকট— যা অধিকাংশ শিল্পীকেই সমস্যায় ফেলে— সে সমস্যা তাঁর ছিল না। যদিও অন্য সমস্যা ছিল; যেমন লিঙ্গপরিচয়ে যেহেতু তিনি নারী, শিল্পী হয়ে ওঠার ব্যাপারে বাড়ির সম্মতি সহজে পাননি। এমনকী শিল্পীজীবনের শুরুর দিকে যখন তিনি নারীর যৌনতা ও অবদমন নিয়ে কাজ করছেন, এবং যখন সে ছবি রীতিমতো শিল্পীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেও সক্ষম হচ্ছে, তখনও তাঁর বাবা তাঁকে ডেকে বলেছেন— নলিনী, এ বয়সে মেয়েরা বিয়ে-থা করে সংসারী হয়, আর সেখানে তুমি এসব কী করছ! তবু নলিনী শিল্পচর্চার জগৎ-ই আঁকড়ে রেখেছিলেন। এবং নিজের পথে চলবেন, এই জেদও। নিজের শিল্পীজীবনের বিভিন্ন উত্থানপতন ফিরে দেখতে গিয়ে নিজেই বলেছেন— আমি কখনও শিল্পসংগ্রাহক বা গ্যালারির পছন্দের কথা ভেবে ছবি আঁকিনি। যখন আর্থিক সংকটে পড়েছি, আমি নিজের আস্তানা ছেড়ে মায়ের কাছে গিয়ে থেকেছি, কিন্তু যেমন ছবি সহজে বিক্রি হয়, সেই ছবি আঁকার কথা ভাবিনি। তো একে নারী, তদুপরি শিল্পবাজারকে গ্রাহ্য করেন না— এমন শিল্পীর খবর যে খুব বেশি চাউর হবে না, সে তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। বরং নলিনী মালানির আন্তর্জাতিক খ্যাতিই খানিক অপ্রত্যাশিত।
নলিনী মালানির জন্ম ১৯৪৬ সালে। করাচি শহরে। দেশভাগের সময়ে বাবা-মা তাঁকে নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। সেখানে এক দশকেরও বেশি সময় কাটিয়ে পাকাপাকিভাবে মুম্বই, ১৯৫৮ সালে। দেশভাগের যন্ত্রণা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতে না হলেও স্মৃতিতে তা স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। তাই ঘটনার পাঁচ দশক বাদেও তিনি বলেন, দেশভাগ এক রক্তাক্ত ক্ষত, যা থেকে এখনও রক্তপাত বন্ধ হয়নি। ১৯৯৮-’৯৯ সালে তৈরি করবেন মস্ত ভিডিও ইনস্টলেশন— সাদাত হাসান মান্টো-র সেই আশ্চর্য ছোটগল্পকে মনে রেখে, নাম দেবেন— রিমেম্বারিং তোবা টেক সিং।
বাড়ির খানিক অমতেই তাঁর আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়া। আপত্তি কেননা, আর্ট কলেজের ডিগ্রি নিয়ে যদি চাকরি না জোটে! নলিনী বাড়িতে বোঝান, আর্ট কলেজে অ্যানাটমি শেখার সুযোগ থাকবে, যা মেডিক্যাল শিক্ষায় কাজে লাগবে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯, পাঁচ বছর পড়েন মুম্বইয়ের বিখ্যাত জেজে স্কুল অফ আর্ট-এ— কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ বা শান্তিনিকেতনের কলাভবন-এর মতোই— যে স্কুল আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রাবস্থাতেই পান্ডোল আর্ট গ্যালারি-তে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়, যা বিরল ঘটনা। ছবি আঁকার পাশাপাশি ১৯৬৯ সালে আকৃষ্ট হন ভিডিও ইনস্টলেশন জাতীয় শিল্পকর্মে— অন্যান্য মাধ্যমে ধারাবাহিক কাজ করে চলা সত্ত্বেও এই ভিডিও ইনস্টলেশন বা ভিডিও আর্ট তিনি কখনও ছাড়েননি। ওই সময়েই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হবে মুম্বইয়ের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের, তিনি জড়িয়ে থাকবেন থিয়েটারের কলাকুশলীদের সঙ্গেও— শিল্পচর্চার বিভিন্ন মাধ্যম তাঁকে আকৃষ্ট করবে এবং তিনি সেসব পথ থেকেই বিভিন্ন উপাদান আত্তীকরণের মাধ্যমে গড়ে তুলবেন একান্ত নিজস্ব এক শিল্পভাষা। আবার কলেজ থেকে পাস করার পরের বছরই, ১৯৭০ সালে, তিনি বৃত্তি নিয়ে যাবেন প্যারিসে। সেখানে শুনবেন রোলাঁ বার্ত, নোয়াম চমস্কি, ক্লদ লেভি-স্ত্রস-এর লেকচার, কাফেতে দেখা হবে জঁ পল সার্ত্র ও সিমোন দ্য বোভোয়া-র সঙ্গে, আলাপ হবে চিত্রপরিচালক গোদার-এর সঙ্গেও। প্রত্যক্ষ করবেন সেই সময়ের রাজনীতি। ফেলে যাওয়া মুম্বইয়ে তখন সাহিত্যিকরা ভারতীয় মহাকাব্যের চরিত্রদের নতুন সময়ের প্রেক্ষিতে পুনরাবিষ্কার করছেন। আর নলিনী নিজের দেশ ও নিজের সংস্কৃতিকে নতুন করে অনুভব করতে শিখবেন বিদেশের মাটিতে বসে। বোধ-এ যিনি আন্তর্জাতিক, অথচ চরিত্রে নিপাট ভারতীয়— নলিনী মালানি হয়ে উঠবেন এমনই এক শিল্পী। যাঁর চোখে রামায়ণের সীতা আর গ্রিক পুরাণের মেদিয়া, মহাভারতের সহদেব আর গ্রিসের কাসান্দ্রা একাকার হয়ে যায় এবং যাঁর শিল্পচর্চায় বার বারই উঠে আসবে এই সব চরিত্র।
নিজের লিঙ্গ-অবস্থান বিষয়ে নলিনী চিরকালই সচেতন। এবং পুরুষ-শিল্পী ও নারী-শিল্পীদের দেখার চোখ যে সামাজিক কারণে ভিন্ন হয়, ভিন্ন হতে বাধ্য, এই বোধও তাঁর প্রবল। ১৯৭৯ সাল নাগাদ সচেষ্ট হন দেশের নারী-শিল্পীদের একত্রে এনে প্রদর্শনী করতে। সঙ্গে ছিলেন পিলু পিচকানওয়ালা-র মতো নারী-ভাস্কর। এদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের ইতিহাসে— পিলু পিচকানওয়ালা ও মীরা মুখোপাধ্যায়— এই দুই নারীর কৃতিত্ব নিয়ে পুরুষ ভাস্করদের তুলনায় কতটুকুই বা আলোচনা হয়! কিন্তু হাজার উদ্যোগ সত্ত্বেও সেই প্রদর্শনীর জন্য অর্থের জোগান দিতে কেউ এগিয়ে আসেন না। এর সাত বছর বাদে, ১৯৮৬ সালে, নলিনী মালানি, অর্পিতা সিং এবং নীলিমা শেখ, এঁদের লাগাতার প্রয়াসে সেই প্রদর্শনী ঘটে উঠতে পারে। পরের বছর সেই প্রদর্শনীর একখানা ক্যাটালগও প্রকাশিত হয়— জগদীশ স্বামীনাথনের মতো শিল্পী পাশে না দাঁড়ালে সে’টুকুও হয়ত সম্ভব হত না, কেননা সে’সময়ের এক বিখ্যাত শিল্প-সমালোচক, লিঙ্গপরিচয়ে নারী হয়েও এই প্রদর্শনী নিয়ে লিখতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
লিঙ্গ-রাজনীতি ও সমকালীন সমাজ-রাজনীতি, দুই বিষয়েই সচেতন নলিনী— অবশ্য এই দুই রাজনীতিকে কি সত্যিই আলাদা করা যায়!— তাঁর শিল্পের বিষয় হিসেবে যেমন উঠে আসে পুরাণ-মহাকাব্যের চরিত্ররা, তেমনই ধরা থাকে সমকাল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ঘটে চলা রক্তপাত তাঁকে বিচলিত করেছিল। সেই সময়ের অজস্র খুন-ধর্ষণ-নির্যাতন-হাহাকারের খবর ধরে রাখা সংবাদপত্র জমিয়ে রেখে তিনি সৃষ্টি করেন এক আশ্চর্য শিল্পমাধ্যম— সেই সংবাদ-সম্বলিত কাগজের মন্ড দিয়ে তৈরি করেন একের পর এক মানুষের মুখের ভাস্কর্য— যে ভাস্কর্য মাধ্যম হিসেবে ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর হলেও স্মৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি। আবার এই কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ধর্ষণের ঘটনাকে মনে রেখে— আট বছর বয়সের আসিফা বানো-কে ধর্ষণের সেই ঘটনা কে-ই বা ভুলতে পারে— মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলের আশি মিটার উঁচু টাওয়ারের দেওয়ালে তৈরি করেন প্রায় ষাট মিটার উচ্চতার এক মস্ত অ্যানিমেশন-শিল্প, যা কিনা দৃশ্যমান বহু দূর থেকেও।
আসলে সমকাল ও পুরাণ, অতীত ও বর্তমান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক, নারীর সামাজিক অবস্থান ও নিপীড়িত-র যন্ত্রণা— নলিনী মালানির শিল্পচর্চা সবকিছু ছুঁয়েই। তাই তিনি খুব সহজেই বলতে পারেন— ইলিয়াডের কাসান্দ্রা-র কথা মনে পড়ে? রাজার সবচাইতে সুন্দরী কন্যা। দেবতা অ্যাপোলো যাঁর সঙ্গে মিলনে আগ্রহী হন, কিন্তু সে তাঁকে ফিরিয়ে দেয়, আর অ্যাপোলো অভিশাপ দেন, তুমি সবকিছুই আগাম দেখতে ও বুঝতে পারবে, কিন্তু তোমার সেই দেখা কোনও কাজে আসবে না, কেউ তোমার ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করবে না। গ্রীকদের পাঠানো মস্ত কাঠের ঘোড়ার চাতুরি কাসান্দ্রা বুঝেছিল, কিন্তু কেউ তাঁর কথা বিশ্বাসই করল না। আর সেটাই ট্রয়ের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল। তা পরিবেশের প্রসঙ্গই বলুন, বা দেশবিদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি— অনেক কিছু বুঝতে পারলেও আমাদের অবস্থাও কি সেই কাসান্দ্রা-র মতো নয়? শিল্পী হিসেবে, সমকালের অন্যতম ভাষ্যকার হিসেবে— এমন ভাষ্যকার, যাঁর ভাষ্য একই সঙ্গে সমসাময়িক, তাৎক্ষণিক অথচ চিরকালীন— নলিনী মালানির গুরুত্ব প্রসঙ্গে তাঁর নিজের এই কথাটুকুই যথেষ্ট।
নলিনীর শিল্পচর্চা কোনও নিভৃতে বসে উপভোগ করার বস্তু নয়। নিষ্ক্রিয় অবস্থান থেকে সেই শিল্পের আস্বাদন সম্ভব নয়— দর্শকের সক্রিয় অংশগ্রহণ অর্থাৎ সচেতন ও ক্রিয়াশীল দর্শক হয়ে ওঠাটা গুরুত্বপূর্ণ— সে ছাড়া তাঁর শিল্পের মর্মোদ্ধার অসম্ভব। তিনি বলেন— শিল্পী, শিল্পকর্ম এবং দর্শক— তিনের মিলনেই শিল্প। এই তিনের মধ্যে একটি উপাদানও অনুপস্থিত হলে শিল্প হয় না। অতএব, তাঁর শিল্পচর্চার দর্শক হয়ে উঠতে পারাটাও এক ধরনের সচেতন প্রয়াস। অপরদিকে ক্রমাগত দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়া বা দর্শককে আরও জড়িয়ে নেওয়া, নলিনীর শিল্পচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রত্যাশিতভাবেই আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছতে, বিশেষত নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে পৌঁছতে, চুয়াত্তর বছর বয়সে তিনি বেছে নেন সোশ্যাল মিডিয়াও— ইনস্টাগ্রাম। সেখানে ছোট ছোট ভিডিওকে তিনি করে তোলেন নিজের শিল্পমাধ্যম। আর সেই ভিডিওয় দৃশ্যমাধ্যমের সঙ্গে মিশিয়ে দেন সাহিত্যকেও।
এমনই একটি ভিডিওয় জুড়ে থাকে প্রুস্ত-এর অমোঘ উচ্চারণ— একটু স্বপ্ন দেখা যদি বিপজ্জনক হয়ে থাকে, তবে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করাটা সে সমস্যার সমাধান নয়; সমাধান হল, আরও বেশি স্বপ্ন দেখা, সবসময় স্বপ্ন দেখে চলা।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে, এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কথা আর কী-ই বা হতে পারে!